পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা
jugantor
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা

  সবুজ চৌধুরী  

১৫ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সহকারী শিক্ষক, সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মোহাম্মদপুর, ঢাকা

রচনা : বর্ষাকাল

ভূমিকা :

আমি বর্ষা, আসিলাম গ্রীষ্মের প্রদাহ শেষ করি

মায়ার কাজল চোখে, মমতার বর্মপুট ভরি।

-সুফিয়া কামাল।

ষড়ঋতুর এই বাংলা মায়ের ষড়রূপে কে না বিস্মিত হয়! ঋতু বৈচিত্র্যের মোহে মোহান্ধ হয় না কার মন! আমরা সবাই প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতি আমাদের বিমুগ্ধ করে তার আপন রূপের মমতাময়ী স্পর্শে। এক্ষেত্রে বর্ষা সবচেয়ে আবেদনময়ী ঋতু। ঘন গৌরবে ঘটে বর্ষার উন্মাদ আগমন। আকাশে আকাশে ছড়িয়ে পড়ে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের ভেলা। সীমাহীন উল্লাসে অবিশ্রান্ত ধারা বর্ষণের মধ্য দিয়ে বর্ষা নেমে আসে বাংলার শ্যামল মাটিতে।

ঋতুচক্রে বর্ষা :

ঋতুচক্রে গ্রীষ্মের পরই বর্ষার স্থান। আষাঢ় ও শ্রাবণ দুই মাস নিয়ে বর্ষাকাল। অন্যভাবে বললে বৃষ্টিপাতের সময়কে বর্ষাকাল বলে। এ দিক থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে আশ্বিন মাসের শেষ পর্যন্ত এর অবস্থান। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে প্রকৃতিকে শীতল ও সিক্ত করতেই বর্ষার আগমন ঘটে।

বর্ষার আগমন :

গ্রীষ্মের দাবদাহে যখন অতিষ্ঠ প্রাণিকুল, চাতক জল চায় মেঘের কাছে, তখনই বর্ষা-কন্যা আসে বৃষ্টির নূপুর পায়ে, ঝুমুর ঝুমুর মল বাজিয়ে। সজল বর্ষণে রুক্ষ্ম প্রকৃতিকে স্নান করিয়ে পুত-পবিত্র করে দেয় বর্ষা। প্রকৃতি যেন বর্ষার ছোঁয়া পেয়ে সজল হয়ে ওঠে। মেঘ-বালিকাদের অবাধ বিচরণ আকাশকে যেন মাটির কাছে টেনে আনে। বর্ষার সমাগমে খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-ডোবা পানিতে থই থই করে, গ্রামগুলো দ্বীপের মতো পানির বুকে ভাসে। বনে জুঁই, কেয়া, কদম ফুলের øিগ্ধ সৌরভ ভাসে বাতাসে। কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর বর্ষার আগমনের চিত্র এভাবে তুলে ধরেছেন-

“ঐ আসে অতি ভৈরব হরষে

জল সিঞ্চিত ক্ষিতি সৌরভ সরসে

ঘন গৌরবে নব যৌবনা বরষা

শ্যাম গম্ভীর সরসা।”

বর্ষার রূপ :

“বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর

আউশের ক্ষেত জলে ভরভর

কালিমাখা মেঘে ওপারে আঁধার

ঘনায়েছে দেখ চাহিরে।

ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।”

বর্ষা-মেয়ের দেহজুড়ে অবিরাম বর্ষণের বারিপাত, কণ্ঠজুড়ে মেঘের গুড়গুড় শব্দ, মাথায় কালো মেঘের কেশপাশ, পা ধৌত করছে এক মাঠ জল-এই তো বর্ষার রূপ! মাঠে দিগন্ত বিস্তীর্ণ শস্যশিশুর নৃত্য দেখতে দেখতে কৃষ্ণধূষর মেঘ বালিকার পাশ কাটিয়ে শ্বেত বক-কন্যারা যেন নিরুদ্দেশ যাত্রা করে। সূর্য লুকোচুরি খেলে মেঘের সঙ্গে। মেঘের ভৈরবী রূপের গলায় বিজলি যেন গহনা পরিয়ে দেয়। সে আনন্দে বর্ষা ঝমঝম শব্দে অবিরাম নৃত্য শুরু করে।

বর্ষার প্রকৃতি ও জনজীবন :

“বাদল হাওয়ায় মনে পড়ে

ছেলেবেলার গান

বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর

নদে এলো বান।”

বর্ষার অবিরাম বৃষ্টিতে ভরে ওঠে খাল-বিল, নদী-নালা। ঘরের কোনে ব্যাঙের ঘ্যাঁঙর ঘ্যাঁঙর ডাক। পানিতে ভিজে পাখিরা গাছের পাতার ফাঁকে চুপটি করে বসে থাকে। গ্রামের মানুষের এ দিনে কোনো কাজ থাকে না। তারা অলসভাবে ঘরে বসে সময় কাটায়। গ্রামের মেয়েরা এ সময় নকশি কাঁথা তৈরি করে। কবিরা বৃষ্টির সৌন্দর্য নিয়ে কবিতা লেখে। কর্দমাক্ত রাস্তা-ঘাট দিয়ে অল্প-স্বল্প লোকজনের আনাগোনা দেখা যায়। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে খেলা করে। বাড়িতে বাড়িতে খিচুড়ি রান্না হয়, অনেকেই ইলিশ মাছ দিয়ে মজা করে খিচুড়ি খায়।

বর্ষার উপকারিতা :

“ঐ দেখ ভাই বর্ষা আসে

কালো বরণ ঘোমটা টানি

সজল পটে কে আঁকে ঐ

স্নিগ্ধ সজীব ছবিখানি।”

বৃষ্টি পানিতে দেশের সব ময়লা ধুয়ে মুছে দূর হয়ে যায়। এ সময় প্রকৃতি খুবই সতেজ হয়ে ওঠে। প্রকৃতিতে দেখা দেয় ফল-ফসলের সম্ভার। নদীপথে পরিবহণ ব্যবস্থা সহজ হয়ে ওঠে।

বর্ষার অপকারিতা :

বর্ষায় মানুষের কষ্ট আর অশান্তির সীমা থাকে না। কাজের জন্য বাইরে বের হওয়ার উপায় থাকে না। কখনো কখনো অতি বৃষ্টিতে বন্যা দেখা দেয়। ডুবে যায় ফসলের মাঠ, শহরের বস্তি। জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পায়। ময়লা আর দূষিত পানিতে ছড়িয়ে পড়ে রোগ। মানুষ সর্দি, কাশি, জ্বর, পেটের পীড়াসহ নানা ধরনের রোগ বৃদ্ধি পায়।

উপসংহার :

“আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন ছল ছল জলধারে

বেণুবনে বায়ু নড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে।”

বর্ষা মানুষের মনকে সংবেদনশীল করে তোলে। বর্ষা যেমন দুহাত ভরে দান করে তেমনি কিছু কষ্টের স্মৃতিও রেখে যায়। তবুও প্রকৃতিতে বর্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বর্ষা যেন সারা বছরের প্রকৃতির প্রাণশক্তি জুগিয়ে দেয়।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা

 সবুজ চৌধুরী 
১৫ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সহকারী শিক্ষক, সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মোহাম্মদপুর, ঢাকা

রচনা : বর্ষাকাল

ভূমিকা :

আমি বর্ষা, আসিলাম গ্রীষ্মের প্রদাহ শেষ করি

মায়ার কাজল চোখে, মমতার বর্মপুট ভরি।

-সুফিয়া কামাল।

ষড়ঋতুর এই বাংলা মায়ের ষড়রূপে কে না বিস্মিত হয়! ঋতু বৈচিত্র্যের মোহে মোহান্ধ হয় না কার মন! আমরা সবাই প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতি আমাদের বিমুগ্ধ করে তার আপন রূপের মমতাময়ী স্পর্শে। এক্ষেত্রে বর্ষা সবচেয়ে আবেদনময়ী ঋতু। ঘন গৌরবে ঘটে বর্ষার উন্মাদ আগমন। আকাশে আকাশে ছড়িয়ে পড়ে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের ভেলা। সীমাহীন উল্লাসে অবিশ্রান্ত ধারা বর্ষণের মধ্য দিয়ে বর্ষা নেমে আসে বাংলার শ্যামল মাটিতে।

ঋতুচক্রে বর্ষা :

ঋতুচক্রে গ্রীষ্মের পরই বর্ষার স্থান। আষাঢ় ও শ্রাবণ দুই মাস নিয়ে বর্ষাকাল। অন্যভাবে বললে বৃষ্টিপাতের সময়কে বর্ষাকাল বলে। এ দিক থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে আশ্বিন মাসের শেষ পর্যন্ত এর অবস্থান। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে প্রকৃতিকে শীতল ও সিক্ত করতেই বর্ষার আগমন ঘটে।

বর্ষার আগমন :

গ্রীষ্মের দাবদাহে যখন অতিষ্ঠ প্রাণিকুল, চাতক জল চায় মেঘের কাছে, তখনই বর্ষা-কন্যা আসে বৃষ্টির নূপুর পায়ে, ঝুমুর ঝুমুর মল বাজিয়ে। সজল বর্ষণে রুক্ষ্ম প্রকৃতিকে স্নান করিয়ে পুত-পবিত্র করে দেয় বর্ষা। প্রকৃতি যেন বর্ষার ছোঁয়া পেয়ে সজল হয়ে ওঠে। মেঘ-বালিকাদের অবাধ বিচরণ আকাশকে যেন মাটির কাছে টেনে আনে। বর্ষার সমাগমে খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-ডোবা পানিতে থই থই করে, গ্রামগুলো দ্বীপের মতো পানির বুকে ভাসে। বনে জুঁই, কেয়া, কদম ফুলের øিগ্ধ সৌরভ ভাসে বাতাসে। কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর বর্ষার আগমনের চিত্র এভাবে তুলে ধরেছেন-

“ঐ আসে অতি ভৈরব হরষে

জল সিঞ্চিত ক্ষিতি সৌরভ সরসে

ঘন গৌরবে নব যৌবনা বরষা

শ্যাম গম্ভীর সরসা।”

বর্ষার রূপ :

“বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর

আউশের ক্ষেত জলে ভরভর

কালিমাখা মেঘে ওপারে আঁধার

ঘনায়েছে দেখ চাহিরে।

ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।”

বর্ষা-মেয়ের দেহজুড়ে অবিরাম বর্ষণের বারিপাত, কণ্ঠজুড়ে মেঘের গুড়গুড় শব্দ, মাথায় কালো মেঘের কেশপাশ, পা ধৌত করছে এক মাঠ জল-এই তো বর্ষার রূপ! মাঠে দিগন্ত বিস্তীর্ণ শস্যশিশুর নৃত্য দেখতে দেখতে কৃষ্ণধূষর মেঘ বালিকার পাশ কাটিয়ে শ্বেত বক-কন্যারা যেন নিরুদ্দেশ যাত্রা করে। সূর্য লুকোচুরি খেলে মেঘের সঙ্গে। মেঘের ভৈরবী রূপের গলায় বিজলি যেন গহনা পরিয়ে দেয়। সে আনন্দে বর্ষা ঝমঝম শব্দে অবিরাম নৃত্য শুরু করে।

বর্ষার প্রকৃতি ও জনজীবন :

“বাদল হাওয়ায় মনে পড়ে

ছেলেবেলার গান

বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর

নদে এলো বান।”

বর্ষার অবিরাম বৃষ্টিতে ভরে ওঠে খাল-বিল, নদী-নালা। ঘরের কোনে ব্যাঙের ঘ্যাঁঙর ঘ্যাঁঙর ডাক। পানিতে ভিজে পাখিরা গাছের পাতার ফাঁকে চুপটি করে বসে থাকে। গ্রামের মানুষের এ দিনে কোনো কাজ থাকে না। তারা অলসভাবে ঘরে বসে সময় কাটায়। গ্রামের মেয়েরা এ সময় নকশি কাঁথা তৈরি করে। কবিরা বৃষ্টির সৌন্দর্য নিয়ে কবিতা লেখে। কর্দমাক্ত রাস্তা-ঘাট দিয়ে অল্প-স্বল্প লোকজনের আনাগোনা দেখা যায়। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে খেলা করে। বাড়িতে বাড়িতে খিচুড়ি রান্না হয়, অনেকেই ইলিশ মাছ দিয়ে মজা করে খিচুড়ি খায়।

বর্ষার উপকারিতা :

“ঐ দেখ ভাই বর্ষা আসে

কালো বরণ ঘোমটা টানি

সজল পটে কে আঁকে ঐ

স্নিগ্ধ সজীব ছবিখানি।”

বৃষ্টি পানিতে দেশের সব ময়লা ধুয়ে মুছে দূর হয়ে যায়। এ সময় প্রকৃতি খুবই সতেজ হয়ে ওঠে। প্রকৃতিতে দেখা দেয় ফল-ফসলের সম্ভার। নদীপথে পরিবহণ ব্যবস্থা সহজ হয়ে ওঠে।

বর্ষার অপকারিতা :

বর্ষায় মানুষের কষ্ট আর অশান্তির সীমা থাকে না। কাজের জন্য বাইরে বের হওয়ার উপায় থাকে না। কখনো কখনো অতি বৃষ্টিতে বন্যা দেখা দেয়। ডুবে যায় ফসলের মাঠ, শহরের বস্তি। জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পায়। ময়লা আর দূষিত পানিতে ছড়িয়ে পড়ে রোগ। মানুষ সর্দি, কাশি, জ্বর, পেটের পীড়াসহ নানা ধরনের রোগ বৃদ্ধি পায়।

উপসংহার :

“আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন ছল ছল জলধারে

বেণুবনে বায়ু নড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে।”

বর্ষা মানুষের মনকে সংবেদনশীল করে তোলে। বর্ষা যেমন দুহাত ভরে দান করে তেমনি কিছু কষ্টের স্মৃতিও রেখে যায়। তবুও প্রকৃতিতে বর্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বর্ষা যেন সারা বছরের প্রকৃতির প্রাণশক্তি জুগিয়ে দেয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন