হাওরবান্ধব বাজেট প্রণয়ন সময়ের দাবি

  সানজিদা খান রিপা ২৬ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হাওরবান্ধব বাজেট প্রণয়ন সময়ের দাবি
ফাইল ফটো

১৩ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেছেন। জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাজেট; অথচ এই বাজেট কী এ সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই অধিকাংশ হাওরবাসী প্রান্তিক মানুষের।

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আটটি জেলার প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে হাওরাঞ্চল, যেখানে বাস করে প্রায় দুই কোটি মানুষ। এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ কাঠামোগত দারিদ্র্য ও প্রান্তিকতার শিকার।

দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে। সমগ্র হাওরাঞ্চলে বাঙালি ছাড়াও বসবাস করে বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ; যেমন- হাজং, গারো, বর্মন, খাসিয়া, মণিপুরী, কোচ, বানাই ইত্যাদি।

হাওর এলাকা বছরে ৭-৮ মাস পানির নিচে তলিয়ে থাকে। তখন হাওরবাসী টুকটাক মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। হাওরে একবারই ফসল হয়। সেই ফসলেই চলে হাওরবাসীর সংসারের খরচ, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, বিয়েশাদি, উৎসব ইত্যাদি।

একটা সময় ছিল, যখন হাওরে দেশি জাতের ধানের চাষ করা হতো; বোরো ধানের আবাদ হতো না। কিন্তু দেশি জাতের ধানের ফলন কম হওয়ায় কৃষকরা ধীরে ধীরে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ধান আবাদ শুরু করে। ব্রি ২৮ জাতের ধান হাওর এলাকার জন্য উপযোগী। বোরো ধান ঘরে তুলতে হাওরবাসীদের অনেক সময় পুরো মে মাস লেগে যায়। অনেক সময় চৈত্র মাসে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে হাওরে বন্যা দেখা দেয়।এসব বিবেচনায় হাওরের কৃষিকে টেকসই করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

২০১৭ সালের অতিবৃষ্টি এবং পার্শ্ববর্তী মেঘালয় অঞ্চলের পাহাড়ি ঢলের তোড়ে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে প্রায় শতভাগ ফসলহানি ঘটে। জাতীয় পর্যায়ে এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। চালের দাম একলাফে অনেক বেড়ে গিয়েছিল।

হাওরে বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতে সীমাহীন দুর্নীতি, সময়মতো বাঁধ নির্মিত না হওয়া, নদী খনন না করা ইত্যাদি কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এত বেশি হয়েছিল বলে মনে করেন এলাকার জনগণ। স্থানীয় সুশীল সমাজ, কৃষক, জেলে তথা জাতীয় পর্যায়ের নাগরিক সমাজের সবাই উল্লেখিত বিষয়গুলো সামনে এনে হাওরবাসীর দুর্ভোগ সরকারের কাছে তুলে ধরতে সোচ্চার ছিলেন এবং এখনও আছেন।

সরকার বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও নিয়েছিল দুর্নীতি লাঘবে। নতুন ‘কাবিটা’ নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করেছে সরকার। জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের জন্য স্থানীয়দের অর্ন্তভুক্ত করে পিআইসি গঠন করা হয়েছে।

কিন্তু তারপরও বলতে চাই, হাওরের মূল সমস্যা সমাধানে ব্যাপারে এখনও হাত দেয়া হয়নি। হাওরের প্রকৃতি-প্রতিবেশ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো নয়। তাই এখানে যে উদ্যোগই গ্রহণ করা হোক না কেন, তা এ অঞ্চলের প্রতিবেশকে পরিকল্পনায় রেখে করতে হবে।

বছরের বেশিরভাগ সময়ে হাওরাঞ্চলে পানি থাকায় এখানকার মানুষ অর্থ উপার্জনমূলক কোনো কাজে যুক্ত থাকতে না পেরে বাধ্য হয়ে বেকার থাকে। ফলে এ অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার অনেক বেশি। এক ফসলের ওপর নির্ভরশীলতা হাওরের খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে, যা পাহাড়ি ঢল সৃষ্ট বন্যা বা দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে আরও তীব্র হয়। তাছাড়া ইজারাদাররা সাধারণ দরিদ্র জেলেদের হাওরে মাছ ধরতে বাধা দেয়।

বর্ষা মৌসুমে নিজ বাড়ির পাশের পানিতেও তারা মাছ ধরতে পারেন না। পাহারাদাররা দেখতে পেলে তাদের জাল কেড়ে নিয়ে যায়। ইজারা নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই হাওরের প্রকৃত মৎস্যজীবীদের। তাই হাওরের ওপর দরিদ্র জেলেদের কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই। আর্থিকভাবে সচ্ছল ইজারাদাররা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ও ঘুষ দিয়ে কমমূল্যে হাওর ইজারা নিয়ে নেয়।

এছাড়া বছরের বিশেষ বিশেষ সময়ে হাওরে সরকারিভাবে মাছ ধরার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। নিষেধাজ্ঞা থাকাকালীন জেলেদের যথাযথ ক্ষতিপূরণও দেয়া হয় না। এই নিষেধাজ্ঞা হাওরে দরিদ্র জেলেদের প্রবেশাধিকারকে বাধাগ্রস্ত করে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত হিমাগারের অভাবে ও আর্থিক সংকটের কারণে মাছ পরিবহনের খরচ বহন করতে না পেরে সাধারণ জেলেরা মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কম দামে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হয়।

হাওরের অর্থনীতির মূল উপাদান ধান ও মাছ। এ অঞ্চলের প্রায় ৫৪% মানুষ জীবিকার জন্য কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে জিডিপিতে ২ শতাংশ যুক্ত হয়, তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কী ভাবছে আর এই উন্নয়নের প্রকৃত রূপরেখাই বা কী? বাজেটে তাদের জন্য বরাদ্দই বা কতটুকু? বরাদ্দের খাতগুলোই বা কী ধরনের? বরাদ্দ অনুযায়ী সঠিক ব্যবহারের পরিকল্পনা ও তদারকির ব্যবস্থা কতটুকু গ্রহণ করা হয়েছে? যোগাযোগ খাতে উন্নয়নের নামে সড়ক নির্মাণ কিংবা কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে শিল্পায়নের মাধ্যমে হাওরবাসী তথা এ অঞ্চলের প্রতিবেশ-পরিবেশ সুরক্ষায় সত্যিকারের উন্নয়ন কখনও কি সম্ভব?

হাওরের জন্য হাওরবান্ধব বাজেট চান হাওরবাসীরা; যে বাজেটে হাওরের প্রাণ-প্রতিবেশ এবং হাওরবাসীর জীবন-জীবিকার সুরক্ষা থাকবে, হাওরের ওপর হাওরবাসীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় হাওর ব্যবস্থাপনার জন্য বরাদ্দ থাকবে, হাওরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সুরক্ষা ও বিকাশের সুযোগ থাকবে, হাওরের মৎস্যজীবীদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকবে, নারী-পুরুষ সব হাওরবাসীর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে প্রযুক্তিগত সুযোগ থাকবে, দুর্যোগ প্রতিরোধে কৃষকদের জন্য কৃষি ঋণসহ অন্যান্য সেবা খাতে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা এবং হাওরে দেশি মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়ক হবে- এমন একটি পরিপূর্ণ বাজেট চান হাওরসহ দেশের সব মানুষ।

এএলআরডি

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×