১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস

ডায়াবেটিসকে নয় ভয়, সচেতনতার হোক জয়

  খন রঞ্জন রায় ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডায়াবেটিসকে নয় ভয়, সচেতনতার হোক জয়

প্রাচীনকাল থেকে ‘মধুমেহ’ নামে শরীরের উপসর্গটিই হচ্ছে হাল আমলের বিশ্বব্যাপী মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী ‘ডায়াবেটিস’ বা বহুমূত্র রোগ। প্রধান উপসর্গ মূত্রাধিক্য। মূত্র বেশি হলে স্বভাবতাই শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। ফলাফল অতিতৃষ্ণা।

ডাক্তারি ভাষায় শরীরবৃত্তিয় এই ঘটনাগুলো মেলিটাস, ইনসিপিডাস, এডিএইচ, অ্যান্টিভাইইউরেটিক হরমোনের ক্রিয়াকলাপের ফল হিসেবেই ‘ডায়াবেটিস’। মানবদেহযন্ত্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ লিভার বা যকৃত। এর নিচের দিকে অগ্ন্যাশয় নামে একটি প্রত্যঙ্গ আছে।

ওখান থেকে এক ধরনের রস নির্গত হয়ে গ্রহণকৃত খাবারকে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরে শক্তি উৎপাদন করে। পরিষ্কার করে বললে অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত রসের নামে ইনসুলিন। এটি একটি হরমোন। এর সহায়তায় মানবদেহের কোষগুলো রক্ত থেকে শর্করা বা গ্লুকোজ বা চিনিজাতীয় শক্তি শোষণ করে। দেহ চলাচল উপযোগী হয়। অগ্ন্যাশয় যদি পরিমাণ মতো যথেষ্ট অগ্নিরস বা ইনসুলিন উৎপন্ন করতে না পারে; তবে রক্তে শর্করা বা চিনির আধিক্য দেখা দেয়। মানবশরীরযন্ত্রে সুনির্দিষ্ট মাত্রার অধিক চিনির উপস্থিতিই ‘ডায়াবেটিস’।

অগ্ন্যাশয়ের অগ্নিরস বা ইনসুলিন নিঃসৃত তারতম্যের কারণে ডায়াবেটিসকে দু’ভাগে বিভক্ত করা যায়। একটি ডায়াবেটিস মেলিটাস; অন্যটি ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস। এই দুই ডায়াবেটিসের ক্রিয়াকলাপ বিপরীতমুখী। পরেরটিই মূত্রাধিক্যের কারণ। তবে বিশ্বব্যাপী প্রথমটি বা ডায়াবেটিস মেলাটাসের প্রকোপ অনেক বেশি। চিকিৎসা সহায়তা ও মাত্রানির্ভরতার উপর ভর করে ডায়াবেটিস মেলাটাইসকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। টাইপ-১ ও টাইপ-২।

টাইপ-১ রোগে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন নিঃসরণকারী কোষগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে ধীরে ধীরে শরীরের প্রয়োজনীয় মাত্রার ইনসুলিন উৎপাদন কমতে থাকে। রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে কৃত্রিম ইনসুলিন ইনজেকশন আকারে শরীরে প্রবাহিত করতে হয়। একে অটোইমিউন বলা হয়।

জন্মগত হরমোন তারতম্যের কারণে সাধারণত শিশু-তরুণদের মধ্যে এ শ্রেণির ‘মধুমেহ’ অধিক হয় এবং জন্ম থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যেই তা ধরা পড়ে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস মূলত ইনস্যুলিন রেজিস্ট্যান্স। এ ধরনের রোগে নিঃসৃত অগ্নিরস যথাযথভাবে শরীর শোষণ করতে পারে না। উদ্বৃত্ত থেকে যায়।

ফলে শরীরে সুগারের মাত্রা বেড়ে যায়। প্রাথমিক অবস্থায় কায়িক শ্রম, ব্যায়াম এবং খাদ্যবিধির উপর নির্ভর করে একে মোকাবেলা করা যায়। সাধারণত ৪০ বছরের পর এ ধরনের বহুমূত্রের আক্রমণ শুরু হয়। তবে স্বল্প ক্ষেত্রে শিশু ও তরুণদেরও হতে পারে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডায়াবেটিস রোগীর ৯০ শতাংশই হল টাইপ-২। এর সুনির্দিষ্ট কারণও রয়েছে। বিশ্বব্যাপী মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা যন্ত্রনির্ভর হয়েছে। শারীরিক শ্রম কমে গেছে। ডায়াবেটিসকে উস্কে দেয় এমন খাবার সহজলভ্য হয়েছে। মিষ্টি ও মিষ্টি জাতীয় খাবারের দোকানে এখন অলিগলি, ঘাট, ফুটপাত সয়লাব হয়েছে। কেনার সামর্থ্য বাড়াটাও অন্যতম প্রধান কারণ।

ডায়াবেটিস রোগের প্রধান উপসর্গ যেহেতু অতিশয় দুর্বলতা, সার্বক্ষণিক ক্ষুধা, অধিক তৃষ্ণা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি; ফলে খাবারের প্রতি অধিক আগ্রহ হওয়াটাও স্বাভাবিক। খাদ্য গ্রহণে সচেতনতা, জীবনধারার পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম; সর্বোপরি রোগ সম্বন্ধে পর্যাপ্ত ধারণা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের শ্রেষ্ঠ উপায়। উদ্বেগজনক হল, দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষই জানেনই না যে, তিনি সারা জীবনের জন্য বয়ে বেড়াচ্ছেন মৃত্যুঝুঁকির ‘ডায়াবেটিস’।

তবে দুর্ভাগ্য এই যে, যারা জানেন, তিনি নিজে এই রোগে আক্রান্ত, তাদের মধ্যে ৫৭ শতাংশকে রোগের সঠিক জ্ঞান ও সুচিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। সারা বিশ্বে প্রতিবছর ১০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে শুধু ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অজ্ঞানতার জন্য।

বিভিন্ন মাত্রার ডায়াবেটিসের জন্য উপসর্গ মোতাবেক চিকিৎসকরা বিশেষ দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। কায়িক শ্রম, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন, পরিমিত সহনীয় মাত্রার খাওয়ার ওষুধ দিয়ে ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা উচিত।

ইনসুলিন আবিষ্কারের আগে সারা পৃথিবীতে হাজার হাজার মানুষ হতাশার সঙ্গে আক্ষেপ নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে। বর্তমানে মহামারীর আকার ধারণ করা এই রোগের শিকার হয়েও ইনসুলিনের কল্যাণে মানুষ সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন উপভোগ করছে।

রোগাক্রান্ত হয়েও নির্ভয়-নির্বিঘ্ন জীবনযাপনের নির্ভরতার প্রতীক ইনসুলিনের আবিষ্কারক ফেডরিক বেনটিং-এর জন্মদিন ১৪ নভেম্বর। তার স্মৃতিরক্ষার পাশপাশি বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯১ সাল থেকে এ দিন বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস পালনের নির্দেশনা দেয়।

সুনির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নিয়ে সারা পৃথিবীর স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ, সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করে থাকে এই দিবস। ডায়াবেটিস প্রতিরোধের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন জনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্য শতভাগ পূর্ণতা পাক, ডায়াবেটিস পরাভূত হোক, ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে লড়াই সফল হোক- এ প্রত্যাশায় পালিত হবে এবারের বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস।

উন্নয়ন কর্মী

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×