প্রোটিনে মোড়ানো এক টুকরো দুঃসংবাদ

  ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন ০৮ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নভেল করোনাভাইরাস। চোখে দেখার বস্তু নয়। অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও তাকে দেখা যায় না। একে দেখা যায় ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে। এ জন্যই অনেকেরই জানার কৌতূহল হয়- এ ভাইরাসটি আসলে কতটা ক্ষুদ্রাকার।

করোনাভাইরাস এক ধরনের বৃত্তাকার ভাইরাস, যার ব্যাস ১২৫ ন্যানোমিটার। এর প্রোটিন আবরণের ব্যাস ৮৫ ন্যানোমিটার এবং এর স্পাইকগুলো ২০ ন্যানোমিটার লম্বা। প্রতিটি করোনাভাইরাসে গড়পড়তায় ৭৪টি স্পাইক থাকে।

অতি আণুবীক্ষণিক ভাইরাসের আকৃতি ব্যাখ্যা করতে ন্যানোমিটার বলতে যে একক ব্যবহার করা হয়েছে, তা সর্বজন বোধগম্য নাও হতে পারে। তাই ন্যানোমিটার বিষয়ে হালকা আলোকপাত করা দরকার বলে মনে করছি।

এক মিলিমিটারের এক হাজার ভাগের এক ভাগ হচ্ছে এক মাইক্রোমিটার এবং এক মাইক্রোমিটারের এক হাজার ভাগের এক ভাগ হল এক ন্যানোমিটার। আমরা খালি চোখে ১০০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত বস্তুকে দেখতে পাই।

যেমন, ঘরের ভেতর সূক্ষ্ম আলোক রশ্মি পড়লে আমরা অনেক ধূলিকণা, বায়ুবাহিত বিভিন্ন উপাদান দেখতে পাই। উল্লেখ্য, উদ্ভিদ ও প্রাণীতে রোগ সৃষ্টিকারী প্রায় সব ব্যাক্টেরিয়াই এর চেয়ে ক্ষুদ্রাকার। ব্যাক্টেরিওলজির গবেষণায় তাই আবিষ্কার হয়েছে অণুবীক্ষণ যন্ত্র।

তবে ভাইরাসের অঙ্গসংস্থানগত গবেষণায় ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ লাগলেও তার উপস্থিতি এবং শনাক্তকরণের জন্য বিভিন্ন জৈব-রাসায়নিক পরীক্ষা করা হয়। এখন আমরা সহজেই অনুমান করতে পারছি, কত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শত্রুর বিরুদ্ধে আমরা সারা পৃথিবীর মানুষ লড়ে চলেছি। এত শক্তিধর বস্তুকে শত্রু বললেও জীবাণু বলা যাচ্ছে না। এটি স্বাধীনভাবে বংশ বৃদ্ধি করতে পারে না। কেননা, এটির গঠন কোষীয় উপাদানে সমৃদ্ধ নয়। ভাইরাসের কেন্দ্রে থাকে ডিএনএ অথবা আরএনএ উপাদান এবং বাইরে থাকে প্রোটিনের একটি আবরণ। নভেল করোনাভাইরাস একটি আরএনএ ভাইরাস।

জীব ও জড়ের মাঝামাঝি এই ছোট্ট অণুজীবের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিশিষ্ট জীববিজ্ঞানী স্যার পিটার মেড্যাওয়ার বলেছেন- ‘এ পিচ অব স্যাড নিউজ র‌্যাপড আপ ইন প্রোটিন।’ অর্থাৎ ভাইরাসটি হচ্ছে প্রোটিনে মোড়ানো এক টুকরো দুঃসংবাদ।

করোনাভাইরাস নিয়ে আমার এ তাত্ত্বিক উপস্থাপনা জীববিজ্ঞানের ছোট একটি ক্লাসের বিষয়বস্তু মনে হতে পারে। তবে করোনাভাইরাস নিয়ে একটু ধারণা ব্যক্ত করলাম এ জন্যই- আমাদের সমাজে অদেখা এ বিষয়টিকে রীতিমতো অবিশ্বাস করছেন অনেকে। এরা উদাসীন। অশিক্ষিত উদাসীন যেমন আছে; তেমনি আছে শিক্ষিত উদাসীন। শিক্ষিত উদাসীনদের আমরা বেশি বেশি তথ্য দিয়ে আরও সচেতন করতে পারি।

নিজে এবং পরিবারকে নিরাপদ রাখতে ঘরে আবদ্ধ থাকা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কোভিড-১৯ প্রতিরোধের একটি অন্যতম পদ্ধতি। কিন্তু জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এটি মানছে না।

সরকার বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে আমাদের উদাসীনতার মধ্যে আরও আশঙ্কার খবর দিল সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। খবরে জানা যায়, করোনাভাইরাস বাতাসে ভেসে বেড়ায় ৩০ মিনিট এবং ছড়াতে পারে ১৪ ফুট।

কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যবিদদের দেয়া করোনাভাইরাস বিষয়ক নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার যে বক্তব্য ছিল, সেটিও এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। গবেষকরা আরও জানতে পেরেছেন, শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে নির্গত হওয়ার পর ভাইরাসটি কঠিন পৃষ্ঠে কয়েকদিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে এবং স্পর্শের মাধ্যমে অন্যের শরীরে চলে যেতে পারে। এর পর কেউ সেই পৃষ্ঠে অবচেতনভাবে হাত রাখার পর নিজের নাক, মুখ ও চোখ স্পর্শ করলে তারও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

তবে ভাইরাসটি কতক্ষণ সক্রিয় থাকবে, তা নির্ভর করছে পৃষ্ঠের ধরন ও তাপমাত্রার ওপর। প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভাইরাসটি কাচ, কাপড়, ধাতু, প্লাস্টিক ও কাগজের ওপর দুই থেকে তিন দিন টিকে থাকতে পারে।

চীনের হুনান প্রদেশের সরকারি গবেষকদের এ গবেষণার ফল পূর্বে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যবিদদের দেয়া মানুষ থেকে মানুষের নিরাপদ দূরত্বে (তিন থেকে ছয় ফুট) থাকার পরামর্শকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। গবেষণাপত্রে গবেষকরা আরও লিখেছেন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আবদ্ধ পরিবেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সক্রিয়তা দূরত্ব সাধারণ স্বীকৃত নিরাপদ দূরত্বকে ছাড়িয়ে যাবে বলে নিশ্চিত করা যায়।

তাহলে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস কক্ষে বা বাসে সামাজিক দূরত্ব বলে কিছু থাকল কি? ধরুন, ঘণ্টায় ৮০ কিমি. বেগে একটি ট্রেন হঠাৎ থামল, তাহলে ওই বগির সামনের লোকটির শ্বাস-প্রশ্বাসের জলীয় কণা পদার্থের স্থিতি জড়তার কারণে মুহূর্তে বগির পেছনে বসা লোকটির শ্বাসের গণ্ডিতে চলে আসবে। মনে পড়ছে, বাংলাদেশে প্রথম অসুস্থ তিনজনের একজন ছিলেন ইতালিফেরত।

তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যেখানে ছিলাম সেখানে কেউ করোনা আক্রান্ত ছিল না। তবে আমি যে এরোপ্লেনে এসেছি সেখানে দু’ব্যক্তি কয়েকবার হাঁচি দিয়েছিল।’

আবার গবেষণার ফলাফলের দিকে ফিরে যাই। গবেষণা থেকে আরও জানা যায়, মানুষের মল বা শারীরবৃত্তীয় তরলে করোনাভাইরাস পাঁচ দিনেরও বেশি টিকে থাকতে পারে। ভাইরাসটি থেকে রক্ষা পেতে ঘনঘন হাত ধোয়া ও মাস্ক পরার কোনো বিকল্প নেই বলেও সতর্ক করেছেন তারা।

গবেষকরা বলেছেন, করোনাভাইরাসের উপস্থিতি থাকলেও যাদের মধ্যে ১২ দিন পর্যন্ত কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না; তাদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম। তবে তখনও তারা ভাইরাসটির বাহক হিসেবে কাজ করবে এবং তাদের কাছ থেকে অন্যরা আক্রান্ত হতে পারে।

গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, যারা ভাইরাসটির সম্ভাব্য বাহক, তাদের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিক আর না দিক; তারা যাতে ১৪ দিন স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিনে থাকে। এর উদ্দেশ্য হল- যাতে তাদের মাধ্যমে অন্য কেউ আক্রান্ত হতে না পারে। অ্যানালস অব ইন্টারনাল মেডিসিন নামে একটি বিখ্যাত চিকিৎসাবিষয়ক জার্নালে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী দাপিয়ে বেড়ানো করোনাভাইরাস নিয়ে অনেকেরই একটা সাধারণ প্রশ্ন- এ ভাইরাস কি আগেও ছিল? ১৯৬০-এর দশকে প্রথম এ ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়। প্রথমদিকে মুরগির মধ্যে সংক্রামক ব্রঙ্কাইটিস ভাইরাস হিসেবে দেখা যায়। পরে সাধারণ সর্দি-হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে এ রকম দু’ধরনের ভাইরাস পাওয়া যায়।

মানুষের মধ্যে পাওয়া ভাইরাস দুটি মনুষ্য করোনাভাইরাস-২২৯ ই এবং মনুষ্য করোনাভাইরাস ওসি-৪৩ নামে নামকরণ করা হয়। তবে অনেকের সন্দেহ যে, এ ভাইরাসটি চীন সরকার তার দেশের গরিব জনগণকে শেষ করে দেয়ার জন্য নিজেরাই তৈরি করে ছড়িয়ে দিয়েছিল।

এবারও করোনাভাইরাস যে প্রাকৃতিক নয়, অর্থাৎ এটি মোটেও বাদুড় থেকে ছড়ায়নি- এ বক্তব্য প্রদান করে বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের এ মহাসংকটে চীনকে রাজনৈতিক চাপে রেখেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন- উহান ইন্সটিটিউট অব ভাইরোলজির এক ইন্টার্ন দুর্ঘটনাবশত করোনাভাইরাসটি ছড়িয়ে দিয়েছেন। এইডস ভাইরাসের (এইচআইভি) আবিষ্কারক ফ্রান্সের নোবেলবিজয়ী বিজ্ঞানী লুক মন্টানিয়ের ফ্রান্সের একটি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন- উহানের ল্যাবরেটরিতে চলতি শতকের গোড়ার দিক থেকেই করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণা চলছে।

তিনি আরও বলেন, কোভিড-১৯-এর ভাইরাস প্রাকৃতিক নয়। এটি একটি জিন প্রকৌশলজাত ভাইরাস। করোনাভাইরাসের কোষের মধ্যে এইচআইভি ভাইরাসের কিছু জিনগত চরিত্রের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। চীনও কম যায়নি। তারাও পাল্টা জবাব দিয়ে বলেছে- আমেরিকা তাদের দেশে এ ভাইরাস ছড়িয়েছে। এখন সাধারণভাবে একটা প্রশ্ন জাগে, আমেরিকা কীভাবে এ ভাইরাস ছড়ায়; ওরাই তো মরছে বেশি!

মাশরুম গবেষক ও উদ্যোক্তা, ধামরাই, ঢাকা

[email protected]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত