আফগানদের ভয়ে রেখে আনন্দে তালেবান
jugantor
আফগানদের ভয়ে রেখে আনন্দে তালেবান
শিশুদের মেলার মাঠে যোদ্ধাদের সশস্ত্র উৎসব

  সেলিম কামাল  

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর থেকে পুরো আফগানিস্তানই যেন ভয়ের ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। নারীরা মুখবুজে ফিরে গেছে ঘরকুনো জীবনে। মৃত্যু-আতঙ্কে দেশ ছাড়ছে লাখ লাখ আফগান। ভয়ে আড্ডা -ফেসবুক ছেড়ে আনমনা হয়ে আছে তরুণ-কিশোরের দল। কখন কী ভুলে প্রাণ যায়! সারাক্ষণই এই চিন্তায় তটস্থ। এর ঠিক উলটো ছবি তালেবান আড্ডায়। প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা আর আনন্দ-উচ্ছাসে সুদে-আসলে মিলিয়ে নিচ্ছে গত ২০ বছরের হিসাব। বুক ফুলিয়ে ঘুরছে লোকালয়ে, বিকাল হলেই দল বেঁধে আড্ডায়। রিসোর্ট, পার্ক-সবখানেই এখন তালেবান। এমনকি ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মেলার মাঠেও এখন তাদের সোল্লাস উপস্থিতি। মঙ্গলবার পশ্চিম কাবুলের এমন একটি ঘটনা নিয়েই নতুন করে সমালোচনায় পড়েছে তালেবান যোদ্ধারা। একে৪৭ আর এম৪ অ্যাসল্ট রাইফেলসহ প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আনন্দ-মহড়ায় নামে শিশুদের মেলার মাঠে। জিহাদি জীবনে কোনোদিন মেলায় যায়নি তারা। কিন্তু এদিন শস্ত্র তালেবান যোদ্ধারা মেলার মাঠে নিজেদের মতো করে উপভোগ করেছে। সবার বুকের সঙ্গেই সেঁটে ছিল একটি করে অস্ত্র। সেই মাঠে কোনো সাধারণ আফগানের উপস্থিতি তো কল্পনাই করা যায়নি। একেবারে নিজেদের মতো করেই আনন্দ করেছে তারা। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেও প্রকাশ পেয়েছে হিংস্রতার বনেদিপনা। মেলার মাঠে থাকা পরিত্যক্ত জলদস্যু জাহাজে চড়ে এক যোদ্ধা অস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘এটা আফগানিস্তান!’ যোদ্ধারা অস্ত্র হাতে যে যার মতো পোজ দিয়ে ছবি তুলছে আর হাসছে। পাশ থেকে বাহবা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের কমান্ডাররা। খুব সাধারণ নিয়মে এ মেলায় সপরিবারে থাকার কথা ছিল অগণিত আফগান শিশু। যাদের হাতে শোভা পেত বাতাসে ভাসা কয়েকটি চকচকে বেলুন, কিংবা কাগজে বানানো রঙিন চরকি। ওই চরকি বাতাস লাগিয়ে ঘোরাতে মনের আনন্দে দৌড়ে বেড়াবে শিশুরা। কিন্তু সে দৃশ্য এখন নিকটঅতীত। ১৫ আগস্ট ক্ষমতায় আসার পর থেকে জীবনসংকটে রয়েছেন আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ। চাকরি নেই, অন্য কোনো উপর্জানের পথও বন্ধ। তালেবানের নিষেধাজ্ঞার খড়গে পড়ে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের রোজগার হয়েছে সুদূর পরাহত। সংসারের ঘানি টানতে অপারগ হয়ে অচল হয়ে পড়েছে নারীদের জীবনচাকা। সবমিলিয়েই আফগানদের স্বাধীনতা হরণের ইঙ্গিত চূড়ান্ত করেছে তালেবান। তালেবান দখল করার পর থেকে আফগানরা ১৯৯০-এর দশকে তাদের নৃশংস নিপীড়নমূলক শাসনের আশঙ্কা করেছিল। সেই সময়ে সংগীত, ফটোগ্রাফি, টেলিভশন এমনকি ঘুড়ি ওড়ানোর মতো বাচ্চাদের খেলাও নিষিদ্ধ করেছিল। তালেবানরা এবার আরও মধ্যপন্থি শাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও ইতোমধ্যেই আফগানদের স্বাধীনতা খর্ব করেছে-যার অন্যতম প্রমাণ মেয়েদের স্কুলে যেতে না-দেওয়া এবং খেলাধুলা থেকে বিরত রাখা।

মেলার মাঠে ইস্পাতকঠিন যোদ্ধারা নিজেদের মধ্যে হাততালি, হাসি-আনন্দে মেতে ওঠে। মেলার পাশেই সুরম্য জলাশয়ের তীরে অন্য তালেবান সদস্যরা রাজহাঁসের আকৃতির পেডালোতে ঝাঁপ দেয় আর জলকেলিতে মেতে ওঠে। আর ঠিক সেই সময়ে সূর্যটা ধীরে ধীরে পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যেতে থাকে- ঠিক যেমন করে তালেবানদের আনন্দের মাঝেই ফিকে হতে থাকে সাধারণ সন্ত্রস্ত আফগানদের স্বাধীনতার রং।

আফগানিস্তানের আকাশসীমা লংঘন করায় যুক্তরাষ্ট্রকে তালেবানের হুঁশিয়ারি : আফগানিস্তানের আকাশসীমা লক্সংঘন করায় যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির তালেবান সরকার। বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন ও দোহা চুক্তি লংঘন করে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের আকাশসীমা লংঘন করেছে। আগামী এই ধরনের আচরণের পরিণতি ভয়ংকর হবে। বৃহস্পতিবার এক টুইটার বার্তায় তালেবান মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, ‘যে কোনো দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষ ওই দেশের জল, স্থল ও আকাশসীমার মালিক এবং বর্তমানে আফগানিস্তানের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকারী হিসাবে তালেবান আফগানিস্তানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। কাজেই সেদেশের যেকোনো সীমানায় যেকোনো কাজ করতে গেলে তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।’

আফগানদের ভয়ে রেখে আনন্দে তালেবান

শিশুদের মেলার মাঠে যোদ্ধাদের সশস্ত্র উৎসব
 সেলিম কামাল 
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর থেকে পুরো আফগানিস্তানই যেন ভয়ের ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। নারীরা মুখবুজে ফিরে গেছে ঘরকুনো জীবনে। মৃত্যু-আতঙ্কে দেশ ছাড়ছে লাখ লাখ আফগান। ভয়ে আড্ডা -ফেসবুক ছেড়ে আনমনা হয়ে আছে তরুণ-কিশোরের দল। কখন কী ভুলে প্রাণ যায়! সারাক্ষণই এই চিন্তায় তটস্থ। এর ঠিক উলটো ছবি তালেবান আড্ডায়। প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা আর আনন্দ-উচ্ছাসে সুদে-আসলে মিলিয়ে নিচ্ছে গত ২০ বছরের হিসাব। বুক ফুলিয়ে ঘুরছে লোকালয়ে, বিকাল হলেই দল বেঁধে আড্ডায়। রিসোর্ট, পার্ক-সবখানেই এখন তালেবান। এমনকি ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মেলার মাঠেও এখন তাদের সোল্লাস উপস্থিতি। মঙ্গলবার পশ্চিম কাবুলের এমন একটি ঘটনা নিয়েই নতুন করে সমালোচনায় পড়েছে তালেবান যোদ্ধারা। একে৪৭ আর এম৪ অ্যাসল্ট রাইফেলসহ প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আনন্দ-মহড়ায় নামে শিশুদের মেলার মাঠে। জিহাদি জীবনে কোনোদিন মেলায় যায়নি তারা। কিন্তু এদিন শস্ত্র তালেবান যোদ্ধারা মেলার মাঠে নিজেদের মতো করে উপভোগ করেছে। সবার বুকের সঙ্গেই সেঁটে ছিল একটি করে অস্ত্র। সেই মাঠে কোনো সাধারণ আফগানের উপস্থিতি তো কল্পনাই করা যায়নি। একেবারে নিজেদের মতো করেই আনন্দ করেছে তারা। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেও প্রকাশ পেয়েছে হিংস্রতার বনেদিপনা। মেলার মাঠে থাকা পরিত্যক্ত জলদস্যু জাহাজে চড়ে এক যোদ্ধা অস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘এটা আফগানিস্তান!’ যোদ্ধারা অস্ত্র হাতে যে যার মতো পোজ দিয়ে ছবি তুলছে আর হাসছে। পাশ থেকে বাহবা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের কমান্ডাররা। খুব সাধারণ নিয়মে এ মেলায় সপরিবারে থাকার কথা ছিল অগণিত আফগান শিশু। যাদের হাতে শোভা পেত বাতাসে ভাসা কয়েকটি চকচকে বেলুন, কিংবা কাগজে বানানো রঙিন চরকি। ওই চরকি বাতাস লাগিয়ে ঘোরাতে মনের আনন্দে দৌড়ে বেড়াবে শিশুরা। কিন্তু সে দৃশ্য এখন নিকটঅতীত। ১৫ আগস্ট ক্ষমতায় আসার পর থেকে জীবনসংকটে রয়েছেন আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ। চাকরি নেই, অন্য কোনো উপর্জানের পথও বন্ধ। তালেবানের নিষেধাজ্ঞার খড়গে পড়ে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের রোজগার হয়েছে সুদূর পরাহত। সংসারের ঘানি টানতে অপারগ হয়ে অচল হয়ে পড়েছে নারীদের জীবনচাকা। সবমিলিয়েই আফগানদের স্বাধীনতা হরণের ইঙ্গিত চূড়ান্ত করেছে তালেবান। তালেবান দখল করার পর থেকে আফগানরা ১৯৯০-এর দশকে তাদের নৃশংস নিপীড়নমূলক শাসনের আশঙ্কা করেছিল। সেই সময়ে সংগীত, ফটোগ্রাফি, টেলিভশন এমনকি ঘুড়ি ওড়ানোর মতো বাচ্চাদের খেলাও নিষিদ্ধ করেছিল। তালেবানরা এবার আরও মধ্যপন্থি শাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও ইতোমধ্যেই আফগানদের স্বাধীনতা খর্ব করেছে-যার অন্যতম প্রমাণ মেয়েদের স্কুলে যেতে না-দেওয়া এবং খেলাধুলা থেকে বিরত রাখা।

মেলার মাঠে ইস্পাতকঠিন যোদ্ধারা নিজেদের মধ্যে হাততালি, হাসি-আনন্দে মেতে ওঠে। মেলার পাশেই সুরম্য জলাশয়ের তীরে অন্য তালেবান সদস্যরা রাজহাঁসের আকৃতির পেডালোতে ঝাঁপ দেয় আর জলকেলিতে মেতে ওঠে। আর ঠিক সেই সময়ে সূর্যটা ধীরে ধীরে পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যেতে থাকে- ঠিক যেমন করে তালেবানদের আনন্দের মাঝেই ফিকে হতে থাকে সাধারণ সন্ত্রস্ত আফগানদের স্বাধীনতার রং।

আফগানিস্তানের আকাশসীমা লংঘন করায় যুক্তরাষ্ট্রকে তালেবানের হুঁশিয়ারি : আফগানিস্তানের আকাশসীমা লক্সংঘন করায় যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির তালেবান সরকার। বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন ও দোহা চুক্তি লংঘন করে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের আকাশসীমা লংঘন করেছে। আগামী এই ধরনের আচরণের পরিণতি ভয়ংকর হবে। বৃহস্পতিবার এক টুইটার বার্তায় তালেবান মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, ‘যে কোনো দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষ ওই দেশের জল, স্থল ও আকাশসীমার মালিক এবং বর্তমানে আফগানিস্তানের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকারী হিসাবে তালেবান আফগানিস্তানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। কাজেই সেদেশের যেকোনো সীমানায় যেকোনো কাজ করতে গেলে তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরুত্থান