বেঁচে থাকা শেখায় ‘সুইসাইড হেল্পলাইন’
jugantor
বেঁচে থাকা শেখায় ‘সুইসাইড হেল্পলাইন’
লেবাননে আত্মহত্যার হিড়িক

  সেলিম কামাল  

০৩ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চলমান চরম অর্থনৈতিক সংকটে পর্যুদস্ত লেবানন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে খাদ্য, জ্বালানি সংকট তীব্র। যেখানে সরকারি ভর্তুকিমূল্যে ৯০০ গ্রাম ওজনের একটি রুটি কিনতে হয় ৩ হাজার ২৫০ পাউন্ড (১৮২ টাকা) দিয়ে, সেখানে সাধারণ মানুষের জীবন তো ওষ্ঠাগতই। যে সংসারে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন বেকার বাবা, সেই সংসারে তার মূল্য কী! এই ভাবনা থেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। লেবাননের বিশাল একটি অংশের মধ্যেই এই হনন প্রবণতা বেড়ে চলেছে। আর সে প্রবণতা প্রতিরোধ করে সংশ্লিষ্টদের জীবনের মানে খুঁজে দিতেই ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তারা চালু করেছে হেল্পলাইন-১৫৬৪। আর বর্তমান সময়ে তাদের ব্যস্ততা বেড়ে হয়েছে কয়েকগুণ।

রাজধানী বৈরুতের মাকদিসিতে অবস্থিত এনজিও সংস্থা এমব্রেসের সঙ্গে যৌথভাবে এ হেল্পলাইন চালু করেছে লেবানন জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি। হেল্পলাইনে কল করা যাবে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত। শিগগিরই এটি ২৪ ঘণ্টা উন্মুক্ত রাখার পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ। এমব্রেসের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে লেবাননে প্রতি ২.১ দিনে ১ জন আত্মহত্যা করেন। প্রতি ৬ ঘণ্টায় ১ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। আত্মহত্যার এ প্রবণতা রোধে এমব্রেসের মিশনগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১. আত্মহত্যা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি; ২. ভুক্তভোগীর জীবন ও তার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া; ৩. তাদের কথাগুলো মন দিয়ে শুনে এবং বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজতে সহায়তা করা এবং ৪. আত্মহত্যা করতে সরাসরি অনুরোধ করা। তাদের ভিশন হচ্ছে-একজন লেবাননিও আত্মহত্যা করবে না। সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করে এযাবৎ ১৫ হাজার ১১৭টি কল পেয়েছে এমব্রেসের ১৫৬৪। এযাবৎ শত শত লেবাননিকে আত্মহত্যার হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছে তারা।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের পর বৈশ্বিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা অতিক্রান্ত করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ লেবানন। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থার এমন চিত্রই পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়-তারা বলেছে, এভাবে চলতে থাকলে অর্থনৈতিক মন্দার ক্ষেত্রে ১৫০ বছরের রেকর্ড ভাঙবে দেশটি।

চলতি বছরে লেবাননের অর্থনীতি আরও ১০ শতাংশের মতো সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে সামনের দিনগুলোয় এ চাপ সামাল দেওয়ার মতো স্পষ্ট কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। গত বছরের ঋণের কারণে লেবানন এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়েছে বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশটির মুদ্রা মূল্যমান হারিয়েছে ৮৫ শতাংশ। পাশাপাশি দারিদ্র্যের হার আরও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির দিকে ধাবিত করছে এক সময়ের মধ্যপ্রাচ্যের বাতিঘর হিসেবে পরিচিত দেশটিকে। খাদ্য, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য জরুরি সরকারি পরিষেবাও এখন তলানিতে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় মেরুদণ্ডহীন এক জাতিতে পরিণত হয়েছে লেবাননিরা। আর এ কারণেই একের পর এক আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে দেশটিতে। প্রতিদিন কয়েক ডজন কল পান কলসেন্টারের কর্মীরা। বর্তমানে মাসে গড়ে ১ হাজার ১০০টি কল পাচ্ছেন তারা। কেউ বলছেন আমার ৪ সন্তান, ঘরে খাবার নেই, মৃত্যু ছাড়া গতি নেই। আবার কেউ বলছেন ঘরে অসুস্থ মা রয়েছেন, তাকে ওষুধ কিনে দিতে পারছেন না বলে তার মরে যেতে ইচ্ছে করছে।

এমব্রেসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সহসভাপতি মিয়া আতৌই বলেন, ‘সংকট ব্যাপক হারে বেড়েছে, কল বেড়ে যাওয়া সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে।’ তিনি জানান, থেরাপি নেওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছেন আরও শতাধিক প্রার্থী। কলসেন্টারের ২৬ বছর বয়সি স্বেচ্ছাসেবক অপারেটর বাউশ্রা গোপনীয়তা রক্ষার শর্তে বলে, ‘যে হারে কল পাচ্ছি আর আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে, তাতে এ মিশন ভিশন দুটোই অসম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘এমন একটি দেশে আর কোনো আশাই দেখতে পাচ্ছি না।’ লাইফলাইনে বর্তমানে ১৭ জন স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছেন। তারা নিজেরা একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর এ দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও স্বেচ্ছাসেবী আহ্বান করেছে এমব্রেস। অবৈতনিক এ সেবায় কলসেন্টারটিতে প্রতি স্বেচ্ছাসেবীকে এক সপ্তাহে সাড়ে তিন ঘণ্টার শিফটে কমপক্ষে এক বছর কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।

বেঁচে থাকা শেখায় ‘সুইসাইড হেল্পলাইন’

লেবাননে আত্মহত্যার হিড়িক
 সেলিম কামাল 
০৩ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চলমান চরম অর্থনৈতিক সংকটে পর্যুদস্ত লেবানন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে খাদ্য, জ্বালানি সংকট তীব্র। যেখানে সরকারি ভর্তুকিমূল্যে ৯০০ গ্রাম ওজনের একটি রুটি কিনতে হয় ৩ হাজার ২৫০ পাউন্ড (১৮২ টাকা) দিয়ে, সেখানে সাধারণ মানুষের জীবন তো ওষ্ঠাগতই। যে সংসারে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন বেকার বাবা, সেই সংসারে তার মূল্য কী! এই ভাবনা থেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। লেবাননের বিশাল একটি অংশের মধ্যেই এই হনন প্রবণতা বেড়ে চলেছে। আর সে প্রবণতা প্রতিরোধ করে সংশ্লিষ্টদের জীবনের মানে খুঁজে দিতেই ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তারা চালু করেছে হেল্পলাইন-১৫৬৪। আর বর্তমান সময়ে তাদের ব্যস্ততা বেড়ে হয়েছে কয়েকগুণ।

রাজধানী বৈরুতের মাকদিসিতে অবস্থিত এনজিও সংস্থা এমব্রেসের সঙ্গে যৌথভাবে এ হেল্পলাইন চালু করেছে লেবানন জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি। হেল্পলাইনে কল করা যাবে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত। শিগগিরই এটি ২৪ ঘণ্টা উন্মুক্ত রাখার পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ। এমব্রেসের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে লেবাননে প্রতি ২.১ দিনে ১ জন আত্মহত্যা করেন। প্রতি ৬ ঘণ্টায় ১ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। আত্মহত্যার এ প্রবণতা রোধে এমব্রেসের মিশনগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১. আত্মহত্যা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি; ২. ভুক্তভোগীর জীবন ও তার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া; ৩. তাদের কথাগুলো মন দিয়ে শুনে এবং বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজতে সহায়তা করা এবং ৪. আত্মহত্যা করতে সরাসরি অনুরোধ করা। তাদের ভিশন হচ্ছে-একজন লেবাননিও আত্মহত্যা করবে না। সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করে এযাবৎ ১৫ হাজার ১১৭টি কল পেয়েছে এমব্রেসের ১৫৬৪। এযাবৎ শত শত লেবাননিকে আত্মহত্যার হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছে তারা।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের পর বৈশ্বিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা অতিক্রান্ত করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ লেবানন। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থার এমন চিত্রই পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়-তারা বলেছে, এভাবে চলতে থাকলে অর্থনৈতিক মন্দার ক্ষেত্রে ১৫০ বছরের রেকর্ড ভাঙবে দেশটি।

চলতি বছরে লেবাননের অর্থনীতি আরও ১০ শতাংশের মতো সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে সামনের দিনগুলোয় এ চাপ সামাল দেওয়ার মতো স্পষ্ট কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। গত বছরের ঋণের কারণে লেবানন এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়েছে বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশটির মুদ্রা মূল্যমান হারিয়েছে ৮৫ শতাংশ। পাশাপাশি দারিদ্র্যের হার আরও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির দিকে ধাবিত করছে এক সময়ের মধ্যপ্রাচ্যের বাতিঘর হিসেবে পরিচিত দেশটিকে। খাদ্য, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য জরুরি সরকারি পরিষেবাও এখন তলানিতে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় মেরুদণ্ডহীন এক জাতিতে পরিণত হয়েছে লেবাননিরা। আর এ কারণেই একের পর এক আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে দেশটিতে। প্রতিদিন কয়েক ডজন কল পান কলসেন্টারের কর্মীরা। বর্তমানে মাসে গড়ে ১ হাজার ১০০টি কল পাচ্ছেন তারা। কেউ বলছেন আমার ৪ সন্তান, ঘরে খাবার নেই, মৃত্যু ছাড়া গতি নেই। আবার কেউ বলছেন ঘরে অসুস্থ মা রয়েছেন, তাকে ওষুধ কিনে দিতে পারছেন না বলে তার মরে যেতে ইচ্ছে করছে।

এমব্রেসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সহসভাপতি মিয়া আতৌই বলেন, ‘সংকট ব্যাপক হারে বেড়েছে, কল বেড়ে যাওয়া সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে।’ তিনি জানান, থেরাপি নেওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছেন আরও শতাধিক প্রার্থী। কলসেন্টারের ২৬ বছর বয়সি স্বেচ্ছাসেবক অপারেটর বাউশ্রা গোপনীয়তা রক্ষার শর্তে বলে, ‘যে হারে কল পাচ্ছি আর আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে, তাতে এ মিশন ভিশন দুটোই অসম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘এমন একটি দেশে আর কোনো আশাই দেখতে পাচ্ছি না।’ লাইফলাইনে বর্তমানে ১৭ জন স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছেন। তারা নিজেরা একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর এ দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও স্বেচ্ছাসেবী আহ্বান করেছে এমব্রেস। অবৈতনিক এ সেবায় কলসেন্টারটিতে প্রতি স্বেচ্ছাসেবীকে এক সপ্তাহে সাড়ে তিন ঘণ্টার শিফটে কমপক্ষে এক বছর কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন