কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার অনন্য প্রতিষ্ঠান: প্রফেসর ড. মো. গিয়াসউদ্দীন মিয়া, উপাচার্য
jugantor
প্রিয় ক্যাম্পাস : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার অনন্য প্রতিষ্ঠান: প্রফেসর ড. মো. গিয়াসউদ্দীন মিয়া, উপাচার্য
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

  ক্যাম্পাস ডেস্ক  

২৫ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিই হচ্ছে কৃষি। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর বিশাল খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক, যুগোপযোগী ও লাগসই প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা কৌশল এবং আধুনিক কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যকে সামনে রেখে আজ থেকে প্রায় তিন যুগ আগে ১৯৮৫ সালে ইনস্টিটিউট অব পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ ইন এগ্রিকালচার (ইপসা) প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ-জাপান-যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ত্রিপক্ষীয় আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় ১৯৯১ থেকে দেশে উচ্চতর কৃষিশিক্ষায় স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত প্রতিষ্ঠানটি এদেশে সর্বপ্রথম ট্রাইমিস্টার ‘নর্থ-আমেরিকান কোর্স ক্রেডিট শিক্ষাদান পদ্ধতি’র প্রবর্তন করে। বিশ্ববিদ্যালয়টি বাংলাদেশের একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত (করোনা সময় ব্যতীত) এক দিনের জন্যও কোনো সেশন জট নেই।

স্বতন্ত্র শিক্ষাদান বৈশিষ্ট্য ও ফলপ্রসূ প্রায়োগিক গবেষণার জন্য অল্প সময়ের মধ্যেই দেশ-বিদেশে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিষ্ঠানটি দেশে উচ্চতর কৃষি শিক্ষায় এক অনন্য উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে। কৃষিক্ষেত্রে অল্প সময়েই তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখায় কৃষিদরদি বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তার ১৯৯৬-২০০১ শাসনামলে ইপসার দ্বিতীয় সমাবর্তনে (১৯ জুন ১৯৯৭ অনুষ্ঠিত) প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ২২ নভেম্বর মহান জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরকৃবি) আইন গেজেট আকারে প্রকাশিত হলে দেশের ১৩তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে এ প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে (১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ইপসা এবং ১৯৯৮ সালে জাতির পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত) এ বিশ্ববিদ্যালয়টি কৃষিতে মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণায় অগ্রাধিকার প্রদান করে আসছে।

২২ নভেম্বর পালিত হলো বিশ্ববিদ্যালয়টির ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ প্রসঙ্গে উপাচার্য ড. মো. গিয়াসউদ্দীন মিয়া বলেন, ‘কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার অনন্য প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার সবার দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছে।’

শুরু থেকে কৃষির বিভিন্ন বিষয়ে এমএস ও পিএইচডি ডিগ্রির পাশাপাশি ২০০৫ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরমেয়াদি বিএস (কৃষি), ২০০৯ সাল থেকে বিএস (ফিশারিজ) এবং ২০১০ সাল থেকে ৫ বছরমেয়াদি ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন এবং ২০১২ সাল থেকে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ উন্নয়ন অনুষদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে বিদেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে এবং বর্তমানে ৫৭ (সাতান্ন) জন বিদেশি ছাত্রছাত্রী অধ্যয়ন করছে। এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোট ৯৮৭ জনকে বিএস (এগ্রিকালচার), ২৭৩ জনকে বিএস (ফিশারিজ), ১৮৮ জনকে বিএস (কৃষি অর্থনীতি), ১৪৫ জনকে ডিভিএম, ২১১৪ জনকে এমএস, ৩২৭ জনকে পিএইচডি এবং ৯৮ জনকে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে।

কৃষি ও কৃষি সম্পর্কিত মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কৃষি, মৎস্য, পশুপালন এবং পশুচিকিৎসা বিজ্ঞানে মৌলিক জ্ঞান সৃজনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য রেখে চলেছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আধুনিক কৃষির নানা বিষয়ে অনেকগুলো গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মৌলিক গবেষণা প্রবন্ধ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ও ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর বিশিষ্ট জার্নালে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। তা ছাড়া প্রতিনিয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক কনফারেন্স বা সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করে প্রবন্ধ উপস্থাপন করছে। শিক্ষকের মৌলিক গবেষণায় অর্জিত ফলাফল থেকে তিন সহশ্রাধিক প্রকাশনা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় জার্নাল এবং পুস্তকে প্রবন্ধ আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও ২০০টির বেশি জনপ্রিয় নিবন্ধ জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি এ পর্যন্ত ধানসহ অন্যান্য অর্থকরী ফসল, সবজি ও তৈল জাতীয় ফসলের ৬০টির বেশি উচ্চফলনশীল জাত ও ১৪টি কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিগুলো কৃষি উন্নয়নে অনন্য অবদান রেখেছে বিশেষ করে বিইউ ধান ১ এবং মুগডালের জাতগুলো বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে মঙ্গা দূরীকরণে; সয়াবিন, লাউ, শিম, পেপে, কুল (আপেলকুল)-এর জাতগুলো দেশের কৃষি উৎপাদনে অসামান্য অবদান রাখছে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির মধ্যেও গত এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিম, চেরি টমেটো, সয়াবিন, ফুলসহ অন্যান্য ফসলের ১৪টি জাত কৃষকের চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষকদের দুই শতাধিক গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন উচ্চ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বিশিষ্ট জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

মৌলিক গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি সর্বোৎকৃষ্ট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্যাটাগরিতে সম্মানজনক আন্তর্জাতিক ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পুরস্কার অর্জন করে। ২০১৫ সালে বৃক্ষরোপণ ও কৃষি বনায়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার-২০১৪ অর্জন। ২০১৭ সালে শিক্ষা, গবেষণা ও বহিরাঙ্গন কার্যক্রমে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪২২ (স্বর্ণ) অর্জন। ব্যক্তিগত গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ এ বিশ্ববিদ্যালয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি স্বর্ণপদক, ইউজিসি এওয়ার্ড, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট পদক, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির ফেলো, ইউজিসি প্রফেসর ইত্যাদি জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ২০২১ সালে বিশ্বখ্যাত স্কোপাস ও সিমাগো ইনডেক্স জরিপে বশেমুরকৃবি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে র‌্যাংকিংয়ে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে পিছনে ফেলে গবেষণা, উদ্ভাবন ও সামাজিক অবস্থান-এ তিন সূচকে প্রথম স্থান লাভ করে।

কৃষি শিক্ষা এবং গবেষণার পাশাপাশি এ বিশ্ববিদ্যালয় তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলো কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বহিরাঙ্গন কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে জ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বিশেষ অবদান রাখছে। সফল পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশীপের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিরাঙ্গন কার্যক্রম। বর্তমানে কাপাসিয়ার টোক গ্রামে কৃষক পর্যায়ে আদর্শ প্রযুক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলোর সম্প্রসারণ করে চলেছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে এ সপ্তাহেই গাজীপুরের কাউলতিয়া ইউনিয়নে নতুন একটি প্রযুক্তি ভিলেজ উদ্বোধন করা হয়েছে। তা ছাড়া ভেটেরিনারি টিচিং হাসপাতালের মাধ্যমে গাজীপুর জেলাসহ আশপাশের এলাকায় প্রাণিস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রোগ চিকিৎসা সেবা প্রদান শুরু করেছে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান তুলে ধরার জন্য নিয়মিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নাল এনালস্ অব বাংলাদেশ এগ্রিকালচার, রিসার্চ এবস্ট্রাক্ট, বুক অব ডির্সাটেশন এবস্ট্রাক্ট (১৯৮৫-২০১৮), বার্ষিক প্রতিবেদন, বশেমুরকৃবি বার্তা, দীর্ঘমেয়াদি কোর্স প্ল্যান ও পরিমার্জিত গ্র্যাজুয়েট ক্যাটালগ নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে বিশেষ স্মরণিকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতগুলোর উৎপাদন মৌসুম, জীবনকাল, বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, ফলন, চাষাবাদ পদ্ধতি এবং প্রযুক্তিগুলোর বর্ণনা ও উপকারিতা সন্নিবেশ করে বশেমুরকৃবি প্রযুক্তি বই নামে একটি সংকলন বশেমুরকৃবি প্রযুক্তি বই প্রকাশ করা হয়েছে। বইটি দ্বারা কৃষিশিক্ষার্থী, কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, গবেষক, সম্প্রসারণবিদ ও এনজিও কর্মী, সর্বোপরি কৃষকরা উপকৃত হবেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশকে সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, স্বপ্ন পোষণ করেছিলেন একটি সুশিক্ষাসমৃদ্ধ, দক্ষ, সৎ ও মেধাবী জাতি গঠনের। জাতির জনকের সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে কৃষি শিক্ষায় বিশ্বমানের দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি এবং লাগসই কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবিত কৃষি প্রযুক্তি কৃষকের দোরগড়ায় পৌঁছে দেয়ার মহান ব্রত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রিয় ক্যাম্পাস : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার অনন্য প্রতিষ্ঠান: প্রফেসর ড. মো. গিয়াসউদ্দীন মিয়া, উপাচার্য

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
 ক্যাম্পাস ডেস্ক 
২৫ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
ফাইল ছবি

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিই হচ্ছে কৃষি। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর বিশাল খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক, যুগোপযোগী ও লাগসই প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা কৌশল এবং আধুনিক কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যকে সামনে রেখে আজ থেকে প্রায় তিন যুগ আগে ১৯৮৫ সালে ইনস্টিটিউট অব পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ ইন এগ্রিকালচার (ইপসা) প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ-জাপান-যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ত্রিপক্ষীয় আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় ১৯৯১ থেকে দেশে উচ্চতর কৃষিশিক্ষায় স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত প্রতিষ্ঠানটি এদেশে সর্বপ্রথম ট্রাইমিস্টার ‘নর্থ-আমেরিকান কোর্স ক্রেডিট শিক্ষাদান পদ্ধতি’র প্রবর্তন করে। বিশ্ববিদ্যালয়টি বাংলাদেশের একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত (করোনা সময় ব্যতীত) এক দিনের জন্যও কোনো সেশন জট নেই।

স্বতন্ত্র শিক্ষাদান বৈশিষ্ট্য ও ফলপ্রসূ প্রায়োগিক গবেষণার জন্য অল্প সময়ের মধ্যেই দেশ-বিদেশে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিষ্ঠানটি দেশে উচ্চতর কৃষি শিক্ষায় এক অনন্য উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে। কৃষিক্ষেত্রে অল্প সময়েই তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখায় কৃষিদরদি বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তার ১৯৯৬-২০০১ শাসনামলে ইপসার দ্বিতীয় সমাবর্তনে (১৯ জুন ১৯৯৭ অনুষ্ঠিত) প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ২২ নভেম্বর মহান জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরকৃবি) আইন গেজেট আকারে প্রকাশিত হলে দেশের ১৩তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে এ প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে (১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ইপসা এবং ১৯৯৮ সালে জাতির পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত) এ বিশ্ববিদ্যালয়টি কৃষিতে মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণায় অগ্রাধিকার প্রদান করে আসছে।

২২ নভেম্বর পালিত হলো বিশ্ববিদ্যালয়টির ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ প্রসঙ্গে উপাচার্য ড. মো. গিয়াসউদ্দীন মিয়া বলেন, ‘কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার অনন্য প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার সবার দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছে।’

শুরু থেকে কৃষির বিভিন্ন বিষয়ে এমএস ও পিএইচডি ডিগ্রির পাশাপাশি ২০০৫ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরমেয়াদি বিএস (কৃষি), ২০০৯ সাল থেকে বিএস (ফিশারিজ) এবং ২০১০ সাল থেকে ৫ বছরমেয়াদি ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন এবং ২০১২ সাল থেকে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ উন্নয়ন অনুষদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে বিদেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে এবং বর্তমানে ৫৭ (সাতান্ন) জন বিদেশি ছাত্রছাত্রী অধ্যয়ন করছে। এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোট ৯৮৭ জনকে বিএস (এগ্রিকালচার), ২৭৩ জনকে বিএস (ফিশারিজ), ১৮৮ জনকে বিএস (কৃষি অর্থনীতি), ১৪৫ জনকে ডিভিএম, ২১১৪ জনকে এমএস, ৩২৭ জনকে পিএইচডি এবং ৯৮ জনকে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে।

কৃষি ও কৃষি সম্পর্কিত মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কৃষি, মৎস্য, পশুপালন এবং পশুচিকিৎসা বিজ্ঞানে মৌলিক জ্ঞান সৃজনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য রেখে চলেছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আধুনিক কৃষির নানা বিষয়ে অনেকগুলো গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মৌলিক গবেষণা প্রবন্ধ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ও ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর বিশিষ্ট জার্নালে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। তা ছাড়া প্রতিনিয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক কনফারেন্স বা সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করে প্রবন্ধ উপস্থাপন করছে। শিক্ষকের মৌলিক গবেষণায় অর্জিত ফলাফল থেকে তিন সহশ্রাধিক প্রকাশনা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় জার্নাল এবং পুস্তকে প্রবন্ধ আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও ২০০টির বেশি জনপ্রিয় নিবন্ধ জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি এ পর্যন্ত ধানসহ অন্যান্য অর্থকরী ফসল, সবজি ও তৈল জাতীয় ফসলের ৬০টির বেশি উচ্চফলনশীল জাত ও ১৪টি কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিগুলো কৃষি উন্নয়নে অনন্য অবদান রেখেছে বিশেষ করে বিইউ ধান ১ এবং মুগডালের জাতগুলো বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে মঙ্গা দূরীকরণে; সয়াবিন, লাউ, শিম, পেপে, কুল (আপেলকুল)-এর জাতগুলো দেশের কৃষি উৎপাদনে অসামান্য অবদান রাখছে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির মধ্যেও গত এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিম, চেরি টমেটো, সয়াবিন, ফুলসহ অন্যান্য ফসলের ১৪টি জাত কৃষকের চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষকদের দুই শতাধিক গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন উচ্চ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বিশিষ্ট জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

মৌলিক গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি সর্বোৎকৃষ্ট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্যাটাগরিতে সম্মানজনক আন্তর্জাতিক ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পুরস্কার অর্জন করে। ২০১৫ সালে বৃক্ষরোপণ ও কৃষি বনায়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার-২০১৪ অর্জন। ২০১৭ সালে শিক্ষা, গবেষণা ও বহিরাঙ্গন কার্যক্রমে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪২২ (স্বর্ণ) অর্জন। ব্যক্তিগত গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ এ বিশ্ববিদ্যালয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি স্বর্ণপদক, ইউজিসি এওয়ার্ড, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট পদক, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির ফেলো, ইউজিসি প্রফেসর ইত্যাদি জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ২০২১ সালে বিশ্বখ্যাত স্কোপাস ও সিমাগো ইনডেক্স জরিপে বশেমুরকৃবি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে র‌্যাংকিংয়ে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে পিছনে ফেলে গবেষণা, উদ্ভাবন ও সামাজিক অবস্থান-এ তিন সূচকে প্রথম স্থান লাভ করে।

কৃষি শিক্ষা এবং গবেষণার পাশাপাশি এ বিশ্ববিদ্যালয় তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলো কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বহিরাঙ্গন কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে জ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বিশেষ অবদান রাখছে। সফল পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশীপের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিরাঙ্গন কার্যক্রম। বর্তমানে কাপাসিয়ার টোক গ্রামে কৃষক পর্যায়ে আদর্শ প্রযুক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলোর সম্প্রসারণ করে চলেছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে এ সপ্তাহেই গাজীপুরের কাউলতিয়া ইউনিয়নে নতুন একটি প্রযুক্তি ভিলেজ উদ্বোধন করা হয়েছে। তা ছাড়া ভেটেরিনারি টিচিং হাসপাতালের মাধ্যমে গাজীপুর জেলাসহ আশপাশের এলাকায় প্রাণিস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রোগ চিকিৎসা সেবা প্রদান শুরু করেছে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান তুলে ধরার জন্য নিয়মিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নাল এনালস্ অব বাংলাদেশ এগ্রিকালচার, রিসার্চ এবস্ট্রাক্ট, বুক অব ডির্সাটেশন এবস্ট্রাক্ট (১৯৮৫-২০১৮), বার্ষিক প্রতিবেদন, বশেমুরকৃবি বার্তা, দীর্ঘমেয়াদি কোর্স প্ল্যান ও পরিমার্জিত গ্র্যাজুয়েট ক্যাটালগ নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে বিশেষ স্মরণিকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতগুলোর উৎপাদন মৌসুম, জীবনকাল, বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, ফলন, চাষাবাদ পদ্ধতি এবং প্রযুক্তিগুলোর বর্ণনা ও উপকারিতা সন্নিবেশ করে বশেমুরকৃবি প্রযুক্তি বই নামে একটি সংকলন বশেমুরকৃবি প্রযুক্তি বই প্রকাশ করা হয়েছে। বইটি দ্বারা কৃষিশিক্ষার্থী, কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, গবেষক, সম্প্রসারণবিদ ও এনজিও কর্মী, সর্বোপরি কৃষকরা উপকৃত হবেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশকে সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, স্বপ্ন পোষণ করেছিলেন একটি সুশিক্ষাসমৃদ্ধ, দক্ষ, সৎ ও মেধাবী জাতি গঠনের। জাতির জনকের সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে কৃষি শিক্ষায় বিশ্বমানের দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি এবং লাগসই কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবিত কৃষি প্রযুক্তি কৃষকের দোরগড়ায় পৌঁছে দেয়ার মহান ব্রত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন