বইয়ের বদলে মানুষ ধার দেয় লাইব্রেরি
jugantor
বইয়ের বদলে মানুষ ধার দেয় লাইব্রেরি

  জামির হোসেন  

১৬ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লাইব্রেরির কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বুকশেলফে সাজানো নানা ধরনের বইয়ের সমাহার। যেখানে যেকোনো বই নিয়ে টেবিলে বসে পড়তে পারেন পাঠক। চাইলে সেখান থেকে বই ধারও নেওয়া যায়। কিন্তু এমন লাইব্রেরির কথা আসলেই অদ্ভুত। যেখানে বই নয়, বইয়ের বদলে মানুষ ধার দেওয়া হয়। লাইব্রেরিগুলোতে যে মানুষকে ধার দেওয়া হয় তাকে বলা হয় বই-মানুষ। এই বই-মানুষের সঙ্গে পাঠকের ভাববিনিময়ের মধ্য দিয়ে একটা সংযোগ তৈরি হয়। তবে এখানে সময় পূর্বনির্ধারিত। কারণ বইয়ের মতো তো বই-মানুষদের বাড়ি নিয়ে পড়া যায় না। লাইব্রেরি যেখানে, সেখানেই আলাপচারিতা।

বইয়ের বদলে মানুষ ধার দেয় বলে এর নাম ‘হিউম্যান লাইব্রেরি’ বা মানব গ্রন্থাগার। বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়া এই পাঠাগারের যাত্রা শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগেই। ২০০০ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে ‘রসকিল্ড ফেস্টিভ্যাল’ নামের এক উৎসবে প্রথম এই লাইব্রেরির যাত্রা শুরু। ২০০৮ সালের মধ্যে এই ধারণা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় পৌঁছে যায়। এরপর ‘হিউম্যান লাইব্রেরি ওরগানাইজেশন’ হিসাবে অনেকটা ঝড়ের গতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপ মিলে বিশ্বের অন্তত ৮৫টি দেশে মানব গ্রন্থাগারের কার্যক্রম চলছে।

মানব গ্রন্থাগারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রনি আবেরগেল। অভিনব এই উদ্যোগ নিয়ে তার বক্তব্য, ‘কোনো সংকটে থাকা মানুষ কীভাবে নিশ্চিন্তে একটু কথা বলতে পারেন, সেটা নিয়ে ভেবেছিলাম আমরা। যে আলোচনায় কেউ কারও বিচার করতে বসবে না। দুজনের ভিন্নতা মেনেই কথা এগোবে। যা নিয়ে আমার ভ্রান্ত ধারণা, তা মানব-বই শুধরে দিতে পারে সেটা। ধরা যাক, আমি নারীবাদীদের দেখতে পারি না। এখানে আমি পেয়ে যেতে পারি এমন এক মানুষ-বইকে, যিনি তার জীবনের গল্প শুনিয়ে আমার ধারণা পালটে দিলেন।’

প্রশ্ন হতে পারে, মানব-বইয়ের ভূমিকায় কারা থাকেন? উত্তর হচ্ছে-আমাদের চারপাশের মানুষই এই মানব-বই। তবে যেই সেই মানুষ নন তারা। এই লাইব্রেরির প্রত্যেকটি বই-ই বিশেষ একটি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে, যাদের কেউ হয়তো তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। কেউ হয়তো তার লাইফস্টাইল, জাতি-পরিচয় বা অক্ষমতার কারণে সমাজ থেকে একঘরে হয়ে পড়েছেন। একজন মানব-বই হয়তো কোনো একা মা, কেউ হয়তো যৌন হেনস্তার শিকার। কেউ শরণার্থী, কেউ হয়তো আবার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। হয়তো শৈশবে ধর্ষণের শিকার কোনো সাহসিনী-এমন অসংখ্য মুখ। যাদের নামের তুলনায় এই পরিচয়ই বড়।

একটা দৃষ্টান্তের মাধ্যমে মানব-বই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যের মানসি এলাকায় সম্প্রতি কোনো এক বৃষ্টিভেজা সকালে এক শ্বেতাঙ্গ মধ্যবয়সি নারী তৃতীয় লিঙ্গের এক নারীর সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু দুজন দুই ধর্মবিশ্বাসের মানুষ হওয়ার কারণে তাদের সাক্ষাৎটি ভালোভাবে শুরু না হলেও শেষ হয় বেশ আবেগঘন পরিবেশের মধ্যদিয়ে। তাদের এই আলাপের সময় মাত্র আধা ঘণ্টা নির্ধারিত থাকলেও তা এক ঘণ্টা পর শেষ হয়। এমনকি বিদায়ের আগে তারা একে অপরকে বুকে জড়িয়ে নেন। আর এটা সম্ভব হয় শুধু হিউম্যান লাইব্রেরির কারণে।

বইয়ের বদলে মানুষ ধার দেয় লাইব্রেরি

 জামির হোসেন 
১৬ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লাইব্রেরির কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বুকশেলফে সাজানো নানা ধরনের বইয়ের সমাহার। যেখানে যেকোনো বই নিয়ে টেবিলে বসে পড়তে পারেন পাঠক। চাইলে সেখান থেকে বই ধারও নেওয়া যায়। কিন্তু এমন লাইব্রেরির কথা আসলেই অদ্ভুত। যেখানে বই নয়, বইয়ের বদলে মানুষ ধার দেওয়া হয়। লাইব্রেরিগুলোতে যে মানুষকে ধার দেওয়া হয় তাকে বলা হয় বই-মানুষ। এই বই-মানুষের সঙ্গে পাঠকের ভাববিনিময়ের মধ্য দিয়ে একটা সংযোগ তৈরি হয়। তবে এখানে সময় পূর্বনির্ধারিত। কারণ বইয়ের মতো তো বই-মানুষদের বাড়ি নিয়ে পড়া যায় না। লাইব্রেরি যেখানে, সেখানেই আলাপচারিতা।

বইয়ের বদলে মানুষ ধার দেয় বলে এর নাম ‘হিউম্যান লাইব্রেরি’ বা মানব গ্রন্থাগার। বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়া এই পাঠাগারের যাত্রা শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগেই। ২০০০ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে ‘রসকিল্ড ফেস্টিভ্যাল’ নামের এক উৎসবে প্রথম এই লাইব্রেরির যাত্রা শুরু। ২০০৮ সালের মধ্যে এই ধারণা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় পৌঁছে যায়। এরপর ‘হিউম্যান লাইব্রেরি ওরগানাইজেশন’ হিসাবে অনেকটা ঝড়ের গতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপ মিলে বিশ্বের অন্তত ৮৫টি দেশে মানব গ্রন্থাগারের কার্যক্রম চলছে।

মানব গ্রন্থাগারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রনি আবেরগেল। অভিনব এই উদ্যোগ নিয়ে তার বক্তব্য, ‘কোনো সংকটে থাকা মানুষ কীভাবে নিশ্চিন্তে একটু কথা বলতে পারেন, সেটা নিয়ে ভেবেছিলাম আমরা। যে আলোচনায় কেউ কারও বিচার করতে বসবে না। দুজনের ভিন্নতা মেনেই কথা এগোবে। যা নিয়ে আমার ভ্রান্ত ধারণা, তা মানব-বই শুধরে দিতে পারে সেটা। ধরা যাক, আমি নারীবাদীদের দেখতে পারি না। এখানে আমি পেয়ে যেতে পারি এমন এক মানুষ-বইকে, যিনি তার জীবনের গল্প শুনিয়ে আমার ধারণা পালটে দিলেন।’

প্রশ্ন হতে পারে, মানব-বইয়ের ভূমিকায় কারা থাকেন? উত্তর হচ্ছে-আমাদের চারপাশের মানুষই এই মানব-বই। তবে যেই সেই মানুষ নন তারা। এই লাইব্রেরির প্রত্যেকটি বই-ই বিশেষ একটি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে, যাদের কেউ হয়তো তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। কেউ হয়তো তার লাইফস্টাইল, জাতি-পরিচয় বা অক্ষমতার কারণে সমাজ থেকে একঘরে হয়ে পড়েছেন। একজন মানব-বই হয়তো কোনো একা মা, কেউ হয়তো যৌন হেনস্তার শিকার। কেউ শরণার্থী, কেউ হয়তো আবার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। হয়তো শৈশবে ধর্ষণের শিকার কোনো সাহসিনী-এমন অসংখ্য মুখ। যাদের নামের তুলনায় এই পরিচয়ই বড়।

একটা দৃষ্টান্তের মাধ্যমে মানব-বই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যের মানসি এলাকায় সম্প্রতি কোনো এক বৃষ্টিভেজা সকালে এক শ্বেতাঙ্গ মধ্যবয়সি নারী তৃতীয় লিঙ্গের এক নারীর সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু দুজন দুই ধর্মবিশ্বাসের মানুষ হওয়ার কারণে তাদের সাক্ষাৎটি ভালোভাবে শুরু না হলেও শেষ হয় বেশ আবেগঘন পরিবেশের মধ্যদিয়ে। তাদের এই আলাপের সময় মাত্র আধা ঘণ্টা নির্ধারিত থাকলেও তা এক ঘণ্টা পর শেষ হয়। এমনকি বিদায়ের আগে তারা একে অপরকে বুকে জড়িয়ে নেন। আর এটা সম্ভব হয় শুধু হিউম্যান লাইব্রেরির কারণে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন