একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা প্রথমপত্র

প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মো. রাজন মিয়া

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা

হবিগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ

মাসি-পিসি

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

উদ্দীপক :

স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ নাজমুন নাহার। শোষণ-বঞ্চনা-লাঞ্ছনা থেকে রেহাই পেতে তিন বছরের ছেলে বাবুলকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ি দেয় ঢাকায় কমলাপুর বস্তিতে। দূর সম্পর্কের রাহেলা খালার সাহায্যে গার্মেন্টে চাকরি নেয় নাজমুন নাহার। গ্রামের এ সরল বালিকাবধূর দিকে চোখ পড়ে বস্তির দোকানদার শামসু মিয়া থেকে শুরু করে গার্মেন্টের ফোরম্যান আবদুল কুদ্দুসের। নাজমুন নাহার নিজেকে সামলিয়ে চলে। এর মধ্যে একদিন গ্রাম থেকে হাজির নাজমুন নাহারের মদখোর, অত্যাচারী আর পাষণ্ড স্বামী ফারুক মিয়া। রাহেলা খালা নাজমুন নাহারকে বলেন- ‘ফারুইক্যা তোর টেহার লাগি আবার নিত আইছে, টেহা শ্যাষ তো তোর দামও শ্যাষ।’ নাজমুন নাহার জীবন-সংগ্রামে স্বামীকে বাদ দিয়ে একাই চলার সিদ্ধান্ত নিলেন।

প্রশ্ন :

ক) সালতি শব্দের অর্থ কী?

খ) ‘সব বিরোধ সব পার্থক্য উড়ে গিয়ে দু’জনের হয়ে গেল একমন, একপ্রাণ’- কেন? ব্যাখ্যা কর।

গ) উদ্দীপকের রাহেলা খালা ও তোমার পঠিত ‘মাসি-পিসি’ গল্পের মাসি ও পিসির মধ্যে সাদৃশ্য আলোচনা কর।

ঘ) ‘উদ্দীপকের নাজমুন নাহারের জীবন-সংগ্রামের সঙ্গে গল্পের আহ্লাদির মিলের চেয়ে অমিল বেশি’- আলোচনা কর।

উত্তর : ক:- সালতি শব্দের অর্থ হচ্ছে শালকাঠ নির্মিত বা তাল কাঠের সরু ডিঙ্গি নৌকা বিশেষ।

উত্তর : খ:- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘মাসি-পিসি’ নামক গল্পে আমরা দেখতে পাই মাসি ও পিসিকে- যারা নাকি দু’জনই বিধবা আর নিঃস্ব। অস্তিত্ব রক্ষার কোনো এক পর্যায়ে শত্রুসম দু’জন নারী একত্রিত হয়েছিলেন। তাদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখক এ উদ্ধৃতি দিয়েছেন।

নারী নির্যাতনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মাসি-পিসি গল্পটি। স্বামীর লাঠি-ঝাঁটা, কলকে পোড়া ছ্যাঁকা, খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আহ্লাদি চলে আসে বাপের ভিটায়। এখানে আমরা দেখতে পাই আহ্লাদির মাসি-পিসিকে। যেহেতু এটি পিসির বাপের বাড়ি আর মাসি আশ্রিত। তাই প্রথমদিকে মাসির প্রতি খানিকটা অবজ্ঞাভাব ছিল পিসির। কিন্তু বিধবা হয়ে যখন দু’জনেই বেঁচে থাকার তাগিদে শাক-সবজি বেচাকেনা শুরু করল তখন আর তাদের মধ্যে আগের রেষারেষি থামল না। সেই মিল আরও গাঢ় হল যখন আহ্লাদি তাদের ঘাড়ে এসে পড়ে। তাদের দু’জনেরই এক মন, এক চিন্তা, কীভাবে আহ্লাদিকে রক্ষা করা যায়।

উত্তর : গ:- ‘মাসি-পিসি’ গল্পের মাসি ও পিসি এবং উদ্দীপকের রাহেলা খালার মধ্যে সাদৃশ্য হচ্ছে তারা উভয়ই সংগ্রামী নারী। তারা অন্য নারীকে সহায়তা করার জন্য বদ্ধপরিকর।

আমাদের পঠিত ‘মাসি-পিসি’ গল্পে আমরা লক্ষ্য করি বুদ্ধিদীপ্ত সাহসী সংগ্রামী দু’জন নিঃস্ব বিধবাকে। অত্যাচারী স্বামী এবং লালসা উন্মত্ত জোতদার, দারোগা ও গুণ্ডা-বদমাইশের হামলা থেকে আহ্লাদিকে নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে অসহায় দুই বিধবার দায়িত্বশীল ও মানবিক জীবনযুদ্ধ খুবই প্রশংসনীয়। দুর্ভিক্ষে তারা তাদের আপনজনকে হারিয়ে আহ্লাদির জন্য সর্বস্ব ঢেলে দিয়েছেন। অন্যদিকে উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই নাজমুন নাহার রাহেলা খালার রক্তের কেউ না হলেও স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ নাজমুন নাহারকে বস্তিতে আশ্রয় দেন। নিজে যেচে গার্মেন্টসে চাকরি পাইয়ে দেন। দোকানদার শাসসু মিয়া বা ফোরম্যান আবদুল কুদ্দুসের কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা করেন নাজমুন নাহারকে। এমনকি মদখোর ফারুক নাজমুন নাহারকে নিতে এলে রাহেলা খালা বাস্তবতা তুলে ধরেন।

এভাবে আমরা দেখি গল্পের মাসি-পিসি যেমন আহ্লাদিকে বাইরের সব নির্যাতন থেকে রক্ষা করেছিল তেমনি রাহেলা খালাও নাজমুন নাহারকে চরম বাস্তবতাকে কীভাবে মোকাবেলা করে জীবনসংগ্রামে জয়ী হওয়া যায় তা শিখিয়ে দেন।

উত্তর : ঘ:- স্বামীর নির্মম নির্যাতনের শিকার পিতৃমাতৃহীন এক তরুণীর করুণ জীবন কাহিনী নিয়ে রচিত ‘মাসি-পিসি’ গল্প। অন্যদিকে জীবনযুদ্ধের এক লড়াকু সৈনিক নাজমুন নাহারকে পাই উদ্দীপকে।

স্বামীর অত্যাচারে আগের সন্তানটি নষ্ট হলে আহ্লাদি আশ্রয় নেয় বাপের বাড়ি। আহ্লাদি যেন হাজার বছর ধরে চলে আসা স্বামী নির্যাতিত যে কোনো বাঙালি গৃহলক্ষ্মীর প্রতিচ্ছবি। সারাক্ষণ পরিশ্রম করার পর মদখোর জগুর সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করেন। স্বামী গৃহের লাঠি-ঝাঁটা, কলকে পোড়ার ছ্যাঁকা খেয়েও প্রতিবাদ করেন না আহ্লাদি। গাঁজাখোর স্বামীর সঙ্গে বাদানুবাদ তো দূরের কথা তার দিকে তাকাতেও সাহস পান না সর্বংসহা আহ্লাদি। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত যেসব নারী স্বামীগৃহে নির্যাতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে ওদেরই একজন আহ্লাদি। উদ্দীপকের নাজমুন নাহার প্রথমদিকে সব অত্যাচার সহ্য করলেও এক সময় শহরে এসে গার্মেন্টে চাকরি নেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তার স্বামী ফারুককে তাড়িয়ে দেন। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, প্রতিবাদী এক আধুনিক নারীর প্রতিচ্ছবি উদ্দীপকের নাজমুন নাহার বুঝতে পেরেছেন নারীর প্রতি সহিংসতার উপযুক্ত জবাব হতে পারে নারীর স্বাবলম্বিতা আর সচেতনতা।

উদ্দীপকের নাজমুন নাহার আর গল্পের আহ্লাদি দু’জনই স্বামীর নির্যাতনের শিকার। কিন্তু একজন কেবল নীরবে অশ্রু বিসর্জন করছে প্রতিবাদ করতে পারছেন না। অন্যদিকে আরেকজন এর সমোচিত জবাব দিচ্ছেন। নারী যে কেবল সংসারের শোভা নয়, তারও যে ব্যক্তিত্ব আছে, আছে অহংবোধ- তা আমরা দেখতে পাই নাজমুন নাহারের মধ্যে। তাই আমরা বলতে পারি উদ্দীপকের নাজমুন নাহারের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে গল্পের আহ্লাদির জীবনে মিলের চেয়ে অমিল বেশি।