অনতিক্রম্য রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা
jugantor
অনতিক্রম্য রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা

  সেলিম আকন্দ  

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ব্যুৎপত্তির দিন থেকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগাবধি যতজন রাষ্ট্রনায়ককে দুনিয়াবাসী স্মরণের আবরণে নিত্যবরণীয় করে রেখেছেন, তাদের মধ্যে শেখ হাসিনা অনতিক্রম্য।

এটি সবার জানা, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতিসত্তার মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিবসহ তিন ভাই- শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেলকে হারিয়ে তার জীবন মেঘাড়ম্বরে মন্দীভূত হয়ে উঠেছিল।

সেই কূলপ্লাবি কুহেলি কুহককে তিনি অবিশ্বাস্য ফুল্লকুসুমিত পুষ্পোদ্যানে শোভিত করেন; স্থিতধি ধৈর্য, অপরিমেয় ত্যাগ, বাংলার জনগণের অনিঃশেষ ভালোবাসা, সৃষ্টিকর্তার অপার কৃপা আর রাষ্ট্রনায়কোচিত রণনে। বলা চলে, একুশ যোগ সাত মিলে মোট আটাশ বছরের জঞ্জালকে জলাঞ্জলি দিয়ে দুনিয়ার মাঝে নিজেকে দুর্দমনীয় দেশিকোত্তম দৌবারিকে উন্নীত করেছেন মূলত রাষ্ট্রনায়কের ঐকান্তিক ঔদার্যে।

দুর্যোগ, দুর্বিপাক, ক্ষুধামন্দা, অপশাসন, অপুষ্টি এবং জঙ্গিবাদে দুষ্ট আর অফুরান অনুযোগ ও স্বজন তোষণে তুষ্ট একটি দেশকে তিনি উন্নীত করেছেন মধ্যম আয়ের দেশে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাকে পরিণত করেছেন ডিজিটাল বাংলাদেশে। দিয়েছেন শত বছরের ব-দ্বীপ পরিকল্পনা।

স্বপ্ন বুনেছেন ২০৪১ সাল নাগাদ মাতৃভূমি বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রের উচ্চকিত আসনে অলঙ্কৃতকরণে। দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নির্ভার আশ্রয় দিয়ে ‘মানবতার মা’র মহিমায় নিজেকে আর তার স্বদেশকে মহিমান্বিত করেছেন। আসলে তিনি নিজে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন যেমন দেখেন, তেমনি তার জনগণকে দেখান। এ কারণেই তিনি ‘ভিশনারি লিডার’। রাষ্ট্রনায়কের সহস্র সৎ গুণ পরানের গহিনে শুধু লালন ও রণন শুধু নয়, বাস্তবে এর প্রয়োগসাধন ঘটিয়ে তিনি এখন অনতিক্রম্য রাষ্ট্রনায়ক।

বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারী বলে এবং তার অকুতোভয় দ্রোহ ধমনিতে শোণিত বলে পঁচাত্তর-উত্তর মহা অমানিশাময় ঘোর দুর্দিনে স্বজনহীন প্রবাসে ছয় বছরের নির্বাসিত জীবনে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে পিতৃহত্যার বিচারে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার প্রাণপণ প্রয়াস নিয়েছিলেন। ’৯৬ সালের ২৩ জুন জনগণের ম্যান্ডেট পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। শুরু করলেন একুশ বছরের জঞ্জাল নিষ্কাশনের অনভিপ্রেত অভিযান।

সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী খুনিচক্রকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করালেন। পার্বত্য শান্তিচুক্তি করে পাহাড়ে রক্তপাত, সংঘাত ও হানাহানি বন্ধ করে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিলেন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনসহ নানা ক্ষেত্রে অভাবিত উন্নয়ন করলেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ২০০১ সালের নির্বাচনে তাকে বিরোধী দলের আসনে বসতে হল। এরপর ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক সমমনা প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানরূপে পেতে তার বয়স বাড়ানোকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠল রাজপথ। এর গলিপথ বেয়ে অনির্বাচিত সরকার কর্তৃক দুই বছর দেশ শাসন শেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয় পেলেন তিনি ও তার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সেই থেকে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন রয়েছে তার দল।

মূলত শেখ হাসিনা এক সংগ্রামশীল নারীর নাম। উপমহাদেশের পারিবারিক উত্তরাধিকারকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিপোষক হিসেবে তিনি পরিজ্ঞাত নন। কোনোভাবেই তুলনীয় নন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, তদীয় পুত্র রাজীব গান্ধী, শ্রী মাভো বন্দর নায়েকে, তার কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা, মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী, অং সাং সু চি ও বেনজীর ভুট্টোর সঙ্গে। তার চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ইন্দিরা গান্ধী বা রাজীব গান্ধীর মতো পিতামাতার অবর্তমানে মন্ত্রিত্ব বা প্রধানমন্ত্রিত্ব দিয়ে তার অভিষেক ঘটেনি।

বন্দর নায়েকে, চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা, মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী বা বেনজীর ভুট্টোর মতো অতি অল্পকাল পরে রাজনীতির মঞ্চ থেকে তার তিরোধান ঘটেনি। আবার দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে অং সাং সু চির মতো জান্তার সঙ্গে আপস করে ক্ষমতা আঁকড়ে থেকে জাতিগত নিধনযজ্ঞে তিনি মাতোয়ারা হয়ে নিজের সুনাম ও সুখ্যাতি তলানিতে নিমজ্জন করেননি; বরং সংগ্রামশীল আপসহীন পিতামাতার সান্নিধ্যে থেকে রাজনীতির বন্ধুর পাঠ নিয়েছেন।

তিনি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্রী সংসদের ভিপি ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে ছাত্রলীগের হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এরপর বঙ্গবন্ধুর দুঃখজনক প্রয়াণের পর চার দশকব্যাপী আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুম, বন্দিত্ব ও অন্তরীণ থেকে পরিপক্ব রাজনীতিবিদ থেকে রাষ্ট্রনায়কের দোর্দণ্ড প্রভাবশালী মহীরুহরূপে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছেন।

তিনিই একমাত্র সরকারপ্রধান, যিনি পরিবার পোষণনীতি পরিহারের সাহস দেখিয়েছেন। নিজ দলের তস্করদের তিনি আস্কারা দেননি। পালের গোদা ‘সম্রাট’দের ফকিরে রূপান্তর করে জেলের ভাত খাইয়ে আইনের শাসনকে সুউচ্চমানে ঊর্ধ্বচারী করেছেন। তার নির্লোভের নিশানা এমন আকাশ ছুঁইছুঁই যে, তিনি নিজের নামে পদ্মা সেতুর নামকরণের প্রস্তাব হাসিমুখে ফিরিয়ে দিয়েছেন। পতাকা হাতে খেলার মাঠে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, উজ্জীবিত করেছেন; কখনও নিজ হাতে রান্না করা খাবার খেলোয়াড়দের বাসায় পাঠিয়েছেন।

কার্যত রবীন্দ্রনাথ কথিত ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’ বইবার শক্তি সৃষ্টিকর্তা অপারভাবে তাকে দিয়েছেন। প্রায় অর্ধশত প্রাপ্ত উপাধি, সম্মাননা, ডিগ্রি কিংবা পুরস্কারের মতো বাংলার দুঃখী মানুষের হাসি দেখে নিজেকে নিত্য আপ্লুত ও উজ্জীবিত রেখেছেন।

এ কারণেই ‘মানবতার মা’ বলতে বিশ্ববাসী তাকেই জানে ও বোঝে। বঙ্গবন্ধুর রক্তে ভেজা এ ইটপাথরের নগরের বদলে মধুমতিঘেঁষা বাইগার নদী বিধৌত টুঙ্গিপাড়া তাকে অনেক বেশি টানে, যেখানে চির শান্তির নিদ্রায় শায়িত আছেন তার মহান পিতা; সেখানেই নিজের শেষ জীবনটা উপভোগ করার বড় সাধ তার। তাই ৭৪ বছরে পদার্পণের প্রাক-মুহূর্তে সরকারপ্রধানের পর্বতপ্রমাণ ক্ষমতার মোহময়তা পরিত্যাগ করার অভিপ্রায় কেবল তাকেই মানায়- ‘বয়স তো চুয়াত্তর হল, আর কত?’

বাংলার মানুষের সৌভাগ্য এই যে, ঘাতকচক্র ১৯ বার তাকে হত্যার নিশানা বানালেও বিধাতা যার সহায়, তার প্রাণবায়ু সংহারের সাধ্য কার? বস্তুত, বাংলার দুঃখী মানুষের দুঃখমোচন করে পুষ্পের হাসি ফোটানোর তরে সৃষ্টিকর্তা নিরন্তর সৃষ্টিশীল উদার মানবী হিসেবে এবং অনতিক্রম্য রাষ্ট্রনায়করূপে ৭৪ বছর বয়সেও পুণ্যতা ও পূর্ণতায় তার জীবনের সুধাপাত্র ভরে রেখেছেন। তিনি দীর্ঘায়ু লাভ করুন; শতায়ু হোন- এ একান্ত ও একাগ্র কামনা আমাদের।

শিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক

অনতিক্রম্য রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা

 সেলিম আকন্দ 
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ব্যুৎপত্তির দিন থেকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগাবধি যতজন রাষ্ট্রনায়ককে দুনিয়াবাসী স্মরণের আবরণে নিত্যবরণীয় করে রেখেছেন, তাদের মধ্যে শেখ হাসিনা অনতিক্রম্য।

এটি সবার জানা, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতিসত্তার মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিবসহ তিন ভাই- শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেলকে হারিয়ে তার জীবন মেঘাড়ম্বরে মন্দীভূত হয়ে উঠেছিল।

সেই কূলপ্লাবি কুহেলি কুহককে তিনি অবিশ্বাস্য ফুল্লকুসুমিত পুষ্পোদ্যানে শোভিত করেন; স্থিতধি ধৈর্য, অপরিমেয় ত্যাগ, বাংলার জনগণের অনিঃশেষ ভালোবাসা, সৃষ্টিকর্তার অপার কৃপা আর রাষ্ট্রনায়কোচিত রণনে। বলা চলে, একুশ যোগ সাত মিলে মোট আটাশ বছরের জঞ্জালকে জলাঞ্জলি দিয়ে দুনিয়ার মাঝে নিজেকে দুর্দমনীয় দেশিকোত্তম দৌবারিকে উন্নীত করেছেন মূলত রাষ্ট্রনায়কের ঐকান্তিক ঔদার্যে।

দুর্যোগ, দুর্বিপাক, ক্ষুধামন্দা, অপশাসন, অপুষ্টি এবং জঙ্গিবাদে দুষ্ট আর অফুরান অনুযোগ ও স্বজন তোষণে তুষ্ট একটি দেশকে তিনি উন্নীত করেছেন মধ্যম আয়ের দেশে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাকে পরিণত করেছেন ডিজিটাল বাংলাদেশে। দিয়েছেন শত বছরের ব-দ্বীপ পরিকল্পনা।

স্বপ্ন বুনেছেন ২০৪১ সাল নাগাদ মাতৃভূমি বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রের উচ্চকিত আসনে অলঙ্কৃতকরণে। দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নির্ভার আশ্রয় দিয়ে ‘মানবতার মা’র মহিমায় নিজেকে আর তার স্বদেশকে মহিমান্বিত করেছেন। আসলে তিনি নিজে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন যেমন দেখেন, তেমনি তার জনগণকে দেখান। এ কারণেই তিনি ‘ভিশনারি লিডার’। রাষ্ট্রনায়কের সহস্র সৎ গুণ পরানের গহিনে শুধু লালন ও রণন শুধু নয়, বাস্তবে এর প্রয়োগসাধন ঘটিয়ে তিনি এখন অনতিক্রম্য রাষ্ট্রনায়ক।

বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারী বলে এবং তার অকুতোভয় দ্রোহ ধমনিতে শোণিত বলে পঁচাত্তর-উত্তর মহা অমানিশাময় ঘোর দুর্দিনে স্বজনহীন প্রবাসে ছয় বছরের নির্বাসিত জীবনে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে পিতৃহত্যার বিচারে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার প্রাণপণ প্রয়াস নিয়েছিলেন। ’৯৬ সালের ২৩ জুন জনগণের ম্যান্ডেট পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। শুরু করলেন একুশ বছরের জঞ্জাল নিষ্কাশনের অনভিপ্রেত অভিযান।

সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী খুনিচক্রকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করালেন। পার্বত্য শান্তিচুক্তি করে পাহাড়ে রক্তপাত, সংঘাত ও হানাহানি বন্ধ করে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিলেন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনসহ নানা ক্ষেত্রে অভাবিত উন্নয়ন করলেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ২০০১ সালের নির্বাচনে তাকে বিরোধী দলের আসনে বসতে হল। এরপর ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক সমমনা প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানরূপে পেতে তার বয়স বাড়ানোকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠল রাজপথ। এর গলিপথ বেয়ে অনির্বাচিত সরকার কর্তৃক দুই বছর দেশ শাসন শেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয় পেলেন তিনি ও তার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সেই থেকে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন রয়েছে তার দল।

মূলত শেখ হাসিনা এক সংগ্রামশীল নারীর নাম। উপমহাদেশের পারিবারিক উত্তরাধিকারকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিপোষক হিসেবে তিনি পরিজ্ঞাত নন। কোনোভাবেই তুলনীয় নন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, তদীয় পুত্র রাজীব গান্ধী, শ্রী মাভো বন্দর নায়েকে, তার কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা, মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী, অং সাং সু চি ও বেনজীর ভুট্টোর সঙ্গে। তার চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ইন্দিরা গান্ধী বা রাজীব গান্ধীর মতো পিতামাতার অবর্তমানে মন্ত্রিত্ব বা প্রধানমন্ত্রিত্ব দিয়ে তার অভিষেক ঘটেনি।

বন্দর নায়েকে, চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা, মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী বা বেনজীর ভুট্টোর মতো অতি অল্পকাল পরে রাজনীতির মঞ্চ থেকে তার তিরোধান ঘটেনি। আবার দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে অং সাং সু চির মতো জান্তার সঙ্গে আপস করে ক্ষমতা আঁকড়ে থেকে জাতিগত নিধনযজ্ঞে তিনি মাতোয়ারা হয়ে নিজের সুনাম ও সুখ্যাতি তলানিতে নিমজ্জন করেননি; বরং সংগ্রামশীল আপসহীন পিতামাতার সান্নিধ্যে থেকে রাজনীতির বন্ধুর পাঠ নিয়েছেন।

তিনি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্রী সংসদের ভিপি ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে ছাত্রলীগের হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এরপর বঙ্গবন্ধুর দুঃখজনক প্রয়াণের পর চার দশকব্যাপী আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুম, বন্দিত্ব ও অন্তরীণ থেকে পরিপক্ব রাজনীতিবিদ থেকে রাষ্ট্রনায়কের দোর্দণ্ড প্রভাবশালী মহীরুহরূপে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছেন।

তিনিই একমাত্র সরকারপ্রধান, যিনি পরিবার পোষণনীতি পরিহারের সাহস দেখিয়েছেন। নিজ দলের তস্করদের তিনি আস্কারা দেননি। পালের গোদা ‘সম্রাট’দের ফকিরে রূপান্তর করে জেলের ভাত খাইয়ে আইনের শাসনকে সুউচ্চমানে ঊর্ধ্বচারী করেছেন। তার নির্লোভের নিশানা এমন আকাশ ছুঁইছুঁই যে, তিনি নিজের নামে পদ্মা সেতুর নামকরণের প্রস্তাব হাসিমুখে ফিরিয়ে দিয়েছেন। পতাকা হাতে খেলার মাঠে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, উজ্জীবিত করেছেন; কখনও নিজ হাতে রান্না করা খাবার খেলোয়াড়দের বাসায় পাঠিয়েছেন।

কার্যত রবীন্দ্রনাথ কথিত ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’ বইবার শক্তি সৃষ্টিকর্তা অপারভাবে তাকে দিয়েছেন। প্রায় অর্ধশত প্রাপ্ত উপাধি, সম্মাননা, ডিগ্রি কিংবা পুরস্কারের মতো বাংলার দুঃখী মানুষের হাসি দেখে নিজেকে নিত্য আপ্লুত ও উজ্জীবিত রেখেছেন।

এ কারণেই ‘মানবতার মা’ বলতে বিশ্ববাসী তাকেই জানে ও বোঝে। বঙ্গবন্ধুর রক্তে ভেজা এ ইটপাথরের নগরের বদলে মধুমতিঘেঁষা বাইগার নদী বিধৌত টুঙ্গিপাড়া তাকে অনেক বেশি টানে, যেখানে চির শান্তির নিদ্রায় শায়িত আছেন তার মহান পিতা; সেখানেই নিজের শেষ জীবনটা উপভোগ করার বড় সাধ তার। তাই ৭৪ বছরে পদার্পণের প্রাক-মুহূর্তে সরকারপ্রধানের পর্বতপ্রমাণ ক্ষমতার মোহময়তা পরিত্যাগ করার অভিপ্রায় কেবল তাকেই মানায়- ‘বয়স তো চুয়াত্তর হল, আর কত?’

বাংলার মানুষের সৌভাগ্য এই যে, ঘাতকচক্র ১৯ বার তাকে হত্যার নিশানা বানালেও বিধাতা যার সহায়, তার প্রাণবায়ু সংহারের সাধ্য কার? বস্তুত, বাংলার দুঃখী মানুষের দুঃখমোচন করে পুষ্পের হাসি ফোটানোর তরে সৃষ্টিকর্তা নিরন্তর সৃষ্টিশীল উদার মানবী হিসেবে এবং অনতিক্রম্য রাষ্ট্রনায়করূপে ৭৪ বছর বয়সেও পুণ্যতা ও পূর্ণতায় তার জীবনের সুধাপাত্র ভরে রেখেছেন। তিনি দীর্ঘায়ু লাভ করুন; শতায়ু হোন- এ একান্ত ও একাগ্র কামনা আমাদের।

শিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক