পাহাড়ে নজর দিন

  নজরুল খান ০৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড়ে নজর দিন
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের মোট আয়তনের ১২ শতাংশ পাহাড়ি এলাকা। মোট ১৬ লাখ হেক্টর জমিজুড়ে রয়েছে পাহাড়ি ভূমি। দেশের সব পাহাড়, এমনকি সমগ্র বাংলাদেশই পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত। সমুদ্র বা মহাসমুদ্রের তলদেশ ভূমিকম্প বা অন্য কোনো ভূ-আন্দোলনের ফলে উপরিভাগে উঠে এসে এ ভূখণ্ড গঠন করেছে।

ভূতাত্ত্বিক গঠন প্রক্রিয়া অনুসারে বাংলাদেশের পাহাড়গুলো তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত- ১. টিপসুরমা ২. ডুপিটিলা এবং ৩. ডিহিং। অতি উচ্চ ও অতি খাড়া পাহাড়গুলো টিপসুরমার অন্তর্গত। ডুপিটিলা ও ডিহিং যথাক্রমে মধ্যম এবং কম উচ্চতাসম্পন্ন। বেলে পাথর, কর্দম পাথর আর সাধারণ বালি দ্বারা গঠিত আমাদের দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাংশের পাহাড়গুলো। বেলে পাথর ও বালি সমৃদ্ধ পাহাড়গুলো অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ। মৃত্তিকার দৃঢ়তা ও পারস্পরিক বন্ধন এখানে তুলনামূলকভাবে দুর্বল। তা ছাড়া এসব গাহাড়ের উত্থান হাজার হাজার বছর আগে। অতিবৃষ্টি ছাড়াও মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে এসব পাহাড়ে প্রতিনিয়ত ভূমিধস হয়ে থাকে। কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ফিলিপাইনসহ অন্যান্য দেশে প্রায়ই এ ধরনের ভূমিধসের ঘটনা ঘটে থাকে।

মহাকালব্যাপী ক্রমাগত বৃষ্টির পানি পাহাড়ের ছোট বড় ফাটল দিয়ে চোয়ানোর ফলে শিলার পারস্পরিক বন্ধন ও দৃঢ়তা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া পাহাড় সৃষ্টির পর থেকেই শিলাক্ষয় ও চ্যুতি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া- ফলে কালের ব্যবধানে শিলার সংযুক্তি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে, যা ক্রমাগত চলতেই থাকবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, অপরিকল্পিত পাহাড় ব্যবহারে এ কাজটি ত্বরান্বিত হয়ে থাকে। পৃথিবীর অনেক বড় বড় শহরের অবস্থান পর্বতশীর্ষে। সেখানে বড় আকারের ভূমিধসের ঘটনা খুবই কম।

আমাদের পাহাড়ি এলাকাও ব্যবহার করতে হবে পাহাড়ের গঠন প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরিকল্পিত উপায়ে। দেশে জনসংখ্যা অত্যধিক। জমির স্বল্পতা এতটাই প্রকট, প্রান্তিক মানুষদের কৃষিজমি দূরে থাক, মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকু পর্যন্ত নেই। তাই সীমিত আকারে হলেও পাহাড়ি ভূমি ব্যবহারের বিকল্প নেই। তবে পাহাড়ের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘিœত না করে পরিকল্পিত উপায়ে পাহাড়ি অঞ্চল ব্যবহার করতে হবে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক সম্পদ তথা বৃক্ষরাজি, লতাগুল্ম, জীবজন্তু, পক্ষীকুল ইত্যাদির ভারসাম্য অক্ষুণœ রেখে পাহাড় ব্যবস্থাপনায় ব্রতী হতে হবে।

পাহাড়ে মানবজাতির বৈচিত্র্যময়তার সাক্ষী বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে। গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ যেন তাদের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যতায় ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বস্তুত সব ধরনের অবকাঠামোই এখানে গড়ে তোলা সম্ভব। তবে তা হতে হবে অত্যন্ত পরিকল্পিত। কিছু কিছু পাহাড় আছে, যেখানে অপ্রয়োজনীয় বৃক্ষ তথা বনজ গাছ-গাছড়ায় ভরপুর। সেসব পাহাড়ে আপেল, আঙ্গুর, বেদানা, নাশপতি ইত্যাদির আবাদ করা যেতে পারে। আশপাশের কিছু দেশে এসব ফলের আবাদ হচ্ছে। বাংলাদেশের জলবায়ু ও ভূমির বৈশিষ্ট্য এবং গুণাগুণও প্রায় একই রকমের। তাই এখানে এগুলো চাষাবাদের পরিকল্পনা হাতে নেয়া যায়।

আমাদের পাহাড়ি অঞ্চল বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। এ সম্পদ রক্ষায় রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশের অত্যন্ত নিকটবর্তী দার্জিলিং ও গেংটক শহর দুটি পাহাড়ের একেবারে শীর্ষে অবস্থিত। সেখানে পাহাড় ধসের কথা শোনা যায়নি, যদিও গঠনশৈলীর দিক থেকে সেগুলো আমাদের পাহাড়গুলোর মতোই। অস্বাভাবিক কিছু ঘটার পেছনে অস্বাভাবিক কিছু কারণ থাকে। এ বছর দীর্ঘ সময়ব্যাপী ভারি বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাহাড় ধস তরান্বিত হয়েছে। পাহাড় ধসের শিকার হয়ে যেসব মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের কারও বাড়িঘরই পাহাড়ের শীর্ষে ছিল না; এগুলো ছিল পাহাড়ের একেবারে পাদদেশে বা ঈষৎ ঢালুতে। উপর থেকে মৃত্তিকা বা প্রস্তরখণ্ড তাদের আবাস্থলে ধসে পড়ায় প্রাণহানি ঘটে। পাহাড়ে স্বল্প পরিসরে হলেও অনেক সমতল ভূমি রয়েছে। সেসব স্থানে পরিকল্পিতভাবে বসতি স্থানান্তর করা যায়। এ ছাড়া শীর্ষ সমতলের টিলাগুলোও বসতি স্থাপন অধিক নিরাপদ।

বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে স্বল্প ও মাঝারি মাত্রার অনেক ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। তন্মধ্যে কতকগুলোর কেন্দ্রবিন্দু ছিল পাহাড়ি এলাকা সংলগ্ন। ভূ-আন্দোলনের ফলে পাহাড়ের মধ্যস্থ আন্তঃশিলা স্তরের সংযুক্তি ও বন্ধন দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। অস্বাভাবিক ভারি বৃষ্টিপাত, দানবীয় পদ্ধতিতে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, নিয়ম ব্যতিরেকে অবকাঠামো তৈরি ইত্যাদি পাহাড়ে বিপর্যয় ডেকে আনছে। একমাত্র বৃষ্টিপাত ছাড়া বাকিগুলো নিয়ন্ত্রণযোগ্য। এখন শুধু দরকার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও আইনের সঠিক প্রয়োগ। তবে এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব ও কর্তব্য সর্বাধিক। ভূমি ও ভূমি ব্যবহার বিশেষজ্ঞ, ঢাকা

[email protected]

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.