বাল্যবিবাহ ও রূপাদের স্বপ্নভঙ্গ

  মো. মাহবুব-উল-আলম ০৭ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাল্যবিবাহ ও রূপাদের স্বপ্নভঙ্গ
প্রতীকী ছবি

বাল্যবিবাহ বাংলাদেশের একটি অন্যতম সমস্যা, যে কারণে অনেক মেয়ের জীবন আবদ্ধ হয়ে পড়ে চার দেয়ালের গণ্ডিতে; অগণিত সম্ভাবনা আটকে যায় নিয়তির বেড়াজালে। তেমনই একজনের গল্প এ লেখার বিষয়বস্তু। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সন্তোষ গ্রামের কৃষক মোমিন উদ্দিনের তিনকন্যার একজন রূপা (ছদ্মনাম), যার স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হওয়ার, সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার। অথচ আজ তার স্বপ্নহীন চোখের অস্থির চাহনিই বলে দেয়- সে এখন ভীত এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কায় শঙ্কিত।

সপ্তম শ্রেণীতে পড়াকালীন সুশ্রী মাত্র ১৪ বছর বয়সে রূপাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। বিয়েতে প্রবল আপত্তি থাকলেও পারিবারিক চাপে এবং মৃত্যুশয্যায় শায়িত পিতামহের ইচ্ছার কাছে পরাজিত হয়ে রূপা বিয়ে করতে বাধ্য হয়, তার চেয়ে দ্বিগুণ বয়সী দেলদুয়ার উপজেলার মো. শাহিন মিয়াকে (ছদ্মনাম)।

নবম শ্রেণী পাস মাঝারি গড়নের শাহিন মিয়ার বয়স ২৭ বছর; চার ভাইবোন ও বাব-মা’র সংসারে শাহিন মিয়া সবার বড়। সংসারের অভাব-অনটন দূর করতে শাহিন মিয়া সৌদি আরব পাড়ি জমান ২০১৩ সালে; নির্মাণ শ্রমিকের কাজ নিয়ে। কোম্পানির ব্যবসা খারাপ হয়ে যাওয়ায় দু’বছর কাজ করার পর ২০১৫ সালে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসেন। জমানো অর্থ ফুরিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে পারিবারিক পছন্দে ২০১৬ সালের জুন মাসে রূপাকে বিয়ে করেন কোনোরকম যৌতুক ছাড়াই। বিয়েতে রূপাকে উপহার হিসেবে দেন একজোড়া স্বর্ণের চুড়ি এবং একজোড়া কানের দুল। বিয়ের পূর্বে শাহিন মিয়া স্বপ্ন দেখতেন এমন একজনকে স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার, যে হবে সামাজিক, ধার্মিক, পরিবারের প্রতি সহনশীল, দায়িত্ব সচেতন এবং যার বয়স হবে ১৫-১৬ বছর। শাহিন মিয়ার বিয়ে সংক্রান্ত সব স্বপ্নই পূরণ হয়েছে; যদিও সাংসারিক কাজে স্ত্রীর অপরিপক্বতার বিষয়টি তার মানসিক যন্ত্রণার কারণ।

ভাইহীন বাবা-মায়ের সংসারে দুই বোন- প্রাণপ্রিয় রেহানা, রাহেলা এবং আদরের পোষা বিড়াল মন্টুকে ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় রূপার পা দুটোকে মনে হচ্ছিল ভীষণ ভারি, মাথাটা মনে হচ্ছিল শূন্য; কোনোকিছুই ভাবতে পারছিল না সে। রূপার চোখে কেবল ভেসে বেড়াচ্ছিল সহপাঠীদের প্রিয় মুখ। শ্বশুরবাড়িতে শুরুর দিকে ভয় ছিল তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। তাকে পর্যবেক্ষণ করা অগণিত চোখের মাঝে সে খুঁজে ফিরছিল একজোড়া বিশ্বস্ত চোখ, যা তাকে সান্ত্বনা দেবে এবং সাহস জোগাবে।

স্বামী শাহিন মিয়া চেষ্টা করছেন কাতার যাওয়ার। তার একান্ত ইচ্ছা- কাতার যাওয়ার পূর্বে সন্তানের বাবা হবেন। রূপার শ্বশুর-শাশুড়ির ইচ্ছাও তাই; যদিও রূপা জানে না- সবার ইচ্ছা পূরণের ঝুঁকির পরিমাণ তার জীবনের সমান, যে জীবন এখনও যাপনই করা হয়নি।

রূপা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রচুর দুর্ভাগা মেয়েদের একজন, যাদের বিয়ে হয়ে যায় ১৫ বছর বয়স হওয়ার পূর্বেই। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী দেড় কোটিরও বেশি কিশোরী বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে ৫৯ ভাগ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই (বিডিএইচএস-২০১৪০। উল্লেখ্য, আমাদের দেশে শতকরা ৩১ জন গর্ভবতীর বয়স ১৫ থেকে ৫৯ বছরের মধ্যে।

বিডিএইচএস-২০১৪ অনুযায়ী ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বিবাহিত কিশোরীদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের হার খুবই কম (৪৪%), যদিও কিশোরী নবদম্পতিদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি (১৭%)। গবেষণায় আরও দেখা যায়- বাল্যবিবাহের শিকার শতকরা ৮৬ জন কিশোরী বধূ স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং শতকরা ২১ জন কিশোরী অপরিকল্পিতভাবে গর্ভধারণ করে; যার অবধারিত ফল হল- মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি, দুর্বল স্বাস্থ্য, অপুষ্টি ও অনুৎপাদনশীলতা। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০১৬-র তথ্য অনুযায়ী দেশে বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা বা বিচ্ছিন্ন নারীর সংখ্যা ১০ শতাংশ, যা ২০১৩ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েদের একটি বড় অংশ নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ফলে তাদের জীবন বিষাদময় হয়ে ওঠে।

এই ছোট্ট দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা ১৫২.২৫ মিলিয়ন (বিপি অ্যান্ড এইচসি-২০১১)। এই বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে ৯ কোটি ৫৫ লাখ ৮৪ হাজার মানুষ কর্মক্ষম; যাদের মধ্যে ৪ কোটি ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার পুরুষ এবং ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৩৭ হাজার নারী। এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে তরুণ-তরুণীদের (বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছর) সংখ্যা ৩১%, যার মধ্যে তরুণের সংখ্যা ১ কোটি ৪১ লাখ ৪৫ হাজার এবং তরুণীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের জন্য জনমিতিক সম্ভাবনার (Demographic Windwo of opportunity) সৃষ্টি করেছে; যাকে জনমিতিক লভ্যাংশে (Demographic dividend) পরিণত করার জন্য আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, কর্মসংস্থান; বিশেষ করে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সঠিক নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য- এসব তরুণ-তরুণীর মধ্যে শতকরা ৪০ জন কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করেনি এবং শতকরা মাত্র ০.১ জন কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করেছে। আগামী ১৫ বছরে বাংলাদেশে নির্ভরশীলতা সূচক (Dependency Ratio) ২০১১-এর ৫৫ ভাগ থেকে ৪৫ ভাগে নেমে আসবে; যাতে প্রতীয়মান হয়- জনমিতিক লভ্যাংশের এ সুযোগ পরিকল্পনা মাফিক কাজে লাগাতে পারলে আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশ পর্যাপ্ত সময় ও বিনিয়োগের মাধ্যমে খুব দ্রুত এগিয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনমিতিক লভ্যাংশের এই সুযোগ আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে এবং পরবর্তীকালে আনুপাতিকহারে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমে আসবে এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে থাকবে। যদি এসব সম্ভাবনাময় কিশোর-কিশোরীর জন্য সঠিক উন্নয়ন কৌশল, কর্মপরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রণয়ন করা যায় এবং তাদের উপযোগী কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, তবেই এই জনমিতিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারব; যেমনটি হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপে। তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আমাদের প্রয়োজন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ মানব উন্নয়ন খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং এই বিনিয়োগের সুফল যাতে কিশোর-কিশোরীরা সমানভাবে পায়, তা নিশ্চিত করতে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

এজন্য প্রথমত বাল্যববিাহ রোধ করতে হবে এবং কিশোরীদের প্রজনন অধিকারসহ অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করে তাদের প্রত্যেককে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশপাশি ইতিমধ্যে যেসব কিশোরী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে; তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সেবার আওতায় রাখতে হবে- যাতে তারা উপযুক্ত হওয়ার আগে মা না হয়।

ঢাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter