নৌপথে সমস্যা আছে সমাধান নেই

  মুহাম্মদ শফিকুর রহমান ০১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যাত্রীবাহী নৌযান ঝড়, বন্যা বা অন্য কোনো কারণে দুর্ঘটনাকবলিত হতে পারে। এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমাদের সঠিক পদক্ষেপের অভাবে যদি দুর্ঘটনা ঘটে, তাজা প্রাণ হারায়; তাহলে সেটা মেনে নেয়া কঠিন। সেটা অস্বাভাবিক।

সম্প্রতি বুড়িগঙ্গায় একটি ছোট লঞ্চ (টেডি লঞ্চ) ডুবে গেছে। মারা গেছে প্রায় ত্রিশ জন। অন্য একটি লঞ্চ ছোট লঞ্চটিকে সরাসরি আঘাত করে। সিসি টিভি ফুটেজে এমনটাই দেখা গেছে। ভাগ্য ভালো, এই দুর্ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। অন্য সব দুর্ঘটনা রেকর্ডই হয় না। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ কী, তা কম সময়ই আমরা জানতে পারি। আবার যারা দুর্ঘটনা ঘটায়, তাদের উপযুক্ত বিচার হয় না। মামলা হলে কিছুদিন জেল খেটে বেরিয়ে যায়।

বুড়িগঙ্গায় এ সময়ে লঞ্চ ডুবার কথা নয়। ঝড়, বন্যা কিছুই নেই। এটা নিছক হত্যাকাণ্ড বলে অনেকের ধারণা। কারণ, বড় যে লঞ্চটি আঘাত করেছে; সেটি দূর থেকেই ছোট লঞ্চটিকে দেখেছে। তখন স্পিড কমানো হল না কেন? ওই জায়গায় এমন বেপরোয়াভাবে লঞ্চ চালানোর কোনো যুক্তি ছিল না। অবশ্য বেপরোয়া লঞ্চ চালনা, একটির গায়ে ওপরটি উঠে যাওয়া, মাঝ নদীতে ধাক্কাধাক্কি করা, বিপজ্জনক প্রতিযোগিতা ইত্যাদি নতুন কিছু নয়।

বুড়িগঙ্গায় বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য খেয়াঘাট। ছোট ছোট নৌকা খেয়া পার করে। দিন-রাত সব সময়। এদের কারণে নৌযান চলাচল ব্যাহত হয়। বরিশালে যে বড় লঞ্চগুলো যায়, সেগুলো দু’শ থেকে আড়াইশ’ ফুট লম্বা। ইচ্ছে করলে হুট করে বাসের মতো ব্রেক কষে লঞ্চ থামানো যায় না।

হুট করে নৌকা চলে এলে তখন সমস্যা হয়। বাল্কহেড (বালুবাহী জাহাজ) রাতে চলাচল করা নিষেধ। তবুও অবাধে চলাচল করছে। এগুলো দূর থেকে দেখে চেনা যায় না। এগুলোতে সিগন্যাল বাতি থাকে না। অধিকাংশ অংশ পানিতে ডুবে থাকে। ফলে অন্য নৌযানের সঙ্গে এর দুর্ঘটনা ঘটে। এভাবে অনেকবারই বিভিন্ন নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাল্কহেড বন্ধে প্রশাসন নীরব। কারণ, এখানে অবৈধ ‘ইনকামের’ সুযোগ বিদ্যমান। মাঝে মাঝে লোকদেখানো অভিযান চালানো হয়। তবে সব সময় নয়। বাল্কহেডের সংঙ্গে সংঘর্ষ হয়ে বড় নৌযান ভয়াবহ দুর্ঘটনাকবলিত হতে পারে। তখন আমাদের তাকিয়ে দেখা ছাড়া উপায় নেই। আমাদের সব উদ্ধারকারী জাহাজ মিলে বড় লঞ্চ টেনে তুলতে পারবে না। একশ’-দেড়শ’ ফুট লম্বা লঞ্চ, যার ওজন নিদেনপক্ষে একশ’ টন; সেটা পানির নিচ থেকে তোলার সক্ষমতা আমাদের নেই।

ভারি নৌযান তোলার সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারে বহু আলোচনা হয়েছে, বহু কথা হয়েছে। দুঃখজনক হল, বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘বৃদ্ধ’ হামজার আয়ু শেষ। যাত্রীবাহী, মালবাহী যত নৌযান গত এক দশকে ডুবেছে; তার আশি ভাগই আমরা তুলতে পারিনি।

ডুবন্ত নৌযান অন্য নৌযানগুলোর চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি করছে। এমনও হয়েছে- ডুবন্ত নৌযানের কারণে বিভিন্ন চ্যানেলে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। নদী খননের কথা না হয় নাই বললাম। চরম ঝুঁকি নিয়ে বরিশালের লঞ্চগুলো যাতায়াত করে। নদী খননের নামে বরাদ্দ হয়। তবে কাজ কতটুকু হয়, তা কারও অজানা নয়।

দুর্ঘটনা ঘটলে মৃতদের পরিবারকে টাকা দেয়া হয়। ভালো কথা; এই টাকায় দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেজন্য আগে কেন খরচ করা হয় না? ডুবে যাওয়া ছোট লঞ্চটির ফিটনেস ছিল কিনা, সন্দেহ আছে। বড় নদীতে এত ছোট লঞ্চ চলার অনুমতি কেন দেয়া হল- এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

কঠিন সত্য হল, নৌ সেক্টরে কোথায় কী কী সমস্যা- সেটা কারও অজানা নয়। অনেক কমিটি, অনেক সুপারিশ জমা পড়ে আছে; কিন্তু কাজ হচ্ছে না। সুপারিশের কাগজে ধুলো জমে গেছে। কেন এসব বাস্তবায়ন হয়নি, তা দেখার কেউ নেই। দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হলে আমরা নড়েচড়ে বসি।

তদন্ত কমিটি গঠনের তোড়জোড় চলে- এই তো! বর্ষা মৌসুম এখন। নদী উত্তাল হবে। মেঘনায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে। তাই এখনই আমাদের নৌ সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ শুরু করতে হবে। যদি না আমরা আর কোনো মায়ের বুক খালি করতে না চাই তাহলে কালক্ষেপণের সুযোগ নেই।

বানারীপাড়া, বরিশাল

[email protected]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত