প্রবীণদের জন্য সড়ক পারাপার ব্যবস্থা সহজ করুন

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রোজী ফেরদৌস

বসুন্ধরা ও যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকাটি বর্তমানে লোকে লোকারণ্য থাকে। প্রধান সড়কে যানবাহনের চাপও অত্যধিক। নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষ ছাড়াও স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী এ পথ দিয়ে যাতায়াত করেন। চলাচল করেন এলাকাবাসী।

সর্বোপরি, যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বিশাল শপিং সেন্টারে কেনাকাটাসহ ভারতীয় ভিসা প্রত্যাশীদের উপচে পড়া ভিড় সব সময় চোখে পড়ে। শপিং সেন্টার ও এলাকার আশপাশে বহু চাকরিজীবীর বাস।

তাছাড়া এই বিশাল প্রাঙ্গণে আছে দুটি নামি মিডিয়া সেন্টার- এদের একটি দৈনিক যুগান্তর; অপরটি যমুনা টেলিভিশন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা হলেও সেখানে এখন বহু নামি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

এসব চাকরিজীবীর ৯০ শতাংশই মধ্যবিত্ত শ্রেণির। চলাচলের জন্য গণপরিবহনই ভরসা। সামর্থ্য অনুযায়ী অনেকেই বেছে নিচ্ছেন ‘ও ভাই’ প্রাইভেট মোটরসাইকেল; সিএনজি অটোরিকশা কিংবা ‘উবার’। যারা মালিবাগ, মৌচাক, রামপুরা বনশ্রী থেকে আসেন, তাদের এসে নামতে হয় নতুন তৈরি ফুটওভার ব্রিজের কাছে। কিশোর তরুণ ও যুবকরা যেমন এই ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করেন, তেমনি মধ্যবয়স্ক, বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রবীণদেরও এপার-ওপার করতে হয় এই ফুটওভার ব্রিজ পাড়ি দিয়ে।

বাস্তবতা হল, আজকাল বেশিরভাগ মধ্য বয়স্ক নরনারী বা প্রবীণদের পায়ে বা হাঁটুতে থাকে সমস্যা। হাড়ের জয়েন্টে থাকে প্রচণ্ড ব্যথা। স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারলেও সিঁড়ি টপকাতে তাদের প্রচণ্ড কষ্ট সহ্য করতে হয়।

এক্ষেত্রে অনেকের হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাছাড়া খাড়া ফুটওভার ব্রিজে উঠতে পারেন না হবু মা ও তিন চার বছরের শিশুরা। অন্যদিকে সেখানে এত ঠাসাঠাসি ভিড় থাকে যে, তাতে যাতায়াত সমস্যা দ্বিগুণ হয়। অনেক তরুণী অভিযোগ করেছেন, ফুটওভার ব্রিজে চলাচলের সময় বখাটেরা তাদের শরীরে এসে ধাক্কা মারে। কেউ কেউ বলছেন, ভিড়ের চাপে এই ফুটওভার ব্রিজটি ভেঙে পড়তে পারে।

অনেক শিশু-কিশোর, কিশোরী-তরুণী বয়স্ক মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে যমুনা ফিউচার পার্কে কেনাকাটা করতে আসেন; যারা হাঁটু-কোমরের ব্যথাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। ফলে তাদের নির্বিঘ্ন চলাচলের ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ফুটওভার ব্রিজ। আশার কথা, দু’দিন হল বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যাতায়াতের জন্য ‘প্রতিবন্ধক বেড়া’ তথা রেলিং অনেকটা সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

এতে মানুষের, বিশেষ করে প্রবীণদের অনেক উপকার হয়েছে। এজন্য কর্তাব্যক্তিদের ধন্যবাদ। তবে কুড়িল চৌরাস্তার আগে আরও একটি স্থানে অন্তত একটি রেলিং সরিয়ে ফেললে অনেক উপকার হবে।

বিদেশে রাস্তা পারাপারের জন্য জেব্রাক্রসিংয়ে দণ্ডায়মান খুঁটিতে একটি নির্দেশনা দেয়া থাকে। মানুষ যখন রাস্তা পারাপার হয় তখন ‘ওয়াক’ বা হাঁটার দৃশ্য লাল রংয়ে ফুটে ওঠে। সঙ্গে বাজে ক্রিং ক্রিং শব্দ। এসময় দুই পাশের যানবাহন একেবারে থেমে যায়। এক বা দুই মিনিট পর সেই ক্রিং ক্রিং শব্দ ও হাঁটার দৃশ্য বন্ধ হয়ে যায়। তখন চলাচল শুরু হয় যানবাহনের।

আমাদের মেয়র সাহেব বা কর্তাব্যক্তিরা বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তারা খুব ভালোভাবেই এসব দৃশ্য দেখেছেন ও জানেন- দু’তিন কিলোমিটার থেকে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার সড়কে উঁচু রেলিং দিয়ে পথচারীদের আটকে রাখা মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করারও শামিল। রাজধানীর যেসব সড়ক মানুষের বসবাসস্থল, সেখানে যাতায়াতের জন্য সড়কে ফুটওভার ব্রিজের পাশাপাশি দেশের বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য জেব্রাক্রসিংয়ের ব্যবস্থা জরুরিভাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আমাদের এক তরুণ তাজা প্রাণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী নিষ্ঠুর দুই বাসচালকের রেষারেষির শিকার হয়ে চলে গেছেন পরপারে। তার পরিবার-স্বজনদের সঙ্গে আমরাও তার অকাল-প্রয়াণ শোকে কাতর।

কর্তৃপক্ষ ওই স্থানে একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করে যেমন ভালো কাজ করেছেন; তেমনি তাদের কাছে এ যমুনা ফিউচার পার্ক-বসুন্ধরা এলাকায় চলাচলকারী প্রবীণদের পক্ষ থেকে অনুরোধ- ফুটওভার ব্রিজটিতে এস্কেলেটর সংযুক্ত করে জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের উপকার করুন। হাজার হাজার এমন মানুষের ওপর রয়েছে পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব।

সে কারণে তাদের চাকরি বা ব্যবসা ‘বেঁচে থাকা’র মতোই অতি প্রয়োজনীয়। এসব বিবেচনায় দ্রুত ফুটওভার ব্রিজে এস্কেলেটর ও নির্দিষ্ট দূরত্বে রাস্তার মাঝখানের রেলিং অপসারণ করে ক্রিং ক্রিং ধ্বনিসহ জেব্রাক্রসিংয়ের ব্যবস্থা করুন।

এমন তো নয় যে, এ রাস্তার পুরোটাই স্টিলের প্রাচীরে ঘেরা। বাড্ডা পোস্ট অফিস গলির দশ-বারো গজ দূরেই পারাপারের জন্য রাস্তার রেলিং সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কুড়িল চৌরাস্তার সম্মুখের প্রাচীরও খোলা। রামপুরা উলন রোডের সামনের রাস্তাও বেশ খানিকটা খোলা। এ স্বল্প পরিসর দিয়েই দু’পারের সাধারণ মানুষ যাতায়াত করে থাকেন। এ নগরীতে বহু রাস্তায় যেমন গ্রিনরোডের দু’পাশে বিভাজকের ওপর দুই ফুট উচ্চতার বড় ফাঁকা ফাঁকা রড বসানো রয়েছে, যেন রিকশা বা সাইকেল যেতে না পরে।

এক সময় প্রবীণ বা বয়োজ্যেষ্ঠদের চলাচল বা চিকিৎসা সুবিধা এতসব নিয়ে ভাবা হতো না। এখন দিন পাল্টেছে, যুগ পাল্টেছে। ডিজিটাল যুগ চলছে। আধুনিক মনমানসিকতা নিয়ে তাই জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

মনে রাখতে হবে, তারাই প্রতিটি পরিবারের সন্তানকে যথাযথ শিক্ষায় মানুষ করে তুলেছেন। সেসব সন্তানই আজ দেশের নেতা-উপনেতা, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং তাদের আনন্দ-বেদনার সরব সাক্ষীও এ প্রবীণরাই। ধনী-নির্ধনের পার্থক্য ভুলে প্রবীণ নাগরিকদের মর্মবেদনা অনুধাবনের কর্তব্য অবশ্যই দায়িত্বশীলদের।

সাংবাদিক, ঢাকা