পরিকল্পিত পরিবার নিশ্চিত করবে নিরাপদ বিশ্ব

  খন রঞ্জন রায় ০৮ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই বিশ্বের জনসংখ্যা পাঁচশ’ কোটি পূর্ণ হওয়ার পর ৯০ দেশের সরকারি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি সভায় চূড়ান্ত হয় বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালনের বিষয়টি।

ইউএনডিপির গভর্ন্যান্স কাউন্সিল কর্তৃক উত্থাপিত প্রস্তাব জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অতি আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে। এরপর থেকে জনসংখ্যা সমস্যার গুরুত্ব ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন চিন্তা করে প্রতিবছর সুনির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নির্ধারণের মাধ্যমে ১৯৯০ সাল থেকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। এ বছর বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘মহামারী কোভিড-১৯-কে প্রতিরোধ করি, নারী ও কিশোরীর সুস্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করি।’

১০০০ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা ছিল ৪০ কোটি। ৭৫০ বছরে তা দ্বিগুণ হয়। এরপর থেকে জনসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। ১০০ বছরে দ্বিগুণ, পরে ৫০ বছরে, বর্তমানে মাত্র ৪০ বছরে দ্বি-গুণিতক হারে জনসংখ্যা বাড়ছে। জনবিস্ফোরণের অবস্থা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে এ সর্বংসহা ধরণী। বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে গড়ে যুক্ত হচ্ছে ২.৬ জন শিশু।

উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এ সংখ্যা অনেক বেশি। ব্রাজিল, চিলি, কিউবা, ইরান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় সন্তান জন্মদানের বিষয়টিকে আলাদা অনুভূতির মধ্যে রাখায় ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল নানামাত্রিক হিসাব-নিকাশ করে এক পরিসংখ্যানে জানিয়েছে, বাংলাদেশে জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে আমরা প্রায় ২৩ কোটির ঘর অতিক্রম করব।

অবশ্য আমরা একা নই; আমাদের প্রতিবেশীরাও জনসংখ্যার হার বৃদ্ধির হিসাবে বেশ তালেগোলে আছে। বলা হচ্ছে, এ সময়কালে জনসংখ্যার হিসাবে ভারত হবে পৃথিবীর এক নম্বর রাষ্ট্র। বর্তমানের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীন পিছিয়ে পড়বে, থাকবে দ্বিতীয় স্থানে।

আশার কথা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কিছুটা হলেও ব্যতিক্রমধর্মী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। দেশে ১৯৭০ সাল থেকে প্রজনন হার কমতে থাকার বিপরীতে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে। সক্ষম দম্পতির মধ্যেও অপেক্ষাকৃত ধীরগতির সন্তান উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখতে পেরেছে। মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার সুফলভোগীদের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম।

পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য কার্যক্রমে জোরালো ভূমিকা রাখায় বাংলাদেশ এসব বিষয় আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে উল্লেখযোগ্যভাবে সক্ষম হওয়ায় ২০১০ সালেই মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে।

তবে জনসংখ্যা সমস্যা শুধু বাংলাদেশের একক বিষয় নয়; এরসঙ্গে বিশ্বায়নের বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমান হিসাবে জন্মহার চলতে থাকলে ২০৫০ সালে পৃথিবী প্রায় এক হাজার কোটি মানুষের পদভারে ভারাক্রান্ত হবে। পৃথিবীর ভৌগোলিক আকার কিন্তু বাড়েনি; বরং কমেছে। গাদাগাদি করে বাসস্থানের ব্যবস্থা করলেও প্রভাব পড়বে মোট সম্পদের ওপর।

সীমিত সম্পদের সুষম বণ্টন হলেও তা হ্রাস পাবে। কিছু কিছু তো ইতোমধ্যে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। বড় বিপর্যয় হচ্ছে বিশ্ব উষ্ণায়ন, গ্রিনহাউস এফেক্ট ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রে। প্রকৃতিকে বাঁচানোর জন্য যতই তোড়জোড় হোক, জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাক; মানুষের খাদ্য চাহিদার জোগান দিতে গিয়ে প্রকৃতি কিন্তু ক্রমেই রুদ্রমূর্তি ধারণ করছে। বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে।

খাদ্য চাহিদা ও জীবনযাত্রার মান পর্যায়ক্রমে ক্রমাবনতির ফলে মানুষ শহরমুখী হবে। বলা হয়, ২০৫০ সালে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ শহরের বাসিন্দা হবে। মাত্র ১০০ বছর আগে উনিশ শতকে সারা পৃথিবীতে মাত্র ১২টি শহর ছিল; যেখানে প্রতিটিতে বসবাস করত গড়ে ১০ লাখ মানুষ। বর্তমানে ৪০০টির বেশি শহর রয়েছে; যেখানে গড়পড়তা ১০ লাখ মানুষ বসবাস করে।

প্রতিটিতে ১ কোটিরও অধিক মানুষ তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে অত্যন্ত কায়ক্লেশে চলছে, এমন শহর আছে ১৯টি। অথচ আঠার শতকে মাত্র ৩ শতাংশ মানুষ শহরের কৃত্রিম হাওয়া-বাতাস-পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের মতো জটিল প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতো।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় এবং শহরকেন্দ্রিক জনস্রোত বৃদ্ধি পাওয়ায় সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। সীমিত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় যতটুকু অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে, তা পর্যাপ্ত নয়।

পরিবেশ দূষণ হচ্ছে অহরহ, যততত্র। মানুষ অসুস্থ হচ্ছে, অপুষ্টিতে ভুগছে, মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে আর এবং এর ফলে পুরো সমাজের ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব।

দেশ, রাষ্ট্র আর ধরণীর অন্যতম মূল উপাদান হল জনসংখ্যা। এ জনসংখ্যাকে পরিকল্পিতভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পৃথিবীর মোট সম্পদ যেহেতু বাড়ছে না; বরং কমছে, তাই মানবজাতির সার্বিক কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা উচিত। পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষকে রক্ষা করতে হলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে।

উন্নয়ন কর্মী

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত