এ সভ্যতা পরিত্যাজ্য

  মুস্তাফিজ শিহাব ২০ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এ সভ্যতা পরিত্যাজ্য

সভ্যতার ক্রমবিকাশে বর্তমানে আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে প্রগতির চূড়ায় অবস্থান করছি। এই সভ্যতা আমাদের অনেক কিছুই দিয়েছে কিন্তু ছিনিয়ে নিয়েছে সব থেকে প্রয়োজনীয় দুটি উপাদান- শান্তি ও নিরাপত্তা।

কয়েকটি পরিবার, গোত্র, দেশ ও দেশগুলোর শিল্প-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি সব কিছুর সমন্বয়ে তৈরি হয় সভ্যতা। সভ্যতার ক্রমবর্ধমান বিকাশে এই একটি জিনিসই বরাবর হয়ে এসেছে। ছোট্ট পরিবার থেকে শুরু করে বিশাল সভ্যতা পর্যন্ত মানুষের প্রথম চাহিদা কিন্তু সেই দুটিই থাকে, শান্তি ও নিরাপত্তা। যখনই কোনো সভ্যতা এই দুটি চাহিদা পূরণে অপারগ হয়, তখনই ওই সভ্যতার ধ্বংস নেমে আসে।

বর্তমানে পৃথিবীময় চলছে ‘ইহুদি খ্রিস্টান যান্ত্রিক বস্তুবাদী সভ্যতা’; যে সভ্যতায় শান্তি ও নিরাপত্তার অভাব স্পষ্ট। একের পর এক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, যেগুলোর মাধ্যমে বিষয়টি অধিকতর স্পষ্ট হয়। দেশে দেশে লেগে রয়েছে যুদ্ধবিগ্রহ। ন্যায়-অন্যায়ের বালাই নেই, আইনের প্রয়োগ নেই। এখানে শক্তিই সব, ‘Might is Right’। যে যেভাবে পারছে নিজেদের স্বার্থোদ্ধারের জন্য শক্তির প্রয়োগ ঘটাচ্ছে।

এভাবে চলতে থাকলে কোনো সভ্যতাই টিকে থাকতে পারে না। একাধারে ইরাক-সিরিয়া-লেবানন-আফগানিস্তান-সোমালিয়া-আরাকানে চলছে যুদ্ধাবস্থা। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও সহিংসতায় প্রতিটি দেশ হয়ে উঠেছে জ্বলন্ত কয়লার স্তূপ। নির্বিচারে গণহত্যা চলছে, ধর্ষিত হচ্ছে কোটি কোটি নারী, বিতাড়িত হচ্ছে লাখো মানুষ। কিন্তু এর পেছনে কারণ হল ইহুদি-খ্রিস্টান সভ্যতার কর্ণধার পশ্চিমাদের ভূরাজনৈতিক লীলাখেলা।

তেলের জন্য, বন্দরের জন্য, সামরিক সুবিধার জন্য, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য, প্রভাব বিস্তারের জন্য সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা পরাশক্তি একের পর এক যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করে যাচ্ছে, যা আমাদের সবার সামনেই স্পষ্ট। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েও এত শরণার্থী দেশ ত্যাগ করেনি; যত শরণার্থী সাম্রাজ্যবাদীদের সন্ত্রাসবাদী আচরণের জন্য হয়েছে।

তাদের এই অতিমাত্রায় শোষণের কারণেই সভ্যতা তার মূলরূপ থেকে বিকৃত হয়ে গেছে এবং ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। পুরো মানবজাতি আজ ত্রাহি সুরে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যই আর্তচিৎকার করছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বিষয়টি অধিক স্পষ্ট হয়। রোমান-পারস্য সভ্যতা যখন আজকের পাশ্চাত্য যান্ত্রিক সভ্যতার মতো ক্ষয়িষ্ণু, পতনোন্মুখ হয়ে পড়েছিল; তখনই উন্মেষ ঘটে মুসলিম সভ্যতার। মুসলিম সভ্যতা ‘শান্তি ও নিরাপত্তা’ অধিক হারে নিশ্চিত করতে পেরেছিল। এ কারণে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে পৃথিবীতে গ্রহণযোগ্য ও উন্নত সভ্যতা বলতেই ছিল মুসলিম সভ্যতা।

বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত প্রগতি মুসলিম সভ্যতারও অনন্য কৃতিত্ব ছিল, তবে একমাত্র সম্বল নয়। মুসলিম সভ্যতার শেকড় প্রোথিত ছিল আল্লাহর হুকুম অর্থাৎ ন্যায় ও সত্যের ভেতরে। ভারতবর্ষের কথাও যদি চিন্তা করি, তবে যুগ পরিবর্তনের মূল কারণই ছিল এই শান্তি ও নিরাপত্তা।

মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নন্দ বংশের রাজা ধনানন্দকে পরাজিত করে মৌর্য সাম্রাজ্যের ভিত্তি গড়েন। সেই ধনানন্দের পরাজয়ের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল তার বিদ্রোহী জনতা; যারা অত্যাচারী রাজার শোষণে, নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। অশান্তি ও অনিরাপদ অবস্থা তাদের বিদ্রোহে বাধ্য করে এবং চন্দ্রগুপ্তকে তারা সহজেই গ্রহণ করতে পারে।

হ্যাঁ, এই সভ্যতা আমাদের থেকে শান্তি ও নিরাপত্তা ছিনিয়ে নিলেও অনেক কিছুই দিয়েছে। বর্তমান ইহুদি-খ্রিস্টান বস্তুবাদী সভ্যতার মূল প্রোথিত আছে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায়।

প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা থেকেই পরবর্তীকালে রোমান-পারস্য সভ্যতা, মিসরীয় সভ্যতা, মুসলিম সভ্যতা ও বর্তমান ইহুদি-খ্রিস্টান সভ্যতা। তবে পাশ্চাত্য সভ্যতার পূর্বে মুসলিম সভ্যতা প্রযুক্তির যে উন্মেষ ঘটিয়েছিল, তার ওপর ভিত্তি করেই বতর্মান পাশ্চাত্য সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে। আবার এ সভ্যতার প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে হয়তো গড়ে উঠবে অন্য কোনো সভ্যতা।

সভ্যতার এই ভাঙাগড়ায় প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের চেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে শান্তি ও নিরাপত্তার জায়গাটি, যেই জায়গায় আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসন এবং সাম্প্রদায়িক মনোভাব যে হারে প্রকট হচ্ছে, তাতে এ সভ্যতা ধ্বংস হতে বেশি দেরি নেই; একটি বিশ্বযুদ্ধই যথেষ্ট। হ্যাঁ, এ আত্মাহীন, জড়বাদী, বস্তুবাদী সভ্যতা ধ্বংস হবে এ বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

প্রশ্ন হল, তার সঙ্গে আমরাও ধ্বংস হয়ে যাব; নাকি তার আগেই ডুবন্ত জাহাজ থেকে নিজেদের রক্ষার উপায় অন্বেষণ করব? আজকে যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলে হামলার ঘটনা কিংবা নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলার ঘটনাটাই বোধোদয় হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয় কি? পরম শান্তি ও নিরাপত্তার দেশ হিসেবে খ্যাত নিউজিল্যান্ডে এমন ঘটনা ঘটার পর আমরা কি ধরে নিতে পারি না- এই সভ্যতা পৃথিবীর কোনো স্থানকেই শান্তি ও নিরাপত্তার চাদরে ঢাকতে পারেনি? এরপরও আমরা যদি উটপাখির মতো মাথা গুঁজে বসে থাকি, তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

সংবাদকর্মী, ঢাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×