মুখ্যমন্ত্রীর আড়ালে আরেক নাম ক্যাপ্টেন
jugantor
মুখ্যমন্ত্রীর আড়ালে আরেক নাম ক্যাপ্টেন
পিনারাই : কেরালার ক্রাইসিস ম্যানেজার * জনমুখী রাজনীতিই জয়ের আসল জাদু

  সেলিম কামাল  

০৬ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘ক্যাপ্টেইন’, ‘কমরেড’ ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’- জনগণের এ সম্বোধনগুলোই বলে দেয়, তিনি কেরালায় কতটা জনপ্রিয়। কী এমন জাদু ছিল তার হাতে! কেরালার সাধারণ ভোটারদের মন জয় করে পরপর দু’বার মসনদে বসছেন পিনারাই বিজয়ন। চার দশকের রেকর্ড ভেঙে পালাবদলের খেলায় ছেদ টানলেন। কংগ্রেস আর বিজেপিকে ঘোল খাইয়ে এবারও ছিনিয়ে নিলেন জয়। হয়ে গেলেন কেরালার ‘মহানায়ক’। দ্য প্রিন্ট।

ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায় এত দিন বাম দল ও কংগ্রেসের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল দেখা গেছে। এক নির্বাচনে কংগ্রেস জয় পেলে, পরের নির্বাচন জিতে বাম দল ক্ষমতায় গেছে। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে সেই রীতি ভেঙেছেন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। তার হাত ধরে লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) টানা দুই মেয়াদে সরকার গড়তে যাচ্ছে এ রাজ্যে। ১৯৮২ সালের পর গত ৪০ বছরে কেরালায় একই দলের পরপর দুই মেয়াদে নির্বাচনে জয়ের ঘটনা এটাই প্রথম। এবারের নির্বাচনে কেরালা বিধানসভার ১৪০ আসনের মধ্যে বামশিবির ৯৬টি আসনে জয় পেয়েছে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য এ রাজ্যে ৭১টি আসনে জয় পেলেই চলত। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) জিতেছে ৪৩টি আসনে। বাকি একটি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থীর। কেরালায় কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপি ভোটের পরীক্ষায় পেয়েছে শূন্য। একটি আসনেও জিততে পারেনি দলটি। ২০১৬ সালের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন প্রবীণ বামপন্থি নেতা বিজয়ন। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (মার্ক্সিস্ট) পলিট ব্যুরোর সদস্য। দলটি সংক্ষেপে সিপিআই-এম নামে পরিচিত। সংকট মোকাবিলায় তার কোনো জুড়ি নেই। তা আরেকবার প্রমাণিত হলো করোনা মহামারিতে। ২০১৭ সালে ঘূর্ণিঝড় অক্ষি, ২০১৮ সালে নিপাহ ভাইরাসের দৌরাত্ম্য, ২০১৮-২০১৯ সালে কয়েকটি জেলায় সংঘটিত ভয়াবহ বন্যার দুঃসময় মোকাবিলায় দারুণ সাফল্য দেখিয়েছেন বিজয়ন। এ কারণেই তার নামের পাশে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ বিশেষণ। মহামারির সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজার পাশাপাশি তিনিও দিনরাত তা মোকাবিলায় কাজ করে গেছেন। বন্যার সময় খাদ্য, ওষুধ আর অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে। ২০২০ সালের মার্চে মোদি সরকার প্রথম যখন লকডাউন ঘোষণা করেছিলেন, তখন দেশব্যাপী খাদ্য সংকটে পড়ে যান সাধারণ শ্রমিকরা। সেসময় কেরালার মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং তাদের কল্যাণে এগিয়ে আসেন। বশির আহমেদ নামে কোচির এক শ্রমিক মুখ্যমন্ত্রী প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা কী করে তাদের ভুলে যাব। আমাদের বিপদে তারা পাশে ছিলেন। আমরা এখন তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি।

গত বছর করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় কেরালার বামপন্থি সরকার দারুণ সাফল্য দেখিয়েছিল। বিশ্বজুড়ে এ সাফল্য ‘কেরালা মডেল’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল। দূরদর্শিতার নজির গড়েছেন অক্সিজেনের ব্যাপক উৎপাদন ও মজুত রেখে। যে কারণে কোভিড সংক্রমণে সেখানে মৃত্যুর হারও অনেক কম। সরকারের দূরদর্শিতাকে বিবেচনায় এনেছেন ভোটাররা। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বাম সরকার এর সুফল পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বাম নেতৃত্বাধীন সরকারের সাফল্য ভোটের লড়াইয়ে এলডিএফ জোটকে এগিয়ে রেখেছিল। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, বিজেপিবিরোধী খ্রিষ্টান-মুসলিম ঐক্য ছিল ‘কমরেডের’ বিধানসভা দখলের আরেক অস্ত্র। মুসলমান ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা দারুণভাবে সমর্থন জুগিয়েছে এ সরকারকে। কেরালার ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) সংখ্যালঘু মুসলিম ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে কংগ্রেসবিরোধী মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ করে আসছিল অনেক আগে থেকেই। সেখানে তৈরি হয় মুসলিম-খ্রিষ্টান ঐক্য। এই ঐক্যকেই পুঁজিতে সম্পৃক্ত করে এলডিএফ।

কেরালায় বিজেপির ব্যর্থতাও এলডিএফকে এগিয়ে রেখেছে অন্যদিক থেকে। সাধারণ সাম্প্রদায়িক কলাকৌশলে এখানকার ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি আকর্ষিত হননি। সচরাচর বিজেপির রাজনীতির মূল পুঁজিই হচ্ছে ধর্মীয় বিদ্বেষ। এই পুঁজি নিয়ে দলটি প্রায় পুরো ভারত দাপিয়ে বেড়ালেও কেরালায় এসে তারা মুখ থুবড়ে পড়ে। আর এই বিজেপি বিদ্বেষের কারণেই অন্য ধর্মাবলম্বীরা এলডিএফকে বেছে নেয়।

জনকল্যাণমুখী রাজনীতি বিজয়নকে এগিয়ে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু ভোটারের মন জয় করতে এটাই তার আসল অস্ত্র নয়। তার সরকারে থাকা অন্য কর্মকর্তারাও তার ইমেজকে ওপরে তুলতে মরিয়া। যে কারণে, সরকারের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার ইমেজের কথা মাথায় রেখে অব্যাহত রাখেন জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম। তাকে জনগণ ‘ক্যাপ্টেইন’ বলে ডাকেন। কেন? বিজয়ন বলেন, ‘আমি জানি না। এটা তাদের ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিরোধীরা এ ধরনের সম্বোধনের বিপরীতে কোনো বিতর্ক তৈরি করতে পারেনি।’ আর কমরেড সিপিএম নেতা কোদিয়ারি বালাকৃষ্ণন জলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীকে আমি কমরেড বলে জানি, ক্যাপ্টেইন নয়।’

মুখ্যমন্ত্রীর আড়ালে আরেক নাম ক্যাপ্টেন

পিনারাই : কেরালার ক্রাইসিস ম্যানেজার * জনমুখী রাজনীতিই জয়ের আসল জাদু
 সেলিম কামাল 
০৬ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘ক্যাপ্টেইন’, ‘কমরেড’ ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’- জনগণের এ সম্বোধনগুলোই বলে দেয়, তিনি কেরালায় কতটা জনপ্রিয়। কী এমন জাদু ছিল তার হাতে! কেরালার সাধারণ ভোটারদের মন জয় করে পরপর দু’বার মসনদে বসছেন পিনারাই বিজয়ন। চার দশকের রেকর্ড ভেঙে পালাবদলের খেলায় ছেদ টানলেন। কংগ্রেস আর বিজেপিকে ঘোল খাইয়ে এবারও ছিনিয়ে নিলেন জয়। হয়ে গেলেন কেরালার ‘মহানায়ক’। দ্য প্রিন্ট।

ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায় এত দিন বাম দল ও কংগ্রেসের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল দেখা গেছে। এক নির্বাচনে কংগ্রেস জয় পেলে, পরের নির্বাচন জিতে বাম দল ক্ষমতায় গেছে। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে সেই রীতি ভেঙেছেন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। তার হাত ধরে লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) টানা দুই মেয়াদে সরকার গড়তে যাচ্ছে এ রাজ্যে। ১৯৮২ সালের পর গত ৪০ বছরে কেরালায় একই দলের পরপর দুই মেয়াদে নির্বাচনে জয়ের ঘটনা এটাই প্রথম। এবারের নির্বাচনে কেরালা বিধানসভার ১৪০ আসনের মধ্যে বামশিবির ৯৬টি আসনে জয় পেয়েছে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য এ রাজ্যে ৭১টি আসনে জয় পেলেই চলত। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) জিতেছে ৪৩টি আসনে। বাকি একটি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থীর। কেরালায় কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপি ভোটের পরীক্ষায় পেয়েছে শূন্য। একটি আসনেও জিততে পারেনি দলটি। ২০১৬ সালের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন প্রবীণ বামপন্থি নেতা বিজয়ন। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (মার্ক্সিস্ট) পলিট ব্যুরোর সদস্য। দলটি সংক্ষেপে সিপিআই-এম নামে পরিচিত। সংকট মোকাবিলায় তার কোনো জুড়ি নেই। তা আরেকবার প্রমাণিত হলো করোনা মহামারিতে। ২০১৭ সালে ঘূর্ণিঝড় অক্ষি, ২০১৮ সালে নিপাহ ভাইরাসের দৌরাত্ম্য, ২০১৮-২০১৯ সালে কয়েকটি জেলায় সংঘটিত ভয়াবহ বন্যার দুঃসময় মোকাবিলায় দারুণ সাফল্য দেখিয়েছেন বিজয়ন। এ কারণেই তার নামের পাশে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ বিশেষণ। মহামারির সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজার পাশাপাশি তিনিও দিনরাত তা মোকাবিলায় কাজ করে গেছেন। বন্যার সময় খাদ্য, ওষুধ আর অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে। ২০২০ সালের মার্চে মোদি সরকার প্রথম যখন লকডাউন ঘোষণা করেছিলেন, তখন দেশব্যাপী খাদ্য সংকটে পড়ে যান সাধারণ শ্রমিকরা। সেসময় কেরালার মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং তাদের কল্যাণে এগিয়ে আসেন। বশির আহমেদ নামে কোচির এক শ্রমিক মুখ্যমন্ত্রী প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা কী করে তাদের ভুলে যাব। আমাদের বিপদে তারা পাশে ছিলেন। আমরা এখন তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি।

গত বছর করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় কেরালার বামপন্থি সরকার দারুণ সাফল্য দেখিয়েছিল। বিশ্বজুড়ে এ সাফল্য ‘কেরালা মডেল’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল। দূরদর্শিতার নজির গড়েছেন অক্সিজেনের ব্যাপক উৎপাদন ও মজুত রেখে। যে কারণে কোভিড সংক্রমণে সেখানে মৃত্যুর হারও অনেক কম। সরকারের দূরদর্শিতাকে বিবেচনায় এনেছেন ভোটাররা। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বাম সরকার এর সুফল পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বাম নেতৃত্বাধীন সরকারের সাফল্য ভোটের লড়াইয়ে এলডিএফ জোটকে এগিয়ে রেখেছিল। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, বিজেপিবিরোধী খ্রিষ্টান-মুসলিম ঐক্য ছিল ‘কমরেডের’ বিধানসভা দখলের আরেক অস্ত্র। মুসলমান ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা দারুণভাবে সমর্থন জুগিয়েছে এ সরকারকে। কেরালার ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) সংখ্যালঘু মুসলিম ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে কংগ্রেসবিরোধী মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ করে আসছিল অনেক আগে থেকেই। সেখানে তৈরি হয় মুসলিম-খ্রিষ্টান ঐক্য। এই ঐক্যকেই পুঁজিতে সম্পৃক্ত করে এলডিএফ।

কেরালায় বিজেপির ব্যর্থতাও এলডিএফকে এগিয়ে রেখেছে অন্যদিক থেকে। সাধারণ সাম্প্রদায়িক কলাকৌশলে এখানকার ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি আকর্ষিত হননি। সচরাচর বিজেপির রাজনীতির মূল পুঁজিই হচ্ছে ধর্মীয় বিদ্বেষ। এই পুঁজি নিয়ে দলটি প্রায় পুরো ভারত দাপিয়ে বেড়ালেও কেরালায় এসে তারা মুখ থুবড়ে পড়ে। আর এই বিজেপি বিদ্বেষের কারণেই অন্য ধর্মাবলম্বীরা এলডিএফকে বেছে নেয়।

জনকল্যাণমুখী রাজনীতি বিজয়নকে এগিয়ে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু ভোটারের মন জয় করতে এটাই তার আসল অস্ত্র নয়। তার সরকারে থাকা অন্য কর্মকর্তারাও তার ইমেজকে ওপরে তুলতে মরিয়া। যে কারণে, সরকারের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার ইমেজের কথা মাথায় রেখে অব্যাহত রাখেন জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম। তাকে জনগণ ‘ক্যাপ্টেইন’ বলে ডাকেন। কেন? বিজয়ন বলেন, ‘আমি জানি না। এটা তাদের ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিরোধীরা এ ধরনের সম্বোধনের বিপরীতে কোনো বিতর্ক তৈরি করতে পারেনি।’ আর কমরেড সিপিএম নেতা কোদিয়ারি বালাকৃষ্ণন জলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীকে আমি কমরেড বলে জানি, ক্যাপ্টেইন নয়।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন