১৬ শব্দে বেঁচে থাকবে মার্কেলের ১৬ বছর
jugantor
১৬ শব্দে বেঁচে থাকবে মার্কেলের ১৬ বছর

  জামির হোসেন  

০২ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চাইলে আরও এক মেয়াদ ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। কিন্তু ‘না’। এবার অবসর নেওয়ার পালা। গত সপ্তাহেই জার্মানিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকার গঠনের আলোচনাও শুরু হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেই অবসরে যাবেন চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। আর এর মধ্যদিয়ে শেষ হবে ১৬ বছরের চ্যান্সেলর জীবন। কিন্তু রাজনীতি থেকে বিদায় নিলেও জার্মানদের কাছে তার আবেদন এখনই শেষ হচ্ছে না। বিশেষ করে তার জীবন ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বক্তৃতাগুলো ও চমৎকার কিছু শব্দ তাকেও বহুদিন স্মরণীয় করে রাখবে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কেলের পর হয়তো আরও অনেক নেতাই আসবেন। কিন্তু তার মতো বাকপটু রাজনীতিক আর কেউ আসবেন না। ১৬ বছরের চ্যান্সেলর জীবনে এমন কিছু শব্দ উপহার দিয়েছেন যা আজও সমানভাবে জনপ্রিয় ও বহুল চর্চিত। তার হাজারো শব্দের মধ্যে মাত্র ১৬টি বাক্য বা শব্দ এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-

ডাই মার্কেল-রাউট (রম্বসের মতো একটি চিহ্ন)

জ্যামিতির রম্বসের মতো একটি চিহ্ন। যা মার্কেলের দুই হাতের সমন্বয়ে তৈরি হয়। শুধু বৈশ্বিক কোনো সম্মেলনে কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো সফরে ক্যামেরার সামনেই তাকে এমনটা করতে দেখা যায়। বিষয়টা ২০০২ সালের পর থেকেই সচেতনে হোক আর অবচেতনে হোক এটা তার বিখ্যাত ভঙ্গি হয়ে ওঠে। এমনকি ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে ভঙ্গিটিকে ক্ষমতার প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করে তার দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ)। প্রচারণার হাতিয়ার হিসাবে বার্লিনের রাস্তার পাশে তোলে বিশাল ব্যানার। পাশে লিখে দেয়, ‘তোমার হাতেই জার্মানির ভবিষ্যৎ’। তবে মার্কেলের বিদায়ের পরও ভঙ্গিটি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তার উত্তরসূরি রাজনীতিক সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট ওলাফ শলৎসকে এখন প্রায়ই এমন ভঙ্গিতে পোজ দিতে দেখা যাচ্ছে।

এরটুসটিগেন (নিজেকে ফিট রাখা)

মার্কেলের শব্দভাণ্ডারের একটি অতি পরিচিত শব্দ। প্রাচীন প্রুশিয়া ভাষার শক্তিশালী একটি বাগধারা এরটুসটিগেন মানে শারীরিক কসরতের মাধ্যমে দেহকে শক্ত-সামর্থ্য করে গড়ে তোলা। রাজনৈতিক জীবনে শব্দটি বহুবার ব্যবহার করেছেন চ্যান্সেলর মার্কেল। বিশেষ করে ইউরোপের আঞ্চলিক সংকট নিয়ে কথা বলার সময়। শব্দটির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চাইতেন, ইউরোপ একটি প্রাচীন মহাদেশ। একে অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিক করে তুলতে হবে। যাতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যায়।

ডাস পাবলিক ভিউয়িং (জনসাধারণের দেখা)

শব্দটি মার্কেলের হাত ধরে জার্মান ভাষায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ২০০৬ সালে। ওই বছর বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজন করেছিল জার্মানি। আর বৈশ্বিক আসরের প্রত্যেকটি খেলাই উন্মুক্ত জন পরিসরে দেখানো হতো। শব্দটি দিয়ে এই বিষয়টি বোঝাতেই ব্যবহার হতো। মার্কেলের যুগে, জার্মান জাতীয় ফুটবল দলকে সমর্থন গৌরবের বিষয় হয়ে ওঠে। যা এর আগে কখনও দেখা যায়নি।

দি মুটটিভেশন (বিবর্তন)

আন্তর্জাতিক আসরে জার্মান জাতীয় ফুটবল দলের সাফল্য চ্যান্সেলর মার্কেলও বেশ উপভোগ করতেন। এমনকি ২০১২ সালে ইউরো ফুটবলের বাছাইপর্বে জার্মানি তুরস্ককে হারিয়ে দেওয়ার পর শুভেচ্ছা জানাতে জার্মান দলের ড্রেসিংরুমেই ঢুকে পড়েন মার্কেল। চ্যান্সেলরের এ আচরণকে ইতিবাচক হিসাবেই দেখে জার্মানরা এবং এই ঘটনার ছবি ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে জার্মানির অনানুষ্ঠানিক মাসকট হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, ওই আসরে বিশ্বকাপও জয় করে জার্মানরা। জয়ের পর চ্যান্সেলরের সেই ঘটনাটি স্মরণ করেন খেলোয়াড়রা। জয়ের নায়ক লুকাস পোডলস্কি একে ‘মুটিভেশন’ হিসাবে বর্ণনা করেন। জার্মান ভাষায় ‘মুটি’ অর্থ মা। আর মার্কেলকে এই ‘মুটি’ নামেই ডাকে অনেক জার্মান।

ডেয়ার স্ট্রেস টেস্ট (স্ট্রেস পরীক্ষা)

স্ট্রেসটেস্টিং শব্দটি চিকিৎসা শাস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। শারীরিক কসরতকালে মানুষের হৃদযন্ত্র কিভাবে কাজ করে তা দেখতে স্ট্রেসটেস্টিং ব্যবহার করা হয়। মার্কেল যুগে একের পর এক অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যদিয়ে যেতে হয় ইউরোপকে। এ সময় সে ব্যাংকই হোক, জোট সরকারই হোক বা পরমাণু প্ল্যান্টই হোক-সবকিছুই স্ট্রেসটেস্টিং ঘোষণা দেন মার্কেল। তারই অংশ হিসাবে ২০২৩ সালের মধ্যে জার্মানির সব পরমাণু কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে।

এনার্জি ভেনডে (শক্তি স্থানান্তর)

দি ভেনডে অর্থ শক্তি স্থানান্তর। ১৯৮৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও বার্লিন দেওয়ালের পতনের মতো ঘটনাবলিকে জার্মানরা কিভাবে দেখে এর মাধ্যমে সেটাই বোঝানো হয়ে থাকে। এনার্জি ভেনডে দিয়ে বোঝায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধাবিত হওয়া। দি ভেনডে সফল হতে সময় নিয়েছিল মাত্র কয়েক মাস। অন্যদিকে মার্কেল যুগে শুরু হয়ে এখনও চলছে এনার্জি ভেনডে।

অলটারনেটিভলস (কোনো বিকল্প নেই)

আক্ষরিক অর্থ ‘বিকল্পহীন’ বা যার কোনো বিকল্প নেই। অলটারনেটিভলস হচ্ছে মার্কেলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিজস্ব ধরণ বা নীতি। যেমনটা সাবেক ব্রিটিশ নারী প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের মধ্যে। শব্দটি প্রথম ব্যবহার হয়েছে বাজার অর্থনীতির বিকল্প নিয়ে বিতর্ক অবসানের জন্য। কিন্তু পরবর্তীতে এটা মার্কেলের সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিতে পরিণত হয়। এবং বৈশ্বিক মন্দার সময় বেইলআউট বা জরুরি তহবিল ছাড়, আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান ও জাতীয় ঋণ কমানোর মতো বিষয়গুলোতে অলটারনেটিভলস বা বিকল্পহীন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। মার্কেলের মুখনিঃসৃত শব্দগুচ্ছটি এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে উগ্র ডানপন্থিরা ‘অলটারনেটিভ ফার ডয়েচেল্যান্ড’ নামে দল গঠন করেছে।

দি ডোনার-মর্ডে (কাবাব পদ্ধতিতে খুন)

দি ডোনার-মর্ডে অর্থ কাবাব পদ্ধতিতে খুন বা হত্যা। চলতি শতকের শুরুর দিকে জার্মানিতে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট আন্ডারগ্রাউন্ড নামে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। ২০০০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সাত বছরে গোষ্ঠীটির হাতে অন্তত ১০ জন গুপ্তহত্যার শিকার হয়। নিহতদের বেশিরভাগই তুর্কি ও কুর্দি বংশোদ্ভূত এবং তারা সবাই ছোট ছোট ব্যবসা পরিচালনা করতেন। এসব হত্যার পেছনের কারণ বা উদ্দেশ্য কি তার কোনো তথ্য তখনও জার্মান পুলিশর কাছে ছিল না। তবে এটাকে জার্মান-তুর্কিদের মধ্যকার ‘গ্যাং ওয়ারফেয়ার’ বলে অভিহিত করার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে বোঝাতে প্রায় ‘ডোনার-মর্ডে’ বা ‘কাবাব পদ্ধতির ঘাতক’ শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করে জার্মান মূলধারার গণমাধ্যম। কারণ ইসমাইল ইয়াসার নামে এক মুসলিম কাবাব রেস্তোরাঁর মালিক ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এ শব্দগুচ্ছটি দিয়ে হত্যাকারীদের বদলে নিহতদেরকেই দানব আকারে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। অবশেষে ২০১১ সালে আরও দুজনকে হত্যার পর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির তথ্য সামনে আসে।

ডাস নয়ল্যান্ড (নতুন অঞ্চল)

ডাস নয়ল্যান্ড শব্দটির অর্থ নতুন কোনো অঞ্চল, এমন একটি ভূখণ্ড যেখানে এখনও মানুষের পা পড়েনি। ইন্টারনেট জগৎ বা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব বোঝাতে মার্কেল ২০১৩ সালে প্রথমবার শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ইন্টারনেট আমাদের জন্য অনেকটা একটা ভার্জিন টেরিটরির মতো।’ জার্মান জনগণও যেন শব্দগুচ্ছটি লুফে নেয়।

দি ভিলকমেনসকুলটুর(স্বাগত সংস্কৃতি)

দি ভিলকমেনসকুলটুর অর্থ স্বাগত সংস্কৃতি। ২০১৫ সালে জার্মান সীমান্তে শরণার্থীর ঢল নামে। এসব শরণার্থীর বেশিরভাগই সিরীয় যুদ্ধের কারণে উদ্বাস্তু হয়েছিল। এ সময় জার্মান সরকারের অনেক কর্মকর্তাই সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে মত দেন। কিন্তু সীমান্ত বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানান মার্কেল। তখন চ্যান্সেলরের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছিল জার্মান জনগণও। শুধু তাই নয়, শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর পাশাপাশি নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতাও করেছিল তারা। তাদের এই মনোভাবকে তুলে ধরতে ‘দি ভিলকমেনসকুলটুর’ শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করা হয়। যার অর্থ ‘স্বাগত সংস্কৃতি’।

ভিয়ার সাপেন ডাস (আমরা এটা করতে পারি)

যেকোনো সমস্যা মোকাবিলার সক্ষমতা বুঝাতে ‘ভিয়ার সাপেন ডাস’ কথাটি ব্যবহৃত হয়। বড় কোনো সংকট সামনে এলেই বেশ জোরের সঙ্গে এই কথাটিই বলতেন মার্কেল। এটা অনেকটা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ‘ইয়েস, উই ক্যান তথা হ্যা, এটা আমরা এটা করতে পারি’ কথাটার মতো। ২০১৫ সালে মধ্যপ্রাচ্য সংকট বিশেষ করে সিরিয়া যুদ্ধের কারণে জার্মানিতে হঠাৎ করেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন বেড়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে জার্মান জনগণের উদ্বেগ দুর করা ও বিরোধীদের সমালোচনা বন্ধের চেষ্টায় এক সাক্ষাৎকারে মার্কেল বলেন, ‘জার্মানি একটি শক্তিশালী দেশ। আমরা এ ধরনের সমস্যা অতীতে মোকাবিলা করেছি। এখনও পারব।’

দি লুগেনপ্রেস (মিথ্যুক গণমাধ্যম)

দি লুগেনপ্রেস অর্থ ‘মিথ্যুক গণমাধ্যম’। ১৯ শতকের শুরুর দিকে তথা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান ভাষায় ‘লায়ার’স প্রেস’ বলে একটি শব্দগুচ্ছের ব্যাপক ব্যবহার হতো। তৎকালে কায়জারের ঔপনিবেশিক শাসন নিয়ে বিদেশি পত্রিকাগুলোর লেখালেখির বিরুদ্ধে জার্মান বুদ্ধিজীবীরা শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করতেন। ১৯৩০-এর দশকে এডলফ হিটলারের সমালোচকদের ‘লিজেনপ্রেস’ তকমা দিয়েছিল নাৎসিরা। প্রায় ৮০ বছর পর শব্দগুচ্ছটি আবার ফিরে আসে মার্কেলের যুগে। ২০১৫ সালে তার সরকারের শরণার্থী নীতির বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী পেগিডা মুভমেন্টের বিক্ষোভে ‘লিজেনপ্রেস’ বলে স্লোগান দেয় বিক্ষোভকারীরা।

ডেয়ার পুটিনফারসটেয়া (পুতিনকে বোঝা)

ডেয়ার পুটিনফারসটেয়ার আক্ষরিক অর্থ পুতিনের বোঝাপড়া। বিশদ অর্থে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিনকে যিনি ভালো করে বোঝেন। সেই অর্থে মার্কেলই হচ্ছেন জার্মানির প্রথম রাজনীতিক যিনি পুতিনকে ভালো বুঝতে পারেন। কারণটা আর কিছু নয়, মার্কেলের রুশ ভাষার দখল। কৈশোরে স্কুলে পড়ার সময় রুশ ভাষার পূর্ব-জার্মানির তৃতীয় সেরা ছাত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন মার্কেল। রাজনৈতিক জীবনে বিশেষ করে চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালনকালে কৈশোরের সেই শিক্ষাটা ভালো কাজে দিয়েছে তার। কোনো দোভাষী ছাড়াই পুতিনের কথা বুঝতে পারতেন তিনি।

দি অ্যাসাইমাটিসে ডিমোবিজিয়ারুং (গণতান্ত্রয়ান বা আন্দোলন)

২০০৫ সালের নির্বাচনে জিতে প্রথমবার চ্যান্সেলর হন মার্কেল। চার বছর পর ২০০৯ সালেও তাকে চ্যান্সেলর নির্বাচন করে জার্মান জনগণ। দ্বিতীয়বার মার্কেলের এই জয়ের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে ‘দি অ্যাসাইমাটিসে ডিমোবিজিয়ারুং’ শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করে জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান ম্যাথিয়াস জং। এর ইংরেজি রূপ ‘অ্যাসিমেট্রিক ডেমোবিলাইজেশন’ অর্থ গণতান্ত্রিক আন্দোলন যা মূলত একটি নির্বাচনি কৌশল। সেই কৌশলটি হচ্ছে বিতর্কিত কোনো বিষয়ে কোনো বিবৃতি বা মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা। উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক বিরোধীদের মনোবল নষ্ট করে দেওয়া।

দি অপনুংজরগেন (খোলার যন্ত্রণা)

শব্দগুচ্ছটির অর্থ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার যন্ত্রণা। করোনা মহামারিকালে আরোপিত দ্বিতীয় লকডাউন তুলে দেওয়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এর উৎপত্তি হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শব্দগুচ্ছটির প্রথম ব্যবহার করেন বিরোধী গ্রিন পার্টিল নেতা ও বাডেন-ভিরতেমবার্গের মুখ্যমন্ত্রী ভিনফ্রিড ক্রেটশম্যান। এর মাধ্যমে তিনি মূলত ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দেন। বিরোধী নেতার সঙ্গে একমত পোষণ করে মার্কেলও লকডাউন তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

দি সোয়ারক্রাপ্ট (মধ্যাকর্ষণ)

বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিলেন মার্কেল। পড়েছেন পদার্থবিদ্যায়। কোয়ান্টাম রসায়নে নিয়েছেন বিশেষ প্রশিক্ষণ। এগুলো তার রাজনৈতিক জীবনের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে। শুধু তাই সম্প্রতি করোনা মহামারির মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় তাকে সাহায্য করেছে এই বিজ্ঞান। মার্কেল মনে করতেন, পদার্থবিদ্যার অনেক সূত্রই রাজনীতিতে প্রয়োগ করা যায়। উদাহরণ হিসাবে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সোয়ারক্রাপ্ট তথা মধ্যাকর্ষণ সূত্র রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। গ্রাভিটি যেমন ‘ভরহীন, গভীরতা নেই’, রাজনীতিও তেমন।

১৬ শব্দে বেঁচে থাকবে মার্কেলের ১৬ বছর

 জামির হোসেন 
০২ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চাইলে আরও এক মেয়াদ ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। কিন্তু ‘না’। এবার অবসর নেওয়ার পালা। গত সপ্তাহেই জার্মানিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকার গঠনের আলোচনাও শুরু হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেই অবসরে যাবেন চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। আর এর মধ্যদিয়ে শেষ হবে ১৬ বছরের চ্যান্সেলর জীবন। কিন্তু রাজনীতি থেকে বিদায় নিলেও জার্মানদের কাছে তার আবেদন এখনই শেষ হচ্ছে না। বিশেষ করে তার জীবন ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বক্তৃতাগুলো ও চমৎকার কিছু শব্দ তাকেও বহুদিন স্মরণীয় করে রাখবে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কেলের পর হয়তো আরও অনেক নেতাই আসবেন। কিন্তু তার মতো বাকপটু রাজনীতিক আর কেউ আসবেন না। ১৬ বছরের চ্যান্সেলর জীবনে এমন কিছু শব্দ উপহার দিয়েছেন যা আজও সমানভাবে জনপ্রিয় ও বহুল চর্চিত। তার হাজারো শব্দের মধ্যে মাত্র ১৬টি বাক্য বা শব্দ এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-

ডাই মার্কেল-রাউট (রম্বসের মতো একটি চিহ্ন)

জ্যামিতির রম্বসের মতো একটি চিহ্ন। যা মার্কেলের দুই হাতের সমন্বয়ে তৈরি হয়। শুধু বৈশ্বিক কোনো সম্মেলনে কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো সফরে ক্যামেরার সামনেই তাকে এমনটা করতে দেখা যায়। বিষয়টা ২০০২ সালের পর থেকেই সচেতনে হোক আর অবচেতনে হোক এটা তার বিখ্যাত ভঙ্গি হয়ে ওঠে। এমনকি ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে ভঙ্গিটিকে ক্ষমতার প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করে তার দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ)। প্রচারণার হাতিয়ার হিসাবে বার্লিনের রাস্তার পাশে তোলে বিশাল ব্যানার। পাশে লিখে দেয়, ‘তোমার হাতেই জার্মানির ভবিষ্যৎ’। তবে মার্কেলের বিদায়ের পরও ভঙ্গিটি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তার উত্তরসূরি রাজনীতিক সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট ওলাফ শলৎসকে এখন প্রায়ই এমন ভঙ্গিতে পোজ দিতে দেখা যাচ্ছে।

এরটুসটিগেন (নিজেকে ফিট রাখা)

মার্কেলের শব্দভাণ্ডারের একটি অতি পরিচিত শব্দ। প্রাচীন প্রুশিয়া ভাষার শক্তিশালী একটি বাগধারা এরটুসটিগেন মানে শারীরিক কসরতের মাধ্যমে দেহকে শক্ত-সামর্থ্য করে গড়ে তোলা। রাজনৈতিক জীবনে শব্দটি বহুবার ব্যবহার করেছেন চ্যান্সেলর মার্কেল। বিশেষ করে ইউরোপের আঞ্চলিক সংকট নিয়ে কথা বলার সময়। শব্দটির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চাইতেন, ইউরোপ একটি প্রাচীন মহাদেশ। একে অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিক করে তুলতে হবে। যাতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যায়।

ডাস পাবলিক ভিউয়িং (জনসাধারণের দেখা)

শব্দটি মার্কেলের হাত ধরে জার্মান ভাষায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ২০০৬ সালে। ওই বছর বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজন করেছিল জার্মানি। আর বৈশ্বিক আসরের প্রত্যেকটি খেলাই উন্মুক্ত জন পরিসরে দেখানো হতো। শব্দটি দিয়ে এই বিষয়টি বোঝাতেই ব্যবহার হতো। মার্কেলের যুগে, জার্মান জাতীয় ফুটবল দলকে সমর্থন গৌরবের বিষয় হয়ে ওঠে। যা এর আগে কখনও দেখা যায়নি।

দি মুটটিভেশন (বিবর্তন)

আন্তর্জাতিক আসরে জার্মান জাতীয় ফুটবল দলের সাফল্য চ্যান্সেলর মার্কেলও বেশ উপভোগ করতেন। এমনকি ২০১২ সালে ইউরো ফুটবলের বাছাইপর্বে জার্মানি তুরস্ককে হারিয়ে দেওয়ার পর শুভেচ্ছা জানাতে জার্মান দলের ড্রেসিংরুমেই ঢুকে পড়েন মার্কেল। চ্যান্সেলরের এ আচরণকে ইতিবাচক হিসাবেই দেখে জার্মানরা এবং এই ঘটনার ছবি ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে জার্মানির অনানুষ্ঠানিক মাসকট হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, ওই আসরে বিশ্বকাপও জয় করে জার্মানরা। জয়ের পর চ্যান্সেলরের সেই ঘটনাটি স্মরণ করেন খেলোয়াড়রা। জয়ের নায়ক লুকাস পোডলস্কি একে ‘মুটিভেশন’ হিসাবে বর্ণনা করেন। জার্মান ভাষায় ‘মুটি’ অর্থ মা। আর মার্কেলকে এই ‘মুটি’ নামেই ডাকে অনেক জার্মান।

ডেয়ার স্ট্রেস টেস্ট (স্ট্রেস পরীক্ষা)

স্ট্রেসটেস্টিং শব্দটি চিকিৎসা শাস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। শারীরিক কসরতকালে মানুষের হৃদযন্ত্র কিভাবে কাজ করে তা দেখতে স্ট্রেসটেস্টিং ব্যবহার করা হয়। মার্কেল যুগে একের পর এক অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যদিয়ে যেতে হয় ইউরোপকে। এ সময় সে ব্যাংকই হোক, জোট সরকারই হোক বা পরমাণু প্ল্যান্টই হোক-সবকিছুই স্ট্রেসটেস্টিং ঘোষণা দেন মার্কেল। তারই অংশ হিসাবে ২০২৩ সালের মধ্যে জার্মানির সব পরমাণু কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে।

এনার্জি ভেনডে (শক্তি স্থানান্তর)

দি ভেনডে অর্থ শক্তি স্থানান্তর। ১৯৮৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও বার্লিন দেওয়ালের পতনের মতো ঘটনাবলিকে জার্মানরা কিভাবে দেখে এর মাধ্যমে সেটাই বোঝানো হয়ে থাকে। এনার্জি ভেনডে দিয়ে বোঝায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধাবিত হওয়া। দি ভেনডে সফল হতে সময় নিয়েছিল মাত্র কয়েক মাস। অন্যদিকে মার্কেল যুগে শুরু হয়ে এখনও চলছে এনার্জি ভেনডে।

অলটারনেটিভলস (কোনো বিকল্প নেই)

আক্ষরিক অর্থ ‘বিকল্পহীন’ বা যার কোনো বিকল্প নেই। অলটারনেটিভলস হচ্ছে মার্কেলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিজস্ব ধরণ বা নীতি। যেমনটা সাবেক ব্রিটিশ নারী প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের মধ্যে। শব্দটি প্রথম ব্যবহার হয়েছে বাজার অর্থনীতির বিকল্প নিয়ে বিতর্ক অবসানের জন্য। কিন্তু পরবর্তীতে এটা মার্কেলের সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিতে পরিণত হয়। এবং বৈশ্বিক মন্দার সময় বেইলআউট বা জরুরি তহবিল ছাড়, আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান ও জাতীয় ঋণ কমানোর মতো বিষয়গুলোতে অলটারনেটিভলস বা বিকল্পহীন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। মার্কেলের মুখনিঃসৃত শব্দগুচ্ছটি এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে উগ্র ডানপন্থিরা ‘অলটারনেটিভ ফার ডয়েচেল্যান্ড’ নামে দল গঠন করেছে।

দি ডোনার-মর্ডে (কাবাব পদ্ধতিতে খুন)

দি ডোনার-মর্ডে অর্থ কাবাব পদ্ধতিতে খুন বা হত্যা। চলতি শতকের শুরুর দিকে জার্মানিতে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট আন্ডারগ্রাউন্ড নামে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। ২০০০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সাত বছরে গোষ্ঠীটির হাতে অন্তত ১০ জন গুপ্তহত্যার শিকার হয়। নিহতদের বেশিরভাগই তুর্কি ও কুর্দি বংশোদ্ভূত এবং তারা সবাই ছোট ছোট ব্যবসা পরিচালনা করতেন। এসব হত্যার পেছনের কারণ বা উদ্দেশ্য কি তার কোনো তথ্য তখনও জার্মান পুলিশর কাছে ছিল না। তবে এটাকে জার্মান-তুর্কিদের মধ্যকার ‘গ্যাং ওয়ারফেয়ার’ বলে অভিহিত করার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে বোঝাতে প্রায় ‘ডোনার-মর্ডে’ বা ‘কাবাব পদ্ধতির ঘাতক’ শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করে জার্মান মূলধারার গণমাধ্যম। কারণ ইসমাইল ইয়াসার নামে এক মুসলিম কাবাব রেস্তোরাঁর মালিক ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এ শব্দগুচ্ছটি দিয়ে হত্যাকারীদের বদলে নিহতদেরকেই দানব আকারে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। অবশেষে ২০১১ সালে আরও দুজনকে হত্যার পর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির তথ্য সামনে আসে।

ডাস নয়ল্যান্ড (নতুন অঞ্চল)

ডাস নয়ল্যান্ড শব্দটির অর্থ নতুন কোনো অঞ্চল, এমন একটি ভূখণ্ড যেখানে এখনও মানুষের পা পড়েনি। ইন্টারনেট জগৎ বা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব বোঝাতে মার্কেল ২০১৩ সালে প্রথমবার শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ইন্টারনেট আমাদের জন্য অনেকটা একটা ভার্জিন টেরিটরির মতো।’ জার্মান জনগণও যেন শব্দগুচ্ছটি লুফে নেয়।

দি ভিলকমেনসকুলটুর(স্বাগত সংস্কৃতি)

দি ভিলকমেনসকুলটুর অর্থ স্বাগত সংস্কৃতি। ২০১৫ সালে জার্মান সীমান্তে শরণার্থীর ঢল নামে। এসব শরণার্থীর বেশিরভাগই সিরীয় যুদ্ধের কারণে উদ্বাস্তু হয়েছিল। এ সময় জার্মান সরকারের অনেক কর্মকর্তাই সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে মত দেন। কিন্তু সীমান্ত বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানান মার্কেল। তখন চ্যান্সেলরের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছিল জার্মান জনগণও। শুধু তাই নয়, শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর পাশাপাশি নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতাও করেছিল তারা। তাদের এই মনোভাবকে তুলে ধরতে ‘দি ভিলকমেনসকুলটুর’ শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করা হয়। যার অর্থ ‘স্বাগত সংস্কৃতি’।

ভিয়ার সাপেন ডাস (আমরা এটা করতে পারি)

যেকোনো সমস্যা মোকাবিলার সক্ষমতা বুঝাতে ‘ভিয়ার সাপেন ডাস’ কথাটি ব্যবহৃত হয়। বড় কোনো সংকট সামনে এলেই বেশ জোরের সঙ্গে এই কথাটিই বলতেন মার্কেল। এটা অনেকটা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ‘ইয়েস, উই ক্যান তথা হ্যা, এটা আমরা এটা করতে পারি’ কথাটার মতো। ২০১৫ সালে মধ্যপ্রাচ্য সংকট বিশেষ করে সিরিয়া যুদ্ধের কারণে জার্মানিতে হঠাৎ করেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন বেড়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে জার্মান জনগণের উদ্বেগ দুর করা ও বিরোধীদের সমালোচনা বন্ধের চেষ্টায় এক সাক্ষাৎকারে মার্কেল বলেন, ‘জার্মানি একটি শক্তিশালী দেশ। আমরা এ ধরনের সমস্যা অতীতে মোকাবিলা করেছি। এখনও পারব।’

দি লুগেনপ্রেস (মিথ্যুক গণমাধ্যম)

দি লুগেনপ্রেস অর্থ ‘মিথ্যুক গণমাধ্যম’। ১৯ শতকের শুরুর দিকে তথা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান ভাষায় ‘লায়ার’স প্রেস’ বলে একটি শব্দগুচ্ছের ব্যাপক ব্যবহার হতো। তৎকালে কায়জারের ঔপনিবেশিক শাসন নিয়ে বিদেশি পত্রিকাগুলোর লেখালেখির বিরুদ্ধে জার্মান বুদ্ধিজীবীরা শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করতেন। ১৯৩০-এর দশকে এডলফ হিটলারের সমালোচকদের ‘লিজেনপ্রেস’ তকমা দিয়েছিল নাৎসিরা। প্রায় ৮০ বছর পর শব্দগুচ্ছটি আবার ফিরে আসে মার্কেলের যুগে। ২০১৫ সালে তার সরকারের শরণার্থী নীতির বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী পেগিডা মুভমেন্টের বিক্ষোভে ‘লিজেনপ্রেস’ বলে স্লোগান দেয় বিক্ষোভকারীরা।

ডেয়ার পুটিনফারসটেয়া (পুতিনকে বোঝা)

ডেয়ার পুটিনফারসটেয়ার আক্ষরিক অর্থ পুতিনের বোঝাপড়া। বিশদ অর্থে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিনকে যিনি ভালো করে বোঝেন। সেই অর্থে মার্কেলই হচ্ছেন জার্মানির প্রথম রাজনীতিক যিনি পুতিনকে ভালো বুঝতে পারেন। কারণটা আর কিছু নয়, মার্কেলের রুশ ভাষার দখল। কৈশোরে স্কুলে পড়ার সময় রুশ ভাষার পূর্ব-জার্মানির তৃতীয় সেরা ছাত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন মার্কেল। রাজনৈতিক জীবনে বিশেষ করে চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালনকালে কৈশোরের সেই শিক্ষাটা ভালো কাজে দিয়েছে তার। কোনো দোভাষী ছাড়াই পুতিনের কথা বুঝতে পারতেন তিনি।

 

দি অ্যাসাইমাটিসে ডিমোবিজিয়ারুং (গণতান্ত্রয়ান বা আন্দোলন)

২০০৫ সালের নির্বাচনে জিতে প্রথমবার চ্যান্সেলর হন মার্কেল। চার বছর পর ২০০৯ সালেও তাকে চ্যান্সেলর নির্বাচন করে জার্মান জনগণ। দ্বিতীয়বার মার্কেলের এই জয়ের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে ‘দি অ্যাসাইমাটিসে ডিমোবিজিয়ারুং’ শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করে জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান ম্যাথিয়াস জং। এর ইংরেজি রূপ ‘অ্যাসিমেট্রিক ডেমোবিলাইজেশন’ অর্থ গণতান্ত্রিক আন্দোলন যা মূলত একটি নির্বাচনি কৌশল। সেই কৌশলটি হচ্ছে বিতর্কিত কোনো বিষয়ে কোনো বিবৃতি বা মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা। উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক বিরোধীদের মনোবল নষ্ট করে দেওয়া।

দি অপনুংজরগেন (খোলার যন্ত্রণা)

শব্দগুচ্ছটির অর্থ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার যন্ত্রণা। করোনা মহামারিকালে আরোপিত দ্বিতীয় লকডাউন তুলে দেওয়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এর উৎপত্তি হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শব্দগুচ্ছটির প্রথম ব্যবহার করেন বিরোধী গ্রিন পার্টিল নেতা ও বাডেন-ভিরতেমবার্গের মুখ্যমন্ত্রী ভিনফ্রিড ক্রেটশম্যান। এর মাধ্যমে তিনি মূলত ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দেন। বিরোধী নেতার সঙ্গে একমত পোষণ করে মার্কেলও লকডাউন তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

দি সোয়ারক্রাপ্ট (মধ্যাকর্ষণ)

বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিলেন মার্কেল। পড়েছেন পদার্থবিদ্যায়। কোয়ান্টাম রসায়নে নিয়েছেন বিশেষ প্রশিক্ষণ। এগুলো তার রাজনৈতিক জীবনের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে। শুধু তাই সম্প্রতি করোনা মহামারির মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় তাকে সাহায্য করেছে এই বিজ্ঞান। মার্কেল মনে করতেন, পদার্থবিদ্যার অনেক সূত্রই রাজনীতিতে প্রয়োগ করা যায়। উদাহরণ হিসাবে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সোয়ারক্রাপ্ট তথা মধ্যাকর্ষণ সূত্র রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। গ্রাভিটি যেমন ‘ভরহীন, গভীরতা নেই’, রাজনীতিও তেমন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন