দিল্লিতে স্বজন খোঁজা মানুষের কান্না

ড্রেনে ড্রেনে মিলছে লাশ, নর্দমায় মিলল পচা-গলা ১১ লাশ * পুড়েছে মুসলিমদের ১২২ বাড়িঘর ৩২২ প্রতিষ্ঠান * দোষী কাউকে ছেড়ে দেয়া হবে না -মোদিকে কেজরিওয়াল

  যুগান্তর ডেস্ক ০৪ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) কেন্দ্র করে দিল্লিতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর থেকে রাজধানীর নর্দমায় মিলছে লাশ। মঙ্গলবার পর্যন্ত গত পাঁচ দিনে ১১টি পচা গলা লাশ ভেসে উঠেছে।

সব মিলিয়ে কয়েক দিনের ওই সহিংসতায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সাড়ে ৩০০ জন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, প্রতিদিনই হাসপাতালে স্বজনদের খোঁজে মানুষের ভিড় বাড়ছে।

অনেকেই সারা দিন বসে থেকে দিন শেষে নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরছে। এদিকে, সহিংসতার এক সপ্তাহ পর মঙ্গলবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে প্রথমবার বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এদিন বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বিতর্কিত সিএএকে কেন্দ্র করে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে দিল্লির উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন শহরে দাঙ্গা-সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের সামনেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ মুসলিমদের অসংখ্য বাড়িঘর ও দোকানপাট বেছে বেছে আগুন ধরিয়ে দেয় উগ্রপন্থীরা।

টানা তিন দিন ধরে চলে এ হামলা, অগ্নিকাণ্ড। ২৬ ফেব্রুয়ারি দিল্লির নর্দমায় প্রথম গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা অঙ্কিত শর্মার লাশ ভেসে উঠেছিল। তাকে সহিংসতার মধ্যে উন্মত্ত জনতা পিটিয়ে হত্যা করেছিল বলে অভিযোগ তার পরিবারের।

সর্বশেষ রোববার ও সোমবার নর্দমাতে পাওয়া গেছে পাঁচটি অজ্ঞাত মৃতদেহ। মরদেহগুলোর বেশির ভাগই পচে গেছে। ফলে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যাচ্ছে না।

ডিএনএ পরীক্ষা করে এসব মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হবে। তবে ভেসে ওঠা মৃতদেহগুলোর সবই দিল্লির সহিংসতায় নিহত কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করছে পুলিশ।

নর্দমাগুলো সবই ভাসমান বর্জ্য, জলজ উদ্ভিদ ও পলির পুরু স্তরে ভর্তি, জানিয়েছেন যমুনা বিহারের বাসিন্দা কনিষ্ক কুমার। নর্দমাগুলোর কয়েকটি দিল্লি সরকারের সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বিভাগের অধীন; কয়েকটি আবার পূর্ব দিল্লি মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের আওতায়।

এগুলোর নেটওয়ার্ক মূলত একটি মূল নর্দমা- ‘নর্দমা নং ১’কে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে বলে দিল্লির সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এটি উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের পূর্ব যমুনা খাল থেকে শুরু হয়ে লোনি দিয়ে দিল্লিতে ঢুকেছে। ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নর্দমাটি উত্তর-পূর্ব দিল্লি ও উত্তর দিল্লির বিশাল অংশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ওখলা বাঁধ হয়ে নয়ডা দিয়ে বেরিয়ে গেছে।

চারটি বড় বড় নর্দমা বিভিন্ন এলাকা দিয়ে এই ‘নর্দমা নং ১’কে ছেদ করেছে। এর বাইরে আরও ২৪টি সরু নর্দমাও আছে।

দিল্লিতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক চিত্র প্রশাসনের তৈরি করা একটি অন্তর্বর্তী রিপোর্টে উঠে এসেছে। উত্তর-পূর্ব জেলার তৈরি ওই রিপোর্টে বলা হয়, এখন পর্যন্ত সহিংসতার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ১২২টি বাড়ি, ৩২২টি দোকান এবং ৩০১টি গাড়ি।

সোমবার প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানান, চূড়ান্ত রিপোর্টে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। জানা যায়, সাব ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেটদের অধীনে তৈরি ১৮টি দলের পেশ করা তথ্যের ভিত্তিতেই ওই অন্তর্বর্তী রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নির্দেশে এই দলগুলো উত্তর-পূর্ব দিল্লির সহিংসতা বিধ্বস্ত এলাকাগুলোতে ‘ড্যামেজ অ্যাসেসমেন্ট সার্ভে’ চালিয়েছে।

দাঙ্গার পর থেকে এখনও প্রায় ৭ শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের খোঁজে হাসপাতালে ছুটছেন স্বজনেরা। মর্গে নতুন কোনো লাশ এলে সেখানে দৌড়াচ্ছেন।

গুরু তেজ বাহাদুর (জিটিবি) হাসপাতালে আসা সোনিয়া বিহারের বাসিন্দা পঙ্কজ বলেন, ‘আমার মা পুনম সিং এবং ভাগ্নে শাগুন ২৭ ফেব্রুয়ারি এ হাসপাতালে আসেন চিকিৎসার জন্য।

তারপর থেকে তাদের খোঁজ মিলছে না। লোক নায়ক হাসপাতাল, জগপ্রদেশ চন্দ্র হাসপাতালেও খোঁজ নিয়েছি, পাইনি। আমার মায়ের ফোনও বন্ধ পাচ্ছি।’ জিটিবি হাসপাতালে ভাই নাইমুদ্দীনের খোঁজে আসেন নাজিমুদ্দীন।

নাইমুদ্দীন চাউরি বাজারের একটি বই বাঁধার দোকানে কাজ করতেন। জাফরাবাদের বাসিন্দা নাজিমুদ্দীন বলেন, দাঙ্গার দ্বিতীয় দিন ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

ওই দাঙ্গায় নিহত হয়েছেন সনু নামের ৩২ বছরের যুবক। তার লাশ নিতে সোমবার জিটিবি হাসপাতালে সারা দিন অপেক্ষায় ছিলেন বাবা অনিল কুমার ও ভাই আসু।

আমির ও আসিফের লাশ নিতে হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা বাবু বাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। জিটিবি হাসপাতালে অন্তত ৪০টি লাশ এসেছে। এর মধ্যে এখনও ১৫টি লাশ শনাক্ত করা যায়নি।

এদিকে, মোদির সঙ্গে বৈঠকে কেজরিওয়াল বলেন, ‘আমাদের জাতীয় রাজনীতির স্বার্থে এ ধরনের দাঙ্গায় যাওয়া উচিত নয়।

ঘটনাপ্রবাহ : ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল বিতর্ক

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত