কেমন আছেন করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যরা

  ডা. জাহীর আল-আমিন ০৮ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত ও ধনী দেশে পরিণত করার স্বপ্ন দেখছেন।

সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে তার পরিকল্পনা ও গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে একটি সমৃদ্ধশালী উন্নত বাংলাদেশ হওয়ার পথে। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রার গল্প এখন আলোচিত।

বাংলাদেশকে অনুসরণ করে অনেক স্বল্পোন্নত দেশ এখন এগিয়ে যাওয়ার সাহস খোঁজে। দেশ উন্নত হতে থাকলে উন্নত হতে হয় সেই দেশের পুলিশ বাহিনীকেও। কেননা, জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশকেই সবার আগে মাঠে নামতে হয়। কাজ করতে হয় মানুষের সবচেয়ে কাছে থেকে। উন্নত দেশের উপযোগী উন্নত পুলিশ বাহিনী গড়তে বাংলাদেশ পুলিশ থেমে নেই।

প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পরিবর্তনের মাধ্যমে পুলিশকে উন্নত দেশের উপযোগী বাহিনী হিসেবে পরিণত করা হবে। উন্নত দেশের পুলিশ হতে হলে পুলিশের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে। মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা নয়, মানবিক আচরণ করতে হবে- সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এসব কথাই বলছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের আইজি ড. বেনজীর আহমেদ।

আমাদের দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। দেশ করোনা আক্রান্ত হওয়ার শুরু থেকেই বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের জন্য কোনো ধরনের সুরক্ষাসামগ্রী হাতে না পেয়েও মানুষের সুরক্ষার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেয়া, অসহায় মানুষকে খোঁজ করে তাদের পাশে সরকারি ও ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা নিয়ে দাঁড়ান- এ মানবিক পুলিশের ছবি বাংলাদেশের মানুষ আজীবন বুকে জড়িয়ে রাখবে।

সব ধরনের ভয়ভীতি তুচ্ছ করে পুলিশ বাহিনী যেমন মানবিকতার পরিচয় দিয়ে জনগণের পাশে থেকেছে; তেমনি বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য আক্রান্তও হয়েছেন প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে। পুলিশের দু’লাখ সদস্যের প্রত্যেকের জন্য এখন পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী রয়েছে; কিন্তু ইতোমধ্যে করোনায় প্রাণ দিয়েছেন ৪৪ জন পুলিশ সদস্য। আক্রান্ত হয়েছেন ১১ হাজার ৪৩১ জন।

যখন পুরো দেশ থেকেই বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর আসছিল; তখন রাজারবাগের কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের বিছানা সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫০, যা মাত্র দু’সপ্তাহ সময়ের মধ্যে ৫০০ বিছানার হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদারতায় দেশের স্বনামধন্য ও আধুনিক ইমপালস হাসপাতালকে শুধু পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সেবা করার জন্য চুক্তিবদ্ধ করা হয়। মাত্র ১২ দিনের মধ্যে পুলিশ হাসপাতালে পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও কিছু স্কুল, কলেজ ও হোটেল ভাড়া নিয়ে আইসোলেশন সেন্টারে রূপান্তর করা হয়েছে।

গত ৯ মে থেকে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বেসরকারি ইমপালস হাসপাতাল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা শুরু করেছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেয়া দেরিতে শুরু করলেও ইমপালস হাসপাতাল নিজেদের খুব দ্রুতই গুছিয়ে নিতে পেরেছিল। প্রথমেই তারা পিপিই, মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, আই প্রটেক্টর ও স্যানিটাইজারসহ সব সুরক্ষাসামগ্রী প্রত্যেক স্টাফের জন্য নিশ্চিত করেন।

সরকার যখন হাসপাতালটিকে কোভিড-১৯ হাসপাতাল করার জন্য ঘোষণা দিয়েছিল, তখন কিছু নার্স চাকরি ছেড়ে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৪৮ জন নার্সকে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছেন। এ পর্যন্ত ইমপালস হাসপাতালে ৯৮৬ জন কোভিড আক্রান্ত পুলিশ সদস্য ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।

ইতোমধ্যে ৭৮৫ জন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে গেছেন। আইসিইউ ও এইচডিইউ সেবা নিয়েছেন ২০১ জন। এরই মধ্যে ১৫৭ জন সংকটাপন্ন অবস্থা কাটিয়ে কেবিনে স্থানান্তরিত হয়েছেন এবং ৩৭ জন রোগী তুলনামূলক ভালো অবস্থায় এইচডিইউতে ডাক্তারদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।

অত্যন্ত সংকটাপন্ন থাকায় ১৭ পুলিশ সদস্যের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ পুলিশের যোগ্য নেতৃত্ব ও আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিতে সময়োপযোগী সিদ্ধান্তগুলো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের ব্যাপক প্রাণহানি থেকে রক্ষা করেছে। পুলিশ সদস্যরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন এবং মৃত্যুর হার কমছে।

আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ এরই মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন; অনেকে আবার কাজে যোগ দিয়েছেন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে জাতীয় পর্যায়ে মৃত্যুর হার যেখানে ১ দশমিক ৩ ভাগ, পুলিশ সদস্যদের মৃত্যুর হার সেখানে মাত্র দশমিক ৪ ভাগ।

এ প্রেক্ষাপটে পুলিশ প্রধান ড. বেনজীর আহমেদের প্রশংসা প্রাপ্য। কেননা, তিনি শুধু আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসাই নিশ্চিত করেননি, চিকিৎসার পাশাপাশি যেসব পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হননি এবং নির্ভয়ে এ মহামারী মোকাবেলায় দিনরাত কাজ করছেন; তাদের তিনি প্যানডেমিক পুলিশিং শেখাচ্ছেন।

ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে কর্মরত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তাদের দেশের প্যানডেমিক পুলিশিং গাইডলাইন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশের গাইডলাইন সংগ্রহ করে বাংলাদেশ পুলিশের উপযোগী ‘প্যানডেমিক পুলিশিং স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি)’ তৈরি করেছেন, যেন বাংলাদেশের প্রত্যেক পুলিশ সদস্য জানতে পারেন- মহামারী সময়ে একজন পুলিশ সদস্যের পেশাগত দায়িত্ব কী হবে?

আমরা জানি, শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। নানা ধরনের সংকটের মধ্যেও তারা দিনরাত এক করে মানুষের পাশে দাঁড়ান।

১৬ কোটির অধিক মানুষের দেশে আমাদের মাত্র ২ লাখের কিছু বেশি পুলিশ সদস্য আছে। আমরা জানি, তাদের কঠিন জীবনকে সহজ ও আধুনিক করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করেছে। দেশের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এমন পদক্ষেপ আরও বাড়ুক; শক্ত হোক আমাদের মানবিক পুলিশ বাহিনীর হাত।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইমপালস হাসপাতাল

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত