বিনা দোষে কেন জেল খাটতে হল জাহালমকে?

  মো. এমদাদ উল্যাহ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিনা দোষে কেন জেল খাটতে হল জাহালমকে?

অবশেষে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে টাঙ্গাইলের নাগরপুরে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন জাহালম। তিনি পেশায় একজন পাটকল শ্রমিক।

তার চেহারার সঙ্গে অনেকটা মিল রয়েছে সোনালী ব্যাংকের সাড়ে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার আসামি আবু সালেকের সঙ্গে।

২০১২ সালের এপ্রিলে আবু সালেকসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা করে দুদক। জালিয়াত চক্র সোনালী ব্যাংকের ক্যান্টনমেন্ট শাখায় আবু সালেকসহ তিন জনের হিসাব থেকে ১০৬টি চেক ইস্যু করে। চেকগুলো ১৮টি ব্যাংকের ১৩টি হিসাবে ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জমা করে ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

দুদক একটি চিঠির মাধ্যমে জাহালমকে ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে নয়টায় ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হাজির হতে বলে। জাহালম তখন নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।

নির্ধারিত দিনে দুই ভাই হাজির হন দুদকের ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। জাহালম বলেছিলেন, ‘স্যার, আমি জাহালম; আবু সালেক না। আমি নির্দোষ।’ জাহালম দুদক কর্মকর্তাদের স্পষ্ট করে জানান, সোনালী ব্যাংকে তার কোনো হিসাব বা লেনদেন নেই। তিনি সামান্য বাংলা জানেন। ইংরেজিতে স্বাক্ষরও করতে পারেন না। আবু সালেক নামে ব্যাংকের হিসাবটিও তার না। হিসাব খোলার ফরমে আবু সালেকের যে ছবি, তা-ও তার নয়।

সেদিন দুদকে উপস্থিত বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা সবাই জাহালমকেই ‘আবু সালেক’ বলে শনাক্ত করেন। দুদকে হাজিরা দিয়ে জাহালম চলে যান নরসিংদীর জুট মিলের কর্মস্থলে। দুই বছর পর ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশালের মিল থেকে জাহালমকে আটক করা হয়।

পুলিশের কাছেও আকুতি করে কোনো লাভ হয়নি জাহালমের। তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। জাহালমের বাবার নাম ইউসুফ আলী। মা মনোয়ারা বেগম। গ্রাম ধুবড়িয়া, ইউনিয়ন সাকিন নাগরপুর। জেলা টাঙ্গাইল। শুধু একজন অপরাধীর সঙ্গে চেহারার মিল থাকায় তাকে জেলে যেতে হয়েছে।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬ এর বিচারকের উদ্দেশে তাকে বারবার বলতে দেখা যায়, ‘স্যার, আমি জাহালম। আমি আবু সালেক না, আমি নির্দোষ।’ কিন্তু তার কথায় কেউ কর্ণপাত করেনি। জাহালমের জন্য আদালতের বারান্দায় ঘুরে ঘুরে হতাশ হয়ে পড়েন তার ভাই শাহানুর মিয়া। কারাগার থেকে বের হওয়ার কোনো লক্ষণই দেখেননি জাহালম। ফলে তিনি হতাশায় নিমজ্জিত হন।

এক পর্যায়ে গত বছরের প্রথম দিকে শাহানুর মিয়া কয়েকজনের পরামর্শে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে গিয়ে ঘটনার বিস্তারিত বলেন। এরপর অনুসন্ধানে নামে মানবাধিকার কমিশন। ওই বছরের ২২ এপ্রিল কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে জাহালমের সঙ্গে কথা বলেন কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে বেরিয়ে আসে, আবু সালেক আর জাহালম একই ব্যক্তি নন। এ কথা ঢাকার আদালতকেও জানায় কমিশন। কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মামলার অন্যতম আসামি নজরুল ইসলাম ওরফে সাগরের সঙ্গেও কাশিমপুর কারাগার পরিদর্শনকালে কমিশনের কথা হয়। তিনি ২০১০ সাল থেকে আবু সালেকের সঙ্গে ব্যবসা করছেন।

দুদক তদন্ত করে সেই আবু সালেকের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা পায়। তার বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়া ইউনিয়নের সিঙ্গিয়া গ্রাম। তার বাবার নাম আবদুল কুদ্দুস। তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাস। এক সময় জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটা এন্ট্রির কাজ করতেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি ব্যাংক জালিয়াতি করেছেন। কয়েক বছর আগে সালেক ঠাকুরগাঁও শহরে ৫ শতক জমি কেনেন। জমি এবং দোকান আছে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায়ও।

নিরীহ জাহালমের আকুতি নিয়ে গত ৩০ জানুয়ারি বুধবার সংবাদ প্রকাশ করে প্রথম সারির একটি দৈনিক। সংবাদে স্বপ্রণোদিত হয়ে আদালত গত ৩ ফেব্রুয়ারি রোববার নিরীহ ও নিরপরাধ জাহালমকে সব মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়। আদেশটি রাতে কারাগারে পৌঁছলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তি দেয়া হয়।

কারাগার থেকে বের হয়ে জাহালম বলেন, ‘কখনও বিশ্বাস করতে পারিনি ছাড়া পাব। বিনা দোষে জেল খাটতে হল। এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’ জাহালম আরও বলেন, ‘আমি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমি এর ক্ষতিপূরণ চাই। আমি চাকরি চাই। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের বিচার চাই। আমাকে মুক্তি দেয়ায় আদালতকে ধন্যবাদ জানাই। মুক্তি পেয়ে আমার খুব ভালো লাগছে।’

অবস্থাদৃষ্টে বোঝা যাচ্ছে, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মানুষের সুন্দর জীবনযাপনে বাধা দেয়। জাহালমের ক্ষেত্রে সৃষ্ট অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় তার পরিবারে চলছে হাহাকার, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

যুগে যুগে জাহালমরাই হয়রানির শিকার হচ্ছে আর ফায়দা লুটছে প্রভাবশালীরা। এর অবসান হওয়া দরকার। আমরা মনে করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশাসন কাজ করলে নিরীহ মানুষ নানা দুর্ভোগ ও হয়রানি থেকে মুক্তি পাবে।

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : ভুল আসামি জাহালম

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×