শহরে গ্রামে গোপন মোবাইল ক্লিনিক মিয়ানমারে
jugantor
শহরে গ্রামে গোপন মোবাইল ক্লিনিক মিয়ানমারে
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের চিকিৎসা দিচ্ছে ডাক্তার-নার্সরা * বিক্ষোভকারীদের মাথায় আঘাত করছে পুলিশ * চিকিৎসকদের ভ্যান লক্ষ্য করে পুলিশের গুলি

  যুগান্তর ডেস্ক  

০৫ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মিয়ানমারে অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসায় শহরে শহরে গোপন মোবাইল ক্লিনিক খোলা হয়েছে। কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভে আহত বিক্ষোভকারীদের উদ্ধার করে এসব ক্লিনিকে ভর্তি করা হচ্ছে। বেশির ভাগেরই মাথায় ও বুকে আঘাত। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী ডাক্তার ও নার্সরা। কিন্তু এখন এসব উদ্ধারকর্মী ও চিকিৎসকদেরকেও টার্গেট করছে সেনা-পুলিশ। আটকের পাশাপাশি তাদের ওপর হামলা-আক্রমণ চালানো হচ্ছে। গুলি ছোড়া হচ্ছে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার মোবাইল ভ্যান লক্ষ্য করে। চিকিৎসকরা যাতে আহত বিক্ষোভকারীদের কাছে না পৌঁছাতে পারে সেজন্য জায়গায় জায়গায় রাস্তা বন্ধ করে মোবাইল হেলথ ভ্যান আটকে দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, পুলিশের গুলি থেকে নিরাপদ থাকাই এখন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা।

দ্য ইরাবতী জানিয়েছে, ইয়াঙ্গুন শহরের নর্থ ওকালাপা এলাকায় পুলিশের গুলিতে আহত বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করায় বুধবার একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অন্তত চার স্বেচ্ছাসেবীকে আটক করা হয়েছে। এসময় তাদের রাইফেলের বাঁট দিয়ে বেদম প্রহার করা হয়। ধ্বংস করা হয় তাদের ব্যবহৃত একটি অ্যাম্বুলেন্সও। মন মিয়াত সাতে হতার নামে দাতব্য প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইউ হ্লা কিয়াইং জানান, অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আহত রোগীদের সেবা দিতে যাওয়ার পথে স্বেচ্ছাসেবী দলটিকে আটক করা হয়েছে। এটাকে খুবই বেদনাদায়ক পরিস্থিতি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে ব্যাপক গণবিক্ষোভের সঙ্গে সঙ্গে চলছে নাগরিক অসহযোগ আন্দোলন। সর্বাত্মক বিক্ষোভ থেকে সেনা শাসনের অবসান, দেশটির নির্বাচিত নেতাদের মুক্তি ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে দাবি জানাচ্ছে অভ্যুত্থানবিরোধীরা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অতিসত্বর ক্ষমতা হস্তান্তর ও বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস নিপীড়ন বন্ধের আহ্বান জানালেও তা কানেই তুলছে না জান্তা সরকার। বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়ে ওঠায় দমনে বেপরোয়া ও মারমুখী হয়ে উঠেছে পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের ওপর রাবার বুলেট, জলকামান ও টিয়ারগ্যাসের সঙ্গে প্রতিদিনই গুলি ছুড়ছে। কখনো স্টান গ্রেনেড আবার কখনো ব্যাপক লাঠিচার্জ করছে। এতে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে প্রায় ৬০ জন। আহত হয়েছে অসংখ্য।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে সেনাবিরোধী বিক্ষোভ-আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে রয়েছেন ডাক্তার ও নার্সরা। একদিকে তারা অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আরেকদিকে নিজেদের সর্বস্ব নিয়ে বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। অসহযোগ আন্দোলনের কারণে সরকারি হাসপাতালগুলোর বেশির ভাগ কার্যক্রমই এখন বন্ধ। ইয়াঙ্গুন জেনারেল হাসপাতালের এক কর্মকর্তার বরাতে রেডিও ফ্রি এশিয়া জানিয়েছে, দেশজুড়ে ৮০ শতাংশ হাসপাতালই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জনগণের স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হাসপাতালের বাইরেই চিকিৎসা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। অন্যদিকে বিক্ষোভে হতাহতদের চিকিৎসা সমস্যা মোকাবিলায় বিকল্প হিসাবে প্রায় সব শহরেই মোবাইল ক্লিনিক খোলা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দ্রুত এসব ক্লিনিকে আনার জন্য নামানো হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স। কখনো চিকিৎসা দিতে মোবাইল হেলথ ভ্যান নিয়ে ঘটনাস্থলেই চলে যাচ্ছেন ডাক্তার-নার্সরা।

মিয়ানমারের চলমান বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে মূলত তরুণরাই। রাবার বুলেট, টিয়ারগ্যাস ও তাজা গুলির ভয় উপেক্ষা করে প্রতিদিনই রাজপথে নামার দুঃসাহস দেখাচ্ছে তারাই। হতাহতদের মধ্যেও এদের সংখ্যাই বেশি। আবার অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্বে বেশি যোগ দিয়েছে কমবয়সি ডাক্তার-নার্সরাই। এর জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত আই নইন থু। এক বছরের কম সময় আগে মিয়ানমারের অন্যতম বড় শহর মান্দালয়ের মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন মাত্র ২৫ বছর বয়সি এই চিকিৎসক। অভ্যুত্থানবিরোধী জোর বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর হতাহতদের জরুরি চিকিৎসা দিচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি ভয়েস অব আমেরিকাকে এক সাক্ষাৎকারে আই নইন থু জানান, মোবাইল ক্লিনিকগুলোতে যেসব রোগী আসছেন তাদের বেশির ভাগেরই মাথায় আঘাত করা হয়েছে। কারণ বিক্ষোভে ব্যাটন ব্যবহার করছে পুলিশ। রাবার বুলেটের ক্ষত নিয়েও বহু বিক্ষোভকারী চিকিৎসা করাচ্ছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে বাধ সাধছে সেনা-পুলিশ। বহু ক্ষেত্রে গুরুতর আহতদের চিকিৎসা করতে না দিয়ে পুলিশ গ্রেফতার করছে। সেনা এবং পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে তাদের। যে কোনো সময় গুলি লাগতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের। এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে কাচিন রাজ্যের রাজধানী মিটকিনার স্বেচ্ছাসেবী নার্স জে নান বলেন, ‘এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চিকিৎসা দেওয়ার সময় পুলিশের গুলি থেকে নিরাপদ থাকা।’

শহরে গ্রামে গোপন মোবাইল ক্লিনিক মিয়ানমারে

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের চিকিৎসা দিচ্ছে ডাক্তার-নার্সরা * বিক্ষোভকারীদের মাথায় আঘাত করছে পুলিশ * চিকিৎসকদের ভ্যান লক্ষ্য করে পুলিশের গুলি
 যুগান্তর ডেস্ক 
০৫ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মিয়ানমারে অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসায় শহরে শহরে গোপন মোবাইল ক্লিনিক খোলা হয়েছে। কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভে আহত বিক্ষোভকারীদের উদ্ধার করে এসব ক্লিনিকে ভর্তি করা হচ্ছে। বেশির ভাগেরই মাথায় ও বুকে আঘাত। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী ডাক্তার ও নার্সরা। কিন্তু এখন এসব উদ্ধারকর্মী ও চিকিৎসকদেরকেও টার্গেট করছে সেনা-পুলিশ। আটকের পাশাপাশি তাদের ওপর হামলা-আক্রমণ চালানো হচ্ছে। গুলি ছোড়া হচ্ছে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার মোবাইল ভ্যান লক্ষ্য করে। চিকিৎসকরা যাতে আহত বিক্ষোভকারীদের কাছে না পৌঁছাতে পারে সেজন্য জায়গায় জায়গায় রাস্তা বন্ধ করে মোবাইল হেলথ ভ্যান আটকে দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, পুলিশের গুলি থেকে নিরাপদ থাকাই এখন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা।

দ্য ইরাবতী জানিয়েছে, ইয়াঙ্গুন শহরের নর্থ ওকালাপা এলাকায় পুলিশের গুলিতে আহত বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করায় বুধবার একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অন্তত চার স্বেচ্ছাসেবীকে আটক করা হয়েছে। এসময় তাদের রাইফেলের বাঁট দিয়ে বেদম প্রহার করা হয়। ধ্বংস করা হয় তাদের ব্যবহৃত একটি অ্যাম্বুলেন্সও। মন মিয়াত সাতে হতার নামে দাতব্য প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইউ হ্লা কিয়াইং জানান, অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আহত রোগীদের সেবা দিতে যাওয়ার পথে স্বেচ্ছাসেবী দলটিকে আটক করা হয়েছে। এটাকে খুবই বেদনাদায়ক পরিস্থিতি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে ব্যাপক গণবিক্ষোভের সঙ্গে সঙ্গে চলছে নাগরিক অসহযোগ আন্দোলন। সর্বাত্মক বিক্ষোভ থেকে সেনা শাসনের অবসান, দেশটির নির্বাচিত নেতাদের মুক্তি ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে দাবি জানাচ্ছে অভ্যুত্থানবিরোধীরা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অতিসত্বর ক্ষমতা হস্তান্তর ও বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস নিপীড়ন বন্ধের আহ্বান জানালেও তা কানেই তুলছে না জান্তা সরকার। বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়ে ওঠায় দমনে বেপরোয়া ও মারমুখী হয়ে উঠেছে পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের ওপর রাবার বুলেট, জলকামান ও টিয়ারগ্যাসের সঙ্গে প্রতিদিনই গুলি ছুড়ছে। কখনো স্টান গ্রেনেড আবার কখনো ব্যাপক লাঠিচার্জ করছে। এতে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে প্রায় ৬০ জন। আহত হয়েছে অসংখ্য।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে সেনাবিরোধী বিক্ষোভ-আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে রয়েছেন ডাক্তার ও নার্সরা। একদিকে তারা অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আরেকদিকে নিজেদের সর্বস্ব নিয়ে বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। অসহযোগ আন্দোলনের কারণে সরকারি হাসপাতালগুলোর বেশির ভাগ কার্যক্রমই এখন বন্ধ। ইয়াঙ্গুন জেনারেল হাসপাতালের এক কর্মকর্তার বরাতে রেডিও ফ্রি এশিয়া জানিয়েছে, দেশজুড়ে ৮০ শতাংশ হাসপাতালই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জনগণের স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হাসপাতালের বাইরেই চিকিৎসা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। অন্যদিকে বিক্ষোভে হতাহতদের চিকিৎসা সমস্যা মোকাবিলায় বিকল্প হিসাবে প্রায় সব শহরেই মোবাইল ক্লিনিক খোলা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দ্রুত এসব ক্লিনিকে আনার জন্য নামানো হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স। কখনো চিকিৎসা দিতে মোবাইল হেলথ ভ্যান নিয়ে ঘটনাস্থলেই চলে যাচ্ছেন ডাক্তার-নার্সরা।

মিয়ানমারের চলমান বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে মূলত তরুণরাই। রাবার বুলেট, টিয়ারগ্যাস ও তাজা গুলির ভয় উপেক্ষা করে প্রতিদিনই রাজপথে নামার দুঃসাহস দেখাচ্ছে তারাই। হতাহতদের মধ্যেও এদের সংখ্যাই বেশি। আবার অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্বে বেশি যোগ দিয়েছে কমবয়সি ডাক্তার-নার্সরাই। এর জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত আই নইন থু। এক বছরের কম সময় আগে মিয়ানমারের অন্যতম বড় শহর মান্দালয়ের মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন মাত্র ২৫ বছর বয়সি এই চিকিৎসক। অভ্যুত্থানবিরোধী জোর বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর হতাহতদের জরুরি চিকিৎসা দিচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি ভয়েস অব আমেরিকাকে এক সাক্ষাৎকারে আই নইন থু জানান, মোবাইল ক্লিনিকগুলোতে যেসব রোগী আসছেন তাদের বেশির ভাগেরই মাথায় আঘাত করা হয়েছে। কারণ বিক্ষোভে ব্যাটন ব্যবহার করছে পুলিশ। রাবার বুলেটের ক্ষত নিয়েও বহু বিক্ষোভকারী চিকিৎসা করাচ্ছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে বাধ সাধছে সেনা-পুলিশ। বহু ক্ষেত্রে গুরুতর আহতদের চিকিৎসা করতে না দিয়ে পুলিশ গ্রেফতার করছে। সেনা এবং পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে তাদের। যে কোনো সময় গুলি লাগতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের। এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে কাচিন রাজ্যের রাজধানী মিটকিনার স্বেচ্ছাসেবী নার্স জে নান বলেন, ‘এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চিকিৎসা দেওয়ার সময় পুলিশের গুলি থেকে নিরাপদ থাকা।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন