মধু থেকে ভ্যাকসিন
jugantor
মধু থেকে ভ্যাকসিন

  শেখ আনোয়ার  

০২ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের ছোটবড় সব দেশই করোনার ছোবল রুখতে মরিয়া। ভ্যাকসিন এখনও অনেক দূর। তবুও মুক্তির অন্য উপায় খোঁজা ও বোঝার নানাবিধ প্রচেষ্টা হচ্ছে।

বহু গবেষক তাদের আর্কাইভ থেকে ধুলো ঝেড়ে প্রাচীন গবেষণাপত্র পুনরায় বের করেছেন। একটাই উদ্দেশ্য- করোনার ভ্যাকসিন। যথাযথ টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার না হলে এ ভাইরাস ফিরে ফিরে আসবে বলেও আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের। সবার মুখেই এখন এক প্রশ্ন- কবে আসছে ভ্যাকসিন?

ভ্যাকসিনের কথা যতবার আলোচনায় আসে, ততবার পৃথিবীজুড়ে আগ্রহ দেখা যায়। মনে হয়, এ শুধু ভ্যাকসিনের দিন। বিশ্বজুড়ে ভ্যাকসিন গবেষণায় অনেক দেশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ভ্যাকসিন গবেষণায় অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথির পর সবশেষে এবার মধুতে মিলল ভ্যাকসিনের আয়ুর্বেদিক ঔষধি নানা উপাদান।

প্রশ্ন হল, এক চামচ মধুতে এমন কী উপাদান রয়েছে- যা অনেক ওষুধের স্থান দখল করতে পারে? ‘উদ্ভিদ তার নিজস্ব জিনগত প্রক্রিয়ায় ফুলের নির্যাস থেকে এ ঔষধি মধু তৈরি করে’- কথাগুলো বলেছেন ওয়েজনিনজেনে অবস্থিত উদ্ভিদ প্রজনন ও উৎপাদন গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান ওলন্দাজ প্রাণিবিজ্ঞানী টিনেক ক্রিমারস। এ প্রাণিবিজ্ঞানী আরও বলেছেন, ‘মধুতে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা মুখে খাওয়া ভ্যাকসিন বা টিকা হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। শুধু তাই নয়; কিছু মূল্যবান ওষুধের অনেক উপাদান নেয়া যায় মধু থেকে।’

ফুল থেকে উৎপাদিত এ মধু সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ। মধু উৎপাদনের সময় মৌমাছি প্রোটিন ঘনীভূত করে। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে এ ঘনীভূত হওয়া প্রক্রিয়া এত সহজে ঘটে, যা গবেষকদের ভাবনার বিষয়। মধুতে ঘনীভূত প্রোটিন সংরক্ষণের জন্য প্রকৃতিই একটি সংরক্ষক তৈরি করে দিয়েছে; আর তা হচ্ছে এর ভেতরকার চিনি। ভ্যাকসিন কর্মসূচি চালানোর অন্যতম একটি বড় বাধা হল প্রয়োজনীয় শীতলীকরণ যন্ত্রাংশ। এর অভাবে প্রোটিনকে রক্ষা করা সম্ভব হয় না; যার ফলে টিকা কর্মসূচি মাঝে মধ্যে ব্যাহত হয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মধুর অন্তর্গত চিনি শীতল স্থানে না থাকা সত্ত্বেও এর প্রোটিনকে রক্ষা করতে পারে। তাই এ প্রোটিন সবসময় সক্রিয় থেকে খুঁজে বেড়ায় কোন প্রোটিন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে তাকে আবার সক্রিয় করে তোলে।

এ ধারণা নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা চলছে। চূড়ান্ত গবেষণায় অনুকূল ফলাফল পেলে উষ্ণমণ্ডলীয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর টিকা কর্মসূচিতে এক আলোড়ন সৃষ্টি হবে। মধু নিয়ে এ গবেষণাকালে দুটি আবিষ্কার একসঙ্গে বেরিয়ে আসে। প্রথম আবিষ্কারটিতে বিজ্ঞানীরা বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েছিলেন; আর সেটি হচ্ছে, ক্যালুনা ভালগারিস জাতীয় জংলি ফুলের গাছ। উষ্ণমণ্ডলীয় দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপে এ গাছ জন্মে। ২০-৫০ সেমি. লম্বা হয়। পাতাগুলোর দৈর্ঘ্য ২-৩ মিলিমিটারের চেয়েও অনেক কম। গ্রীষ্মের শেষে ফুল ফোটে। এ উদ্ভিদের মধুর নির্যাসে এন্টিফাংগাল প্রোটিনের উপস্থিতি রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মৌমাছি নির্যাস খাওয়ার পর এর অভ্যন্তরস্থ প্রোটিন যদি হজম না করে সরাসরি মধুতে ছেড়ে দেয়, তবে একটি নতুন আশার আলো দেখা যেতে পারে। এ আশার আলোর প্রবেশ ঘটেছিল গবেষণায়। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা বাণিজ্যিকভাবে মধু উৎপাদন ফার্মের মৌমাছিগুলোকে বোভিন সেরাম এলুমিন নামের প্রোটিন মিশ্রিত চিনির দ্রবণ খাইয়ে ছিলেন।

পরীক্ষার এক পর্যায়ে দেখা যায়, মধুতে মৌমাছির ছেড়ে দেয়া প্রোটিনগুলো অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। শুধু তাই নয়, মৌমাছিদের যে ঘনত্বের দ্রবণ খাওয়ানো হয়েছিল, ঠিক সেই ঘনত্বের প্রোটিনই রয়েছে মধুতে।

দ্বিতীয় আরেকটি আবিষ্কার ছিল প্রভাবক বা প্রোমোটার। এরা নির্যাসের জিনকে সব সময় সক্রিয় রাখে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এ প্রভাবকগুলো শুধু সেসব নির্যাসেই প্রস্তুত করা যায়, যেসব নির্যাসে মৌমাছি বসে। এখন অপরাজিতা গোত্রের উদ্ভিদের নির্যাসের মাধ্যমে একটি ভ্যাকসিন তৈরির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছেন তারা। এ ভ্যাকসিন কুকুরকে আক্রমণকারী পারভো ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করবে।

প্রোটিনের পৃষ্ঠদেশের একটি বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে এ ভ্যাকসিনে, যা অ্যান্টিবডি তৈরি করে মানবকোষে করোনাভাইরাসকেও নিষ্ক্রিয় করতে পারবে। ইতোমধ্যে ক্যালুনা ভালগারিস উদ্ভিদের চাষ শুরু হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদের ফুলের নির্যাসে মৌমাছি বসে সংগ্রহ করে মধু। আর বিশেষভাবে প্রস্তুত এ মধুতে থাকবে সেই উপাদান, যা ভ্যাকসিন হিসেবে কাজ করবে।

উদ্ভিদের সাহায্যে মধুর মাধ্যমে ভ্যাকসিন তৈরির এ প্রক্রিয়া খুবই আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি ঘটনা বলে জানান কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চার্লি আর্নটজেন। তিনি ভ্যাকসিন তৈরির জন্য এক বিশেষ জাতের কলার মান উন্নয়ন ঘটিয়েছেন জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে। আগামী দিনে হয়তো করোনার মতো জটিল ভাইরাসের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় উপাদান পাওয়া যাবে এ মধু থেকে।

বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক

xposure7@gmail.com

মধু থেকে ভ্যাকসিন

 শেখ আনোয়ার 
০২ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের ছোটবড় সব দেশই করোনার ছোবল রুখতে মরিয়া। ভ্যাকসিন এখনও অনেক দূর। তবুও মুক্তির অন্য উপায় খোঁজা ও বোঝার নানাবিধ প্রচেষ্টা হচ্ছে।

বহু গবেষক তাদের আর্কাইভ থেকে ধুলো ঝেড়ে প্রাচীন গবেষণাপত্র পুনরায় বের করেছেন। একটাই উদ্দেশ্য- করোনার ভ্যাকসিন। যথাযথ টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার না হলে এ ভাইরাস ফিরে ফিরে আসবে বলেও আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের। সবার মুখেই এখন এক প্রশ্ন- কবে আসছে ভ্যাকসিন?

ভ্যাকসিনের কথা যতবার আলোচনায় আসে, ততবার পৃথিবীজুড়ে আগ্রহ দেখা যায়। মনে হয়, এ শুধু ভ্যাকসিনের দিন। বিশ্বজুড়ে ভ্যাকসিন গবেষণায় অনেক দেশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ভ্যাকসিন গবেষণায় অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথির পর সবশেষে এবার মধুতে মিলল ভ্যাকসিনের আয়ুর্বেদিক ঔষধি নানা উপাদান।

প্রশ্ন হল, এক চামচ মধুতে এমন কী উপাদান রয়েছে- যা অনেক ওষুধের স্থান দখল করতে পারে? ‘উদ্ভিদ তার নিজস্ব জিনগত প্রক্রিয়ায় ফুলের নির্যাস থেকে এ ঔষধি মধু তৈরি করে’- কথাগুলো বলেছেন ওয়েজনিনজেনে অবস্থিত উদ্ভিদ প্রজনন ও উৎপাদন গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান ওলন্দাজ প্রাণিবিজ্ঞানী টিনেক ক্রিমারস। এ প্রাণিবিজ্ঞানী আরও বলেছেন, ‘মধুতে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা মুখে খাওয়া ভ্যাকসিন বা টিকা হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। শুধু তাই নয়; কিছু মূল্যবান ওষুধের অনেক উপাদান নেয়া যায় মধু থেকে।’

ফুল থেকে উৎপাদিত এ মধু সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ। মধু উৎপাদনের সময় মৌমাছি প্রোটিন ঘনীভূত করে। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে এ ঘনীভূত হওয়া প্রক্রিয়া এত সহজে ঘটে, যা গবেষকদের ভাবনার বিষয়। মধুতে ঘনীভূত প্রোটিন সংরক্ষণের জন্য প্রকৃতিই একটি সংরক্ষক তৈরি করে দিয়েছে; আর তা হচ্ছে এর ভেতরকার চিনি। ভ্যাকসিন কর্মসূচি চালানোর অন্যতম একটি বড় বাধা হল প্রয়োজনীয় শীতলীকরণ যন্ত্রাংশ। এর অভাবে প্রোটিনকে রক্ষা করা সম্ভব হয় না; যার ফলে টিকা কর্মসূচি মাঝে মধ্যে ব্যাহত হয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মধুর অন্তর্গত চিনি শীতল স্থানে না থাকা সত্ত্বেও এর প্রোটিনকে রক্ষা করতে পারে। তাই এ প্রোটিন সবসময় সক্রিয় থেকে খুঁজে বেড়ায় কোন প্রোটিন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে তাকে আবার সক্রিয় করে তোলে।

এ ধারণা নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা চলছে। চূড়ান্ত গবেষণায় অনুকূল ফলাফল পেলে উষ্ণমণ্ডলীয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর টিকা কর্মসূচিতে এক আলোড়ন সৃষ্টি হবে। মধু নিয়ে এ গবেষণাকালে দুটি আবিষ্কার একসঙ্গে বেরিয়ে আসে। প্রথম আবিষ্কারটিতে বিজ্ঞানীরা বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েছিলেন; আর সেটি হচ্ছে, ক্যালুনা ভালগারিস জাতীয় জংলি ফুলের গাছ। উষ্ণমণ্ডলীয় দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপে এ গাছ জন্মে। ২০-৫০ সেমি. লম্বা হয়। পাতাগুলোর দৈর্ঘ্য ২-৩ মিলিমিটারের চেয়েও অনেক কম। গ্রীষ্মের শেষে ফুল ফোটে। এ উদ্ভিদের মধুর নির্যাসে এন্টিফাংগাল প্রোটিনের উপস্থিতি রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মৌমাছি নির্যাস খাওয়ার পর এর অভ্যন্তরস্থ প্রোটিন যদি হজম না করে সরাসরি মধুতে ছেড়ে দেয়, তবে একটি নতুন আশার আলো দেখা যেতে পারে। এ আশার আলোর প্রবেশ ঘটেছিল গবেষণায়। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা বাণিজ্যিকভাবে মধু উৎপাদন ফার্মের মৌমাছিগুলোকে বোভিন সেরাম এলুমিন নামের প্রোটিন মিশ্রিত চিনির দ্রবণ খাইয়ে ছিলেন।

পরীক্ষার এক পর্যায়ে দেখা যায়, মধুতে মৌমাছির ছেড়ে দেয়া প্রোটিনগুলো অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। শুধু তাই নয়, মৌমাছিদের যে ঘনত্বের দ্রবণ খাওয়ানো হয়েছিল, ঠিক সেই ঘনত্বের প্রোটিনই রয়েছে মধুতে।

দ্বিতীয় আরেকটি আবিষ্কার ছিল প্রভাবক বা প্রোমোটার। এরা নির্যাসের জিনকে সব সময় সক্রিয় রাখে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এ প্রভাবকগুলো শুধু সেসব নির্যাসেই প্রস্তুত করা যায়, যেসব নির্যাসে মৌমাছি বসে। এখন অপরাজিতা গোত্রের উদ্ভিদের নির্যাসের মাধ্যমে একটি ভ্যাকসিন তৈরির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছেন তারা। এ ভ্যাকসিন কুকুরকে আক্রমণকারী পারভো ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করবে।

প্রোটিনের পৃষ্ঠদেশের একটি বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে এ ভ্যাকসিনে, যা অ্যান্টিবডি তৈরি করে মানবকোষে করোনাভাইরাসকেও নিষ্ক্রিয় করতে পারবে। ইতোমধ্যে ক্যালুনা ভালগারিস উদ্ভিদের চাষ শুরু হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদের ফুলের নির্যাসে মৌমাছি বসে সংগ্রহ করে মধু। আর বিশেষভাবে প্রস্তুত এ মধুতে থাকবে সেই উপাদান, যা ভ্যাকসিন হিসেবে কাজ করবে।

উদ্ভিদের সাহায্যে মধুর মাধ্যমে ভ্যাকসিন তৈরির এ প্রক্রিয়া খুবই আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি ঘটনা বলে জানান কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চার্লি আর্নটজেন। তিনি ভ্যাকসিন তৈরির জন্য এক বিশেষ জাতের কলার মান উন্নয়ন ঘটিয়েছেন জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে। আগামী দিনে হয়তো করোনার মতো জটিল ভাইরাসের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় উপাদান পাওয়া যাবে এ মধু থেকে।

বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক

xposure7@gmail.com