ক্ষুধায় রুটি নয়, মেলে ঘুমের ওষুধ
jugantor
ক্ষুধায় রুটি নয়, মেলে ঘুমের ওষুধ
আফগানিস্তানে অভাবের দানব

  যুগান্তর ডেস্ক  

২৫ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে অভাব। চাকরি নেই। কাজ নেই। খাবারের দাম লাগাম ছাড়া। পেটে ক্ষুধার দানব অথচ পকেট শুকিয়ে কাঠ! ঘরে ঢুকলেই পরিবারের মলিন মুখ। না খেয়ে থাকতে থাকতে বুকের দুধও শুকিয়ে গেছে মায়ের। ক্ষুধায় চিৎকার করছে কোলের ছোট শিশুটি। এক টুকরো রুটিও নেই তাকে দেওয়ার। বাধ্য হয়েই সেই অবুঝ-নিষ্পাপকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুঝুঁকিতে। রুটির বদলে খাওয়াচ্ছেন সস্তা দরের ঘুমের ওষুধ। কেননা একটি রুটির দামে মেলে পাঁচটি ওষুধ। সবার পকেটেই এই নিদ্রাবড়ি। কেউ কেউ আবার হয়ে উঠছেন আরও দুঃসাহসী। পেট বাঁচাতে বিক্রি করে দিচ্ছেন নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। মায়া-মমতা-বিবেক ধামাচাপা দিয়ে বেচে দিচ্ছেন নিজের গর্ভের ধন। নিজের ঔরসজাত সন্তান! তালেবানদের আফগান দখলের পরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই একই দৃশ্যই ঘুরপাক খাচ্ছে দেশটির নিুবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পাড়ার গলি-ঘুপচিতে। বিবিসি।

নিষ্ঠুরতার চরম বাস্তবতা থেকে বাদ যায় না সদ্য পৃথিবীর আলো দেখা শিশুও। আব্দুর ওহাব নামের এক আফগান বাবা বলেন, ‘আমাদের শিশুরা কাঁদছে। তাদের ঘুম নেই। পেটে ক্ষুধার যন্ত্রণা। আর উপায় না পেয়ে আমরা ফার্মেসিতে যাই, ওষুধ দেই বাচ্চাদের যাতে তারা তন্দ্রা অনুভব করে।’ গোলাম হযরত নামে একজন ট্যাবলেটের পাতা বের করে বলেন, এটি তিনি এক বছরের শিশুসহ ছয় সন্তানকে দিচ্ছেন। এ চিত্রটি আফগানে নতুন নয়। দেশটির তৃতীয় বৃত্তম শহর হেরাতের কাছাকাছি একটি অঞ্চলের চিত্র এটি। হাজার হাজার ছোট মাটির ঘরের বসতি তৈরি করেছে এখানকার মানুষ। প্রায় এক যুগ ধরে অঞ্চলের মানুষ যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। বিবিসিকে সাক্ষাৎকারে দেওয়ার সময় একজন পকেট থেকে ট্যাবলেটের পাতা বের করে দেখান। যার মধ্যে ছিল আলপ্রাজোলাম-ট্রাঙ্কুলাইজার। এই ওষুধ মূলত উদ্বেগজনিত ব্যাধি নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। অনেকে আবার এসিটালোপ্রাম ও স্যারট্রেলাইন ট্যাবলেটের পাতা বের করেছিল। যা মূলত বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত রোগে ব্যবহৃত হয়। সেবনমাত্রই তন্দ্রার ভাব আসে। ক্ষুধার কষ্ট থামাতে এই শিশুদের ‘বিষ’ই খাওয়াচ্ছেন বাবা-মায়েরা। খাচ্ছেন নিজেরাও। চিকিৎসকরা বলেন, পর্যাপ্ত পুষ্টি না পাওয়া শিশুদের এ ওষুধ সেবন করালে তাদের লিভারের ক্ষতি হয়। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি, ঘুম ও আচরণগত সমস্যাও দেখা দেয়। স্থানীয় ফার্মেসিতে পাওয়া যায় এসব ওষুধ। পাঁচটি ট্যাবলেট পাওয়া যায় ১০ আফগানিসে। আফগানি হলো দেশটির মুদ্রার নাম। ১০ আফগানি প্রায় ১০ ইউএন সেন্টের সমান। দরিদ্র্যতার চরম শিখরে চলে যাওয়া দেশটির মানুষ এখন একটি রুটিই ভাগ করে খাচ্ছে পুরো পরিবার। সকালের শুকনো রুটি পানিতে ডুবিয়ে নরম করে রাতে তা খেয়েই কোনো মতে বেঁচে থাকে তারা। এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ দিন আনে দিন খায়। কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়াই গত আগস্টে তালেবানরা যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন আফগানিস্তানে বিদেশি তহবিল স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থনৈতিক পতনের সূত্রপাত এখান থেকেই। খুব কম দিনেই তারা কাজ খুঁজে পায় যার সর্বোচ্চ মূল্য থাকে ১০০ আফগানি, যা প্রায় এক ডলার সমান। এভাবে আর কতদিন! বেঁচে পেটের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পর্যন্ত বিক্রি করা শুরু করেছে অসহায়-হতদরিদ্র আফগানরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০ বছর বয়সি এক ব্যক্তি (ছদ্মনাম আম্মার) বিবিসিকে তার নয় ইঞ্চি লম্বা অস্ত্রোপচারের দাগটি দেখান। মাত্র তিন মাস আগেই নিজের কিডনি বিক্রি করেছেন তিনি। ভয় থাকলেও আর কোনো রাস্তা তার জন্য উন্মুক্ত ছিল না বলে জানান। কিডনি বেচে পেয়েছিলেন প্রায় ২৭০,০০০ আফগানি (৩,১০০ ইউএস ডলার)। যার বেশির ভাগই তার পরিবারের খাবার কেনা ও ধার-দেনা পরিশোধে শেষ হয়ে গেছে। অনেকে বিক্রি করছেন তার ছেলে-মেয়েও। সেরকমই এক নারী জানান, কিডনি বিক্রি করেও পরিশোধ হয়নি ঋণ। এখন তার কন্যা বিক্রির জন্য প্রতিনিয়ত তাকে জোর করা হচ্ছে এবং হেনস্তা করা হচ্ছে। অশ্রুসিক্ত চোখে এক বাবা জানান, তিনি তার আদরের মেয়েকে এক লাখ আফগানির দামে বিক্রি করে দিয়েছেন।

ক্ষুধায় রুটি নয়, মেলে ঘুমের ওষুধ

আফগানিস্তানে অভাবের দানব
 যুগান্তর ডেস্ক 
২৫ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে অভাব। চাকরি নেই। কাজ নেই। খাবারের দাম লাগাম ছাড়া। পেটে ক্ষুধার দানব অথচ পকেট শুকিয়ে কাঠ! ঘরে ঢুকলেই পরিবারের মলিন মুখ। না খেয়ে থাকতে থাকতে বুকের দুধও শুকিয়ে গেছে মায়ের। ক্ষুধায় চিৎকার করছে কোলের ছোট শিশুটি। এক টুকরো রুটিও নেই তাকে দেওয়ার। বাধ্য হয়েই সেই অবুঝ-নিষ্পাপকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুঝুঁকিতে। রুটির বদলে খাওয়াচ্ছেন সস্তা দরের ঘুমের ওষুধ। কেননা একটি রুটির দামে মেলে পাঁচটি ওষুধ। সবার পকেটেই এই নিদ্রাবড়ি। কেউ কেউ আবার হয়ে উঠছেন আরও দুঃসাহসী। পেট বাঁচাতে বিক্রি করে দিচ্ছেন নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। মায়া-মমতা-বিবেক ধামাচাপা দিয়ে বেচে দিচ্ছেন নিজের গর্ভের ধন। নিজের ঔরসজাত সন্তান! তালেবানদের আফগান দখলের পরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই একই দৃশ্যই ঘুরপাক খাচ্ছে দেশটির নিুবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পাড়ার গলি-ঘুপচিতে। বিবিসি।

নিষ্ঠুরতার চরম বাস্তবতা থেকে বাদ যায় না সদ্য পৃথিবীর আলো দেখা শিশুও। আব্দুর ওহাব নামের এক আফগান বাবা বলেন, ‘আমাদের শিশুরা কাঁদছে। তাদের ঘুম নেই। পেটে ক্ষুধার যন্ত্রণা। আর উপায় না পেয়ে আমরা ফার্মেসিতে যাই, ওষুধ দেই বাচ্চাদের যাতে তারা তন্দ্রা অনুভব করে।’ গোলাম হযরত নামে একজন ট্যাবলেটের পাতা বের করে বলেন, এটি তিনি এক বছরের শিশুসহ ছয় সন্তানকে দিচ্ছেন। এ চিত্রটি আফগানে নতুন নয়। দেশটির তৃতীয় বৃত্তম শহর হেরাতের কাছাকাছি একটি অঞ্চলের চিত্র এটি। হাজার হাজার ছোট মাটির ঘরের বসতি তৈরি করেছে এখানকার মানুষ। প্রায় এক যুগ ধরে অঞ্চলের মানুষ যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। বিবিসিকে সাক্ষাৎকারে দেওয়ার সময় একজন পকেট থেকে ট্যাবলেটের পাতা বের করে দেখান। যার মধ্যে ছিল আলপ্রাজোলাম-ট্রাঙ্কুলাইজার। এই ওষুধ মূলত উদ্বেগজনিত ব্যাধি নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। অনেকে আবার এসিটালোপ্রাম ও স্যারট্রেলাইন ট্যাবলেটের পাতা বের করেছিল। যা মূলত বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত রোগে ব্যবহৃত হয়। সেবনমাত্রই তন্দ্রার ভাব আসে। ক্ষুধার কষ্ট থামাতে এই শিশুদের ‘বিষ’ই খাওয়াচ্ছেন বাবা-মায়েরা। খাচ্ছেন নিজেরাও। চিকিৎসকরা বলেন, পর্যাপ্ত পুষ্টি না পাওয়া শিশুদের এ ওষুধ সেবন করালে তাদের লিভারের ক্ষতি হয়। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি, ঘুম ও আচরণগত সমস্যাও দেখা দেয়। স্থানীয় ফার্মেসিতে পাওয়া যায় এসব ওষুধ। পাঁচটি ট্যাবলেট পাওয়া যায় ১০ আফগানিসে। আফগানি হলো দেশটির মুদ্রার নাম। ১০ আফগানি প্রায় ১০ ইউএন সেন্টের সমান। দরিদ্র্যতার চরম শিখরে চলে যাওয়া দেশটির মানুষ এখন একটি রুটিই ভাগ করে খাচ্ছে পুরো পরিবার। সকালের শুকনো রুটি পানিতে ডুবিয়ে নরম করে রাতে তা খেয়েই কোনো মতে বেঁচে থাকে তারা। এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ দিন আনে দিন খায়। কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়াই গত আগস্টে তালেবানরা যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন আফগানিস্তানে বিদেশি তহবিল স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থনৈতিক পতনের সূত্রপাত এখান থেকেই। খুব কম দিনেই তারা কাজ খুঁজে পায় যার সর্বোচ্চ মূল্য থাকে ১০০ আফগানি, যা প্রায় এক ডলার সমান। এভাবে আর কতদিন! বেঁচে পেটের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পর্যন্ত বিক্রি করা শুরু করেছে অসহায়-হতদরিদ্র আফগানরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০ বছর বয়সি এক ব্যক্তি (ছদ্মনাম আম্মার) বিবিসিকে তার নয় ইঞ্চি লম্বা অস্ত্রোপচারের দাগটি দেখান। মাত্র তিন মাস আগেই নিজের কিডনি বিক্রি করেছেন তিনি। ভয় থাকলেও আর কোনো রাস্তা তার জন্য উন্মুক্ত ছিল না বলে জানান। কিডনি বেচে পেয়েছিলেন প্রায় ২৭০,০০০ আফগানি (৩,১০০ ইউএস ডলার)। যার বেশির ভাগই তার পরিবারের খাবার কেনা ও ধার-দেনা পরিশোধে শেষ হয়ে গেছে। অনেকে বিক্রি করছেন তার ছেলে-মেয়েও। সেরকমই এক নারী জানান, কিডনি বিক্রি করেও পরিশোধ হয়নি ঋণ। এখন তার কন্যা বিক্রির জন্য প্রতিনিয়ত তাকে জোর করা হচ্ছে এবং হেনস্তা করা হচ্ছে। অশ্রুসিক্ত চোখে এক বাবা জানান, তিনি তার আদরের মেয়েকে এক লাখ আফগানির দামে বিক্রি করে দিয়েছেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন