মেয়ে বেচে ঋণ শোধ করছে অসহায় বাবারা
jugantor
আফগানিস্তানে মৃত্যুদূতের মতো চোখ রাঙাচ্ছে ক্ষুধা
মেয়ে বেচে ঋণ শোধ করছে অসহায় বাবারা
গবাদিপশু বেচে দিচ্ছেন খরায় দিশাহারা কৃষক

  সেলিম কামাল  

২৭ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মেয়ে বেচে ঋণ শোধ করছে অসহায় বাবারা

এমনিতেই গত কুড়ি বছরের যুদ্ধে বিধ্বস্ত আফগানিস্তান। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে নিষেধাজ্ঞায় জমাট বেঁধেছে বিশ্বব্যাংকের রিজার্ভ। এমনকি বন্ধ রয়েছে বিভিন্ন বিদেশি সাহায্যও। সব মিলিয়েই বিপর্যস্ত দেশটির অর্থনীতি। এর মধ্যে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো দেশটিতে জেঁকে বসেছে খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ অবস্থায় সন্তানদের মুখে দু’মুঠো অন্ন জোগাতে ঋণের দায় মাথায় নিয়ে মেয়েদের বাল্যবিয়ের মাধ্যমে বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছেন বাবা-মা। উপায়ন্তর না দেখে গবাদিপশু বিক্রি করে সন্তানদের জন্য খাবার জোগাচ্ছেন দিশাহারা কৃষক। বিশ্বখাদ্য কর্মসূচির সোমবারের হুঁশিয়ারি বলছে, আফগানিস্তানে মৃত্যুদূতের মতো চোখ রাঙাচ্ছে ক্ষুধা। আসছে শীতেই খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা । মারা যেতে পারে কোটি কোটি মানুষ। এএফপি, আলজাজিরা।

খরায় ফেটে চৌচির পশ্চিম আফগানিস্তানের মাটি। খাদ্যের অভাব লেগেই আছে এ অঞ্চলের অধিবাসীদের ঘরে ঘরে। ফাহিমা তাদের একজন। কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে, ক্ষুধায় নয়-তার দুই মেয়ের জন্য। ছয় বছর বয়সি ফারিশতে এবং ১৮ মাস বয়সি শোকরিয়াকে ঋণের দায়ে বাল্যবিয়ের মাধ্যমে অন্য একটি পরিবারের কাছে বেচে দিয়েছেন তাদের বাবা। মাটির তৈরি দেয়ালঘেরা আর ত্রিপল দিয়ে ঢাকা একটি ঘরেই তাদের বসবাস। ফাহিমা ওই শিশুদের জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছেন, ‘আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব!’ তার স্বামী তাকে বলে দিয়েছেন, ‘আমরা যদি বাচ্চাদের ছেড়ে না দিই, তাহলে সবাই না খেয়ে মারা যাব।’ ফাহিমা বললেন, ‘টাকার জন্য আমার মেয়েদের ছেড়ে দিতে আমার ভীষণ ভীষণ খারাপ লাগছে।’ বড় মেয়েটির জন্য তারা পাচ্ছেন প্রায় তিন লাখ, আর ছোটটির জন্য পাচ্ছেন প্রায় আড়াই লাখ টাকা। যদিও চুক্তি অনুযায়ী এই টাকা তারা মাসে মাসে কিস্তি হিসাবে পাবেন। কারণ, মেয়ে দুটোর স্বামীরা এখনো নাবালক। আফগানিস্তানে বাল্যবিয়ে যুগ যুগ ধরে একটি প্রচলিত প্রথা। এ ক্ষেত্রে ছেলের বাবারা মেয়ে কিনতে দর কষাকষির সুযোগও পান। এ ঘটনা শুধু ফাহিমার পরিবারেরই নয়, ঘটছে হাজার হাজার আফগান পরিবারে। ২০১৮ সালের দুর্ভিক্ষের সময় বাল্যবিয়ের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। আর এ বছর সেখানে বৃষ্টি না হলে এ প্রবণতা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হয়। পশ্চিমাঞ্চলীয় বাদঘিস প্রদেশের রাজধানী কালা-ই-নাউতে সবচেয়ে বেশি মানুষ খরায় পীড়িত। এ অঞ্চলে এক ডজনের বেশি পরিবার পাওয়া গেছে যারা তাদের মেয়েদের বিয়ের মাধ্যমে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। ২৫ বছর বয়সি সাবেরেহ মুদি দোকানের নোটিশ পেয়েছেন, ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তাকে জেলে যেতে হবে। এ কারণে ঋণ মেটাতে সাবেরেহ তার তিন বছরের মেয়ে জাকেরেহকে মুদি দোকানির চার বছরের ছেলে জাবিউল্লাহর সঙ্গে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। ৪৩ বছর বয়সি রাবিয়া তার ছেলেদের নিয়ে একটি নোংরা তাঁবুতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘এবার কঠিন শীত হবে। ভয়ে আমি এখন থেকেই কুঁকড়ে যাচ্ছি, ওই কনকনে শীত থেকে কীভাবে আমার ছেলেদের বাঁচাব।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন শীত যেভাবে এগিয়ে আসছে, তাতেই মারা যাবে বহু আফগান। খরায় আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত জেলা বালা মুরগাবের চার পাশের কৃষিজমিগুলো শুকিয়ে ফেটে চৌচির। ভূমিহীন কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমি ক্রেতা খুঁজছি, আমার পাঁচ বছরের শিশুটিকে বিক্রি করতে চাই।’ অভাবের তাড়নায় বহু কৃষক গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছেন অন্যত্র, সম্ভবত ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহের আশায়। অনেকে অভাব ঘোচাতে বিক্রি করে দিয়েছেন তাদের গবাদিপশুগুলো।

আফগানিস্তানে মৃত্যুদূতের মতো চোখ রাঙাচ্ছে ক্ষুধা

মেয়ে বেচে ঋণ শোধ করছে অসহায় বাবারা

গবাদিপশু বেচে দিচ্ছেন খরায় দিশাহারা কৃষক
 সেলিম কামাল 
২৭ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
মেয়ে বেচে ঋণ শোধ করছে অসহায় বাবারা
ছবি: সংগৃহীত

এমনিতেই গত কুড়ি বছরের যুদ্ধে বিধ্বস্ত আফগানিস্তান। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে নিষেধাজ্ঞায় জমাট বেঁধেছে বিশ্বব্যাংকের রিজার্ভ। এমনকি বন্ধ রয়েছে বিভিন্ন বিদেশি সাহায্যও। সব মিলিয়েই বিপর্যস্ত দেশটির অর্থনীতি। এর মধ্যে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো দেশটিতে জেঁকে বসেছে খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ অবস্থায় সন্তানদের মুখে দু’মুঠো অন্ন জোগাতে ঋণের দায় মাথায় নিয়ে মেয়েদের বাল্যবিয়ের মাধ্যমে বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছেন বাবা-মা। উপায়ন্তর না দেখে গবাদিপশু বিক্রি করে সন্তানদের জন্য খাবার জোগাচ্ছেন দিশাহারা কৃষক। বিশ্বখাদ্য কর্মসূচির সোমবারের হুঁশিয়ারি বলছে, আফগানিস্তানে মৃত্যুদূতের মতো চোখ রাঙাচ্ছে ক্ষুধা। আসছে শীতেই খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা । মারা যেতে পারে কোটি কোটি মানুষ। এএফপি, আলজাজিরা।

খরায় ফেটে চৌচির পশ্চিম আফগানিস্তানের মাটি। খাদ্যের অভাব লেগেই আছে এ অঞ্চলের অধিবাসীদের ঘরে ঘরে। ফাহিমা তাদের একজন। কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে, ক্ষুধায় নয়-তার দুই মেয়ের জন্য। ছয় বছর বয়সি ফারিশতে এবং ১৮ মাস বয়সি শোকরিয়াকে ঋণের দায়ে বাল্যবিয়ের মাধ্যমে অন্য একটি পরিবারের কাছে বেচে দিয়েছেন তাদের বাবা। মাটির তৈরি দেয়ালঘেরা আর ত্রিপল দিয়ে ঢাকা একটি ঘরেই তাদের বসবাস। ফাহিমা ওই শিশুদের জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছেন, ‘আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব!’ তার স্বামী তাকে বলে দিয়েছেন, ‘আমরা যদি বাচ্চাদের ছেড়ে না দিই, তাহলে সবাই না খেয়ে মারা যাব।’ ফাহিমা বললেন, ‘টাকার জন্য আমার মেয়েদের ছেড়ে দিতে আমার ভীষণ ভীষণ খারাপ লাগছে।’ বড় মেয়েটির জন্য তারা পাচ্ছেন প্রায় তিন লাখ, আর ছোটটির জন্য পাচ্ছেন প্রায় আড়াই লাখ টাকা। যদিও চুক্তি অনুযায়ী এই টাকা তারা মাসে মাসে কিস্তি হিসাবে পাবেন। কারণ, মেয়ে দুটোর স্বামীরা এখনো নাবালক। আফগানিস্তানে বাল্যবিয়ে যুগ যুগ ধরে একটি প্রচলিত প্রথা। এ ক্ষেত্রে ছেলের বাবারা মেয়ে কিনতে দর কষাকষির সুযোগও পান। এ ঘটনা শুধু ফাহিমার পরিবারেরই নয়, ঘটছে হাজার হাজার আফগান পরিবারে। ২০১৮ সালের দুর্ভিক্ষের সময় বাল্যবিয়ের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। আর এ বছর সেখানে বৃষ্টি না হলে এ প্রবণতা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হয়। পশ্চিমাঞ্চলীয় বাদঘিস প্রদেশের রাজধানী কালা-ই-নাউতে সবচেয়ে বেশি মানুষ খরায় পীড়িত। এ অঞ্চলে এক ডজনের বেশি পরিবার পাওয়া গেছে যারা তাদের মেয়েদের বিয়ের মাধ্যমে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। ২৫ বছর বয়সি সাবেরেহ মুদি দোকানের নোটিশ পেয়েছেন, ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তাকে জেলে যেতে হবে। এ কারণে ঋণ মেটাতে সাবেরেহ তার তিন বছরের মেয়ে জাকেরেহকে মুদি দোকানির চার বছরের ছেলে জাবিউল্লাহর সঙ্গে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। ৪৩ বছর বয়সি রাবিয়া তার ছেলেদের নিয়ে একটি নোংরা তাঁবুতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘এবার কঠিন শীত হবে। ভয়ে আমি এখন থেকেই কুঁকড়ে যাচ্ছি, ওই কনকনে শীত থেকে কীভাবে আমার ছেলেদের বাঁচাব।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন শীত যেভাবে এগিয়ে আসছে, তাতেই মারা যাবে বহু আফগান। খরায় আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত জেলা বালা মুরগাবের চার পাশের কৃষিজমিগুলো শুকিয়ে ফেটে চৌচির। ভূমিহীন কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমি ক্রেতা খুঁজছি, আমার পাঁচ বছরের শিশুটিকে বিক্রি করতে চাই।’ অভাবের তাড়নায় বহু কৃষক গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছেন অন্যত্র, সম্ভবত ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহের আশায়। অনেকে অভাব ঘোচাতে বিক্রি করে দিয়েছেন তাদের গবাদিপশুগুলো।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন