রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতি : কাজ নেই, খাবার নেই

কাজের খোঁজে পতিতালয়ে ভেনিজুয়েলার নারীরা

সন্তানদের নিয়ে বিপাকে মায়েরা * বাচ্চা জন্ম দিতে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পালিয়ে যাচ্ছে

  যুগান্তর ডেস্ক ২৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভেনিজুয়েলার নারীরা
ছবি: এএফপি

গত কয়েক মাস ধরে রেকর্ড অর্থনৈতিক সংকটে ধুঁকছে ভেনিজুয়েলা। কাজ নেই, অস্বাভাবিক মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ঘাটতি। বিদ্যুৎ নেই, ওষুধ নেই, ডাক্তার নেই। এক কথায় কোনোভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এ সংকট এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য হচ্ছেন সেখানকার নারীরা।

তাও নিজের দেশে নয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে। বিশেষ করে, কলম্বিয়ার পতিতা পল্লীতে ভিড় জমাচ্ছেন তারা। কাজের খোঁজে দেশ ছাড়ছেন গর্ভবতী মায়েরা। ছোট্ট ছোট্ট শিশু কোলে নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছেন অনেকেই। রয়টার্স, গার্ডিয়ান, স্কাই নিউজ, বিবিসি, ডেইলি মেইনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে যুগান্তর পাঠকদের জন্য আজকের এ বিশেষ আয়োজন।

সম্প্রতি ভেনিজুয়েলার সীমান্তবর্তী কলম্বিয়ার কুকুটা শহরের এক যৌনপল্লীতে ৬০ যৌনকর্মীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্কাই নিউজের এক সাংবাদিক। তাদের মধ্যে মাত্র দু’জন কলম্বিয়ার অধিবাসী। বাকি ৫৮ জনই ভেনিজুয়েলা থেকে আসা। এটাই এখন তাদের জীবিকার একমাত্র উপায় বলে জানিয়েছেন নারীরা। অস্থায়ীভাবে দেশ ছেড়েছিলেন এসব নারী। কিন্তু তাদের কাছে কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। ফলে কলম্বিয়ায় কোনো কাজ পাচ্ছেন না তারা। সাক্ষাৎকারে এক নারী বলেন, ‘আমি এ কাজে এসেছি। কারণ আমি এটা করতে বাধ্য হয়েছি। এ ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই।’

কাজের খোঁজে দলে দলে দেশ ছাড়ছেন গর্ভবতী নারীরাও। বেশির ভাগই সীমান্ত পার হয়ে ব্রাজিলে ঢুকছেন। সেখানে গাড়ি ধোয়া ও গ্লাস মোছার কাজ করছেন তারা। সম্প্রতি ব্রাজিলের রোরাইমা রাজ্যের বোয়া ভিস্টা শহরের এক মহাসড়কে দাঁড়ানো এমনই এক গর্ভবতী নারীর ছবি ভাইরাল হয়েছে।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, রাস্তার ধারে পার্ক করা সাদা একটি প্রাইভেটের সামনে মারাবী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে গাড়ি মোছায় ‘ডাস্টার’। বোঝাই যাচ্ছে, কাজটি পেতে হাসিমুখে গাড়ির মালিকের মনজয়ের চেষ্টা করছেন ওই নারী। ভেনিজুয়েলার এ চরম অবস্থায় হাসপাতালে নবজাতকের যথাযথ চিকিৎসা না থাকায় নিরাপদে বাচ্চা জন্ম দিতেও দেশ ছাড়ছেন অনেক গর্ভবতী নারী।

ব্রাজিল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিদিন প্রায় ৮০০ গর্ভবতী নারী সীমান্ত পার হয়ে আসছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই শুধু রোরাইমা রাজ্যেই এদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৫ হাজারে। রাজ্যের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন তিনটি শিশুর জন্ম দিচ্ছেন ভেনিজুয়েলার মায়েরা।

সোমবার রোরাইমা রাজ্যের এক হাসপাতালে বাচ্চা জন্ম দিয়েছেন মারিয়া তেরেসা লোপেজ (২০)। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি যদি ভেনিজুয়েলায় থাকতাম, আমার বাচ্চা বাঁচত না। সেখানে কোনো খাবার নেই, কোনো ওষুধ নেই। এমনকি কোনো ডাক্তারও নেই। অভাব-অনটন আর বিপদ থেকে বাঁচতে ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা আর কোলের শিশু নিয়েও পালিয়ে যাচ্ছেন হাজার হাজার মা। এমনই একজন মা ২৫ বছর বয়সী এলিজাবেথ হারনানদেজ।

ছোট ছোট চার ছেলে-মেয়েসহ কলম্বিয়ার সীমান্তের শহর কুকুটার একটি চার্চের বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন স্বামী পরিত্যক্তা এই নারী। কেন্দ্রের মেঝেতে বিছানা পেতে সেখানেই চার সন্তান ও নিজের ঘুমানোর ব্যবস্থা করেছেন তিনি। সোমবার এক সাক্ষাৎকারে স্কাই নিউজকে তিনি বলেন, ভেনিজুয়েলার মারগারিটা দ্বীপ থেকে এসেছেন তিনি।

কখনও নৌকা চড়ে, কখনও বাসে আবার কখনও হেঁটে অবশেষে কুকুটায় পৌঁছেছেন তিনি। তিনি এখানে এসেছেন তাও এক মাস হতে চলল। অন্যরা যখন কিছু একটা করার চেষ্টা করছেন, তখন এখানে কোনো কাজ করা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কারণ তার কোলের শিশুটার বয়স মাত্র ৮ মাস। সন্তানদের মধ্যে বড়টার বয়স ছয় বছর।

দেশের এমন সংকটে কাজের খোঁজে দেশ ছাড়ছেন ভেনিজুয়েলার লাখ লাখ নারী-পুরুষ। শুধু কলম্বিয়ায় নয়, ল্যাটিন আমেরিকার ইকুয়েডর, ব্রাজিল, পেরু, চিলি, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা প্রভৃতি দেশে সে াতের মতো পাড়ি জমাচ্ছেন তারা। এ যাবৎ প্রায় ২০ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছেন।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য মতে, ইতিমধ্যে ভেনিজুয়েলার প্রায় আট লাখ অধিবাসী কলম্বিয়ায় প্রবেশ করেছে। চলতি বছর সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে ইকুয়েডরে প্রবেশ করেছে সাড়ে পাঁচ লাখ অধিবাসী। ভেনিজুয়েলার এ ‘শরণার্থী’ স্রোত ঠেকাতে ইতিমধ্যে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করেছে ইকুয়েডর, চিলি ও ব্রাজিল।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter