জনসংযোগ ও অ্যাকটিভেশন খাতকে রক্ষার পদক্ষেপ নিন
jugantor
জনসংযোগ ও অ্যাকটিভেশন খাতকে রক্ষার পদক্ষেপ নিন

  মিলন কুমার বিশ্বাস  

০৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাকালে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে আঘাত এসেছে, তার নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাদ যায়নি ব্যবসায় বিপণনের অন্যতম প্রভাবক জনসংযোগ। নতুন স্বাভাবিকতায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা আমাদের আশাবাদী করে তোলে। আর যারা প্রচলিত বিপণন কার্যক্রমে জড়িত, তাদের জন্য করোনা এক স্থবিরতা। বিপণনের প্রথাগত ধারণা অনুযায়ী ব্যক্তি, পণ্য কিংবা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজটি দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়। এর একটি হল- এবাভ দ্য লাইন (এটিএল), যেখানে গণমাধ্যম এবং সংবাদ ব্যবস্থাপনার মধ্যদিয়ে পণ্য কিংবা প্রতিষ্ঠানকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়।

প্রযুক্তির সম্প্র্রসারণে চালু হওয়া ডিজিটাল মার্কেটিংকেও এটিএল হিসেবে ধরা যায়। জনসংযোগের অন্য ধারাটি হল- বিলো দ্য লাইন (বিটিএল), যার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে জনসমাগম করে প্রতিষ্ঠান কিংবা পণ্যকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। সম্মেলন-সমাবেশ থেকে শুরু করে মানুষকে ঘরের বাইরে এনে এ ধরনের প্রচারণা বা অ্যাকটিভেশনে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম হিসেবেই চিনি।

দেশে বাণিজ্যিকভাবে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের যাত্রা শুরু ১৯৯৯ সালের শেষের দিকে। মূলত ২০০২ সালের পর থেকেই এটি ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করে। তবে এক দশক ধরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে নতুন ধারণার এ ব্যবসা। বাণিজ্যিক আয়োজন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্মেলন-যাই হোক না কেন, এক প্রতিষ্ঠানে সব সমাধান পাওয়ার নামই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট।

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানে যে কোনো আয়োজন করতে হলে ‘জ্যাক অব অল ট্রেডস’ হতে হয়। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নে যা যা প্রয়োজন, এ-টু-জেড সমাধান বলা চলে। এ খাতের চাহিদা বাড়ায় পুরনোদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের অনেকেই যুক্ত হয়েছিলেন এ ব্যবসায়। কিন্তু করোনার কারণে ছোট ছোট ইভেন্ট কোম্পানি এরই মধ্যে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। আর পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে সংকটে পড়বে এ খাতের প্রায় সব প্রতিষ্ঠান।

লাইটিং থেকে স্টেজ ডিজাইন, কার্পেন্টার থেকে ক্যাটারিং, লজিস্টিক থেকে অপারেশন্স-সবকিছু মিলিয়ে এ সেক্টরে ৫ লাখের অধিক পেশাজীবীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। সঙ্গে পোষ্য-পরিবারের সংখ্যাও সমান। মার্চের প্রথম সপ্তাহে দেশে করোনা শনাক্তের পরে ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে জনসমাগম। সীমিত হয়ে পড়ে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের ক্ষেত্র। গত ৬ মাস সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় সব ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন বন্ধ থাকায় অস্তিত্ব সংকটে পড়ে জনসংযোগে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে করোনাকালে অনেক সেক্টরে ব্যয় সংকোচনের নামে বিজ্ঞাপন এবং অনুষ্ঠান আয়োজনে বিধিনিষেধ নিয়ে আসে মালিকপক্ষ; যেমন: ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা জনসংযোগে ব্যয় সংকোচন করে বিজ্ঞাপন সীমিত করেন।

দেশে বর্তমানে পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠান জনসংযোগের কাজ করলেও অন্যূন ২০০ প্রতিষ্ঠান নিয়মিত। এর মধ্যে দুটি বণিক সমিতি- ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএমএমএবি) এবং অ্যাডভারটাইজিং এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ এ ব্যবসায় প্রতিনিধিত্ব করছে। সচেতন ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল সত্তা হিসেবে এ ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত সবাই মহামারী থেকে দেশকে উদ্ধার করতে সরকার ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের যে কোনো উদ্যোগকে সমর্থন করতে প্রস্তুত। এজেন্সিগুলো তাদের মানবসম্পদ এবং অন্যান্য দক্ষতা নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ মহামারীর জন্য এই ইন্ডাস্ট্রির ৩০০ অংশীদারের মধ্যে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। আর বছরের বাকি সময় মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ সীমাবদ্ধ করতে হবে বলে কোনো কাজ থাকবে না; ফলে এ ইন্ডাস্ট্রি মারাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হবে। এ পরিস্থিতিতে ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখতে ঋণের কিস্তির সময় বাড়ানো ও ছাড় দেয়া, ন্যূনতম বা বিনা সুদে ব্যাংক ঋণের সুবিধা, ভ্যাট প্রদানের ক্ষেত্রে সময় বাড়ানো এবং এআইটি মওকুফ করার মতো বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন, তা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকসহ যুক্তরাজ্যভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে সবার আগে। আমরা আশাবাদী- আবারও জমে উঠবে দেশের সম্মেলন কেন্দ্রগুলো, নিরাপদ দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনেই চলবে আয়োজন। আর গত ছয় মাসে অভিজ্ঞতা তো হলই আমাদের। ডিজিটাল আয়োজন বা ওয়েবিনার কখনোই প্রচলিত আয়োজনের বিকল্প হতে পারে না; এটি একটি অনুকল্প মাত্র।

প্রধান নির্বাহী, বিটিএল হাউজ

জনসংযোগ ও অ্যাকটিভেশন খাতকে রক্ষার পদক্ষেপ নিন

 মিলন কুমার বিশ্বাস 
০৭ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাকালে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে আঘাত এসেছে, তার নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাদ যায়নি ব্যবসায় বিপণনের অন্যতম প্রভাবক জনসংযোগ। নতুন স্বাভাবিকতায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা আমাদের আশাবাদী করে তোলে। আর যারা প্রচলিত বিপণন কার্যক্রমে জড়িত, তাদের জন্য করোনা এক স্থবিরতা। বিপণনের প্রথাগত ধারণা অনুযায়ী ব্যক্তি, পণ্য কিংবা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজটি দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়। এর একটি হল- এবাভ দ্য লাইন (এটিএল), যেখানে গণমাধ্যম এবং সংবাদ ব্যবস্থাপনার মধ্যদিয়ে পণ্য কিংবা প্রতিষ্ঠানকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়।

প্রযুক্তির সম্প্র্রসারণে চালু হওয়া ডিজিটাল মার্কেটিংকেও এটিএল হিসেবে ধরা যায়। জনসংযোগের অন্য ধারাটি হল- বিলো দ্য লাইন (বিটিএল), যার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে জনসমাগম করে প্রতিষ্ঠান কিংবা পণ্যকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। সম্মেলন-সমাবেশ থেকে শুরু করে মানুষকে ঘরের বাইরে এনে এ ধরনের প্রচারণা বা অ্যাকটিভেশনে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম হিসেবেই চিনি।

দেশে বাণিজ্যিকভাবে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের যাত্রা শুরু ১৯৯৯ সালের শেষের দিকে। মূলত ২০০২ সালের পর থেকেই এটি ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করে। তবে এক দশক ধরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে নতুন ধারণার এ ব্যবসা। বাণিজ্যিক আয়োজন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্মেলন-যাই হোক না কেন, এক প্রতিষ্ঠানে সব সমাধান পাওয়ার নামই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট।

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানে যে কোনো আয়োজন করতে হলে ‘জ্যাক অব অল ট্রেডস’ হতে হয়। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নে যা যা প্রয়োজন, এ-টু-জেড সমাধান বলা চলে। এ খাতের চাহিদা বাড়ায় পুরনোদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের অনেকেই যুক্ত হয়েছিলেন এ ব্যবসায়। কিন্তু করোনার কারণে ছোট ছোট ইভেন্ট কোম্পানি এরই মধ্যে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। আর পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে সংকটে পড়বে এ খাতের প্রায় সব প্রতিষ্ঠান।

লাইটিং থেকে স্টেজ ডিজাইন, কার্পেন্টার থেকে ক্যাটারিং, লজিস্টিক থেকে অপারেশন্স-সবকিছু মিলিয়ে এ সেক্টরে ৫ লাখের অধিক পেশাজীবীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। সঙ্গে পোষ্য-পরিবারের সংখ্যাও সমান। মার্চের প্রথম সপ্তাহে দেশে করোনা শনাক্তের পরে ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে জনসমাগম। সীমিত হয়ে পড়ে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের ক্ষেত্র। গত ৬ মাস সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় সব ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন বন্ধ থাকায় অস্তিত্ব সংকটে পড়ে জনসংযোগে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে করোনাকালে অনেক সেক্টরে ব্যয় সংকোচনের নামে বিজ্ঞাপন এবং অনুষ্ঠান আয়োজনে বিধিনিষেধ নিয়ে আসে মালিকপক্ষ; যেমন: ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা জনসংযোগে ব্যয় সংকোচন করে বিজ্ঞাপন সীমিত করেন।

দেশে বর্তমানে পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠান জনসংযোগের কাজ করলেও অন্যূন ২০০ প্রতিষ্ঠান নিয়মিত। এর মধ্যে দুটি বণিক সমিতি- ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএমএমএবি) এবং অ্যাডভারটাইজিং এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ এ ব্যবসায় প্রতিনিধিত্ব করছে। সচেতন ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল সত্তা হিসেবে এ ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত সবাই মহামারী থেকে দেশকে উদ্ধার করতে সরকার ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের যে কোনো উদ্যোগকে সমর্থন করতে প্রস্তুত। এজেন্সিগুলো তাদের মানবসম্পদ এবং অন্যান্য দক্ষতা নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ মহামারীর জন্য এই ইন্ডাস্ট্রির ৩০০ অংশীদারের মধ্যে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। আর বছরের বাকি সময় মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ সীমাবদ্ধ করতে হবে বলে কোনো কাজ থাকবে না; ফলে এ ইন্ডাস্ট্রি মারাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হবে। এ পরিস্থিতিতে ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখতে ঋণের কিস্তির সময় বাড়ানো ও ছাড় দেয়া, ন্যূনতম বা বিনা সুদে ব্যাংক ঋণের সুবিধা, ভ্যাট প্রদানের ক্ষেত্রে সময় বাড়ানো এবং এআইটি মওকুফ করার মতো বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন, তা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকসহ যুক্তরাজ্যভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে সবার আগে। আমরা আশাবাদী- আবারও জমে উঠবে দেশের সম্মেলন কেন্দ্রগুলো, নিরাপদ দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনেই চলবে আয়োজন। আর গত ছয় মাসে অভিজ্ঞতা তো হলই আমাদের। ডিজিটাল আয়োজন বা ওয়েবিনার কখনোই প্রচলিত আয়োজনের বিকল্প হতে পারে না; এটি একটি অনুকল্প মাত্র।

প্রধান নির্বাহী, বিটিএল হাউজ