গ্রিস সীমান্তে মরছে ইউরোপের মানবতা
jugantor
গ্রিস সীমান্তে মরছে ইউরোপের মানবতা
৩২ হাজার আটক সীমান্ত সুরক্ষায় ৭০ কোটি ইউরো

  যুগান্তর ডেস্ক  

০৯ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রিস সীমান্তে ভয়াবহ এক মানবিক ট্র্যাজেডি ঘটছে। হাজার হাজার অভিবাসী তুরস্ক-গ্রিস সীমান্ত দিয়ে গ্রিসে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।

গ্রিস সীমান্তে ভয়াবহ এক মানবিক ট্র্যাজেডি ঘটছে। হাজার হাজার অভিবাসী তুরস্ক-গ্রিস সীমান্ত দিয়ে গ্রিসে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।

গ্রিক পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত কয়েকদিনে প্রায় ৩২ হাজার শরণার্থী গ্রিক সীমান্তে আটক করা হয়েছে।

অভিবাসীপ্রত্যাশীদের অনেকে বলেছেন, পুলিশ তাদের প্রহার করেছে। তাদের সঙ্গে থাকা অর্থ কেড়ে নিয়েছে। পায়ের জুতা কেড়ে নিয়েছে। এরপর তুরস্কের দিকে একটি ট্রাকে তাদের দলা পাকিয়ে ফেলে দেয়া হয়েছে।

একজন অভিবাসী তার শার্ট খুলে দেখিয়েছেন পিঠে প্রহারের দাগ কিভাবে স্পষ্ট হয়ে আছে। তারা ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। সব মিলিয়ে ইউরোপের মানবতা এখন গ্রিস সীমান্তে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। ওই অঞ্চল সফর করেছেন ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি মেইলের সাংবাদিক ইয়ান বিরেল।

তিনি ওই মানব ট্র্যাজেডি প্রত্যক্ষ করে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। তার কাছে নির্যাতিত এসব অভিবাসী বলেছেন, তারা অন্তঃসত্ত্বা একজন নারীকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় তাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসে।

আবদুল রাজ্জাক আল মুহাদ নামে এক অভিবাসী বলেছেন, তার পরিবার একটি বনের ভেতর ৫ দিন আত্মগোপন করে কাটিয়েছেন। তারপর গ্রিক পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। তাদের সঙ্গে থাকা সবকিছু কেড়ে নিয়েছে তারা।

ফরেন পলিসি বলছে, গত এক মাসের মধ্যে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সব আবেদন বাতিল করেছে গ্রিস। অবৈধভাবে সীমান্ত টপকানোর সব ধরনের প্রচেষ্টাও নস্যাৎ করে দিয়েছে দেশটি।

গ্রিস ‘ইউরোপের ঢাল’ হিসেবে কাজ করছে। বিনিময়ে দেশটিকে ৭০ কোটি ইউরো অর্থনৈতিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট কমিটির পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান ডেভিড ম্যাক এলিস্টার বলেন, গত বছর ইউরোপের অভিবাসী হওয়ার জন্য ১৩ লাখ মানুষ আবেদন করেছিল। সম্প্রতি তুর্কি সীমান্ত খুলে দেয়ায় ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় সীমান্তে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে।

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধে রক্তগঙ্গা বয়ে যাওয়ার ফলে সেখান থেকে পালিয়ে কয়েক বছর আগে দক্ষিণ তুরস্কে একজন শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন মুহাম্মদ। গত সপ্তাহে তিনি শুনতে পান গ্রিস সীমান্ত খুলে দেয়া হয়েছে। মুহাম্মদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল ইউরোপে যাওয়া।

ফলে এমন খবর পেয়ে তিনিও পা বাড়ান অন্ধকার এক ভয়াবহ জগতে। অনেকের সঙ্গে তিনি তুরস্ক-গ্রিস সীমান্ত পাড়ি দেন। গ্রিসের ভেতর দিয়ে কয়েক ঘণ্টা হাঁটতে থাকেন। কিন্তু তাকে স্থানীয় লোকজন চিনতে পারে। তারা পুলিশে খবর দেয়।

মুহাম্মদ বলেন, তারা আমাদের কাছে থাকা সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আমাদের প্রহার করেছে। এতে তাদের একজনের নাক ভেঙে গেছে। অন্য একজনকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে পেটানো হয়েছে। এরপর ফেরত পাঠানো হয়েছে তুরস্কে। এ সময় তিনি শার্ট খুলে দেখান গায়ে প্রহারের চিহ্ন। মুহাম্মদ আরও বলেন,

পুলিশ তার স্ত্রীকেও মেরেছে। তিনি শুধু কাগজপত্র ফেরত চেয়েছিলেন। কারণ তার ভেতর তাদের বিয়ের সনদ রয়েছে।

ইয়ান বিরেল লিখেছেন, এই স্থানটি ইউরোপের সবচেয়ে গোলযোগপূর্ণ এলাকা। এর মূলে রয়েছে সিরিয়া যুদ্ধের সংকট। ৯ বছর পরও সেই যুদ্ধ এখনও চলছে।

সেখানে যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন আমি ছিলাম রাজধানী দামেস্কে। আমি ছিলাম বয়সে তরুণ। সেখানে রক্তপাত, বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে দেখেছি গণতন্ত্র কিভাবে মরে যাচ্ছে।

এই যুদ্ধে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫ লাখ মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৭০ লাখ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সিরিয়া যুদ্ধ এখন স্থান বদল করে পৌঁছে গেছে ইউরোপের দ্বারপ্রান্তে। এ অবস্থায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান অভিবাসীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে ইউরোপকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছেন।

এজন্য কিছু বিশ্লেষক তাকে অভিযুক্ত করেছেন। তারা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে তুর্কি প্রেসিডেন্ট সিরিয়ার যুদ্ধকে গ্রিস সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন। একটি বিষয় সুনিশ্চিত। তা হল- এই দুটি দেশের মধ্যবর্তী সীমান্তে মৃত্যু এবং নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়েছে।

শনিবার সীমান্তে আরও বাজে দৃশ্য দেখা গেছে। ছোড়া হয়েছে কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট। এ সময় অভিবাসীরা ‘সীমান্ত গেট খুলে দাও’ স্লোগান দিতে থাকেন। অনেকে সীমান্তের বেড়া ধরে ধাক্কা দিতে থাকেন। অনেকে অভিযোগ করেছেন, গ্রিক পুলিশ তাদের সন্ত্রাসী বানিয়ে দিচ্ছে।

গ্রিস সীমান্তে মরছে ইউরোপের মানবতা

৩২ হাজার আটক সীমান্ত সুরক্ষায় ৭০ কোটি ইউরো
 যুগান্তর ডেস্ক 
০৯ মার্চ ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
গ্রিস সীমান্তে ভয়াবহ এক মানবিক ট্র্যাজেডি ঘটছে। হাজার হাজার অভিবাসী তুরস্ক-গ্রিস সীমান্ত দিয়ে গ্রিসে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।
ছবি: সংগৃহীত

গ্রিস সীমান্তে ভয়াবহ এক মানবিক ট্র্যাজেডি ঘটছে। হাজার হাজার অভিবাসী তুরস্ক-গ্রিস সীমান্ত দিয়ে গ্রিসে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।

গ্রিক পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত কয়েকদিনে প্রায় ৩২ হাজার শরণার্থী গ্রিক সীমান্তে আটক করা হয়েছে।

অভিবাসীপ্রত্যাশীদের অনেকে বলেছেন, পুলিশ তাদের প্রহার করেছে। তাদের সঙ্গে থাকা অর্থ কেড়ে নিয়েছে। পায়ের জুতা কেড়ে নিয়েছে। এরপর তুরস্কের দিকে একটি ট্রাকে তাদের দলা পাকিয়ে ফেলে দেয়া হয়েছে।

একজন অভিবাসী তার শার্ট খুলে দেখিয়েছেন পিঠে প্রহারের দাগ কিভাবে স্পষ্ট হয়ে আছে। তারা ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। সব মিলিয়ে ইউরোপের মানবতা এখন গ্রিস সীমান্তে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। ওই অঞ্চল সফর করেছেন ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি মেইলের সাংবাদিক ইয়ান বিরেল।

তিনি ওই মানব ট্র্যাজেডি প্রত্যক্ষ করে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। তার কাছে নির্যাতিত এসব অভিবাসী বলেছেন, তারা অন্তঃসত্ত্বা একজন নারীকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় তাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসে।

আবদুল রাজ্জাক আল মুহাদ নামে এক অভিবাসী বলেছেন, তার পরিবার একটি বনের ভেতর ৫ দিন আত্মগোপন করে কাটিয়েছেন। তারপর গ্রিক পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। তাদের সঙ্গে থাকা সবকিছু কেড়ে নিয়েছে তারা।

ফরেন পলিসি বলছে, গত এক মাসের মধ্যে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সব আবেদন বাতিল করেছে গ্রিস। অবৈধভাবে সীমান্ত টপকানোর সব ধরনের প্রচেষ্টাও নস্যাৎ করে দিয়েছে দেশটি।

গ্রিস ‘ইউরোপের ঢাল’ হিসেবে কাজ করছে। বিনিময়ে দেশটিকে ৭০ কোটি ইউরো অর্থনৈতিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট কমিটির পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান ডেভিড ম্যাক এলিস্টার বলেন, গত বছর ইউরোপের অভিবাসী হওয়ার জন্য ১৩ লাখ মানুষ আবেদন করেছিল। সম্প্রতি তুর্কি সীমান্ত খুলে দেয়ায় ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় সীমান্তে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে।

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধে রক্তগঙ্গা বয়ে যাওয়ার ফলে সেখান থেকে পালিয়ে কয়েক বছর আগে দক্ষিণ তুরস্কে একজন শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন মুহাম্মদ। গত সপ্তাহে তিনি শুনতে পান গ্রিস সীমান্ত খুলে দেয়া হয়েছে। মুহাম্মদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল ইউরোপে যাওয়া।

ফলে এমন খবর পেয়ে তিনিও পা বাড়ান অন্ধকার এক ভয়াবহ জগতে। অনেকের সঙ্গে তিনি তুরস্ক-গ্রিস সীমান্ত পাড়ি দেন। গ্রিসের ভেতর দিয়ে কয়েক ঘণ্টা হাঁটতে থাকেন। কিন্তু তাকে স্থানীয় লোকজন চিনতে পারে। তারা পুলিশে খবর দেয়।

মুহাম্মদ বলেন, তারা আমাদের কাছে থাকা সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আমাদের প্রহার করেছে। এতে তাদের একজনের নাক ভেঙে গেছে। অন্য একজনকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে পেটানো হয়েছে। এরপর ফেরত পাঠানো হয়েছে তুরস্কে। এ সময় তিনি শার্ট খুলে দেখান গায়ে প্রহারের চিহ্ন। মুহাম্মদ আরও বলেন,

পুলিশ তার স্ত্রীকেও মেরেছে। তিনি শুধু কাগজপত্র ফেরত চেয়েছিলেন। কারণ তার ভেতর তাদের বিয়ের সনদ রয়েছে।

ইয়ান বিরেল লিখেছেন, এই স্থানটি ইউরোপের সবচেয়ে গোলযোগপূর্ণ এলাকা। এর মূলে রয়েছে সিরিয়া যুদ্ধের সংকট। ৯ বছর পরও সেই যুদ্ধ এখনও চলছে।

সেখানে যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন আমি ছিলাম রাজধানী দামেস্কে। আমি ছিলাম বয়সে তরুণ। সেখানে রক্তপাত, বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে দেখেছি গণতন্ত্র কিভাবে মরে যাচ্ছে।

এই যুদ্ধে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫ লাখ মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৭০ লাখ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সিরিয়া যুদ্ধ এখন স্থান বদল করে পৌঁছে গেছে ইউরোপের দ্বারপ্রান্তে। এ অবস্থায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান অভিবাসীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে ইউরোপকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছেন।

এজন্য কিছু বিশ্লেষক তাকে অভিযুক্ত করেছেন। তারা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে তুর্কি প্রেসিডেন্ট সিরিয়ার যুদ্ধকে গ্রিস সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন। একটি বিষয় সুনিশ্চিত। তা হল- এই দুটি দেশের মধ্যবর্তী সীমান্তে মৃত্যু এবং নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়েছে।

শনিবার সীমান্তে আরও বাজে দৃশ্য দেখা গেছে। ছোড়া হয়েছে কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট। এ সময় অভিবাসীরা ‘সীমান্ত গেট খুলে দাও’ স্লোগান দিতে থাকেন। অনেকে সীমান্তের বেড়া ধরে ধাক্কা দিতে থাকেন। অনেকে অভিযোগ করেছেন, গ্রিক পুলিশ তাদের সন্ত্রাসী বানিয়ে দিচ্ছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন