নির্বাচনে নিজের তীরে নিজেই বিদ্ধ হয়েছে বিএনপি

  ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচনে নিজের তীরে নিজেই বিদ্ধ হয়েছে বিএনপি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের ভরাডুবি ঘটেছে। এখন পরাজয়ের কারণ খুঁজতে গিয়ে বিএনপি দল হিসেবে এবং ঐক্যফ্রন্ট জোট হিসেবে অন্যের দোষগুলো চিহ্নিতকরণের পাশাপাশি নিজেদের দুর্বলতাগুলো খুঁজতে শুরু করেছে।

নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি প্রদানের পর তারা আত্ম-বিশ্লেষণে ও আত্মা-অন্বেষণে ফিরে আসবে বলে আশা করছি।

নিশ্চয়ই তারা নজর দেবেন তাদের অতীত কর্মকাণ্ডের দিকে। নজর দেবেন ইউনিয়ন, থানা ও জেলা পর্যায়ের সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রতি এবং তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের দিকে। বিএনপির ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে সামগ্রিক নীরবতা রয়েছে, যদিও তাদের ফ্রন্টের ইশতেহারে এ কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।

ঐক্যফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থীদের ২৬০ জন ছিল বিএনপি থেকে। তাহলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতি নিষ্ঠাবান ছিলেন মাত্র ৪০ জন। ভোটাররা স্পষ্ট ধারণা করেছে, ২৬০ জনই সব ব্যাপারে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করবেন। অতএব মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম এবং নতুন প্রজন্মের বিশাল সংখ্যক ভোটার প্রথম থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, তারা ঐক্যফ্রন্টকে ভোট দেবে না।

বিএনপির ইশতেহারে দুর্নীতি ও দুর্নীতি উচ্ছেদের স্পষ্ট ঘোষণা ছিল না; যদি ঘোষণা থাকতও, তবু দুর্নীতির রেকর্ড ও দুর্নীতির দায়ে সাজা প্রাপ্তির ইতিহাস তাদের জন্য প্রতিকূল আবহ সৃষ্টি করে রেখেছে।

এ কারণে ভোটারের মনে এক ধরনের বিরূপ ভাব সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এমন মন্তব্যও শুনতে হয়েছে যে, বিএনপি বোধহয় যুদ্ধাপরাধী এবং দুর্নীতিবাজদের পুনর্বাসনের জন্য নির্বাচনে নেমেছে।

অপরদিকে আওয়ামী লীগের বিজয়ে তাদের ইশতেহার বিশাল ভূমিকা পালন করেছে। ৮০ পৃষ্ঠার এই ইশতেহারে ভোটারদের ভাবনার জগৎকে জাগ্রত, উন্মুখ ও চঞ্চল করেছে।

আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন, সহযোগী সংগঠন, এমনকি স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ ইশতেহারের সারসংক্ষেপ সবার হাতে তুলে দিয়েছে। মানুষ সেসবের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছে এবং সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় ব্যাপক হারে নির্বাচন ভোট দিতে এসেছে এবং মহাজোটকে ভোট দিয়েছে।

শেখ হাসিনা ব্যক্তি হিসেবে, নেত্রী হিসেবে, বঙ্গবন্ধুকন্যা হিসেবে এবং বিশ্বনন্দিত নেত্রী হিসেবে জাতির মুখ উজ্জ্বল করেছেন। তার দক্ষতা ও কারিশমা অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। তার আমলের কার্যকলাপ ও কীর্তিগুলো অনেক পূর্ব থেকে গণমাধ্যমে কিংবা দেয়াল লিখনে এসেছে।

এসব মানুষ বিশ্বাসও করেছে। বিএনপি-জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ও বিনাশী কর্মকাণ্ড এবং অপশাসন গণমাধ্যমগুলো প্রায়ই জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ফলে বয়োজ্যেষ্ঠ ও উদীয়মান ভোটারের মগজে তা স্থান করে নিয়ে একটি নেতিবাচক আবহ আগেই তৈরি হয়েছিল।

এবার ভোটারদের মধ্যে ব্যাপকসংখ্যক ছিল তরুণ। প্রথমবারের মতো ভোটার ছিল প্রায় পৌনে দুই কোটি। তারাও আস্থা স্থাপন করেছে সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রতি। জয় দেখিয়ে দিয়েছে, দেশকে নির্ধারিত সময়ের আগেই ডিজিটাল করা এবং তার ফলাফল চাকরি, উদ্যোগ ও ব্যবসায় প্রতিফলন সম্ভব। এই জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ বেকার রয়েছে এবং তারা তাদের বেকারত্বের কারণ হিসেবে অপ্রাসঙ্গিক শিক্ষাকে দায়ী করেছে। তারা আশ্বস্ত হয়েছে যে, তাদের বেকারত্ব ঘুচানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তাছাড়া নির্বাচনের পূর্বেই জানা গেছে, তরুণ ভোটাররা উন্নয়নের পক্ষে এবং তারা উন্নয়নের নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা রেখেই উন্নয়নকে বেকারত্ব দূরীকরণ, দারিদ্র্য নিরসন, দুর্নীতি, মাদকের বিস্তার ও অন্যান্য সামাজিক বৈকল্য বিতাড়নের চাবিকাঠি বিবেচনা করেছে এবং ব্যাপক হারে মহাজোটের পক্ষে ভোট দিয়েছে। নির্বাচনের পূর্বে তারা বিএনপি নেতাদের কথিত দুরভিসন্ধি, কাণ্ডারিহীনতা, দোদুল্যমানতা ও মওদুদ-ফখরুলের বাকবিতণ্ডা গভীরভাবে বিবেচনায় নিয়েছে।

শুধু তরুণ সমাজ নয়, অসহায় ও অবলা নয়, নারীরাও তাকে ব্যাপক হারে ভোট দিয়েছে; কেননা শেখ হাসিনা সর্বস্তরে নারীর ক্ষমতায়নে ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছেন।

শেখ হাসিনা ও তার জোট দেশকে অভূতপূর্ব এবং অনেকটা সর্বজনীন উন্নয়ন ও কল্যাণ উপহার দিয়েছে। দেশে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষিত হওয়ায় উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাপক হারে দেশে এসেছে; যার পরিপ্রেক্ষিতে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। প্রায় ৫ কোটি মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে এবং বিশাল জনগোষ্ঠির মৌলিক চাহিদা পূরণের পর সমাজের উচ্চস্তরে আসীনদের সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা পূরণের গতি ত্বরান্বিত হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের বিশাল অংশ জামায়াতকে প্রতিহত করার শপথে দীপ্ত ছিল। আমরা সেই ১৯৯২ সালেই জামায়াত-শিবির যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলাম।

আমরা আন্দোলন করেছি, দাবি পেশ করেছি; শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে শুধু সাহসিকতা নয়, দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তিদান ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বাকিদের প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে নির্মূলের পথ

উন্মুক্ত করেছেন। সরকারের এই মেয়াদে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বিএনপি-জামায়াতের অধীনে পালনকে মুক্তিযোদ্ধারা মৃত্যু যাতনাতুল্য ভেবেছে এবং প্রাণপণে লড়াই করে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে কাজ করেছে।

নির্বাচনের পর এবার বহু মানুষের গ্রামছাড়া, গৃহহারা, সম্পদহারা এবং জীবনহারা ও দেশান্তরী হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সেজন্য মানুষ প্রাণপণ প্রতিজ্ঞা করে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করেছে।

এসবের বিপরীতে বিএনপি আরও কিছু মারাত্মক ভুল করেছে। ২৬ জন জামায়াত প্রার্র্থীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মারকলিপি পেশ এবং মামলা দায়েরের পরও তাদের প্রার্থিতা বাতিলের আইনি ক্ষমতা ইসির ছিল না।

বিএনপি প্রকাশ্যে জামায়াতের এসব সদস্যকে আপন বলে গ্রহণ করায় মুক্তিযোদ্ধাদের মনে প্রচণ্ড ঘৃণার উদ্রেক হয়েছে এবং ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। বস্তুত বিএনপি নেতাদের এমন উলঙ্গ অবস্থানের কারণে তরুণ ভোটাররা প্রত্যক্ষ করেছেন জামায়াতের প্রতি বিএনপি কতটা নিবেদিত।

এই জামায়াতই নির্বাচনের দিন বেলা ১২টার আগেই নির্বাচন বর্জন করে মিত্রদের রাস্তায় বসিয়েছে। ভোটাররা এরই মধ্যে কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে কিংবা কেন্দ্রাভিমুখ হয়েছে।

তারা নেতাদের অনুসরণ করে ভোট বর্জন করলে প্রতিপক্ষের রোষানলে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই তারা ভোট দিয়েছে এবং সে সময় ‘ভোট না পচানো’র মনস্তত্ত্বও কাজ করেছে।

গ্রামীণ সমাজে ‘ভোট না পচানো’র কথা প্রায়ই উচ্চারিত হয়। অনেক ভোটারই যে প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে, তাকে ভোট দেন। এই মনস্তত্ত্ব এবারের নির্বাচনেও কাজ করেছে।

বিশ্বব্যাপী অনুকূল প্রচারণা ও দেশের অভ্যন্তরে সামগ্রিক পারিপার্শ্বিকতায় তারা আগেই জেনেছে, মহাজোটের বিজয় অনিবার্য।

তাই তারা বিজয়ী প্রার্থীর অনুকূলে ভোট দিয়ে ভোটদাতার হার স্ফীত করেছে; ব্যতিক্রম ইভিএমের ক্ষেত্রে। এই নতুন প্রযুক্তির গোপনীয়তার দিকটি নিয়ে ভোটার চিন্তিত ছিল। ভোটার মনে করেছে, ইভিএম ব্যবস্থায় ভোটার পরিচয় অস্পষ্ট থাকবে না এবং তারা পরাজিত প্রার্থীর জিঘাংসার শিকার হতে পারে। অতএব ভোট কেন্দ্রে অনুপস্থিত থাকাটাই তারা সঙ্গত মনে করেছে।

ভোটারের এসব বৈষয়িক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট বুঝতে ভুল করেছে বা যথাযথ কৌশল নিয়ে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা চলে, বিএনপি নিজের তীরে নিজেই বিদ্ধ হয়েছে।

অধ্যাপক ও মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×