হাতে হাতে বিপ্লব ছড়াচ্ছে হকাররা
jugantor
হাতে হাতে বিপ্লব ছড়াচ্ছে হকাররা
মিয়ানমার বিক্ষোভে পথ-ব্যবসা রমরমা

  যুগান্তর ডেস্ক  

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরগরম হয়ে উঠছে মিয়ানমারের অভ্যুত্থানবিরোধী আন্দোলন। টানা ২৫ দিন ধরে চলা সর্বাত্মক বিক্ষোভের

প্রথম সারিতেই আছেন চিকিৎসক-শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারী। সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে টগবগ করে ফুটছে মিয়ানমারের রাজপথ। বিক্ষোভের এ ডামাডোলে সবচেয়ে ব্যতিক্রম এবং চোখে পড়ার মতো আন্দোলন করছেন দেশটির হতদরিদ্র হকার-শ্রমিকরা। ইয়াঙ্গুন, মান্দালয়ের বড় বড় জনসমাবেশে ঘুরে ঘুরে ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ড বিক্রি করছেন তারা। হাতে হাতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সেনাবিরোধী বিপ্লব। একেবারে নামমাত্র মূল্যে। সস্তা পেয়ে কিনছেন বিক্ষোভকারীরাও। এক ঢিলে দুই পাখি- বিক্ষোভও করছেন, রোজগারও করছেন। লাল ফিতা, ট্যাটু, জান্তামুখোশ, স্লোগান লেখা কার্ড বিক্রি করেই ক্ষোভ ছড়িয়ে দিচ্ছেন জনে জনে। আরও বেগবান করছেন সেনাবিরোধী বিক্ষোভ।

সেনাবাহিনীর হুঁশিয়ারি আর পুলিশের ধরপাকড়, বুলেট-জলকামান সত্ত্বেও প্রতিদিনই রাস্তায় রাস্তায় চলছে মিছিল-সমাবেশ। অনেকটা উৎসবের আমেজে এসব মিছিল-সমাবেশে অংশ নিচ্ছে লাখ লাখ গণতন্ত্রকামী মানুষ। আন্দোলন-সংগ্রাম ও ধর্মঘটের কারণে বেশিরভাগ দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য আপাতত বন্ধ থাকলেও হকারদের পথ-ব্যবসা এখন রমরমা। বিক্ষোভের ডামাডোল ও উৎসবের আমেজের মধ্যে আকাশচুম্বী চাহিদা এখন লাল ফিতা, নানা রঙের ব্যানার-ফেস্টুন ও পতাকার। ফ্রন্টিয়ার মিয়ানমার। মিয়ানমারে চলতি মাসের শুরুতে (১ ফেব্রুয়ারি) সেনা অভ্যুত্থান ও নির্বাচিত শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদেরকে আটক করে ক্ষমতার দখল নেন রোহিঙ্গা গণহত্যায় অভিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। মূলত অভ্যুত্থানের পরপরই শুরু হয় সেনাবিরোধী প্রতিবাদ-আন্দোলন-বিক্ষোভ। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে চলছে স্বতঃস্ফূর্ত এই আন্দোলন। এতে কৃষক-শ্রমিক-মজুর, শিক্ষক-শিক্ষার্থী-চিকিৎসক যেমন আছেন, রয়েছেন সুন্দরী মডেল থেকে শুরু করে কবি-শিল্পীও। নানা রং-ঢং আর সাজপোশাকে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন তারা। হয়তো কারও হাতে রঙিন পতাকা; কারও হাতে ব্যানার-ফেস্টুন। আবার কারও মাথায় বাধা বিপ্লবের লাল নিশান লাল ফিতা। অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভই যেন এখন বড় উৎসব দেশটিতে। আর এই উৎসব যেন পূর্ণতা পেয়েছে পথ-ব্যবসায়ী ও হকারদের হাত ধরে।

কেউ হয়তো বিক্ষোভের আগে ক্যাপ, মানিব্যাগ, ওয়ালেটসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা জিনিসের ফেরিওয়ালা ছিলেন। কেউ হয়তো মোবাইল ও ইলেকট্রনিক্সের জিনিস বিক্রি করতেন। ওই সব জিনিস বাদ দিয়ে তারা এখন লাল ফিতা, ব্যানার-ফেস্টুন ও রঙিন পাতা পসরা সাজিয়েছেন। হরতাল-ধর্মঘট আর বিক্ষোভের মধ্যে যখন সব দোকানপাট বন্ধ তখন হয়তো সেই বন্ধ দোকানের সামনে একটা চটের বিছানা পেতে বসে গেছেন কোনো হকার বা ফেরিওয়ালা। ৫৭ বছর ইউ খিন মিন্ট তাদেরই একজন। ইয়াঙ্গুনের রাস্তায় পার্স ও মানিব্যাগ বিক্রি করতেন তিনি। কিন্তু শহরের রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের ঢল

নামার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি নিজের ব্যবসাও বদলে ফেলেন। বিক্রি শুরু করেন বিক্ষোভে ব্যবহৃত নানা ধরনের ব্যানার-ফেস্টুন ও সু চির দল এনএলডির পতাকা ও হেডব্যান্ড। এক সাক্ষাৎকারে খিন মিন্ট জানান, ভালোই চলছে তার এই নতুন ব্যবসা। প্রতিদিন ১০০-১৫০টি হেডব্যান্ড বিক্রি হয় তার। এক একটা হেডব্যান্ড কিনতে লাগে ২০০ কিয়াট (মিয়ানমারের মুদ্রা)। আর বিক্রি হয় ৩০০ কিয়াটে। দিনশেষে ১০০টি হেডব্যান্ড বিক্রি থেকেই তার লাভ দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার কিয়াট। এ ছাড়া এনএলডির পতাকা বিক্রি হয় ৩০-৫০ কিয়াটে।

খিন মিন্টের মতোই ইয়াঙ্গুনের কেন্দ্রের সুলে প্যাগোডার কাছে প্রায় একই ধরনের জিনিস বিক্রি করেন ড খিন লে (৩২) নামের এক নারী হকার। তিনি জানান, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পরই তার আয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আগে কেনা-বেচা ভালো না হলেও এখন তার দৈনিক আয় ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার কিয়াট। ইউ খিন মিন্ট বা ড খিন লেই শুধু নয়, রাজধানী নেপিদো ও প্রধান দুই শহর ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়সহ ছোটবড় সব শহরে এমন হাজারো পথ-ব্যবসায়ী ও হকার রয়েছে। সেনা অভ্যুত্থানের ফলে তাদের আয়-রোজগার বৃদ্ধি পেলেও সেনাশাসন পছন্দ তাদের কারোরই। তাই ব্যবসার পাশাপাশি সুযোগ পেলেই মিছিলেই যোগ দেন অনেকেই। বা মিছিল করতে করতেই বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করেন। যেমনটা উঠে এসেছে নারী হকার ড. খিন লের কথায়। তিনি বলেছেন, ‘স্বৈরশাসকদের আমার পছন্দ নয়। তাই বিক্ষোভকারীদের জন্য দরকারি এসব জিনিস বিক্রির মাধ্যমে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছি।’

হাতে হাতে বিপ্লব ছড়াচ্ছে হকাররা

মিয়ানমার বিক্ষোভে পথ-ব্যবসা রমরমা
 যুগান্তর ডেস্ক 
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরগরম হয়ে উঠছে মিয়ানমারের অভ্যুত্থানবিরোধী আন্দোলন। টানা ২৫ দিন ধরে চলা সর্বাত্মক বিক্ষোভের

প্রথম সারিতেই আছেন চিকিৎসক-শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারী। সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে টগবগ করে ফুটছে মিয়ানমারের রাজপথ। বিক্ষোভের এ ডামাডোলে সবচেয়ে ব্যতিক্রম এবং চোখে পড়ার মতো আন্দোলন করছেন দেশটির হতদরিদ্র হকার-শ্রমিকরা। ইয়াঙ্গুন, মান্দালয়ের বড় বড় জনসমাবেশে ঘুরে ঘুরে ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ড বিক্রি করছেন তারা। হাতে হাতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সেনাবিরোধী বিপ্লব। একেবারে নামমাত্র মূল্যে। সস্তা পেয়ে কিনছেন বিক্ষোভকারীরাও। এক ঢিলে দুই পাখি- বিক্ষোভও করছেন, রোজগারও করছেন। লাল ফিতা, ট্যাটু, জান্তামুখোশ, স্লোগান লেখা কার্ড বিক্রি করেই ক্ষোভ ছড়িয়ে দিচ্ছেন জনে জনে। আরও বেগবান করছেন সেনাবিরোধী বিক্ষোভ।

সেনাবাহিনীর হুঁশিয়ারি আর পুলিশের ধরপাকড়, বুলেট-জলকামান সত্ত্বেও প্রতিদিনই রাস্তায় রাস্তায় চলছে মিছিল-সমাবেশ। অনেকটা উৎসবের আমেজে এসব মিছিল-সমাবেশে অংশ নিচ্ছে লাখ লাখ গণতন্ত্রকামী মানুষ। আন্দোলন-সংগ্রাম ও ধর্মঘটের কারণে বেশিরভাগ দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য আপাতত বন্ধ থাকলেও হকারদের পথ-ব্যবসা এখন রমরমা। বিক্ষোভের ডামাডোল ও উৎসবের আমেজের মধ্যে আকাশচুম্বী চাহিদা এখন লাল ফিতা, নানা রঙের ব্যানার-ফেস্টুন ও পতাকার। ফ্রন্টিয়ার মিয়ানমার। মিয়ানমারে চলতি মাসের শুরুতে (১ ফেব্রুয়ারি) সেনা অভ্যুত্থান ও নির্বাচিত শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদেরকে আটক করে ক্ষমতার দখল নেন রোহিঙ্গা গণহত্যায় অভিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। মূলত অভ্যুত্থানের পরপরই শুরু হয় সেনাবিরোধী প্রতিবাদ-আন্দোলন-বিক্ষোভ। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে চলছে স্বতঃস্ফূর্ত এই আন্দোলন। এতে কৃষক-শ্রমিক-মজুর, শিক্ষক-শিক্ষার্থী-চিকিৎসক যেমন আছেন, রয়েছেন সুন্দরী মডেল থেকে শুরু করে কবি-শিল্পীও। নানা রং-ঢং আর সাজপোশাকে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন তারা। হয়তো কারও হাতে রঙিন পতাকা; কারও হাতে ব্যানার-ফেস্টুন। আবার কারও মাথায় বাধা বিপ্লবের লাল নিশান লাল ফিতা। অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভই যেন এখন বড় উৎসব দেশটিতে। আর এই উৎসব যেন পূর্ণতা পেয়েছে পথ-ব্যবসায়ী ও হকারদের হাত ধরে।

কেউ হয়তো বিক্ষোভের আগে ক্যাপ, মানিব্যাগ, ওয়ালেটসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা জিনিসের ফেরিওয়ালা ছিলেন। কেউ হয়তো মোবাইল ও ইলেকট্রনিক্সের জিনিস বিক্রি করতেন। ওই সব জিনিস বাদ দিয়ে তারা এখন লাল ফিতা, ব্যানার-ফেস্টুন ও রঙিন পাতা পসরা সাজিয়েছেন। হরতাল-ধর্মঘট আর বিক্ষোভের মধ্যে যখন সব দোকানপাট বন্ধ তখন হয়তো সেই বন্ধ দোকানের সামনে একটা চটের বিছানা পেতে বসে গেছেন কোনো হকার বা ফেরিওয়ালা। ৫৭ বছর ইউ খিন মিন্ট তাদেরই একজন। ইয়াঙ্গুনের রাস্তায় পার্স ও মানিব্যাগ বিক্রি করতেন তিনি। কিন্তু শহরের রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের ঢল

নামার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি নিজের ব্যবসাও বদলে ফেলেন। বিক্রি শুরু করেন বিক্ষোভে ব্যবহৃত নানা ধরনের ব্যানার-ফেস্টুন ও সু চির দল এনএলডির পতাকা ও হেডব্যান্ড। এক সাক্ষাৎকারে খিন মিন্ট জানান, ভালোই চলছে তার এই নতুন ব্যবসা। প্রতিদিন ১০০-১৫০টি হেডব্যান্ড বিক্রি হয় তার। এক একটা হেডব্যান্ড কিনতে লাগে ২০০ কিয়াট (মিয়ানমারের মুদ্রা)। আর বিক্রি হয় ৩০০ কিয়াটে। দিনশেষে ১০০টি হেডব্যান্ড বিক্রি থেকেই তার লাভ দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার কিয়াট। এ ছাড়া এনএলডির পতাকা বিক্রি হয় ৩০-৫০ কিয়াটে।

খিন মিন্টের মতোই ইয়াঙ্গুনের কেন্দ্রের সুলে প্যাগোডার কাছে প্রায় একই ধরনের জিনিস বিক্রি করেন ড খিন লে (৩২) নামের এক নারী হকার। তিনি জানান, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পরই তার আয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আগে কেনা-বেচা ভালো না হলেও এখন তার দৈনিক আয় ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার কিয়াট। ইউ খিন মিন্ট বা ড খিন লেই শুধু নয়, রাজধানী নেপিদো ও প্রধান দুই শহর ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়সহ ছোটবড় সব শহরে এমন হাজারো পথ-ব্যবসায়ী ও হকার রয়েছে। সেনা অভ্যুত্থানের ফলে তাদের আয়-রোজগার বৃদ্ধি পেলেও সেনাশাসন পছন্দ তাদের কারোরই। তাই ব্যবসার পাশাপাশি সুযোগ পেলেই মিছিলেই যোগ দেন অনেকেই। বা মিছিল করতে করতেই বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করেন। যেমনটা উঠে এসেছে নারী হকার ড. খিন লের কথায়। তিনি বলেছেন, ‘স্বৈরশাসকদের আমার পছন্দ নয়। তাই বিক্ষোভকারীদের জন্য দরকারি এসব জিনিস বিক্রির মাধ্যমে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছি।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন