মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের ১০০ দিন পার
jugantor
মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের ১০০ দিন পার

  সেলিম কামাল  

১২ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ। কাকডাকা এক ভোর। সূর্যের ঘুম ভাঙেনি তখনও। অর্জিত গণতন্ত্রের সুখনিদ্রায় মগ্ন জনগণ। হঠাৎ ‘বজ পাত’। ঘুম ভেঙে চোখ মেলল মিয়ানমারবাসী। এক অশুভ শক্তির লালচোখের বিজলীতে শিশুগণতন্ত্রের চোখে নেমে এলো ঘোর অন্ধকার। ধুঁকে ধুঁকে চলা দেশটির রুগ্ন গণতন্ত্রকে বারবার গলা টিপে ধরছে ‘প্রতিরক্ষার বেশধারী’ শক্তিধর অসুররা। মঙ্গলবার সেই অসুরদের হত্যা, অত্যাচার আর নিপীড়নের বিভীষিকাময় ১০০ দিন পার করল মিয়ানমার।

প্রতিদিনের মতো সেদিন ভোরেও নেপিদোর সংসদ ভবনের পাশের বাগানে ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজে ব্যস্ত ছিলেন অ্যারোবিক্স ইন্সট্রাক্টর খিং নিন ওয়েই। ঠিক তার পেছন দিয়েই অভ্যুত্থান উৎসবে যাচ্ছিল মিয়ানমার জান্তাদের গাড়িবহর। তারপরই খিং নিনের মতো পুরো মিয়ানমারবাসী জেনে গেল এনএলডি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে অং সান সু চিকে গ্রেফতার করেছে জান্তারা।

এরপর থেকেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপ্রেমীরা। পরদিনই শিক্ষক, চিকিৎসক, কবি, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সব শ্রেণিপেশার মানুষ অভ্যুত্থানের প্রতিবাদে নেমে পড়েন রাজপথে। বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ৪৩ শিশুসহ মোট ৭৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বুট-বুলেটের বর্বরতা থেকে রেহাই পায়নি সাত বছরের শিশুও। ৭০ জন সাংবাদিকসহ পাঁচ হাজারের বেশি নাগরিককে গ্রেফতার করেছে জান্তারা। জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অন্যায়ভাবে সাধারণ নাগরিক হত্যার নিন্দা অব্যাহত রেখেছে। কোনো কোনো দেশের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞাও। অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেল দেশটি। কয়েকটি সংস্থার বিনিয়োগ বন্ধে ক্ষতি হল ৯.৪ ট্রিলিয়ন কিয়াটের। চাকরিহারা হয়েছেন ছয় লাখ কর্মী। ‘ক্ষুধা’ নামের দানবের থাবায় বহু প্রাণ এখন ওষ্ঠাগত। অভ্যুত্থানের পর দুই সপ্তাহের মধ্যে মিয়ানমারে সর্বাত্মক রূপ নিয়েছে আন্দোলন-সংগ্রাম। শুরুটা অসহযোগ দিয়ে হলেও ক্রমেই প্রতিরোধ আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়ে জনগণ। দেশজুড়ে হাসপাতাল-ক্লিনিক বন্ধ করে হয় আন্দোলনের সূত্রপাত। কর্মবিরতি পালন করেছেন চিকিৎসক-নার্সরা। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তালা মেরে রাস্তায় নেমেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা। রাস্তায় বাসের চাকা ঘোরেনি; রেললাইনে চলেনি ট্রেন। সব বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ক্রমবর্ধমান এই বিক্ষোভ-আন্দোলন ঠেকাতে নানা ফন্দি-ফিকির করেছে সেনা কর্তৃপক্ষ। দিনের বেলায় বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে কখনও রাবার বুলেট-টিয়ার গ্যাস-জলকামান আবার কখনও সরাসরি তাজা গুলি ছুড়েছে। রাতে চলেছে প্রকাশ্য হত্যা, গুম, অপহরণ ও ধরপাকড়। সশস্ত্রবাহিনী দিবস ছিল ২৭ মার্চ। সেদিনই সর্বাধিক বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে জান্তাবাহিনী। ওই দিন ১৪৪ জনকে হত্যার মাধ্যমে দিবসটির অন্য নাম হয় ‘লজ্জা দিবস’। এদিনের সেনা আগ্রাসনকে ‘গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল বলেছে, দিনটি চিরকাল সন্ত্রাস ও অসম্মানের সাক্ষী হিসাবে ইতিহাসে খোদাই করা থাকবে। সেদিন থেকেই মনে করা হচ্ছিল গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার। বিভিন্ন বিদ্রোহী জাতিগোষ্ঠীর সহযোগিতায় সশস্ত্র যুদ্ধের প্রশিক্ষণ অব্যাহত রেখেছে মিয়ানমারের তরুণ-যুবারা। খণ্ড খণ্ড প্রতিরোধে বেশ কিছু জান্তা সদস্যকে হত্যার দাবিও করেছে বিদ্রোহী গ্রুপগুলো।

মিয়ানমারে চলমান সেনাশাসনের অবসান ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ‘ছায়া সরকার’ গঠন করে অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সংসদ সদস্যদের জোট। ছায়া সরকারে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) পাশাপাশি দেশটির ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর রাজনীতিকেরা রয়েছেন। তারা আত্মগোপনে থেকে এ ছায়া সরকার পরিচালনা করছেন ও জান্তাবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানায় এনএলডির আইনপ্রণেতাদের জোট রিপ্রেজেন্টিং পাইদাউংসু হ্লুতাউ (সিআরপিএইচ)।

মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের ১০০ দিন পার

 সেলিম কামাল 
১২ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ। কাকডাকা এক ভোর। সূর্যের ঘুম ভাঙেনি তখনও। অর্জিত গণতন্ত্রের সুখনিদ্রায় মগ্ন জনগণ। হঠাৎ ‘বজ পাত’। ঘুম ভেঙে চোখ মেলল মিয়ানমারবাসী। এক অশুভ শক্তির লালচোখের বিজলীতে শিশুগণতন্ত্রের চোখে নেমে এলো ঘোর অন্ধকার। ধুঁকে ধুঁকে চলা দেশটির রুগ্ন গণতন্ত্রকে বারবার গলা টিপে ধরছে ‘প্রতিরক্ষার বেশধারী’ শক্তিধর অসুররা। মঙ্গলবার সেই অসুরদের হত্যা, অত্যাচার আর নিপীড়নের বিভীষিকাময় ১০০ দিন পার করল মিয়ানমার।

প্রতিদিনের মতো সেদিন ভোরেও নেপিদোর সংসদ ভবনের পাশের বাগানে ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজে ব্যস্ত ছিলেন অ্যারোবিক্স ইন্সট্রাক্টর খিং নিন ওয়েই। ঠিক তার পেছন দিয়েই অভ্যুত্থান উৎসবে যাচ্ছিল মিয়ানমার জান্তাদের গাড়িবহর। তারপরই খিং নিনের মতো পুরো মিয়ানমারবাসী জেনে গেল এনএলডি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে অং সান সু চিকে গ্রেফতার করেছে জান্তারা।

এরপর থেকেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপ্রেমীরা। পরদিনই শিক্ষক, চিকিৎসক, কবি, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সব শ্রেণিপেশার মানুষ অভ্যুত্থানের প্রতিবাদে নেমে পড়েন রাজপথে। বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ৪৩ শিশুসহ মোট ৭৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বুট-বুলেটের বর্বরতা থেকে রেহাই পায়নি সাত বছরের শিশুও। ৭০ জন সাংবাদিকসহ পাঁচ হাজারের বেশি নাগরিককে গ্রেফতার করেছে জান্তারা। জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অন্যায়ভাবে সাধারণ নাগরিক হত্যার নিন্দা অব্যাহত রেখেছে। কোনো কোনো দেশের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞাও। অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেল দেশটি। কয়েকটি সংস্থার বিনিয়োগ বন্ধে ক্ষতি হল ৯.৪ ট্রিলিয়ন কিয়াটের। চাকরিহারা হয়েছেন ছয় লাখ কর্মী। ‘ক্ষুধা’ নামের দানবের থাবায় বহু প্রাণ এখন ওষ্ঠাগত। অভ্যুত্থানের পর দুই সপ্তাহের মধ্যে মিয়ানমারে সর্বাত্মক রূপ নিয়েছে আন্দোলন-সংগ্রাম। শুরুটা অসহযোগ দিয়ে হলেও ক্রমেই প্রতিরোধ আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়ে জনগণ। দেশজুড়ে হাসপাতাল-ক্লিনিক বন্ধ করে হয় আন্দোলনের সূত্রপাত। কর্মবিরতি পালন করেছেন চিকিৎসক-নার্সরা। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তালা মেরে রাস্তায় নেমেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা। রাস্তায় বাসের চাকা ঘোরেনি; রেললাইনে চলেনি ট্রেন। সব বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ক্রমবর্ধমান এই বিক্ষোভ-আন্দোলন ঠেকাতে নানা ফন্দি-ফিকির করেছে সেনা কর্তৃপক্ষ। দিনের বেলায় বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে কখনও রাবার বুলেট-টিয়ার গ্যাস-জলকামান আবার কখনও সরাসরি তাজা গুলি ছুড়েছে। রাতে চলেছে প্রকাশ্য হত্যা, গুম, অপহরণ ও ধরপাকড়। সশস্ত্রবাহিনী দিবস ছিল ২৭ মার্চ। সেদিনই সর্বাধিক বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে জান্তাবাহিনী। ওই দিন ১৪৪ জনকে হত্যার মাধ্যমে দিবসটির অন্য নাম হয় ‘লজ্জা দিবস’। এদিনের সেনা আগ্রাসনকে ‘গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল বলেছে, দিনটি চিরকাল সন্ত্রাস ও অসম্মানের সাক্ষী হিসাবে ইতিহাসে খোদাই করা থাকবে। সেদিন থেকেই মনে করা হচ্ছিল গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার। বিভিন্ন বিদ্রোহী জাতিগোষ্ঠীর সহযোগিতায় সশস্ত্র যুদ্ধের প্রশিক্ষণ অব্যাহত রেখেছে মিয়ানমারের তরুণ-যুবারা। খণ্ড খণ্ড প্রতিরোধে বেশ কিছু জান্তা সদস্যকে হত্যার দাবিও করেছে বিদ্রোহী গ্রুপগুলো।

মিয়ানমারে চলমান সেনাশাসনের অবসান ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ‘ছায়া সরকার’ গঠন করে অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সংসদ সদস্যদের জোট। ছায়া সরকারে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) পাশাপাশি দেশটির ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর রাজনীতিকেরা রয়েছেন। তারা আত্মগোপনে থেকে এ ছায়া সরকার পরিচালনা করছেন ও জান্তাবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানায় এনএলডির আইনপ্রণেতাদের জোট রিপ্রেজেন্টিং পাইদাউংসু হ্লুতাউ (সিআরপিএইচ)।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন