মেজবানিতে মাছের কাঁটা
jugantor
মেজবানিতে মাছের কাঁটা

  আশরাফী বিন্তে আকরাম  

০২ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশিষ্ট ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া চট্টগ্রামের মেজবান নিয়ে একটি ছড়া লিখেছিলেন। ছড়াটি ছিল এমন-

ওরে দেশের ভাই, খুশির সীমা নাই।

জলদি আইয়ু সাজিগুজি, মেজ্জান খাইবার লাই।

আমাদের কাছে এ মেজবান বা মেজ্জান হল বাংলাদেশের বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের বহুমাত্রিক ঐতিহ্যবাহী একটি সামাজিক ভোজের আয়োজন বা অনুষ্ঠান। চট্টগ্রামের স্থানীয় লোকেরা আঞ্চলিক মেজবানকে মেজ্জান বলে থাকেন। আবার চট্টগ্রামের পার্শ্ববর্তী নোয়াখালী অঞ্চলে মেজবান জেয়াফত নামে বহুল প্রচলিত (জাতীয় বিশ্বকোষ, ২০১২)। এ মেজবানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল- সামাজিক সম্প্রীতি বা বন্ধন; যেখানে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য একই আসনে একই খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। সাধারণত কারও কুলখানি, মৃত্যুবার্ষিকী, আকিকা, জন্মদিন, ব্যক্তিগত সাফল্য, নতুন ব্যবসায়ের সূচনা, গৃহপ্রবেশ, পরিবারে কাঙ্ক্ষিত শিশুর জন্ম, বিবাহ, খাৎনা, মেয়েদের কান ছেদ এবং ধর্মীয় ব্যক্তির মৃত্যুবার্ষিকী ইত্যাদি নানা উপলক্ষে মেজবানির আয়োজন করা হয়।

নির্দিষ্ট উপলক্ষ ছাড়াও যে কোনো শুভ ঘটনায় মেজবানের আয়োজন করা হয়। রাজনৈতিক নেতারাও জনপ্রিয়তা লাভের জন্য কিংবা দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে বড় পরিসরে এ আয়োজন করে। এ বঙ্গীয় অঞ্চলের মানুষ আবার মাজার সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। তাই শীতের সময় বিভিন্ন মাজারে ওরস শরিফ, মিলাদ মাহফিলে এ গণভোজের আয়োজন করা হয়। মেজবানে অতিথিদের সাধারণত সাদা ভাত এবং গরুর মাংস খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ জানানো হয়। বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলে বিভিন্ন উপলক্ষে ভোজের আয়োজন হলেও চট্টগ্রামের মেজবানের জনপ্রিয়তার কাছে তা ঢাকা পড়ে যায়। তাই আমাদের জানা হয় না, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মেজবানির খবর। এ রকম এক মেজবানির খবর জানতে পারি এ করোনাকালে, আমার গ্রামের বাড়িতে অবস্থানকালে; আর তা হল মাছ পোলাওয়ের মেজবানি। এ বছর করোনাকালে আমরা যারা শহরবাসী, তাদের অনেকেরই দীর্ঘ সময় গ্রামে থাকার সুযোগ ঘটেছে। আমার বেলায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।

আমার গ্রাম এদেশের উত্তরবঙ্গের বগুড়া জেলার সান্তাহারে। তারাপুর, সান্তাহার রেলজংশনের পার্শ্ববর্তী সাধারণ একটি গ্রাম। অর্থনৈতিকভাবে এ গ্রামে আভিজাত্যের ছাপ খুব একটা চোখে না পড়লেও গ্রামের একটি বিশেষ রীতি চোখে পড়ল রমজানে ইফতারির গণআয়োজনে। যেহেতু সামাজিক গণউপস্থিতির নিষেধাজ্ঞা ছিল, তাই মসজিদ বা খোলা মাঠে আয়োজনের পরিবর্তে বাড়িতেই বউ-ঝিরা রান্না করে বাড়ি বাড়ি ইফতারি দেয়। অনেকের কাছে মনে হতে পারে, এ আবার নতুন কী? রমজানে তো আমরা বাড়ি বাড়ি ইফতারি দেই। বিষয়টি আমার কাছেও সেরকম মনে হলেও ইফতারির উপাদানে আমার চোখ আটকে যায়; আর তা হল ইফতারির প্লেটে হলুদমিশ্রিত ভাত দেখে।

আশ্চর্য হয়ে বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, মানুষ আবার হলুদমাখা ভাত দেয় নাকি? তিনি বললেন- না, এটি হলুদমাখা ভাত নয়; এর নাম মাছ পোলাও। পোলাও! পরে নেড়েচেড়ে দেখলাম- ভাতে মাছের উপস্থিতি না থাকলেও মাছের কাঁটার উপস্থিতি বলে দিচ্ছে, এ খাবারের নাম মাছ পোলাও বা মাছ বিরিয়ানি। ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে জানলাম, এ গ্রামের মেজবানিতে মাছ পোলাও বেশ জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী খাবার; যা বছরের পর বছর, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম একইভাবে মেজবানিতে রান্না হয়ে আসছে। এ মাছ-পোলাওয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো মাছের ব্যবহার না থাকলেও গ্রামের লোকেরা তাদের আর্থিক সঙ্গতির ওপর ভিত্তি করে সিলভার কার্প আর পাঙ্গাশ মাছ ব্যবহার করে। কারণ তা দামে কম, আকারেও বড়। ফলে এ মাছ দিয়ে বেশি পরিমাণে পোলাও রান্না করা ও অনেক মানুষের মেজবানি সম্ভব।

তবে এ খাবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, অসচ্ছল গ্রামবাসীর অনেকে মেজবানিতে অতিথি আপ্যায়নে বিরিয়ানি খাওয়ানো হয়েছে- এ মানসিক শান্তিতে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারে। হাজার হোক, আমরা তো অতিথিপরায়ণ জাতি। তাই অতিথি আপ্যায়নে পোলাও যেন শুধু একটি খাবার নয়, সমাজের দশজনের কাছে নিজের সামাজিক মর্যাদা বাড়িয়ে তোলার একটি প্রতীকও বটে। মাছ রান্নায় হলুদ আবশ্যক বলে তাই বিরিয়ানি হয় অনেকটা হলুদ মিশ্রিত ভাতের মতো। প্রথমে মসলাযোগে ঝালের আধিক্যে অধিক সময় ধরে মাছ কষাতে হয় বলে একসময় মসলা আর মাছ আলাদা করা যায় না। এ মসলামিশ্রিত মাছে সাধারণ ভাতের চাল মিশ্রণ করে কথিত পোলাও রান্না করা হয়। এ মাছ বিরিয়ানিতে মাছের অনুপাতে চালের পরিমাণ এত বেশি হয় বলে সেই বিরিয়ানিতে মাছের অস্তিত্ব একেবারে থাকে না বললেই চলে। এ মাছ পোলাওয়ে না আছে পোলাওয়ের চাল, না আছে টিভি চ্যানেলে পরীক্ষামূলক শখের রান্নায় ইলিশ, চিংড়ি কিংবা খাবারে ভিন্নতা আনতে মাংসের পরিবর্তে দামি মাছের উপস্থিতি। তবুও তারাপুরবাসীর কাছে তা পোলাও বা বিরিয়ানি। তাই পাতে নিলে মাছের অস্তিত্ব না থাকলেও কাঁটার উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয় এটি মাছ বিরিয়ানি।

এ বিরিয়ানি মুখরোচক খাবার হয়ে ওঠে এখানকার গ্রামগুলোর মেজবানি বা মজলিশে। আমার কাছে এ মাছ বিরিয়ানি বা মাছ পোলাওয়ের সামাজিকতা আর আমাদের সবার চেনা রান্না করা মাছ পোলাওয়ের রসনাবিলাস এক মনে হয়নি; বরং মনে হয়েছে দরিদ্র গ্রামবাসীর কাছে অতিথি আপ্যায়নে বা মেজবানিতে মুখরক্ষার উপাদান এ পোলাও। অথবা বলা চলে, এ খাবার তারাপুর গ্রামের নিুবিত্ত মানুষগুলোর সামাজিক পরিচয়ের একরকম প্রতিনিধিত্ব করে। গবেষক ডি বি জেলেফি অধিকাংশ সংস্কৃতির বেলায় সাধারণত পাঁচ ধরনের খাদ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে দ্বিতীয় ধরনের খাবার হচ্ছে মর্যাদাপূর্ণ খাবার, যা অনেক বিশেষ মুহূর্তে ভক্ষণ করা হয় (আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন, ১৯৬৭)। তারাপুরের মাছ-বিরিয়ানি নিঃসন্দেহে এ তালিকায় পড়ে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, চিত্রদেব তার বিবাহ বাসরের কাব্য কথায় বিশ শতকের কৃষ্ণনগরের মহারাজ কুমার গৌরীশচন্দ্র রায়ের পাকা দেখা উপলক্ষে ১৩৮ রকমের খাবারে মাছ পোলাওয়ের তালিকা দিয়েছেন। সে তালিকায় যে রুই মাছের টিকলি পোলাও (মাছের ছোট গোলাকার টিকলি বা বল) আর চিংড়ি মাছের কাশ্মীরি পোলাওয়ের কথা বলা হয়েছে (দত্ত, বঙ্গদর্শন, ২০১৭), তা থেকে তারাপুরের মাছ পোলাও সম্পূর্ণ আলাদা।

১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফেনী জেলার উত্তরাঞ্চলীয় অঞ্চলের জমিদার শমসের গাজী তার মা কোয়ারা বেগমের নামে একটি বড় পুকুর খনন উপলক্ষে ভোজের আয়োজন করেছিলেন। সেই ভোজের জন্য চট্টগ্রামের নিজামপুর এলাকার প্রতিবেশীর পুকুর থেকে মাছ ধরে আনা হয়েছিল। আবার হিন্দু ঐতিহ্যে মেজবান রান্নার সময় গরুর পরিবর্তে মাছ ব্যবহার করা হয়। এরপর থেকে চট্টগ্রামের হিন্দু সম্প্রদায় প্রতি বছর চট্টগ্রাম পরিষদ ব্যানারের অধীনে মাছ, সবজি ও শুকনো মাছ দিয়ে রান্না করা তরকারি দিয়ে মেজবানি আয়োজন করে থাকে (মমতাজ, ২০১২)। কিন্তু তারাপুরের এ মাছ পোলাওয়ের মেজবানি যেন এসব মাছ মেজবানি থেকে একেবারেই আলাদা। আবার দৈনন্দিন খাবার শেষে প্লেটের কোণে ফেলে দেয়া মাছের কাঁটা আর মাছ পোলাওয়ের মাছের কাঁটা যেন একই মাছের দুটি আলাদা অনুষঙ্গ।

আমাদের গ্রামনির্ভর এ দেশে রয়েছে খাবারের ঐতিহ্য। কিন্তু এ ঐতিহ্যবাহী খাবারের যে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য আছে, তা যেন অনালোকিত; যেমনটা তারাপুরের মাছ পোলাওয়ের মেজবানি। খাবারের তালিকায় এটি পোলাও হিসেবে আদৌ স্থান পাবে কিনা, এ নিয়ে সন্দেহ থাকলেও এ মাছ পোলাও খেতে গিয়ে অতিথিদের মধ্যে আনন্দের কমতি নেই। খাওয়ার সময় পোলাওয়ে কাঁটার উপস্থিতি যেন প্রতীকী গুরুত্ব পায় অতিথি আর অতিথি আপ্যায়নকারী উভয়ের মাঝে।

সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, হাজী মোহাম্মাদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

asrafiakram.soc@gmail.com

মেজবানিতে মাছের কাঁটা

 আশরাফী বিন্তে আকরাম 
০২ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশিষ্ট ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া চট্টগ্রামের মেজবান নিয়ে একটি ছড়া লিখেছিলেন। ছড়াটি ছিল এমন-

ওরে দেশের ভাই, খুশির সীমা নাই।

জলদি আইয়ু সাজিগুজি, মেজ্জান খাইবার লাই।

আমাদের কাছে এ মেজবান বা মেজ্জান হল বাংলাদেশের বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের বহুমাত্রিক ঐতিহ্যবাহী একটি সামাজিক ভোজের আয়োজন বা অনুষ্ঠান। চট্টগ্রামের স্থানীয় লোকেরা আঞ্চলিক মেজবানকে মেজ্জান বলে থাকেন। আবার চট্টগ্রামের পার্শ্ববর্তী নোয়াখালী অঞ্চলে মেজবান জেয়াফত নামে বহুল প্রচলিত (জাতীয় বিশ্বকোষ, ২০১২)। এ মেজবানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল- সামাজিক সম্প্রীতি বা বন্ধন; যেখানে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য একই আসনে একই খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। সাধারণত কারও কুলখানি, মৃত্যুবার্ষিকী, আকিকা, জন্মদিন, ব্যক্তিগত সাফল্য, নতুন ব্যবসায়ের সূচনা, গৃহপ্রবেশ, পরিবারে কাঙ্ক্ষিত শিশুর জন্ম, বিবাহ, খাৎনা, মেয়েদের কান ছেদ এবং ধর্মীয় ব্যক্তির মৃত্যুবার্ষিকী ইত্যাদি নানা উপলক্ষে মেজবানির আয়োজন করা হয়।

নির্দিষ্ট উপলক্ষ ছাড়াও যে কোনো শুভ ঘটনায় মেজবানের আয়োজন করা হয়। রাজনৈতিক নেতারাও জনপ্রিয়তা লাভের জন্য কিংবা দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে বড় পরিসরে এ আয়োজন করে। এ বঙ্গীয় অঞ্চলের মানুষ আবার মাজার সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। তাই শীতের সময় বিভিন্ন মাজারে ওরস শরিফ, মিলাদ মাহফিলে এ গণভোজের আয়োজন করা হয়। মেজবানে অতিথিদের সাধারণত সাদা ভাত এবং গরুর মাংস খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ জানানো হয়। বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলে বিভিন্ন উপলক্ষে ভোজের আয়োজন হলেও চট্টগ্রামের মেজবানের জনপ্রিয়তার কাছে তা ঢাকা পড়ে যায়। তাই আমাদের জানা হয় না, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মেজবানির খবর। এ রকম এক মেজবানির খবর জানতে পারি এ করোনাকালে, আমার গ্রামের বাড়িতে অবস্থানকালে; আর তা হল মাছ পোলাওয়ের মেজবানি। এ বছর করোনাকালে আমরা যারা শহরবাসী, তাদের অনেকেরই দীর্ঘ সময় গ্রামে থাকার সুযোগ ঘটেছে। আমার বেলায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।

আমার গ্রাম এদেশের উত্তরবঙ্গের বগুড়া জেলার সান্তাহারে। তারাপুর, সান্তাহার রেলজংশনের পার্শ্ববর্তী সাধারণ একটি গ্রাম। অর্থনৈতিকভাবে এ গ্রামে আভিজাত্যের ছাপ খুব একটা চোখে না পড়লেও গ্রামের একটি বিশেষ রীতি চোখে পড়ল রমজানে ইফতারির গণআয়োজনে। যেহেতু সামাজিক গণউপস্থিতির নিষেধাজ্ঞা ছিল, তাই মসজিদ বা খোলা মাঠে আয়োজনের পরিবর্তে বাড়িতেই বউ-ঝিরা রান্না করে বাড়ি বাড়ি ইফতারি দেয়। অনেকের কাছে মনে হতে পারে, এ আবার নতুন কী? রমজানে তো আমরা বাড়ি বাড়ি ইফতারি দেই। বিষয়টি আমার কাছেও সেরকম মনে হলেও ইফতারির উপাদানে আমার চোখ আটকে যায়; আর তা হল ইফতারির প্লেটে হলুদমিশ্রিত ভাত দেখে।

আশ্চর্য হয়ে বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, মানুষ আবার হলুদমাখা ভাত দেয় নাকি? তিনি বললেন- না, এটি হলুদমাখা ভাত নয়; এর নাম মাছ পোলাও। পোলাও! পরে নেড়েচেড়ে দেখলাম- ভাতে মাছের উপস্থিতি না থাকলেও মাছের কাঁটার উপস্থিতি বলে দিচ্ছে, এ খাবারের নাম মাছ পোলাও বা মাছ বিরিয়ানি। ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে জানলাম, এ গ্রামের মেজবানিতে মাছ পোলাও বেশ জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী খাবার; যা বছরের পর বছর, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম একইভাবে মেজবানিতে রান্না হয়ে আসছে। এ মাছ-পোলাওয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো মাছের ব্যবহার না থাকলেও গ্রামের লোকেরা তাদের আর্থিক সঙ্গতির ওপর ভিত্তি করে সিলভার কার্প আর পাঙ্গাশ মাছ ব্যবহার করে। কারণ তা দামে কম, আকারেও বড়। ফলে এ মাছ দিয়ে বেশি পরিমাণে পোলাও রান্না করা ও অনেক মানুষের মেজবানি সম্ভব।

তবে এ খাবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, অসচ্ছল গ্রামবাসীর অনেকে মেজবানিতে অতিথি আপ্যায়নে বিরিয়ানি খাওয়ানো হয়েছে- এ মানসিক শান্তিতে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারে। হাজার হোক, আমরা তো অতিথিপরায়ণ জাতি। তাই অতিথি আপ্যায়নে পোলাও যেন শুধু একটি খাবার নয়, সমাজের দশজনের কাছে নিজের সামাজিক মর্যাদা বাড়িয়ে তোলার একটি প্রতীকও বটে। মাছ রান্নায় হলুদ আবশ্যক বলে তাই বিরিয়ানি হয় অনেকটা হলুদ মিশ্রিত ভাতের মতো। প্রথমে মসলাযোগে ঝালের আধিক্যে অধিক সময় ধরে মাছ কষাতে হয় বলে একসময় মসলা আর মাছ আলাদা করা যায় না। এ মসলামিশ্রিত মাছে সাধারণ ভাতের চাল মিশ্রণ করে কথিত পোলাও রান্না করা হয়। এ মাছ বিরিয়ানিতে মাছের অনুপাতে চালের পরিমাণ এত বেশি হয় বলে সেই বিরিয়ানিতে মাছের অস্তিত্ব একেবারে থাকে না বললেই চলে। এ মাছ পোলাওয়ে না আছে পোলাওয়ের চাল, না আছে টিভি চ্যানেলে পরীক্ষামূলক শখের রান্নায় ইলিশ, চিংড়ি কিংবা খাবারে ভিন্নতা আনতে মাংসের পরিবর্তে দামি মাছের উপস্থিতি। তবুও তারাপুরবাসীর কাছে তা পোলাও বা বিরিয়ানি। তাই পাতে নিলে মাছের অস্তিত্ব না থাকলেও কাঁটার উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয় এটি মাছ বিরিয়ানি।

এ বিরিয়ানি মুখরোচক খাবার হয়ে ওঠে এখানকার গ্রামগুলোর মেজবানি বা মজলিশে। আমার কাছে এ মাছ বিরিয়ানি বা মাছ পোলাওয়ের সামাজিকতা আর আমাদের সবার চেনা রান্না করা মাছ পোলাওয়ের রসনাবিলাস এক মনে হয়নি; বরং মনে হয়েছে দরিদ্র গ্রামবাসীর কাছে অতিথি আপ্যায়নে বা মেজবানিতে মুখরক্ষার উপাদান এ পোলাও। অথবা বলা চলে, এ খাবার তারাপুর গ্রামের নিুবিত্ত মানুষগুলোর সামাজিক পরিচয়ের একরকম প্রতিনিধিত্ব করে। গবেষক ডি বি জেলেফি অধিকাংশ সংস্কৃতির বেলায় সাধারণত পাঁচ ধরনের খাদ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে দ্বিতীয় ধরনের খাবার হচ্ছে মর্যাদাপূর্ণ খাবার, যা অনেক বিশেষ মুহূর্তে ভক্ষণ করা হয় (আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন, ১৯৬৭)। তারাপুরের মাছ-বিরিয়ানি নিঃসন্দেহে এ তালিকায় পড়ে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, চিত্রদেব তার বিবাহ বাসরের কাব্য কথায় বিশ শতকের কৃষ্ণনগরের মহারাজ কুমার গৌরীশচন্দ্র রায়ের পাকা দেখা উপলক্ষে ১৩৮ রকমের খাবারে মাছ পোলাওয়ের তালিকা দিয়েছেন। সে তালিকায় যে রুই মাছের টিকলি পোলাও (মাছের ছোট গোলাকার টিকলি বা বল) আর চিংড়ি মাছের কাশ্মীরি পোলাওয়ের কথা বলা হয়েছে (দত্ত, বঙ্গদর্শন, ২০১৭), তা থেকে তারাপুরের মাছ পোলাও সম্পূর্ণ আলাদা।

১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফেনী জেলার উত্তরাঞ্চলীয় অঞ্চলের জমিদার শমসের গাজী তার মা কোয়ারা বেগমের নামে একটি বড় পুকুর খনন উপলক্ষে ভোজের আয়োজন করেছিলেন। সেই ভোজের জন্য চট্টগ্রামের নিজামপুর এলাকার প্রতিবেশীর পুকুর থেকে মাছ ধরে আনা হয়েছিল। আবার হিন্দু ঐতিহ্যে মেজবান রান্নার সময় গরুর পরিবর্তে মাছ ব্যবহার করা হয়। এরপর থেকে চট্টগ্রামের হিন্দু সম্প্রদায় প্রতি বছর চট্টগ্রাম পরিষদ ব্যানারের অধীনে মাছ, সবজি ও শুকনো মাছ দিয়ে রান্না করা তরকারি দিয়ে মেজবানি আয়োজন করে থাকে (মমতাজ, ২০১২)। কিন্তু তারাপুরের এ মাছ পোলাওয়ের মেজবানি যেন এসব মাছ মেজবানি থেকে একেবারেই আলাদা। আবার দৈনন্দিন খাবার শেষে প্লেটের কোণে ফেলে দেয়া মাছের কাঁটা আর মাছ পোলাওয়ের মাছের কাঁটা যেন একই মাছের দুটি আলাদা অনুষঙ্গ।

আমাদের গ্রামনির্ভর এ দেশে রয়েছে খাবারের ঐতিহ্য। কিন্তু এ ঐতিহ্যবাহী খাবারের যে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য আছে, তা যেন অনালোকিত; যেমনটা তারাপুরের মাছ পোলাওয়ের মেজবানি। খাবারের তালিকায় এটি পোলাও হিসেবে আদৌ স্থান পাবে কিনা, এ নিয়ে সন্দেহ থাকলেও এ মাছ পোলাও খেতে গিয়ে অতিথিদের মধ্যে আনন্দের কমতি নেই। খাওয়ার সময় পোলাওয়ে কাঁটার উপস্থিতি যেন প্রতীকী গুরুত্ব পায় অতিথি আর অতিথি আপ্যায়নকারী উভয়ের মাঝে।

সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, হাজী মোহাম্মাদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

asrafiakram.soc@gmail.com