কোটা পদ্ধতির সংস্কার জরুরি

  জহিরুল শামীম ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কয়েকদিন ধরে দেশের শিক্ষিত ও বঞ্চিত তরুণ সমাজ কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। আন্দোলনে সাধারণ ছাত্রদের জনস্রোত ও বক্তব্য শুনলেই বোঝা যায়- দীর্ঘদিনের চাপা কষ্ট আর ক্ষোভ তারা প্রকাশ করছেন। তারা চান, যৌক্তিক প্রমাণ করে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ন্যায্য দাবি তুলে ধরতে। তাদের আন্দোলন দেখে মনে হয়, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের যে মূল চেতনা শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্তি, তা তাদের রক্তে বয়ে চলেছে। হয়তো তারা রক্তে আগুন ধরা জ্বালাময়ী ৭ মার্চের ভাষণ পাবে না। পাবে না ৬ দফার স্রষ্টার মতো কোনো মহান নেতা। তবে ইতিহাস থেকে তারা এ শিক্ষা পাবে যে, যুবকরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে কোনো যৌক্তিক আন্দোলনে পরাজিত হয়নি; জয়ী হয়েছে।

আমরা এখন দেখব- কোটা পদ্ধতি কতটা যৌক্তিক। আমাদের সংবিধানের ২৮(১)-এ বলা আছে, রাষ্ট্র কারও প্রতি বৈষম্য করবে না। ২৯(১)-এ বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রে কর্মে নিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিক সমান। এতে বোঝা যায়, কোনো কোটা থাকা উচিত না। কিন্তু ২৯(৩)এর(ক)-তে আছে, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করার জন্য তাদের জন্য বিশেষ বিধান থাকবে। এতে আমরা রাষ্ট্রে কোটা ব্যবস্থা থাকার সাংবিধানিক যৌক্তিকতা দেখতে পাই। তবে তা শুধু অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য।

এখন প্রশ্ন হল, অনগ্রসর কারা? প্রতিবন্ধীরা অনগ্রসর। উপজাতি শ্রেণী ভৌগোলিক ও ভাষার কারণে অনেক পিছিয়ে। পিছিয়ে রয়েছে আমাদের দেশের ছিন্নমূল মানুষ। আছেন চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এমন মানুষজন। হ্যাঁ, যদি আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ পিছিয়ে পড়া হিসেবে বিবেচিত হন, তাহলে তিনি কোটার সুবিধা পাওয়ার অধিক হকদার। আবার কোটাধারীদের মধ্যে কেউ যদি উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য হন বা এদের কেউ বা কোনো শ্রেণী যদি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে আসেন, তাহলে তারা কোটার সুবিধা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার হারাবেন।

মেয়েরা একসময় পিছিয়ে ছিল। কয়েক বছরে দেখা যায়, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ছেলেদের চেয়ে মেয়ে পরীক্ষার্থী বেশি। সবক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। সুতরাং এখন নারীদের জন্য কোটা প্রযোজ্য কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার। জেলা কোটার অযৌক্তিকতা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা অনেক আগেই মতপ্রকাশ করেছেন।

মনে রাখতে হবে, কোটা কারও জন্য পুরস্কার নয়। পুরস্কারের জন্য রয়েছে রাষ্ট্রপতি পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অন্যান্য পুরস্কার। এর চেয়ে বড় পুরস্কার হল মানুষের মনের কোঠায় ভালোবাসার জায়গা করে নেয়া। সর্বদা তাদের অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে তাদের আদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করা। সুতরাং যদি পুরস্কার হিসেবে কাউকে কোনো কোটা দেয়া হয়, তাহলে তা হবে সংবিধানবহির্ভূত ও মানবাধিকারবিরোধী।

কাউকে যদি একবার কোনো সুবিধা দেয়া হয়, সেটা যতই অযৌক্তিক বা সংবিধানবিরোধী হোক না কেন, তা তারা ছাড়তে চাইবে না; বরং সে সুবিধা পাওয়ার জন্য যে কোনো পন্থা অবলম্বন করবে। প্রয়োজনে টাকা দিয়ে সনদ কিনে নেবে।

আমরা একটি দুর্ভাগা জাতি। এ দেশ স্বাধীন করার জন্য যিনি পাকিস্তানিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নেতৃত্ব দিয়েছেন, পেয়েছেন একটি ভূখণ্ড। একটি মানচিত্র। সেই ভূমিই তার রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। যারা এ দেশ স্বাধীন করার জন্য বাড়িঘর ছেড়েছেন, তাদের প্রাপ্য মর্যাদাটুকু আমরা দিতে পারিনি। কলঙ্কিত করেছি তাদের সঙ্গে একঝাঁক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা যোগ করে। সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, সনদধারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। খবরে জানতে পারলাম, আরও প্রায় দেড় লাখ আবেদন জমা পড়েছে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নতুন করে নাম তোলার জন্য।

যদি মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি, নারীদের উপবৃত্তি আরও বৃদ্ধি করা হয়, তবু দেশের মানুষ কিছুই বলবে না বরং সাধুবাদ জানাবে। কিন্তু আমাদের এই ছোট্ট জনবহুল উন্নয়নশীল দেশে ৫৬% কোটা রেখে মেধাবীদের বঞ্চিত করা বড্ড বেমানান।

সুতরাং সুখী সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলা গড়তে মেধাকে মূল্যায়ন করে কোটা পদ্ধতির সংস্কার জরুরি। প্রায় ছাব্বিশ লাখ বেকারের এই দেশে মেধাবীদের হতাশ না করে তাদের দেশ গড়ার কাজে সুযোগ দিলে আমরা একটি সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা উপহার পাব।

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×