থিওরি অব সিমুলেশন ও করোনাক্রান্তি

  রাশেদ রাফি ২৯ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবী নামক সিনেপ্লেক্সের ইতিহাসে অন্যতম সুপারহিট সিনেমা চলছে এখন। আমরা সবাই সিনেমার অভিনেতা। সিনেমার নাম করোনাক্রান্তি। আসলে সিনেমা তো সেই বিগব্যাং থেকেই শুরু।

করোনাক্রান্তি হল সিনেমার ভেতরে সিনেমা; আখ্যানের ভেতরে উপাখ্যান। চীনের উহান নগরী থেকে শুরু হওয়া সেই সিনেমার দৃশ্যপটে এখন বাংলাদেশ। আসল দৃশ্যপটের শুরু এপ্রিলের ১০ তারিখ থেকে।

যেদিন দেখলাম, শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার এক বৃদ্ধ মা তার ছেলেকে নিয়ে বসে আছেন সৎকার করবেন বলে। কিন্তু মায়ের আহাজারিতে সাড়া দিচ্ছে না কেউ- এমন কী ভাইবোনরাও না! এরপর ১৪ এপ্রিল পর্দায় এলো টাঙ্গাইলের সখীপুরের ছবি। দেখলাম, করোনার লক্ষণ থাকায় ছেলেমেয়েরা কীভাবে মাকে ফেলে এলো বনের ভেতরে।

এমন দৃশ্য যখন একটার পর একটা আসতেই থাকল, তখন ভাবলাম- এসব অমানবিক দৃশ্য দিয়ে কী বুঝানো হচ্ছে? হয়তো বুঝানো হচ্ছে, ‘দেখ, তোমরা মানব অথচ অভিনয় করছ অমানবিক চরিত্রে।’

আবার পাশাপাশি দেখানো হল, মানবিকতা কাকে বলে সেটাও। করোনার ভয়কে তুচ্ছ করে করোনাক্রান্তিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করল পুলিশ, এখনও করছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই, তারাই হয়ে উঠছে মানবিকতার উদাহরণ। শুরুর দিকে করোনার ভয়ে যখন ডাক্তাররাও দূরে দূরে থাকছিল, এমন কী আপনজনরাও রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাচ্ছিল না বা পরিবারের মৃত ব্যক্তির ধারেকাছে যাচ্ছিল না; সেই দুর্দিনে সব করেছে পুলিশ।

এরই মধ্যে সিনেমায় টান টান উত্তেজনা আনার জন্য নির্মাতা ক্যামেরা নিয়ে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায়। দেখালেন, ‘আই কান্ট ব্রেদ’ নামের বর্ণবাদবিরোধী প্লট। শেষান্তে দেখানো হল, পুলিশদের হাঁটুগেড়ে মাফ চাওয়া এবং বিক্ষোভরত সাদা-কালো মানুষদের করোনার ভয় উপেক্ষা করে দৌড়ে এসে সেই পুলিশদের জড়িয়ে ধরে কান্নার দৃশ্য।

আচ্ছা, কাঁদতে কাঁদতে কী বলছিল ওরা? সম্ভবত বলছিল- উই আর হিউম্যান, উই আর হিউম্যান। পর্দায় এসব দৃশ্য দেখে আবেগে কাঁদেননি আপনারা?

আরও আছে। ভারতের কেরালা রাজ্যে গর্ভবতী হাতির সঙ্গে মানুষের নির্মমতা; বাংলাদেশের মাদারীপুরে বিষ মিশিয়ে বানর মারার করুণ দৃশ্য; নাটোরে একসঙ্গে ২০০ শামুখখোল পাখি মেরে একদম খেয়ে ফেলা কিংবা চালচোর থেকে শুরু করে অসুর শাহেদ-সাবরিনা পর্যন্ত- এসব কি কম সিনেম্যাটিক! ইতিহাস বলে, পৃথিবীর মানুষরা এমন টানটান উত্তেজনাপূর্ণ সিনেমায় আর অভিনয় করেনি কখনও।

এবার সবাই যেন উপলব্ধি করছে- আরে এ তো পাতানো খেলা! বানানো সিনেমা! আসলে তো তা-ই! অক্সফোর্ড দার্শনিক নিক বোস্ট্রমের সিমুলেশন তত্ত্ব তো তা-ই বলছে। ওই তত্ত্বমতে, হতে পারে পৃথিবীতে মানুষের পুরো জীবনপ্রণালিই একটি কম্পিউটার গেমের সিমুলেশন বা ভান।

হয়তো মহাবিশ্বের কোথাও মানুষের চেয়ে উন্নত বুদ্ধিমত্তার কোনো সভ্যতা তাদের আওতায় থাকা অতিমাত্রার শক্তি ও মানসম্পন্ন কোনো সুপার কম্পিউটারে চালিত ভিডিও গেমসের মাধ্যমে পুরো পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষদের জীবনযাপন ও গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করছে, যার কিছুই আমরা জানি না। হলিউড মুভি ‘মেট্রিক্স’-এ দেখা যায় সিমুলেশন থিওরির ব্যবহারিক অনুশীলনের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে। মেট্রিক্সের প্রধান চরিত্র নিও মরফিউজের কথানুযায়ী, লাল ও নীল রঙের দুটি পিল থেকে লাল রঙের পিল বেছে নেয়ার পর সে জেগে ওঠে। শুরু হয় তার সিমুলেটেড জীবন। নিও নিজের ইচ্ছামতো কিছুই করতে পারে না। তার পুরো জীবন নিয়ন্ত্রণ করে সুপার কম্পিউটার।

বিজ্ঞানী আইনস্টাইন যখন সফলতার তুঙ্গে, তখন তার সঙ্গে কাজ করতেন পদার্থবিদ জন হুইলার। জন হুইলারের সুরেও সিমুলেশন থিওরির সমর্থন পাওয়া যায়। তার মতে, নিউটনিয়ান যুগে পদার্থবিদ্যাকে বলা হতো অস্তিত্বশীল বস্তুর বিজ্ঞান; কিন্তু এখন এসব অস্তিত্বশীল পদার্থকে ঘিরে থাকা সম্ভাবনাও এর পরিধিভুক্ত যেমন- কোয়ান্টাম ফিজিক্স। তার একটি ভাষ্য হল- ‘ইট ফ্রম বিট’; যাকে বাংলায় বলা যায়, তথ্য থেকেই অস্তিত্ব।

গত রাতে যেসব কাজ করব বলে ভেবে রেখেছিলাম, আজ তার একটিও হয়নি। সারাদিন কাটল গান গেয়ে গেয়ে। তার মানে কি আমার পুরো দিনটি অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করল?

এখন আমি যে বাসায় থাকি, তার সামনে-পেছনে অনেক গাছগাছালি। করোনাকালে ছাদে ওঠা বেড়ে গেছে। ছাদে উঠে পেছনের গাছগাছালি দেখি; শৈশবের গ্রামকে টেনে আনি। ইদানীং এমন সব পাখি দেখি, যা আগে কখনই দেখিনি। কোত্থেকে আসে ওরা? কে পাঠাচ্ছে ওদের? ঘরেও আমার দুটি পাখি আছে। ‘তিনা’ ও ‘তোনি’। এখন ওরাই আমার সব। গতকাল সন্ধ্যায় মুরগি কিনতে দোকানে গেলাম।

যে মুরগিটি পছন্দ করলাম, ও আমার দিকে এমনভাবে চেয়ে থাকল; যেন বলছিল- আমি যদি তোমার ‘তিনা’ ও ‘তোনি’ হতাম, তবে কী করতে? আচ্ছা! এ ঘটনাগুলোর সব কি সিমুলেটেড? আমি কি কোনো সুপার কম্পিউটারের ভেতরে? তাহলে করোনাকালে যা ঘটল এবং যা ঘটছে, তার সবই কি সিমুলেটেড?

[email protected]

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত