টিকটক-লাইকির নিয়ন্ত্রণ জরুরি
jugantor
টিকটক-লাইকির নিয়ন্ত্রণ জরুরি

  মোহাম্মাদ বুস্তানী  

১২ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্মার্টফোন ব্যবহার করেন অথচ টিকটকের ভিডিও দেখেননি, এমন কাউকে পাওয়া বেশ কঠিনই হবে বর্তমান সময়ে। অথবা বহুল ব্যবহৃত অ্যাপস ইমু ব্যবহার করেন, অথচ এটি থেকে বিচিত্র রকমের প্রেম নিবেদনের নোটিফিকেশন পাননি, এমন মানুষও খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্কর হবে নিশ্চয়।

সিনেমা নাটকের জনপ্রিয় সংলাপ, গান বা ওয়াজ মাহফিলের বক্তাদের বক্তব্যের একাংশের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে এবং হাত-পা নাড়িয়ে ভিডিও তৈরির অ্যাপস টিকটক ও লাইকির ব্যবহার দিনদিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এ অ্যাপসগুলোর মাধ্যমে যেসব অশ্লীল ভঙ্গিমায় দেহ প্রদর্শন, ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও নির্মাণ ও বিকলাঙ্গ মানসিকতা প্রচার ও প্রসারের মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা যে কোনো রুচিশীল ও বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মনকে নাড়া দেবে।

সেলিব্রিটি তারকা থেকে শুরু করে উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরী কেউই পিছিয়ে নেই এক্ষেত্রে। ইদানীং বৃদ্ধ বয়সী কিছু মানুষজনের আগ্রহও বেশ চমকে ওঠার মতো।

চীনের বাইটডান্স নির্মিত ‘টিকটক’ ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংস্থা বিগোর ‘লাইকি’ অত্যন্ত অল্প সময়ে বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে এশিয়ায় কিশোর-কিশোরীদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে চীনা প্রযুক্তি বাজারে ও ১৭ সাল নাগাদ বিশ্ববাজারে টিকটক এবং ২০১৭ সালে লাইকি উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকেই হু হু করে বাড়তে থাকে ব্যবহারকারীর সংখ্যা। বর্তমানে টিকটক এবং লাইকি এশিয়ায় নেতৃত্বস্থানীয় দুটি ছোট ভিডিওর প্লাটফর্ম এবং সব থেকে বড় সঙ্গীত ভিডিওভিত্তিক দ্রুততম ক্রমবর্ধমান সামাজিক নেটওয়ার্ক ও প্লাটফর্ম। গ্লোবাল ওয়েব ইনডেক্সের তথ্যানুসারে, বর্তমানে টিকটক ও লাইকি ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ভারতে চলতি বছরের ৩ এপ্রিল আদালত কর্তৃক টিকটক নিষিদ্ধ করার নির্দেশ জারির পর সচেতন নাগরিকরা এ দেশেও এটি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন। যদিও এখন অবধি মাধ্যম দুটি নিয়ন্ত্রণের আশানুরূপ কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয়নি।

৩ আগস্ট সাধারণ মানুষকে হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগে কথিত ‘টিকটক স্টার’ অপুকে সহযোগীসহ গ্রেফতারের পর ফের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে টিকটক-লাইকির নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার ও ব্যবহারকারীদের রুচিবিবর্জিত তথাকথিত ট্রেন্ড।

এদের হাতে লাঞ্ছনার শিকার হওয়া থেকে বাদ পড়ছে না সমাজের সম্মানিত পেশাজীবী মানুষজনও। অপু ও তার বাহিনীর হাতে হামলার শিকারের পর ইঞ্জিনিয়ার মো. হাসিবুল হক নামের একজন ব্যক্তির ফেসবুকে দেয়া একটি স্ট্যাটাস ভাইরাল হলে আবারও প্রতিবাদে সরব হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। গ্রেফতারের পরদিন ৪ আগস্ট আদালত অপু ও তার সহযোগীর জামিন নামঞ্জুর করে দু’জনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

নিছক বিনোদন ও অল্প সময়ে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা থেকে এসব সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের জনপ্রিয়তা বাড়তে দেখা গেলেও ইদানীং অল্প কিছু পয়সা আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় কিশোর-কিশোরীদের আগ্রহে নতুনমাত্রা যোগ হয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত বস্তিপাড়া এবং শিক্ষাবঞ্চিত নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা কিশোর-কিশোরীরা চোখের সামনে সামান্য কিছু অর্থের লোভ আর সস্তা জনপ্রিয়তার হাতছানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে নির্দ্বিধায়।

বিচিত্র প্রাণীদের মতো হেয়ারস্টাইল আর কিম্ভূতকিমাকার বেশভূষা ধারণ করে ভিডিও ধারণের পর তা আপলোড করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না; বরং সেগুলোকে বাস্তব জীবনের অনুষঙ্গ বানাতে গিয়ে তথাকথিত হিরো বা মডেল বনে গিয়ে ফিল্মি কায়দা-কসরত দেখানোর নামে তৈরি করছে কিশোর গ্যাং। আজব নাচ আর বিদেশি ভাষার গান ছাড়াও যে প্রতিভা প্রদর্শনের সুস্থ-স্বাভাবিক-সৃজনশীল পন্থা আছে, তা যেন মাধ্যম দুটি ব্যবহারকারীদের জানাই নেই।

মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক শিক্ষার অভাব, দারিদ্র্য ও বিদেশি অপসংস্কৃতির ঢেউয়ে গা ভাসিয়ে সামাজিক মূল্যবোধ হারিয়ে মূল্যহীন জনপ্রিয়তার দিকে ছুটছে এসব তরুণ-তরুণী। অবশ্য রুচিবিবর্জিত এসব ভিডিও দেখে এ সুযোগ সৃষ্টিতে তাদের পরোক্ষ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছি আমরাই। এ যেন ভাইরাল হওয়ার ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত দেশব্যাপী তরুণ সমাজের বিরাট একটা অংশ।

ফলে নৈতিকতা, সামাজিকতা, শ্লীলতা কিংবা মানবিক মূল্যবোধের মতো অত্যাবশ্যকীয় সামাজিক গুণাবলির সংকটে পড়া তরুণ প্রজন্মের এ বিশাল অংশটা পুরো জাতির মানসিক পরিপক্বতার বিপরীতে ক্রমবর্ধমান ক্যান্সার হিসেবেই আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। আর এখান থেকে গজিয়ে ওঠা কিশোর গ্যাং আগামীর বাংলাদেশে জনশৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে। প্রযুক্তিনির্ভর একুশ শতকের তরুণ প্রজন্মকে সুপথে রাখা না গেলে হয়তো সোনার বাংলার আকাশ অদূর ভবিষ্যতে কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাবে। সেই ধোঁয়ার বিষাক্ততায় বাঁচব না আমি, আপনি, আমরা কেউই।

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

টিকটক-লাইকির নিয়ন্ত্রণ জরুরি

 মোহাম্মাদ বুস্তানী 
১২ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্মার্টফোন ব্যবহার করেন অথচ টিকটকের ভিডিও দেখেননি, এমন কাউকে পাওয়া বেশ কঠিনই হবে বর্তমান সময়ে। অথবা বহুল ব্যবহৃত অ্যাপস ইমু ব্যবহার করেন, অথচ এটি থেকে বিচিত্র রকমের প্রেম নিবেদনের নোটিফিকেশন পাননি, এমন মানুষও খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্কর হবে নিশ্চয়।

সিনেমা নাটকের জনপ্রিয় সংলাপ, গান বা ওয়াজ মাহফিলের বক্তাদের বক্তব্যের একাংশের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে এবং হাত-পা নাড়িয়ে ভিডিও তৈরির অ্যাপস টিকটক ও লাইকির ব্যবহার দিনদিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এ অ্যাপসগুলোর মাধ্যমে যেসব অশ্লীল ভঙ্গিমায় দেহ প্রদর্শন, ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও নির্মাণ ও বিকলাঙ্গ মানসিকতা প্রচার ও প্রসারের মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা যে কোনো রুচিশীল ও বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মনকে নাড়া দেবে।

সেলিব্রিটি তারকা থেকে শুরু করে উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরী কেউই পিছিয়ে নেই এক্ষেত্রে। ইদানীং বৃদ্ধ বয়সী কিছু মানুষজনের আগ্রহও বেশ চমকে ওঠার মতো।

চীনের বাইটডান্স নির্মিত ‘টিকটক’ ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংস্থা বিগোর ‘লাইকি’ অত্যন্ত অল্প সময়ে বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে এশিয়ায় কিশোর-কিশোরীদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে চীনা প্রযুক্তি বাজারে ও ১৭ সাল নাগাদ বিশ্ববাজারে টিকটক এবং ২০১৭ সালে লাইকি উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকেই হু হু করে বাড়তে থাকে ব্যবহারকারীর সংখ্যা। বর্তমানে টিকটক এবং লাইকি এশিয়ায় নেতৃত্বস্থানীয় দুটি ছোট ভিডিওর প্লাটফর্ম এবং সব থেকে বড় সঙ্গীত ভিডিওভিত্তিক দ্রুততম ক্রমবর্ধমান সামাজিক নেটওয়ার্ক ও প্লাটফর্ম। গ্লোবাল ওয়েব ইনডেক্সের তথ্যানুসারে, বর্তমানে টিকটক ও লাইকি ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ভারতে চলতি বছরের ৩ এপ্রিল আদালত কর্তৃক টিকটক নিষিদ্ধ করার নির্দেশ জারির পর সচেতন নাগরিকরা এ দেশেও এটি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন। যদিও এখন অবধি মাধ্যম দুটি নিয়ন্ত্রণের আশানুরূপ কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয়নি।

৩ আগস্ট সাধারণ মানুষকে হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগে কথিত ‘টিকটক স্টার’ অপুকে সহযোগীসহ গ্রেফতারের পর ফের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে টিকটক-লাইকির নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার ও ব্যবহারকারীদের রুচিবিবর্জিত তথাকথিত ট্রেন্ড।

এদের হাতে লাঞ্ছনার শিকার হওয়া থেকে বাদ পড়ছে না সমাজের সম্মানিত পেশাজীবী মানুষজনও। অপু ও তার বাহিনীর হাতে হামলার শিকারের পর ইঞ্জিনিয়ার মো. হাসিবুল হক নামের একজন ব্যক্তির ফেসবুকে দেয়া একটি স্ট্যাটাস ভাইরাল হলে আবারও প্রতিবাদে সরব হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। গ্রেফতারের পরদিন ৪ আগস্ট আদালত অপু ও তার সহযোগীর জামিন নামঞ্জুর করে দু’জনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

নিছক বিনোদন ও অল্প সময়ে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা থেকে এসব সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের জনপ্রিয়তা বাড়তে দেখা গেলেও ইদানীং অল্প কিছু পয়সা আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় কিশোর-কিশোরীদের আগ্রহে নতুনমাত্রা যোগ হয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত বস্তিপাড়া এবং শিক্ষাবঞ্চিত নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা কিশোর-কিশোরীরা চোখের সামনে সামান্য কিছু অর্থের লোভ আর সস্তা জনপ্রিয়তার হাতছানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে নির্দ্বিধায়।

বিচিত্র প্রাণীদের মতো হেয়ারস্টাইল আর কিম্ভূতকিমাকার বেশভূষা ধারণ করে ভিডিও ধারণের পর তা আপলোড করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না; বরং সেগুলোকে বাস্তব জীবনের অনুষঙ্গ বানাতে গিয়ে তথাকথিত হিরো বা মডেল বনে গিয়ে ফিল্মি কায়দা-কসরত দেখানোর নামে তৈরি করছে কিশোর গ্যাং। আজব নাচ আর বিদেশি ভাষার গান ছাড়াও যে প্রতিভা প্রদর্শনের সুস্থ-স্বাভাবিক-সৃজনশীল পন্থা আছে, তা যেন মাধ্যম দুটি ব্যবহারকারীদের জানাই নেই।

মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক শিক্ষার অভাব, দারিদ্র্য ও বিদেশি অপসংস্কৃতির ঢেউয়ে গা ভাসিয়ে সামাজিক মূল্যবোধ হারিয়ে মূল্যহীন জনপ্রিয়তার দিকে ছুটছে এসব তরুণ-তরুণী। অবশ্য রুচিবিবর্জিত এসব ভিডিও দেখে এ সুযোগ সৃষ্টিতে তাদের পরোক্ষ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছি আমরাই। এ যেন ভাইরাল হওয়ার ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত দেশব্যাপী তরুণ সমাজের বিরাট একটা অংশ।

ফলে নৈতিকতা, সামাজিকতা, শ্লীলতা কিংবা মানবিক মূল্যবোধের মতো অত্যাবশ্যকীয় সামাজিক গুণাবলির সংকটে পড়া তরুণ প্রজন্মের এ বিশাল অংশটা পুরো জাতির মানসিক পরিপক্বতার বিপরীতে ক্রমবর্ধমান ক্যান্সার হিসেবেই আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। আর এখান থেকে গজিয়ে ওঠা কিশোর গ্যাং আগামীর বাংলাদেশে জনশৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে। প্রযুক্তিনির্ভর একুশ শতকের তরুণ প্রজন্মকে সুপথে রাখা না গেলে হয়তো সোনার বাংলার আকাশ অদূর ভবিষ্যতে কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাবে। সেই ধোঁয়ার বিষাক্ততায় বাঁচব না আমি, আপনি, আমরা কেউই।

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়