শিশুর ভাষা বিকাশে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের প্রভাব ও করণীয়
jugantor
শিশুর ভাষা বিকাশে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের প্রভাব ও করণীয়

  সাতিয়া মুনতাহা  

১২ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করতে ভাষাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। এজন্য ভাষার বিকাশ হওয়া অনেক জরুরি। শিশুর জন্মের পর থেকেই ভাষার বিকাশ হতে থাকে। শিশুকাল থেকেই যেন ভাষার বিকাশ পরিপূর্ণভাবে হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। আজকাল স্মার্টফোন ব্যবহারে আসক্তি বাড়ছে শিশুদের। অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ। এছাড়া স্মার্টফোনের বিকিরণ শিশুদের মস্তিষ্ক ও চোখের ক্ষতিসহ বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করছে।

শিশু জন্মের পর থেকে তার পারিপার্শ্বিকতা দেখে ও শুনেই ভাষা শেখে এবং কথা বলা শুরু করে। শিশুদের ওপর পরিচালিত ইউনিসেফের গবেষণা বলছে- শিশুর ৬ মাস থেকে ২ বছর হতেই বাবা-মা শিশুকে স্মার্টফোন ও টেলিভিশনসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, যা শিশুর ভাষা বিকাশে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। শিশুর ভাষা বিকাশের স্তর লক্ষ করলে দেখা যায়, ৪-৫ মাস বয়সে শিশু বিভিন্ন শব্দ করতে পারে। ৬-১২ মাস বয়সে বাবা, মা, দাদা, নানা ইত্যাদি শব্দ করে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ১২-১৮ মাস বয়সে ছোট ছোট নির্দেশনা পালন করে এবং নতুন নতুন শব্দ অনুকরণ করার চেষ্টা করে। ২ বছর বয়সে ২টি শব্দ ব্যবহার করে কথা বলে। যেমন- ‘আমি যাব।’ ৩-৪ বছর বয়সে ৩ অথবা ৪ বাক্যে স্পষ্ট করে কথা বলতে পারে। ৫ বছর বয়সে গল্প বুঝতে পারে ও বলতে পারে, আবেগ-অনুভূতি বুঝতে পারে। এ সময়টি ভাষা বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্মার্টফোন, টিভি, ল্যাপটপ এ ডিভাইসগুলো মূলত ‘একমুখী যোগাযোগ’। ১ বছর বয়স থেকে শিশু যখন স্মার্টফোন ব্যবহার করে, তখন সে মূলত কার্টুন, গান, নাচ অথবা অন্যান্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানগুলোই দেখে। আশপাশের পারিপার্শ্বিক অবস্থার দিকে তার মনোযোগ থাকে না। সম্পূর্ণ মনোযোগ থাকে স্মার্টফোনের ভিডিওর ওপর। ওই মুহূর্তে না সে আশপাশে দেখে; না সে প্রশ্ন করে অথবা প্রশ্নের উত্তর দেয়। এর ফলে শিশুর ভাষার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এমন অবস্থা চলতে থাকলে সমস্যা ধীরে ধীরে প্রকট হতে থাকে।

বর্তমানে দেখা যায়, ৮-১০ মাস বয়স হলেই স্মার্টফোনের প্রতি শিশুর একটি আকর্ষণ তৈরি হয়। স্মার্টফোন না দিলে সে কান্নাকাটিও করে। ‘ডেভেলমেন্ট সায়েন্স’-এর গবেষণায় দেখা যায়, ৭ মাস থেকে ২ বছর বয়সি শিশুদের মাঝে বেশ কিছু আচরণগত সমস্যা দেখা যায় এবং ৮-১৩ বছরের শিশুরা নিজেকে গুরুত্বহীন ভাবা শুরু করে। যার ফলে শিশু বদমেজাজি, অস্থিরতা, ভাংচুর করা ও অন্যান্য আচরণগত সমস্যা করতে থাকে। যেমন- সঠিকভাবে কথার ব্যবহার করতে পারে না কিংবা কারও সঙ্গে মিশতে পারে না। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে, যারা কিছুটা কথা বলতে পারে; তারাও কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করে না এবং কথার পরিমাণ ধীরে ধীরে কমাতে শুরু করে। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা যায়, যেসব শিশু স্মার্টফোন বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহার করছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কথা বলা বা প্রকাশে দেরিতে ভোগে; যাকে ‘স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ডিলে’ বলা হয়। অন্যদিকে যারা এসব ব্যবহার করছে না, তারা স্বাভাবিক বিকাশের মাধ্যমেই বেড়ে উঠছে।

শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। পিতা-মাতার অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারও শিশুর ভাষা বিকাশ ও আচরণগত সমস্যার কারণ হতে পারে। গবেষণা বলে- মায়েরা, বাবাদের থেকে বেশি ফোন ব্যবহার করে। শিশুকে খাওয়ানোর সময়, ঘুম পাড়ানোর সময়, এমনকি শিশুর হাতে স্মার্টফোন দিয়ে পরিবারের কাজ করে। অন্যদিকে বাবারাও অফিস থেকে এসে স্মার্টফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যা শিশুরা দেখে ও অনুকরণ করতে থাকে। এর ফলে শিশু কথা বলার মানুষ পায় না এবং কথা শিখতে বিলম্ব করে।

ভাষার বিকাশ দেরি হলে অবহেলা করতে নেই। শিশু দেরিতে হয়তো কথা বলবে- এমন ভুল ধারণা অনেকেই করে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে একটি শিশুর জীবনে অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক অভিভাবক এই ভেবে খুশি থাকে যে, শিশু স্মার্টফোনের ফাংশন বুঝতে পারছে, ইউটিউবে যেতে পারছে, গেমস খেলতে পারছে। কিন্তু অনেক সময় এটি শিশুর জন্য ভালো নাও হতে পারে। শিশুকে স্মার্টফোন, টিভি, ল্যাপটপ ইত্যাদি ব্যবহার করতে দিতে হবে, প্রযুক্তি সম্পর্কে অবশ্যই ধারণা দিতে হবে; কিন্তু সেটা একটি নির্দিষ্ট বয়সে। লক্ষ রাখতে হবে, যেন এর ফলে শিশুর ক্ষতি না হয়ে যায়।

শিশুকে পর্যাপ্ত সময় দিন। কথা বলুন। পারিপার্শ্বিক জিনিসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন। বুঝান ও শেখান, যা শিশুর ভাষার বিকাশ স্বাভাবিক হতে সাহায্য করবে। যদি সমস্যা প্রকট হয় এবং শিশু কথা না বুঝে বা প্রকাশ না করে, সেক্ষেত্রে দেরি না করে অবিলম্বে একজন প্রফেশনাল ‘স্পিস অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তিনি তদারকির মাধ্যমে শিশুর সমস্যা নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদান করে শিশুর ভাষা বিকাশকে স্বাভাবিক করতে সাহায্য করবেন।

‘দীপ্ত সীমান্ত’ বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিজিবি, পিলখানা, ঢাকা

 

শিশুর ভাষা বিকাশে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের প্রভাব ও করণীয়

 সাতিয়া মুনতাহা 
১২ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করতে ভাষাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। এজন্য ভাষার বিকাশ হওয়া অনেক জরুরি। শিশুর জন্মের পর থেকেই ভাষার বিকাশ হতে থাকে। শিশুকাল থেকেই যেন ভাষার বিকাশ পরিপূর্ণভাবে হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। আজকাল স্মার্টফোন ব্যবহারে আসক্তি বাড়ছে শিশুদের। অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ। এছাড়া স্মার্টফোনের বিকিরণ শিশুদের মস্তিষ্ক ও চোখের ক্ষতিসহ বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করছে।

শিশু জন্মের পর থেকে তার পারিপার্শ্বিকতা দেখে ও শুনেই ভাষা শেখে এবং কথা বলা শুরু করে। শিশুদের ওপর পরিচালিত ইউনিসেফের গবেষণা বলছে- শিশুর ৬ মাস থেকে ২ বছর হতেই বাবা-মা শিশুকে স্মার্টফোন ও টেলিভিশনসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, যা শিশুর ভাষা বিকাশে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। শিশুর ভাষা বিকাশের স্তর লক্ষ করলে দেখা যায়, ৪-৫ মাস বয়সে শিশু বিভিন্ন শব্দ করতে পারে। ৬-১২ মাস বয়সে বাবা, মা, দাদা, নানা ইত্যাদি শব্দ করে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ১২-১৮ মাস বয়সে ছোট ছোট নির্দেশনা পালন করে এবং নতুন নতুন শব্দ অনুকরণ করার চেষ্টা করে। ২ বছর বয়সে ২টি শব্দ ব্যবহার করে কথা বলে। যেমন- ‘আমি যাব।’ ৩-৪ বছর বয়সে ৩ অথবা ৪ বাক্যে স্পষ্ট করে কথা বলতে পারে। ৫ বছর বয়সে গল্প বুঝতে পারে ও বলতে পারে, আবেগ-অনুভূতি বুঝতে পারে। এ সময়টি ভাষা বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্মার্টফোন, টিভি, ল্যাপটপ এ ডিভাইসগুলো মূলত ‘একমুখী যোগাযোগ’। ১ বছর বয়স থেকে শিশু যখন স্মার্টফোন ব্যবহার করে, তখন সে মূলত কার্টুন, গান, নাচ অথবা অন্যান্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানগুলোই দেখে। আশপাশের পারিপার্শ্বিক অবস্থার দিকে তার মনোযোগ থাকে না। সম্পূর্ণ মনোযোগ থাকে স্মার্টফোনের ভিডিওর ওপর। ওই মুহূর্তে না সে আশপাশে দেখে; না সে প্রশ্ন করে অথবা প্রশ্নের উত্তর দেয়। এর ফলে শিশুর ভাষার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এমন অবস্থা চলতে থাকলে সমস্যা ধীরে ধীরে প্রকট হতে থাকে।

বর্তমানে দেখা যায়, ৮-১০ মাস বয়স হলেই স্মার্টফোনের প্রতি শিশুর একটি আকর্ষণ তৈরি হয়। স্মার্টফোন না দিলে সে কান্নাকাটিও করে। ‘ডেভেলমেন্ট সায়েন্স’-এর গবেষণায় দেখা যায়, ৭ মাস থেকে ২ বছর বয়সি শিশুদের মাঝে বেশ কিছু আচরণগত সমস্যা দেখা যায় এবং ৮-১৩ বছরের শিশুরা নিজেকে গুরুত্বহীন ভাবা শুরু করে। যার ফলে শিশু বদমেজাজি, অস্থিরতা, ভাংচুর করা ও অন্যান্য আচরণগত সমস্যা করতে থাকে। যেমন- সঠিকভাবে কথার ব্যবহার করতে পারে না কিংবা কারও সঙ্গে মিশতে পারে না। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে, যারা কিছুটা কথা বলতে পারে; তারাও কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করে না এবং কথার পরিমাণ ধীরে ধীরে কমাতে শুরু করে। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা যায়, যেসব শিশু স্মার্টফোন বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহার করছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কথা বলা বা প্রকাশে দেরিতে ভোগে; যাকে ‘স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ডিলে’ বলা হয়। অন্যদিকে যারা এসব ব্যবহার করছে না, তারা স্বাভাবিক বিকাশের মাধ্যমেই বেড়ে উঠছে।

শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। পিতা-মাতার অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারও শিশুর ভাষা বিকাশ ও আচরণগত সমস্যার কারণ হতে পারে। গবেষণা বলে- মায়েরা, বাবাদের থেকে বেশি ফোন ব্যবহার করে। শিশুকে খাওয়ানোর সময়, ঘুম পাড়ানোর সময়, এমনকি শিশুর হাতে স্মার্টফোন দিয়ে পরিবারের কাজ করে। অন্যদিকে বাবারাও অফিস থেকে এসে স্মার্টফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যা শিশুরা দেখে ও অনুকরণ করতে থাকে। এর ফলে শিশু কথা বলার মানুষ পায় না এবং কথা শিখতে বিলম্ব করে।

ভাষার বিকাশ দেরি হলে অবহেলা করতে নেই। শিশু দেরিতে হয়তো কথা বলবে- এমন ভুল ধারণা অনেকেই করে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে একটি শিশুর জীবনে অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক অভিভাবক এই ভেবে খুশি থাকে যে, শিশু স্মার্টফোনের ফাংশন বুঝতে পারছে, ইউটিউবে যেতে পারছে, গেমস খেলতে পারছে। কিন্তু অনেক সময় এটি শিশুর জন্য ভালো নাও হতে পারে। শিশুকে স্মার্টফোন, টিভি, ল্যাপটপ ইত্যাদি ব্যবহার করতে দিতে হবে, প্রযুক্তি সম্পর্কে অবশ্যই ধারণা দিতে হবে; কিন্তু সেটা একটি নির্দিষ্ট বয়সে। লক্ষ রাখতে হবে, যেন এর ফলে শিশুর ক্ষতি না হয়ে যায়।

শিশুকে পর্যাপ্ত সময় দিন। কথা বলুন। পারিপার্শ্বিক জিনিসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন। বুঝান ও শেখান, যা শিশুর ভাষার বিকাশ স্বাভাবিক হতে সাহায্য করবে। যদি সমস্যা প্রকট হয় এবং শিশু কথা না বুঝে বা প্রকাশ না করে, সেক্ষেত্রে দেরি না করে অবিলম্বে একজন প্রফেশনাল ‘স্পিস অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তিনি তদারকির মাধ্যমে শিশুর সমস্যা নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদান করে শিশুর ভাষা বিকাশকে স্বাভাবিক করতে সাহায্য করবেন।

‘দীপ্ত সীমান্ত’ বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিজিবি, পিলখানা, ঢাকা