করোনাকালে মৌখিক পরীক্ষায় আইনজীবী তালিকাভুক্তকরণের বাস্তবতা
jugantor
করোনাকালে মৌখিক পরীক্ষায় আইনজীবী তালিকাভুক্তকরণের বাস্তবতা

  মর্তুজা হাসান সৈকত  

০৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করে নির্ধারিত ফি জমা দিলেই যেখানে আইনজীবী হিসেবে সনদপ্রাপ্ত হওয়া যায়; সেখানে বাংলাদেশে এ পেশায় কর্মজীবন শুরু করতে চাইলে বার কাউন্সিলের অধীন অনুষ্ঠিত প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।

বর্তমানে দেশে প্রায় অর্ধকোটি বিচারাধীন মামলার জট থাকলেও অন্তর্ভুক্তির পরীক্ষার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে এবং প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘতর হয়েছে। অথচ দেশে মামলা সংখ্যার আনুপাতিক হারে যে পরিমাণ আইনজীবী থাকা প্রয়োজন, তা নেই।

বার কাউন্সিলের বিধি অনুসারে, প্রতি ছয় মাস পরপর তালিকাভুক্তিকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা থাকলেও বিগত বছরগুলোয় দেখা গেছে, পরীক্ষার একটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লেগে যাচ্ছে। কোনো কারণে একবার কেউ অকৃতকার্য হলে তার পাঁচ থেকে ছয় বছর সময় লেগে যাচ্ছে আইনজীবী হতে। এ কারণে শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা দীর্ঘদিন উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসারে প্রতি ক্যালেন্ডার ইয়ারে পরীক্ষার একটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানিয়ে আসছে।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তিকরণের সর্বশেষ প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রাথমিক ধাপে উত্তীর্ণ প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষানবিশ আইনজীবীর জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে।

এ অবস্থায় তারা লিখিত পরীক্ষা মওকুফ করে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছে। তাদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার একটি তারিখ ঘোষণা করলেও পরীক্ষা কেন্দ্র না পাওয়া এবং করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত তা স্থগিত করা হয়েছে। অবশ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, পরীক্ষা নেয়ার ব্যাপারে বার কাউন্সিল এখনও অনড় অবস্থানেই রয়েছে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্তও এসেছে ইতোমধ্যে।

এমনকি ২২ সেপ্টেম্বর বিকালে গণভবনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এখনই এইচএসসি পরীক্ষা নেয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজনে সেখানে বিকল্পভাবে মূল্যায়নের চিন্তাভাবনা চলছে বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

তদুপরি, বার কাউন্সিল-যাদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগই হল নিয়মিত পরীক্ষা গ্রহণ না করা, তারা কীভাবে মহামারীর সময়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় না নিয়ে পরীক্ষা নেয়ার ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিয়েছে, সে প্রশ্ন পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকসহ বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে। কারণ, মাত্রই কিছুদিন আগে করোনাভাইরাসের ‘দ্বিতীয় ওয়েভ’ বিষয়ে আশঙ্কা ব্যক্ত করে সতর্ক করছে সংক্রমণ মোকাবেলায় গঠিত কারিগরি পরামর্শক কমিটি। এ অবস্থায় একটি পাবলিক পরীক্ষা নিতে যাওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে।

কারণ, যতই পরীক্ষা কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষা নেয়া হোক না কেন, এ পরিস্থিতেতে পরীক্ষা নিলে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবেই। সংক্রমণ না কমার আগে লিখিত পরীক্ষা হলে এই ১৩ হাজার পরীক্ষার্থীকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে ঢাকায় আসতে হবে। ঢাকায় আসতে নিশ্চয়ই তারা বিভিন্ন গণপরিবহন ব্যবহার করবেন। পরীক্ষার্থীদের অনেকের সঙ্গেই আসবেন অভিভাবকরাও। তাদের বড় একটি অংশ যে হোটেলগুলোয় উঠবেন সেখান থেকে ভাইরাসে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকবে।

আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে যতই দূরে দূরে বসিয়ে পরীক্ষা নেয়া হোক না কেন, এ সংখ্যক পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্র থেকে একইসঙ্গে বের হতে হবে। তাতেও ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর একটা ঝুঁকি থেকে যাবে। তাছাড়া অনেকেই আছেন, যারা দীর্ঘসময় মাস্ক পরে থাকতে পারেন না। তারা কীভাবে পরীক্ষা দেবেন, এ নিয়েও ভাবতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, করোনার প্রাদুর্ভাব না কমা পর্যন্ত যখনই পরীক্ষা হোক, কিছু-না-কিছু পরীক্ষার্থী করোনায় আক্রান্ত থাকবেই। তাদের ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেয়া হবে, সেটিও বার কাউন্সিলকে স্পষ্ট করতে হবে।

তাই সবদিক বিবেচনা করে এ বছর লিখিত পরীক্ষার আয়োজন না করে এর বিকল্প নিয়ে বার কাউন্সিল চিন্তাভাবনা করতে পারে। বিকল্প কী হতে পারে-সেটা নিয়ে তালিকাভুক্তিকরণ কমিটির সদস্যরা প্রয়োজনে বার কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারেন। সেটা হতে পারে ভাইরাসের সংক্রমণ কমে এলে শুধু এ বছরের জন্য প্রিলিমিনারি উত্তীর্ণ শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা।

তবে মেধা যাচাইয়ে লিখিত পরীক্ষা নিতেই হবে-এমন অবস্থা থাকলে জেলা জজদের অধীন স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিটি জেলায় লিখিত পরীক্ষা আয়োজনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেটি হলে তালিকাভুক্তিকরণ প্রক্রিয়ায় আবার দীর্ঘসময় লেগে যাবে। অন্যদিকে, লিখিত পরীক্ষার ব্যাপারে পরীক্ষার্থীদের প্রবল আপত্তি রয়েছে।

এর মূল কারণ হচ্ছে, ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা এবং পরীক্ষার খাতা চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ। যদিও বার কাউন্সিল বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে খাতায় OMR শিট সংযুক্ত করার ব্যাপারে উদাসীন থেকেছে। খবর নিয়ে জেনেছি, ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্তিকরণ পরীক্ষার ফলাফলে টানা ১১৮ পরীক্ষার্থী প্রিলিমিনারি ও লিখিত উভয় ধাপে উত্তীর্ণ হয়েছে।

কোনো পাবলিক পরীক্ষার পরপর দুটি ধাপে একসঙ্গে এতজন পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হলে নিশ্চয়ই যে কারও মনে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটে। তাই বিচার বিভাগের মতো বার কাউন্সিলের প্রতিটি পদক্ষেপকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি ঙগজ শিট সংযুক্ত করাসহ পরীক্ষা পদ্ধতিও যুগোপযোগী করতে হবে।

আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, প্রতি ক্যালেন্ডার ইয়ারে পরীক্ষার একটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনা থাকার পরও বার কাউন্সিল যেখানে কখনোই তা করতে পারেনি, সেখানে করোনার সংক্রমণের ভেতরে পরীক্ষা নেয়ার তোড়জোড় খারাপ নজির সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, বিশেষ বিবেচনায় বিসিএসের মতো পরীক্ষাও পিএসসি একাধিকবার দুই ধাপে সম্পন্ন করেছে নিকট অতীতে।

তাছাড়া বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার ১৯৭২-এর ৪০(১) এবং ৪০(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে ২০১৭ ও ২০২০ সালের প্রিলিমিনারি উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধিত করতেও তেমন কোনো বাধা নেই। প্রস্তাবটি শুধু রেজুলেশন আকারে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে অনুমোদন নিয়ে গেজেট প্রকাশ করলেই হয়ে যাবে।

মাত্র কিছুদিন আগে বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ আইনজীবী তালিকাভুক্তিকরণ পরীক্ষায় বারবার অকৃতকার্য হওয়া একজনের ক্ষেত্রে এভাবে গেজেট প্রকাশ করে উচ্চ আদালতে পেশা পরিচালনার সুযোগ করে দিয়েছিল।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বেশ কয়েকটি প্রদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশ যেখানে এবার মেধা যাচাইয়ের সব ধরনের পরীক্ষা পদ্ধতি বাতিল করে পরবর্তী শ্রেণিতে অটো প্রমোশন দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল মহামারীকালে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পরীক্ষার একটি ধাপকে এবারের জন্য বিনা সংশয়ে মওকুফ করতে পারে। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা। সে ক্ষেত্রে ভাইরাসের সংক্রমণ কিছুটা কমে এলে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তিকরণের প্রক্রিয়া তারা সম্পন্ন করবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এটাই হতে পারে সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ।

কবি, কলামিস্ট

[email protected]

করোনাকালে মৌখিক পরীক্ষায় আইনজীবী তালিকাভুক্তকরণের বাস্তবতা

 মর্তুজা হাসান সৈকত 
০৭ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করে নির্ধারিত ফি জমা দিলেই যেখানে আইনজীবী হিসেবে সনদপ্রাপ্ত হওয়া যায়; সেখানে বাংলাদেশে এ পেশায় কর্মজীবন শুরু করতে চাইলে বার কাউন্সিলের অধীন অনুষ্ঠিত প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।

বর্তমানে দেশে প্রায় অর্ধকোটি বিচারাধীন মামলার জট থাকলেও অন্তর্ভুক্তির পরীক্ষার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে এবং প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘতর হয়েছে। অথচ দেশে মামলা সংখ্যার আনুপাতিক হারে যে পরিমাণ আইনজীবী থাকা প্রয়োজন, তা নেই।

বার কাউন্সিলের বিধি অনুসারে, প্রতি ছয় মাস পরপর তালিকাভুক্তিকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা থাকলেও বিগত বছরগুলোয় দেখা গেছে, পরীক্ষার একটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লেগে যাচ্ছে। কোনো কারণে একবার কেউ অকৃতকার্য হলে তার পাঁচ থেকে ছয় বছর সময় লেগে যাচ্ছে আইনজীবী হতে। এ কারণে শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা দীর্ঘদিন উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসারে প্রতি ক্যালেন্ডার ইয়ারে পরীক্ষার একটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানিয়ে আসছে।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তিকরণের সর্বশেষ প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রাথমিক ধাপে উত্তীর্ণ প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষানবিশ আইনজীবীর জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে।

এ অবস্থায় তারা লিখিত পরীক্ষা মওকুফ করে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছে। তাদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার একটি তারিখ ঘোষণা করলেও পরীক্ষা কেন্দ্র না পাওয়া এবং করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত তা স্থগিত করা হয়েছে। অবশ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, পরীক্ষা নেয়ার ব্যাপারে বার কাউন্সিল এখনও অনড় অবস্থানেই রয়েছে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্তও এসেছে ইতোমধ্যে।

এমনকি ২২ সেপ্টেম্বর বিকালে গণভবনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এখনই এইচএসসি পরীক্ষা নেয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজনে সেখানে বিকল্পভাবে মূল্যায়নের চিন্তাভাবনা চলছে বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

তদুপরি, বার কাউন্সিল-যাদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগই হল নিয়মিত পরীক্ষা গ্রহণ না করা, তারা কীভাবে মহামারীর সময়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় না নিয়ে পরীক্ষা নেয়ার ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিয়েছে, সে প্রশ্ন পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকসহ বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে। কারণ, মাত্রই কিছুদিন আগে করোনাভাইরাসের ‘দ্বিতীয় ওয়েভ’ বিষয়ে আশঙ্কা ব্যক্ত করে সতর্ক করছে সংক্রমণ মোকাবেলায় গঠিত কারিগরি পরামর্শক কমিটি। এ অবস্থায় একটি পাবলিক পরীক্ষা নিতে যাওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে।

কারণ, যতই পরীক্ষা কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষা নেয়া হোক না কেন, এ পরিস্থিতেতে পরীক্ষা নিলে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবেই। সংক্রমণ না কমার আগে লিখিত পরীক্ষা হলে এই ১৩ হাজার পরীক্ষার্থীকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে ঢাকায় আসতে হবে। ঢাকায় আসতে নিশ্চয়ই তারা বিভিন্ন গণপরিবহন ব্যবহার করবেন। পরীক্ষার্থীদের অনেকের সঙ্গেই আসবেন অভিভাবকরাও। তাদের বড় একটি অংশ যে হোটেলগুলোয় উঠবেন সেখান থেকে ভাইরাসে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকবে।

আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে যতই দূরে দূরে বসিয়ে পরীক্ষা নেয়া হোক না কেন, এ সংখ্যক পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্র থেকে একইসঙ্গে বের হতে হবে। তাতেও ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর একটা ঝুঁকি থেকে যাবে। তাছাড়া অনেকেই আছেন, যারা দীর্ঘসময় মাস্ক পরে থাকতে পারেন না। তারা কীভাবে পরীক্ষা দেবেন, এ নিয়েও ভাবতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, করোনার প্রাদুর্ভাব না কমা পর্যন্ত যখনই পরীক্ষা হোক, কিছু-না-কিছু পরীক্ষার্থী করোনায় আক্রান্ত থাকবেই। তাদের ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেয়া হবে, সেটিও বার কাউন্সিলকে স্পষ্ট করতে হবে।

তাই সবদিক বিবেচনা করে এ বছর লিখিত পরীক্ষার আয়োজন না করে এর বিকল্প নিয়ে বার কাউন্সিল চিন্তাভাবনা করতে পারে। বিকল্প কী হতে পারে-সেটা নিয়ে তালিকাভুক্তিকরণ কমিটির সদস্যরা প্রয়োজনে বার কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারেন। সেটা হতে পারে ভাইরাসের সংক্রমণ কমে এলে শুধু এ বছরের জন্য প্রিলিমিনারি উত্তীর্ণ শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা।

তবে মেধা যাচাইয়ে লিখিত পরীক্ষা নিতেই হবে-এমন অবস্থা থাকলে জেলা জজদের অধীন স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিটি জেলায় লিখিত পরীক্ষা আয়োজনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেটি হলে তালিকাভুক্তিকরণ প্রক্রিয়ায় আবার দীর্ঘসময় লেগে যাবে। অন্যদিকে, লিখিত পরীক্ষার ব্যাপারে পরীক্ষার্থীদের প্রবল আপত্তি রয়েছে।

এর মূল কারণ হচ্ছে, ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা এবং পরীক্ষার খাতা চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ। যদিও বার কাউন্সিল বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে খাতায় OMR শিট সংযুক্ত করার ব্যাপারে উদাসীন থেকেছে। খবর নিয়ে জেনেছি, ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্তিকরণ পরীক্ষার ফলাফলে টানা ১১৮ পরীক্ষার্থী প্রিলিমিনারি ও লিখিত উভয় ধাপে উত্তীর্ণ হয়েছে।

কোনো পাবলিক পরীক্ষার পরপর দুটি ধাপে একসঙ্গে এতজন পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হলে নিশ্চয়ই যে কারও মনে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটে। তাই বিচার বিভাগের মতো বার কাউন্সিলের প্রতিটি পদক্ষেপকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি ঙগজ শিট সংযুক্ত করাসহ পরীক্ষা পদ্ধতিও যুগোপযোগী করতে হবে।

আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, প্রতি ক্যালেন্ডার ইয়ারে পরীক্ষার একটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনা থাকার পরও বার কাউন্সিল যেখানে কখনোই তা করতে পারেনি, সেখানে করোনার সংক্রমণের ভেতরে পরীক্ষা নেয়ার তোড়জোড় খারাপ নজির সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, বিশেষ বিবেচনায় বিসিএসের মতো পরীক্ষাও পিএসসি একাধিকবার দুই ধাপে সম্পন্ন করেছে নিকট অতীতে।

তাছাড়া বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার ১৯৭২-এর ৪০(১) এবং ৪০(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে ২০১৭ ও ২০২০ সালের প্রিলিমিনারি উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধিত করতেও তেমন কোনো বাধা নেই। প্রস্তাবটি শুধু রেজুলেশন আকারে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে অনুমোদন নিয়ে গেজেট প্রকাশ করলেই হয়ে যাবে।

মাত্র কিছুদিন আগে বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ আইনজীবী তালিকাভুক্তিকরণ পরীক্ষায় বারবার অকৃতকার্য হওয়া একজনের ক্ষেত্রে এভাবে গেজেট প্রকাশ করে উচ্চ আদালতে পেশা পরিচালনার সুযোগ করে দিয়েছিল।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বেশ কয়েকটি প্রদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশ যেখানে এবার মেধা যাচাইয়ের সব ধরনের পরীক্ষা পদ্ধতি বাতিল করে পরবর্তী শ্রেণিতে অটো প্রমোশন দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল মহামারীকালে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পরীক্ষার একটি ধাপকে এবারের জন্য বিনা সংশয়ে মওকুফ করতে পারে। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা। সে ক্ষেত্রে ভাইরাসের সংক্রমণ কিছুটা কমে এলে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তিকরণের প্রক্রিয়া তারা সম্পন্ন করবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এটাই হতে পারে সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ।

কবি, কলামিস্ট

[email protected]