‘সাদা সোনা’য় কপাল পুড়ল মোরালেসের

বলিভিয়ার মূল্যবান খনিজ ধাতু লিথিয়ামকে ‘একবিংশ শতাব্দীর স্বর্ণ’ও বলা হয়

  যুগান্তর ডেস্ক ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইভো মোরালেস। বলিভিয়ায় প্রথমবারের মতো আদি ও মূল জনগোষ্ঠীর একজন হিসেবে ২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। দেশের মানুষের চরম দারিদ্র্য বিমোচনে যেমন ভূমিকা রেখেছেন। তেমনি তার স্বাস্থ্য ও শিক্ষানীতিও ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। চলতি বছরের ২০ অক্টোবর চতুর্থ মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তোলে বিরোধীরা। তাদের দাবি, ভোট গণনায় জালিয়াতি হয়েছে। চরম অশান্ত ও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অঙ্গন। বিক্ষোভের তিন সপ্তাহের মাথায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হন মোরালেস। ‘গণতন্ত্রহীনতা’ ও ‘নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপি’কে মোরালেসের এই ক্ষমতাচ্যুতির কারণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে বিরোধীরা। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মোরালেসকে আসলে ‘কুদেতা বা অভ্যুত্থান’র মাধ্যমে সরিয়ে দেয়া হল। আর এই নেপথ্যে রয়েছে ভূ-রাজনীতি ও বলিভিয়ার একপ্রকার মূল্যবান খনিজ ধাতু। নাম লিথিয়াম। ‘সাদা সোনা’ হিসেবে খ্যাত এই খনিজের কারণেই কপাল পুড়েছে মোরালেসের। বলিভিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ হচ্ছে এই লিথিয়াম। বিশ্বের লিথিয়াম মজুদের প্রায় ৫০ ভাগ আছে বলিভিয়ায় দক্ষিণে আন্দিজ পর্বতমালার একেবারে ওপরের দিকে। পটোসি নামে পরিচিত এই অঞ্চলটি কুইচুরা এবং আমারা আদিবাসীদের গরিব এলাকা। এই লিথিয়ামই হতে যাচ্ছে পরবর্তী বিশ্বের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত বস্তু। মোবাইল থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক কার- আজ ও আগামী দিনের প্রায় সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রের প্রাণভোমরা যে ব্যাটারি, তার প্রধান রসদ লিথিয়াম। স্মার্টফোন-বিপ্লব এগিয়ে নিতে এবং আসন্ন বৈদ্যুতিক গাড়ি-বিপ্লবের জন্য লিথিয়াম ব্যাটারি লাগছেই। যে কারণে একে ‘একবিংশ শতাব্দীর স্বর্ণ’ও বলা হয়। সঙ্গে এ-ও বলা হয়, এ শতাব্দীতে বলিভিয়া হয়ে উঠতে পারে গত শতাব্দীর সৌদি আরবের মতো। কারণ পেট্রোলিয়ামের গুরুত্বের জায়গা নিতে চলেছে লিথিয়াম। পুঁজি ও দক্ষতা বাড়ানো হয়নি বলে বলিভিয়া নিজ উদ্যোগে লিথিয়াম উত্তোলন ও ব্যবহার করতে পারেনি। দশকের পর দশক বিদেশি বহুজাতিক মাইনিং কোম্পানিগুলো এই সম্পদের সুবিধাভোগী। এর মাঝে ছিল ব্রিটিশ-সুইশ ‘গ্লেনকোর’, ভারতীয় ‘জিন্দাল স্টিল’, আর্জেন্টিনার ‘প্যান আমেরিকান এনার্জি’, কানাডার ‘ট্রাইমেটাল মাইনিং’ ইত্যাদি। এসব কোম্পানি বলিভিয়ার খনিজ আহরণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনসমাজের ভালো-মন্দের তোয়াক্কা করেছে কমই।

২০০৬ সালে প্রথম আদিবাসী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় এসে ইভো মোরালেস চাইছিলেন এই সম্পদে জাতীয় সার্বভৌমত্ব বাড়াতে। তার সরকারের একটা সিদ্ধান্ত ছিল খনিজ উত্তোলনের কাজটি বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বলিভিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘কমিবল’ বা ‘ওয়াইএলবি’র সঙ্গে মিলে করতে হবে। মোরালেস সরকার লিথিয়াম উত্তোলন শেষে রফতানির আগে তাতে ‘মূল্য সংযোজন’ করতেও চাইছিল। এভাবে তারা বছরে প্রায় চার লাখ লিথিয়াম ব্যাটারি তৈরির পরিকল্পনা করে। এই ইচ্ছাটিই শেষ পর্যন্ত মোরালেসের জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ায়। বহুজাতিকদের সঙ্গে দর-কষাকষিতে লিপ্ত হয়ে মোরালেস দেশটির অর্থনীতির আকার-আকৃতি কয়েক গুণ বাড়িয়ে নিয়েছিলেন। মোরালেস ক্ষমতায় আসার আগে বলিভিয়া হাইড্রোকার্বন খাত থেকে পেত বছরে ৭৩ কোটি ১০ লাখ ডলার। মোরালেসের আমলে সর্বশেষ এটা দাঁড়িয়েছিল ৪.৯৫ বিলিয়ন ডলারে। কেবল এ ব্যবধানের কারণেই শেষ পর্যন্ত তাকে যেতে হল, এমনটি বলা যাবে না। মোরালেসের বিদায়ের পেছনে নির্বাচনী দুর্নীতির ‘অপরাধ’ও আছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×