‘মৃত্যুর সওদাগর’ তকমা মুছতেই নোবেল পুরস্কার আলফ্রেডের
jugantor
‘মৃত্যুর সওদাগর’ তকমা মুছতেই নোবেল পুরস্কার আলফ্রেডের
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কয়েকটি দেশে ৯৩টি ডিনামাইট কারখানা * অর্থনীতিতে নোবেল নেই, আছে নোবেল স্মারক পুরস্কার * বিয়ে করেননি আলফ্রেড নোবেল

  জামির হোসেন  

০৪ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ডিনামাইটসহ ভয়াবহ সব মারণাস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ভাবন করেছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন অসংখ্য কারখানা। দেশে দেশে ব্যবসা করে আয় করেছিলেন লাখ লাখ ডলার। কিন্তু তার এই উদ্ভাবন একসময় লাখো-কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়। ফলে তাকে ডাকা হতে থাকে ‘মৃত্যুর সওদাগর’। বলা হতে থাকে ‘মানুষ মারার উপায় উদ্ভাবন করে ধনী হয়েছেন’ তিনি। নিজের নামের সঙ্গে এই ঘৃনা-সমালোচনা মেনে নিতে পারেননি বিশ্বখ্যাত প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক আলফ্রেড বার্নার্ড নোবেল। অবশেষে সেই কলঙ্ক মুছতেই জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে দান করে যান নিজের সব সম্পদ। প্রবর্তন করেন বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ‘নোবেল পুরস্কার’। এ ক্ষেত্রেও তিনি শতভাগ সফল হয়েছেন। আজ দুনিয়াজুড়ে মানুষ তাকে জানে ‘জ্ঞান-বিজ্ঞান আর শান্তির পৃষ্ঠপোষক’ হিসাবে। বিজ্ঞান, সাহিত্য ও অথর্নীতির মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষ অবদান বা উদ্ভাবনের জন্য প্রতি বছর অক্টোবর মাসে অল্প কিছু মানুষকে এই পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। দেওয়া হয় বিখ্যাত উপাধি ‘নোবেল বিজয়ী’। আজ থেকে শুরু হচ্ছে এ বছরের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা।

১৮৩৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমের এক প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আলফ্রেড নোবেল। শৈশব থেকেই অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিলেন। মাত্র এক বছরের জন্য স্কুলে গেলেও বেশ কয়েকটা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন তিনি। প্রথম থেকেই তার তীব্র আগ্রহ ছিল বিভিন্ন ধরনের প্রকৌশলগত সমস্যা সমাধানের প্রতি। ১৮৪২ সালে স্টকহোম ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে আলফ্রেড চলে যান রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে। বাবা ইমানুয়েল নোবেল ছিলেন প্রকৌশলী। সেখানে তিনি ইস্পাত ও লোহার কারখানা স্থাপন করেন। সেই ইস্পাত ও লোহা দিয়ে তৈরি যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করা হতো রুশ সেনাবাহিনীতে। ১৮৫৯ সালে নোবেল স্টকহোমে ফিরে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশও ভ্রমণ করেন তিনি। প্যারিসে পরিচয় হয় নাইট্রোগ্লিসারিনের মূল আবিষ্কারক অ্যাসকানিয় সোব্রেরোর সঙ্গে। সোব্রেরো নাইট্রোগ্লিসারিনের ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবে গবেষণা বন্ধ করে দেন। কিন্তু নোবেলের তরুণ মন সেই বিস্ফোরক পদার্থটিকেই বশে আনতে প্রবল আগ্রহী হয়ে ওঠে। একে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য বিস্ফোরক পদার্থে রূপ দেওয়াই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য। এটা নিয়ে গবেষণা করার সময় একাধিকবার দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাতে প্রাণ হারিয়েছে বহু মানুষ। এমনকি এমনি এক দুর্ঘটনায় তার নিজের ছোট ভাইও মারা যান। তার পরও হাল ছাড়েননি। অবশেষে সফল হন তিনি। আবিষ্কার করেন শক্তিশালী বিস্ফোরক ডিনামাইট। ১৯৬৭ সালের নিজের নামে এর প্যাটেন্টও করে ফেলেন। এই সময় ইউরোপজুড়ে বইছিল শিল্পায়নের জোয়ার। ফলে শিগগিরই খনিতে বিস্ফোরণ ঘটানো ও পাহাড়ের মধ্য দিয়ে সুড়ঙ্গ বা রাস্তা তৈরির মতো ভারী কাজে ডিনামাইটের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু অল্প কিছু দিন পরই যুদ্ধ ও সংঘাতের অন্যতম মারণাস্ত্র হয়ে ওঠে ডিনামাইট।

চাহিদা বাড়ায় ডিনামাইট কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন নোবেল। এভাবে সুইডেনের পাশাপাশি ইউরোপের ইতালি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও ইংল্যান্ডে কারখানা স্থাপন করা হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার অন্তত ৯৩টি ডিনামাইট কারখানা ছিল। ডিনামাইট আবিষ্কারের সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে ব্যালিস্টিক পাউডারও আবিষ্কার করেন নোবেল। উদ্ভাবন করেন পিস্তল থেকে শুরু করে কামান অবধি বিভিন্ন রকমের মারণাস্ত্র। তিনি বোফর্স নামের একটি অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন। ৩৫৫টি আবিষ্কারের পেটেন্ট ছিল তার। পেটেন্টগুলো খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। বলা যায়, বিভিন্ন মারণাস্ত্রের অগ্রদূত ছিলেন আলফ্রেড নোবেল। এই অস্ত্র ব্যবসা করেই তিনি হয়ে ওঠেন সেই সময়ের অন্যতম ধনী ব্যক্তি। কিন্তু নোবেলের আবিষ্কৃত ডিনামাইট ও অন্যান্য অস্ত্রের সামরিক ব্যবহার মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। তাকে কঠোর বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। ১৮৮৮ সালে তার ভাই লুডভিগ নোবেল ফ্রান্সের কান শহরে মৃত্যুবরণ করেন। খবরটি ভুলভাবে ছড়িয়ে পড়ায় সবাই ভেবেছিল আলফ্রেড নোবেলই বুঝি মারা গেছেন। পত্রিকায় মৃত্যু সংবাদের শিরোনামে লেখা হয় ‘মৃত্যুর সওদাগর মারা গেছেন’। এমন শিরোনামের খবরটি খুব বিচলিত করে তাকে, সবকিছু থেকেই ধীরে ধীরে সরে দাঁড়ান আলফ্রেড নোবেল। এ সময় তিনি এমন কিছু করে যাওয়ার কথা ভাবেন, যার ফলে তার মৃত্যুর পর সবাই তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। আর এজন্য তার সব সম্পদ দান করে একটি উইল করেন। উইলে লিখে যান, তিনি তার ৯৪ ভাগ সম্পদ পুরস্কার আকারে দান করতে চান। সে সময় তার সম্পদ ছিল ৩১০ কোটি সুইডিশ ক্রোনা (৩০ লাখ ডলার)। যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারে (প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার সমতুল্য)।

বিয়ে করেননি নোবেল। ছিল না কোনো নারীর সঙ্গে তেমন সম্পর্কও। সন্তানহীন নোবেল তাই তার সম্পদ উন্মুক্ত হাতে দান করতে পেরেছিলেন। এর আগেও বেশ কয়েবার উইল করেছিলেন নোবেল। তবে ১৮৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর জীবনের শেষ উইলটি করেন তিনি। এটা ছিল বিশেষ একটা উইল। এই উইলেই নিজের সম্পত্তির প্রায় ৯৪ ভাগই তিনি দান করেন পুরস্কার প্রদানের জন্য। তিনি ঠিক করে দেন, প্রতি বছর সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সফল এবং অনন্যসাধারণ গবেষণা উদ্ভাবন ও মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য তার সম্পত্তির অর্থ দিয়ে পুরস্কার প্রদান করা হবে। পাঁচটি ক্ষেত্র-পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য, শান্তিতে পুরস্কারের কথা বলে যান তিনি।

বর্তমানে ষষ্ঠ পুরস্কারটি দেওয়া হয় অর্থনীতিতে। তবে প্রকৃতপক্ষে অর্থনীতিতে কোনো নোবেল নেই, যা আছে তা হচ্ছে নোবেল স্মারক পুরস্কার। আলফ্রেড নোবেল উইলে পাঁচটি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার নিয়ে কিছু বলেননি। ১৯৬৮ সালে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেভেরিজেস রিক্সব্যাংক তাদের ৩০০ বছর পূর্তিতে নোবেল ফাউন্ডেশনকে একটি বিরাট অঙ্কের অর্থ দান করে। এই অর্থ দিয়ে আলফ্রেড নোবেলের সম্মানার্থে একটি নতুন পুরস্কার প্রদান করা হবে বলে ঠিক করা হয়। ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে এই পুরস্কারের পুরো নাম রাখা হয় ‘দ্য সেভেরিজেস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল’। সুইডেনের রয়্যাল একাডেমি অব সায়েন্স পুরস্কার প্রদানের বিষয়টি পরিচালনা করে।

আলফ্রেড নোবেল নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করলেও তিনি কখনো এই পুরস্কার বিতরণ দেখে যেতে পারেননি। উইল করার পরের বছরই মারা যান তিনি। আর ১৯০১ সাল থেকে তার নামানুসারে চালু হয় বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক পুরস্কার ‘নোবেল’। সেই থেকে প্রতি বছর অক্টোবরের শুরু থেকেই নোবেল বিজয়ীদের নাম প্রকাশ করা হতে থাকে। ১০ ডিসেম্বর সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে আনুষ্ঠানিকভাবে নোবেল লরিয়েটদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী।

অর্থনীতিতে প্রথম নোবেল পুরস্কার পান জ্যান টিনবারগেন ও র‌্যাগনার ফ্রিস। ‘অর্থনৈতিক পদ্ধতিসমূহের বিশ্লেষণের জন্য গতিশীল নকশা প্রণয়ন এবং এর উন্নয়নে’র জন্য তারা এই পুরস্কার পান। ১৯৬৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৫০ বার এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এখন পর্যন্ত ৮১ জন অর্থনীতিতে অবদান রাখায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল

জন্ম : ২১ অক্টোবর, ১৮৩৩, স্টকহোম, সুইডেন

মৃত্যু : ১০ ডিসেম্বর, ১৮৯৬, সারেমো, ইতালি

সমাধি : স্টকহোম

পেশা : রসায়নবিদ, প্রকৌশলী ও আবিষ্কারক

বাবা : ইমানুয়েল নোবেল

মা : ক্যারোলিনা অ্যান্দ্রিয়েতে (আলসেল)

উল্লেখযোগ্য কাজ : ডিনামাইট আবিষ্কার, নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন।

‘মৃত্যুর সওদাগর’ তকমা মুছতেই নোবেল পুরস্কার আলফ্রেডের

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কয়েকটি দেশে ৯৩টি ডিনামাইট কারখানা * অর্থনীতিতে নোবেল নেই, আছে নোবেল স্মারক পুরস্কার * বিয়ে করেননি আলফ্রেড নোবেল
 জামির হোসেন 
০৪ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ডিনামাইটসহ ভয়াবহ সব মারণাস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ভাবন করেছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন অসংখ্য কারখানা। দেশে দেশে ব্যবসা করে আয় করেছিলেন লাখ লাখ ডলার। কিন্তু তার এই উদ্ভাবন একসময় লাখো-কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়। ফলে তাকে ডাকা হতে থাকে ‘মৃত্যুর সওদাগর’। বলা হতে থাকে ‘মানুষ মারার উপায় উদ্ভাবন করে ধনী হয়েছেন’ তিনি। নিজের নামের সঙ্গে এই ঘৃনা-সমালোচনা মেনে নিতে পারেননি বিশ্বখ্যাত প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক আলফ্রেড বার্নার্ড নোবেল। অবশেষে সেই কলঙ্ক মুছতেই জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে দান করে যান নিজের সব সম্পদ। প্রবর্তন করেন বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ‘নোবেল পুরস্কার’। এ ক্ষেত্রেও তিনি শতভাগ সফল হয়েছেন। আজ দুনিয়াজুড়ে মানুষ তাকে জানে ‘জ্ঞান-বিজ্ঞান আর শান্তির পৃষ্ঠপোষক’ হিসাবে। বিজ্ঞান, সাহিত্য ও অথর্নীতির মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষ অবদান বা উদ্ভাবনের জন্য প্রতি বছর অক্টোবর মাসে অল্প কিছু মানুষকে এই পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। দেওয়া হয় বিখ্যাত উপাধি ‘নোবেল বিজয়ী’। আজ থেকে শুরু হচ্ছে এ বছরের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা।

১৮৩৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমের এক প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আলফ্রেড নোবেল। শৈশব থেকেই অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিলেন। মাত্র এক বছরের জন্য স্কুলে গেলেও বেশ কয়েকটা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন তিনি। প্রথম থেকেই তার তীব্র আগ্রহ ছিল বিভিন্ন ধরনের প্রকৌশলগত সমস্যা সমাধানের প্রতি। ১৮৪২ সালে স্টকহোম ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে আলফ্রেড চলে যান রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে। বাবা ইমানুয়েল নোবেল ছিলেন প্রকৌশলী। সেখানে তিনি ইস্পাত ও লোহার কারখানা স্থাপন করেন। সেই ইস্পাত ও লোহা দিয়ে তৈরি যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করা হতো রুশ সেনাবাহিনীতে। ১৮৫৯ সালে নোবেল স্টকহোমে ফিরে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশও ভ্রমণ করেন তিনি। প্যারিসে পরিচয় হয় নাইট্রোগ্লিসারিনের মূল আবিষ্কারক অ্যাসকানিয় সোব্রেরোর সঙ্গে। সোব্রেরো নাইট্রোগ্লিসারিনের ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবে গবেষণা বন্ধ করে দেন। কিন্তু নোবেলের তরুণ মন সেই বিস্ফোরক পদার্থটিকেই বশে আনতে প্রবল আগ্রহী হয়ে ওঠে। একে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য বিস্ফোরক পদার্থে রূপ দেওয়াই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য। এটা নিয়ে গবেষণা করার সময় একাধিকবার দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাতে প্রাণ হারিয়েছে বহু মানুষ। এমনকি এমনি এক দুর্ঘটনায় তার নিজের ছোট ভাইও মারা যান। তার পরও হাল ছাড়েননি। অবশেষে সফল হন তিনি। আবিষ্কার করেন শক্তিশালী বিস্ফোরক ডিনামাইট। ১৯৬৭ সালের নিজের নামে এর প্যাটেন্টও করে ফেলেন। এই সময় ইউরোপজুড়ে বইছিল শিল্পায়নের জোয়ার। ফলে শিগগিরই খনিতে বিস্ফোরণ ঘটানো ও পাহাড়ের মধ্য দিয়ে সুড়ঙ্গ বা রাস্তা তৈরির মতো ভারী কাজে ডিনামাইটের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু অল্প কিছু দিন পরই যুদ্ধ ও সংঘাতের অন্যতম মারণাস্ত্র হয়ে ওঠে ডিনামাইট।

চাহিদা বাড়ায় ডিনামাইট কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন নোবেল। এভাবে সুইডেনের পাশাপাশি ইউরোপের ইতালি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও ইংল্যান্ডে কারখানা স্থাপন করা হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার অন্তত ৯৩টি ডিনামাইট কারখানা ছিল। ডিনামাইট আবিষ্কারের সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে ব্যালিস্টিক পাউডারও আবিষ্কার করেন নোবেল। উদ্ভাবন করেন পিস্তল থেকে শুরু করে কামান অবধি বিভিন্ন রকমের মারণাস্ত্র। তিনি বোফর্স নামের একটি অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন। ৩৫৫টি আবিষ্কারের পেটেন্ট ছিল তার। পেটেন্টগুলো খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। বলা যায়, বিভিন্ন মারণাস্ত্রের অগ্রদূত ছিলেন আলফ্রেড নোবেল। এই অস্ত্র ব্যবসা করেই তিনি হয়ে ওঠেন সেই সময়ের অন্যতম ধনী ব্যক্তি। কিন্তু নোবেলের আবিষ্কৃত ডিনামাইট ও অন্যান্য অস্ত্রের সামরিক ব্যবহার মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। তাকে কঠোর বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। ১৮৮৮ সালে তার ভাই লুডভিগ নোবেল ফ্রান্সের কান শহরে মৃত্যুবরণ করেন। খবরটি ভুলভাবে ছড়িয়ে পড়ায় সবাই ভেবেছিল আলফ্রেড নোবেলই বুঝি মারা গেছেন। পত্রিকায় মৃত্যু সংবাদের শিরোনামে লেখা হয় ‘মৃত্যুর সওদাগর মারা গেছেন’। এমন শিরোনামের খবরটি খুব বিচলিত করে তাকে, সবকিছু থেকেই ধীরে ধীরে সরে দাঁড়ান আলফ্রেড নোবেল। এ সময় তিনি এমন কিছু করে যাওয়ার কথা ভাবেন, যার ফলে তার মৃত্যুর পর সবাই তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। আর এজন্য তার সব সম্পদ দান করে একটি উইল করেন। উইলে লিখে যান, তিনি তার ৯৪ ভাগ সম্পদ পুরস্কার আকারে দান করতে চান। সে সময় তার সম্পদ ছিল ৩১০ কোটি সুইডিশ ক্রোনা (৩০ লাখ ডলার)। যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারে (প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার সমতুল্য)।

বিয়ে করেননি নোবেল। ছিল না কোনো নারীর সঙ্গে তেমন সম্পর্কও। সন্তানহীন নোবেল তাই তার সম্পদ উন্মুক্ত হাতে দান করতে পেরেছিলেন। এর আগেও বেশ কয়েবার উইল করেছিলেন নোবেল। তবে ১৮৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর জীবনের শেষ উইলটি করেন তিনি। এটা ছিল বিশেষ একটা উইল। এই উইলেই নিজের সম্পত্তির প্রায় ৯৪ ভাগই তিনি দান করেন পুরস্কার প্রদানের জন্য। তিনি ঠিক করে দেন, প্রতি বছর সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সফল এবং অনন্যসাধারণ গবেষণা উদ্ভাবন ও মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য তার সম্পত্তির অর্থ দিয়ে পুরস্কার প্রদান করা হবে। পাঁচটি ক্ষেত্র-পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য, শান্তিতে পুরস্কারের কথা বলে যান তিনি।

বর্তমানে ষষ্ঠ পুরস্কারটি দেওয়া হয় অর্থনীতিতে। তবে প্রকৃতপক্ষে অর্থনীতিতে কোনো নোবেল নেই, যা আছে তা হচ্ছে নোবেল স্মারক পুরস্কার। আলফ্রেড নোবেল উইলে পাঁচটি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার নিয়ে কিছু বলেননি। ১৯৬৮ সালে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেভেরিজেস রিক্সব্যাংক তাদের ৩০০ বছর পূর্তিতে নোবেল ফাউন্ডেশনকে একটি বিরাট অঙ্কের অর্থ দান করে। এই অর্থ দিয়ে আলফ্রেড নোবেলের সম্মানার্থে একটি নতুন পুরস্কার প্রদান করা হবে বলে ঠিক করা হয়। ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে এই পুরস্কারের পুরো নাম রাখা হয় ‘দ্য সেভেরিজেস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল’। সুইডেনের রয়্যাল একাডেমি অব সায়েন্স পুরস্কার প্রদানের বিষয়টি পরিচালনা করে।

আলফ্রেড নোবেল নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করলেও তিনি কখনো এই পুরস্কার বিতরণ দেখে যেতে পারেননি। উইল করার পরের বছরই মারা যান তিনি। আর ১৯০১ সাল থেকে তার নামানুসারে চালু হয় বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক পুরস্কার ‘নোবেল’। সেই থেকে প্রতি বছর অক্টোবরের শুরু থেকেই নোবেল বিজয়ীদের নাম প্রকাশ করা হতে থাকে। ১০ ডিসেম্বর সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে আনুষ্ঠানিকভাবে নোবেল লরিয়েটদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী।

অর্থনীতিতে প্রথম নোবেল পুরস্কার পান জ্যান টিনবারগেন ও র‌্যাগনার ফ্রিস। ‘অর্থনৈতিক পদ্ধতিসমূহের বিশ্লেষণের জন্য গতিশীল নকশা প্রণয়ন এবং এর উন্নয়নে’র জন্য তারা এই পুরস্কার পান। ১৯৬৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৫০ বার এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এখন পর্যন্ত ৮১ জন অর্থনীতিতে অবদান রাখায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল

জন্ম : ২১ অক্টোবর, ১৮৩৩, স্টকহোম, সুইডেন

মৃত্যু : ১০ ডিসেম্বর, ১৮৯৬, সারেমো, ইতালি

সমাধি : স্টকহোম

পেশা : রসায়নবিদ, প্রকৌশলী ও আবিষ্কারক

বাবা : ইমানুয়েল নোবেল

মা : ক্যারোলিনা অ্যান্দ্রিয়েতে (আলসেল)

উল্লেখযোগ্য কাজ : ডিনামাইট আবিষ্কার, নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন