বন্ধ হোক সরকারি কর্মকর্তাদের ভ্রমণ বিলাস
jugantor
বন্ধ হোক সরকারি কর্মকর্তাদের ভ্রমণ বিলাস

  গোপাল নাথ বাবুল  

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে এমন সব বিষয়ে বিদেশ সফরের কথা উল্লেখ করা হয়, যা শুনলে হাসতে হাসতে পরান বের হয়ে যাবার উপক্রম হয়।

যেমন- গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের জন্য কোন ধরনের ভবন নির্মাণ করা যায় সেটা দেখতে ৩০ কর্মকর্তার বিদেশ সফরের প্রস্তাব, গাভীর প্রজনন, আলু চাষ, পুকুর খনন, লিফট দেখা ও ফল উৎপাদনের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিদেশ সফরের প্রস্তাব ইত্যাদি।

এ সংক্রান্ত কিছু প্রস্তাব পাসের পর ইতোমধ্যে অনেক কর্মকর্তা ‘অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে’ জনগণের কষ্টার্জিত টাকার শ্রাদ্ধ করে বিদেশ সফর সম্পন্ন করে ফেলেছেন। শোনা যায়, অনেকে আবার পরিবার-পরিজন নিয়ে বিদেশে যান। সেখানে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কী ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন, তা জানা না গেলেও তাদের কেউ কেউ পরিবার-পরিজন, ইয়ার-দোস্ত সহযোগে ‘ফুর্তি-মৌজ’ সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার ডালি নিয়ে ফিরে থাকেন বলে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সূত্রে জানা গেছে।

সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাইমারি স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় একটি প্রকল্পে ১ হাজার কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠিয়ে ডিম ও সবজি খিচুড়িসহ অন্যান্য ‘রান্না এবং প্রসেসিং’ শিখতে ৫ কোটি টাকা চেয়ে বসে এবং একই বিষয়ে দেশে প্রশিক্ষণের জন্য আরও ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেয়।

এমন হাস্যকর প্রকল্পের কথা শুনে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে তড়িঘড়ি করে মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি বাতিল করে জনগণকে ধন্য করেছে।

কিন্তু যে দেশে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে সরকারি কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের কোষাগার খালি করতে অভ্যস্ত, তারা এত সহজে উদ্যম হারাবেন কেন? ফলে দেখা যায়, আরও অধিক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে তারা ‘মানুষকে হাত ধোয়া শিখানো’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে এবং এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা অর্জনে কর্মকর্তাদের বিদেশ পাঠাতে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দের আবদার করেছে। এতেও মারাত্মক সমালোচনা শুরু হলে প্রকল্প পরিচালক আনোয়ার ইউসুফ এর সপক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন- আমাদের প্রস্তাব পাস হবে, এমন তো কথা নয়; ভালোমন্দ দেখার জন্য তো একনেক ও প্লানিং কমিশন আছে।

‘খিচুড়ি রান্না শেখা’ প্রকল্পের সমালোচনার জবাবেও এমন সাফাই গেয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আকরাম আল হোসেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন- এটার জন্য ‘অতি অল্প’ অর্থ চাওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হল, দেশের সাধারণ মানুষের শ্রমে-ঘামে অর্জিত ৫ কোটি টাকা যার কাছে ‘অতি অল্প’ অর্থ বলে প্রতীয়মান হয়; তার সরকারি চাকরি করার যোগ্যতা আছে কিনা অথবা তিনি আদৌ সৎ কিনা- জনগণ তেমন প্রশ্ন করতেই পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের টাকা নয়ছয় করার মতো প্রকল্প হাতে নেয়ার অধিকার তাকে বা তাদের কে দিয়েছে, এ প্রশ্নও নির্দ্বিধায় করা যায়। করোনাকালে জনগণের আর্থিক শোচনীয় অবস্থা ও বিভিন্ন প্রকল্পের অনিয়মের প্রতি আলোকপাত করে গত ১৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় ব্যয় প্রস্তাবনার বিষয়ে আপত্তি তুলে পরিকল্পনামন্ত্রী সব খাতে খরচ অর্ধেকে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয়ার পরও মন্ত্রণালয়গুলোর এমন হাস্যকর প্রকল্প গ্রহণ মানে এক ধরনের মস্করা করার শামিল।

খিচুড়ি কীভাবে রান্না করতে হয়, কীভাবে বিতরণ করতে হয় এবং এর জন্য বাজার কীভাবে করতে হয় অথবা মানুষকে কীভাবে হাত ধোয়াতে হয়- ইত্যাদি ‘কর্ম’ শেখার জন্য হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ পাঠানোর নামে যারা সরকারি অর্থ লুটপাটের ধান্ধা করেন, তাদের পত্রপাঠ বিদায় করার ব্যাপারে গ্রামের বাণ্টুনির মা, পরাইন্যার মা, পুতুইন্যার মা এবং ভূতনির মা-খালারাও মত প্রকাশ করেছেন।

এটা সম্ভব না হলে ‘সহজ পদ্ধতিতে ঘুষ খাওয়ার কৌশল’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় সরকারি কর্মকর্তাদের ‘উচ্চতর’ প্রশিক্ষণের গ্রহণের জন্য বিদেশ পাঠানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।

পরিশেষে বলব, করোনাকালে সরকারি কর্মকর্তাদের উচিত সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা। তা না করে যারা সরকারি কোষাগারের টাকা লোপাটের বিভিন্ন ফন্দি-ফিকিরে মত্ত, তাদের ব্যাপারে আরও কঠোর হওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আকুল আবেদন জানাচ্ছি।

দোহাজারী, চট্টগ্রাম

বন্ধ হোক সরকারি কর্মকর্তাদের ভ্রমণ বিলাস

 গোপাল নাথ বাবুল 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে এমন সব বিষয়ে বিদেশ সফরের কথা উল্লেখ করা হয়, যা শুনলে হাসতে হাসতে পরান বের হয়ে যাবার উপক্রম হয়।

যেমন- গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের জন্য কোন ধরনের ভবন নির্মাণ করা যায় সেটা দেখতে ৩০ কর্মকর্তার বিদেশ সফরের প্রস্তাব, গাভীর প্রজনন, আলু চাষ, পুকুর খনন, লিফট দেখা ও ফল উৎপাদনের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিদেশ সফরের প্রস্তাব ইত্যাদি।

এ সংক্রান্ত কিছু প্রস্তাব পাসের পর ইতোমধ্যে অনেক কর্মকর্তা ‘অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে’ জনগণের কষ্টার্জিত টাকার শ্রাদ্ধ করে বিদেশ সফর সম্পন্ন করে ফেলেছেন। শোনা যায়, অনেকে আবার পরিবার-পরিজন নিয়ে বিদেশে যান। সেখানে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কী ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন, তা জানা না গেলেও তাদের কেউ কেউ পরিবার-পরিজন, ইয়ার-দোস্ত সহযোগে ‘ফুর্তি-মৌজ’ সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার ডালি নিয়ে ফিরে থাকেন বলে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সূত্রে জানা গেছে।

সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাইমারি স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় একটি প্রকল্পে ১ হাজার কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠিয়ে ডিম ও সবজি খিচুড়িসহ অন্যান্য ‘রান্না এবং প্রসেসিং’ শিখতে ৫ কোটি টাকা চেয়ে বসে এবং একই বিষয়ে দেশে প্রশিক্ষণের জন্য আরও ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেয়।

এমন হাস্যকর প্রকল্পের কথা শুনে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে তড়িঘড়ি করে মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি বাতিল করে জনগণকে ধন্য করেছে।

কিন্তু যে দেশে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে সরকারি কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের কোষাগার খালি করতে অভ্যস্ত, তারা এত সহজে উদ্যম হারাবেন কেন? ফলে দেখা যায়, আরও অধিক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে তারা ‘মানুষকে হাত ধোয়া শিখানো’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে এবং এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা অর্জনে কর্মকর্তাদের বিদেশ পাঠাতে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দের আবদার করেছে। এতেও মারাত্মক সমালোচনা শুরু হলে প্রকল্প পরিচালক আনোয়ার ইউসুফ এর সপক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন- আমাদের প্রস্তাব পাস হবে, এমন তো কথা নয়; ভালোমন্দ দেখার জন্য তো একনেক ও প্লানিং কমিশন আছে।

‘খিচুড়ি রান্না শেখা’ প্রকল্পের সমালোচনার জবাবেও এমন সাফাই গেয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আকরাম আল হোসেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন- এটার জন্য ‘অতি অল্প’ অর্থ চাওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হল, দেশের সাধারণ মানুষের শ্রমে-ঘামে অর্জিত ৫ কোটি টাকা যার কাছে ‘অতি অল্প’ অর্থ বলে প্রতীয়মান হয়; তার সরকারি চাকরি করার যোগ্যতা আছে কিনা অথবা তিনি আদৌ সৎ কিনা- জনগণ তেমন প্রশ্ন করতেই পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের টাকা নয়ছয় করার মতো প্রকল্প হাতে নেয়ার অধিকার তাকে বা তাদের কে দিয়েছে, এ প্রশ্নও নির্দ্বিধায় করা যায়। করোনাকালে জনগণের আর্থিক শোচনীয় অবস্থা ও বিভিন্ন প্রকল্পের অনিয়মের প্রতি আলোকপাত করে গত ১৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় ব্যয় প্রস্তাবনার বিষয়ে আপত্তি তুলে পরিকল্পনামন্ত্রী সব খাতে খরচ অর্ধেকে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয়ার পরও মন্ত্রণালয়গুলোর এমন হাস্যকর প্রকল্প গ্রহণ মানে এক ধরনের মস্করা করার শামিল।

খিচুড়ি কীভাবে রান্না করতে হয়, কীভাবে বিতরণ করতে হয় এবং এর জন্য বাজার কীভাবে করতে হয় অথবা মানুষকে কীভাবে হাত ধোয়াতে হয়- ইত্যাদি ‘কর্ম’ শেখার জন্য হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ পাঠানোর নামে যারা সরকারি অর্থ লুটপাটের ধান্ধা করেন, তাদের পত্রপাঠ বিদায় করার ব্যাপারে গ্রামের বাণ্টুনির মা, পরাইন্যার মা, পুতুইন্যার মা এবং ভূতনির মা-খালারাও মত প্রকাশ করেছেন।

এটা সম্ভব না হলে ‘সহজ পদ্ধতিতে ঘুষ খাওয়ার কৌশল’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় সরকারি কর্মকর্তাদের ‘উচ্চতর’ প্রশিক্ষণের গ্রহণের জন্য বিদেশ পাঠানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।

পরিশেষে বলব, করোনাকালে সরকারি কর্মকর্তাদের উচিত সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা। তা না করে যারা সরকারি কোষাগারের টাকা লোপাটের বিভিন্ন ফন্দি-ফিকিরে মত্ত, তাদের ব্যাপারে আরও কঠোর হওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আকুল আবেদন জানাচ্ছি।

দোহাজারী, চট্টগ্রাম