বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ হ্রাসের পরিণাম শুভ হবে না
jugantor
বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ হ্রাসের পরিণাম শুভ হবে না

  নজরুল ইসলাম  

২৯ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কমছে। তথ্য-উপাত্তে চোখ রাখলে পরিবর্তনটা সহজেই চোখে পড়ে। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৯৯০ সালে মাধ্যমিকে মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞানের পরীক্ষার্থী ছিল ৪২.৮১ শতাংশ আর উচ্চমাধ্যমিকে ২৮.১৩ শতাংশ।

১৯৯৬ সালে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ১৫.৩৩ শতাংশ। এরপর ২০০২ সালে তা বেড়ে হয় ২৫.৮৪ শতাংশ। তারপর আবার পতনের শুরু এবং ২০১৩ সালে তা নেমে আসে ১৭.০১ শতাংশে। ২০১৪ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আমরা এ বিষয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন।’

শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান পড়ার আগ্রহ হারাচ্ছে; কিন্তু কেন? মাধ্যমিকে বিজ্ঞান পড়া শিক্ষার্থীদের সাধারণ একটা চিন্তাধারা হচ্ছে, বিজ্ঞান পড়া মানেই ভবিষ্যতে ডাক্তার বা প্রকৌশলী হওয়া এবং তাদের মতে, যেটির ক্ষেত্র খুব সীমিত।

তবে অন্য একটা কারণও খুব স্পষ্ট- বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানীদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড’ যখন ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিল, তখন আমাদের অনেকের অনাগ্রহ, ক্ষেত্র বিশেষে তাচ্ছিল্য ছিল অবাক করার মতো! বরাবরের মতো সব থেকে এগিয়ে ছিলেন নেটিজেনরা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে অল্প জ্ঞান আছে কিন্তু পেশায় বা নেশায় চিকিৎসক নন- এ দলটি।

এর আগে যখন বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. তারেক আলম অ্যান্টিপ্রোটোজোয়াল মেডিসিন ইভারমেকটিনের সিঙ্গেল ডোজের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক ডক্সিসাইক্লিন প্রয়োগে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সাফল্য পাওয়ার কথা ঘোষণা এবং এ বিষয়ে আরও পরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন, তখনও এ দলটি একই ধরনের অনাগ্রহ এবং তাচ্ছিল্য দেখিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে অবশ্য এ দুটি ওষুধের ব্যবহারের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে আইসিডিডিআর’বি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করেছে। আমি নিজে যখন সাসপেক্টেড পেশেন্ট হিসেবে দেশের একটি বেসরকারি হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিন কন্সালট্যান্টের শরণাপন্ন হই, তখন আমাকেও ইভারমেকটিন প্রেসক্রাইব করা হয়েছিল।

যারা গ্লোব বায়োটেকের ভ্যাকসিন নিয়ে তাচ্ছিল্য ও ট্রল করেছেন, তারা হয়তো প্রতিষ্ঠানটির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের প্রধান মাইক্রোবায়োলজিস্ট ড. আসিফ মাহমুদের চোখ ছলছল করে ওঠাটা দেখেছেন কিন্তু শেষের দিকে উচ্চারণ করা তার কথাটি শোনেননি- ‘ওরা যদি পারে, আমরাও পারব।’

অথচ এ নেটিজেনরাই দফায় দফায় ট্রায়াল দিয়ে ব্যর্থ হওয়া বিভিন্ন উন্নত দেশের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের খবর শেয়ার দিতে দিতে টাইমলাইন ভরে ফেলেছেন। অনেকেই আবার ভ্যাকসিন নিয়ে সন্দেহ করছেন। সমালোচনাকারীদের ভাবা উচিত, ভ্যাকসিনটা যদি শেষ পর্যন্ত সফল নাও হয়, তাতেও আমাদের অনেক কিছু অর্জন করার সুযোগ থাকবে।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘যে দেশে গুণের সমাদর নেই, সে দেশে গুণী জন্মাতে পারে না।’ তাই সমাজে তথা রাষ্ট্রে যেসব গুণী ব্যক্তি আমাদের কল্যাণে কাজ করেন, তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়া আমাদের কর্তব্য।

আমরা যদি প্রচেষ্টার শুরুতেই তাদের নিরাশ করি তাহলে আমরা সফলতার মুখ দেখব কীভাবে? আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সমালোচনা করার আগে আমরা ভুলে গেলাম; যারা আমাদের জন্য কিছু আবিষ্কার করার চেষ্টা করছেন, তারা সবাই ডাক্তার-বিজ্ঞানী বা গবেষক। কমার্সপড়ুয়া এক্সিকিউটিভ বা বিসিএস করা অফিসার নন! যারা পেশেন্টদের ইভারমেকটিন প্রেসক্রাইব করছেন, তারাও সবাই রেজিস্টার্ড ফিজিশিয়ান।

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো কিছু আবিষ্কার করে ফেললেই আমরা তা ব্যবহার করি না। গণস্বাস্থ্য-আরএনএ বায়োটেক লিমিটেডের গবেষকরা ‘জি র‌্যাপিড ডট ব্লট’ নামে যে কিট আবিষ্কার করেছিলেন, তা কিন্তু আমরা এখনও ব্যবহার করতে পারছি না। কাজেই গ্লোব বায়োটেক ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে ফেললেও আমরা সঙ্গে সঙ্গে তা ব্যবহার করব না। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে সেটি ব্যবহার হবে।

এখন ভ্যাকসিনটি দ্বিতীয় ধাপে অ্যানিমেল মডেলে ট্রায়াল করা হবে। এরপর এটি মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যাবে। মানবদেহে ট্রায়ালে যেতে হলেও বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) অনুমতি লাগবে।

আমাদের ক্রিকেট দল বা কাবাডি দল যদি কোনো টুর্নামেন্টে জয় পায়, তখন আমরা তাদের লালগালিচা সংবর্ধনা দেই। তাহলে বিজ্ঞানী, গবেষক, চিকিৎসকদের বেলায় আমাদের এ দীনতা কেন?

আমরা যদি করোনাভাইরাসকে পরাজিত করতে চাই তাহলে আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষকদের ওপরই আস্থা রাখতে হবে; আইনজীবী কিংবা ব্যাংকাররা নিশ্চয়ই করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করবে না। সে জন্যই আমাদের সন্তানদের বিজ্ঞান পড়তে উৎসাহ দিতে হবে। ড. আসিফ মাহমুদ এবং ড. বিজন কুমার শীলদের মতো বিজ্ঞানীদের ধন্যবাদ যে, তারা সরকারি চাকুরে হননি; হলে হয়তো আমরা এ প্রচেষ্টাগুলো দেখতে পেতাম না।

আমি শিক্ষকতা পেশা ছেড়েছি আজ প্রায় দেড় বছর। যদি আজ অবধি আমি শিক্ষক থাকতাম তাহলে আমার শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলনে ড. আসিফ মাহমুদের উপস্থাপনার ভিডিওটা দেখাতাম। তার উপস্থাপনা, জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস দেখাতাম; দেশের জন্য ভালোবাসা দেখাতাম। আমার শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতাম বড় হয়ে বিজ্ঞানী হতে বা বিজ্ঞান পড়তে।

গত কয়েক বছরে আমরা অনেক সিভিল সার্ভিস অফিসার পেয়েছি। আমাদের দেশ এখন কমার্সপড়ুয়া বেসরকারি এক্সিকিউটিভ আর বিসিএস উত্তীর্ণ সরকারি অফিসারে পরিপূর্ণ। সেই তুলনায় বিজ্ঞানী বা গবেষক তৈরি হয়নি। চাকুরে হওয়ার জন্য লেখাপড়া না করে আমাদের বিজ্ঞানী বা গবেষক হওয়ার জন্য লেখাপড়া করা উচিত।

আমেরিকান যুক্তিবিদ ও দার্শনিক নোয়াম চমস্কি বলেছেন, ‘উই উইল ওভারকাম করোনাভাইরাস, বাট উই হ্যাভ মোর সিরিয়াস ক্রাইসিস অ্যাহেড অব আস।’ এখন আমরা যদি ভবিষ্যতের সেই ক্রাইসিসগুলো মোকাবেলা করতে চাই তাহলে আমাদের দরকার বিজ্ঞান শিক্ষা এবং বিজ্ঞান জানা মানুষ। কাজেই শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান পড়ায় আগ্রহ ফেরাতে হবে।

এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ব্যাপক। আমাদেরও দায়িত্ব আছে- বিজ্ঞান, বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ বাড়াতে হবে এবং তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে হবে। নোভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় দেশের প্রত্যেক চিকিৎসক, চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষকদের প্রচেষ্টা সফল হোক, এ প্রত্যাশা করছি।

উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক উপাধ্যক্ষ

[email protected]

বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ হ্রাসের পরিণাম শুভ হবে না

 নজরুল ইসলাম 
২৯ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কমছে। তথ্য-উপাত্তে চোখ রাখলে পরিবর্তনটা সহজেই চোখে পড়ে। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৯৯০ সালে মাধ্যমিকে মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞানের পরীক্ষার্থী ছিল ৪২.৮১ শতাংশ আর উচ্চমাধ্যমিকে ২৮.১৩ শতাংশ।

১৯৯৬ সালে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ১৫.৩৩ শতাংশ। এরপর ২০০২ সালে তা বেড়ে হয় ২৫.৮৪ শতাংশ। তারপর আবার পতনের শুরু এবং ২০১৩ সালে তা নেমে আসে ১৭.০১ শতাংশে। ২০১৪ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আমরা এ বিষয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন।’

শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান পড়ার আগ্রহ হারাচ্ছে; কিন্তু কেন? মাধ্যমিকে বিজ্ঞান পড়া শিক্ষার্থীদের সাধারণ একটা চিন্তাধারা হচ্ছে, বিজ্ঞান পড়া মানেই ভবিষ্যতে ডাক্তার বা প্রকৌশলী হওয়া এবং তাদের মতে, যেটির ক্ষেত্র খুব সীমিত।

তবে অন্য একটা কারণও খুব স্পষ্ট- বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানীদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড’ যখন ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিল, তখন আমাদের অনেকের অনাগ্রহ, ক্ষেত্র বিশেষে তাচ্ছিল্য ছিল অবাক করার মতো! বরাবরের মতো সব থেকে এগিয়ে ছিলেন নেটিজেনরা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে অল্প জ্ঞান আছে কিন্তু পেশায় বা নেশায় চিকিৎসক নন- এ দলটি।

এর আগে যখন বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. তারেক আলম অ্যান্টিপ্রোটোজোয়াল মেডিসিন ইভারমেকটিনের সিঙ্গেল ডোজের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক ডক্সিসাইক্লিন প্রয়োগে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সাফল্য পাওয়ার কথা ঘোষণা এবং এ বিষয়ে আরও পরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন, তখনও এ দলটি একই ধরনের অনাগ্রহ এবং তাচ্ছিল্য দেখিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে অবশ্য এ দুটি ওষুধের ব্যবহারের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে আইসিডিডিআর’বি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করেছে। আমি নিজে যখন সাসপেক্টেড পেশেন্ট হিসেবে দেশের একটি বেসরকারি হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিন কন্সালট্যান্টের শরণাপন্ন হই, তখন আমাকেও ইভারমেকটিন প্রেসক্রাইব করা হয়েছিল।

যারা গ্লোব বায়োটেকের ভ্যাকসিন নিয়ে তাচ্ছিল্য ও ট্রল করেছেন, তারা হয়তো প্রতিষ্ঠানটির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের প্রধান মাইক্রোবায়োলজিস্ট ড. আসিফ মাহমুদের চোখ ছলছল করে ওঠাটা দেখেছেন কিন্তু শেষের দিকে উচ্চারণ করা তার কথাটি শোনেননি- ‘ওরা যদি পারে, আমরাও পারব।’

অথচ এ নেটিজেনরাই দফায় দফায় ট্রায়াল দিয়ে ব্যর্থ হওয়া বিভিন্ন উন্নত দেশের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের খবর শেয়ার দিতে দিতে টাইমলাইন ভরে ফেলেছেন। অনেকেই আবার ভ্যাকসিন নিয়ে সন্দেহ করছেন। সমালোচনাকারীদের ভাবা উচিত, ভ্যাকসিনটা যদি শেষ পর্যন্ত সফল নাও হয়, তাতেও আমাদের অনেক কিছু অর্জন করার সুযোগ থাকবে।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘যে দেশে গুণের সমাদর নেই, সে দেশে গুণী জন্মাতে পারে না।’ তাই সমাজে তথা রাষ্ট্রে যেসব গুণী ব্যক্তি আমাদের কল্যাণে কাজ করেন, তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়া আমাদের কর্তব্য।

আমরা যদি প্রচেষ্টার শুরুতেই তাদের নিরাশ করি তাহলে আমরা সফলতার মুখ দেখব কীভাবে? আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সমালোচনা করার আগে আমরা ভুলে গেলাম; যারা আমাদের জন্য কিছু আবিষ্কার করার চেষ্টা করছেন, তারা সবাই ডাক্তার-বিজ্ঞানী বা গবেষক। কমার্সপড়ুয়া এক্সিকিউটিভ বা বিসিএস করা অফিসার নন! যারা পেশেন্টদের ইভারমেকটিন প্রেসক্রাইব করছেন, তারাও সবাই রেজিস্টার্ড ফিজিশিয়ান।

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো কিছু আবিষ্কার করে ফেললেই আমরা তা ব্যবহার করি না। গণস্বাস্থ্য-আরএনএ বায়োটেক লিমিটেডের গবেষকরা ‘জি র‌্যাপিড ডট ব্লট’ নামে যে কিট আবিষ্কার করেছিলেন, তা কিন্তু আমরা এখনও ব্যবহার করতে পারছি না। কাজেই গ্লোব বায়োটেক ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে ফেললেও আমরা সঙ্গে সঙ্গে তা ব্যবহার করব না। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে সেটি ব্যবহার হবে।

এখন ভ্যাকসিনটি দ্বিতীয় ধাপে অ্যানিমেল মডেলে ট্রায়াল করা হবে। এরপর এটি মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যাবে। মানবদেহে ট্রায়ালে যেতে হলেও বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) অনুমতি লাগবে।

আমাদের ক্রিকেট দল বা কাবাডি দল যদি কোনো টুর্নামেন্টে জয় পায়, তখন আমরা তাদের লালগালিচা সংবর্ধনা দেই। তাহলে বিজ্ঞানী, গবেষক, চিকিৎসকদের বেলায় আমাদের এ দীনতা কেন?

আমরা যদি করোনাভাইরাসকে পরাজিত করতে চাই তাহলে আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষকদের ওপরই আস্থা রাখতে হবে; আইনজীবী কিংবা ব্যাংকাররা নিশ্চয়ই করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করবে না। সে জন্যই আমাদের সন্তানদের বিজ্ঞান পড়তে উৎসাহ দিতে হবে। ড. আসিফ মাহমুদ এবং ড. বিজন কুমার শীলদের মতো বিজ্ঞানীদের ধন্যবাদ যে, তারা সরকারি চাকুরে হননি; হলে হয়তো আমরা এ প্রচেষ্টাগুলো দেখতে পেতাম না।

আমি শিক্ষকতা পেশা ছেড়েছি আজ প্রায় দেড় বছর। যদি আজ অবধি আমি শিক্ষক থাকতাম তাহলে আমার শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলনে ড. আসিফ মাহমুদের উপস্থাপনার ভিডিওটা দেখাতাম। তার উপস্থাপনা, জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস দেখাতাম; দেশের জন্য ভালোবাসা দেখাতাম। আমার শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতাম বড় হয়ে বিজ্ঞানী হতে বা বিজ্ঞান পড়তে।

গত কয়েক বছরে আমরা অনেক সিভিল সার্ভিস অফিসার পেয়েছি। আমাদের দেশ এখন কমার্সপড়ুয়া বেসরকারি এক্সিকিউটিভ আর বিসিএস উত্তীর্ণ সরকারি অফিসারে পরিপূর্ণ। সেই তুলনায় বিজ্ঞানী বা গবেষক তৈরি হয়নি। চাকুরে হওয়ার জন্য লেখাপড়া না করে আমাদের বিজ্ঞানী বা গবেষক হওয়ার জন্য লেখাপড়া করা উচিত।

আমেরিকান যুক্তিবিদ ও দার্শনিক নোয়াম চমস্কি বলেছেন, ‘উই উইল ওভারকাম করোনাভাইরাস, বাট উই হ্যাভ মোর সিরিয়াস ক্রাইসিস অ্যাহেড অব আস।’ এখন আমরা যদি ভবিষ্যতের সেই ক্রাইসিসগুলো মোকাবেলা করতে চাই তাহলে আমাদের দরকার বিজ্ঞান শিক্ষা এবং বিজ্ঞান জানা মানুষ। কাজেই শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান পড়ায় আগ্রহ ফেরাতে হবে।

এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ব্যাপক। আমাদেরও দায়িত্ব আছে- বিজ্ঞান, বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ বাড়াতে হবে এবং তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে হবে। নোভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় দেশের প্রত্যেক চিকিৎসক, চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষকদের প্রচেষ্টা সফল হোক, এ প্রত্যাশা করছি।

উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক উপাধ্যক্ষ

[email protected]