রমজানে করোনা ওয়ার্ডে রোগী ভোগান্তি নিরসনের উপায় কী?
jugantor
রমজানে করোনা ওয়ার্ডে রোগী ভোগান্তি নিরসনের উপায় কী?

  শ.ই.শামীম  

৩১ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত রোজায় আমাদের হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডের অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি-রোজার শুরুতেই আমাদের হাসপাতালের রোগী সেবার মান পড়ে গেল।

একজন বৃদ্ধা মহিলা, যিনি কিডনি ডায়ালাইসিসের রোগী, সকাল থেকে ডায়ালাইসিস ইউনিটের ডাক্তাররা সেই রোগীর আত্মীয়কে ফোনের পর ফোন দিচ্ছেন রোগীকে ডায়ালাইসিসে নিয়ে যাওয়ার জন্য; অথচ ওয়ার্ডবয়ের অভাবে নেওয়া যাচ্ছে না।

পাঁচ ঘন্টা পরে আমি জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ ট্রলি নিয়ে যাই। একাই রোগীকে ডায়ালাইসিসে পৌঁছে দেই। ততক্ষণে রোগী অচেতন হয়ে গেছে। সময় তখন দুপুর ২টা। নেহায়েত ভাগ্যগুণে সে যাত্রায় তিনি বেঁচে যান।

তবে বিখ্যাত ব্যাংকার শহিদুল ইসলাম বাদলের সে সৌভাগ্যটুকু হলো না। বলতে গেলে আমার হাতের উপরেই তিনি মারা গেলেন। সেদিন লিফট বিকল ছিল। দুপুর দুটোর আগেই পিপিই পড়েছি; সারা বিকাল কাঁধে করে অক্সিজেন সিলিন্ডার সাততলা পর্যন্ত উঠিয়েছি। সন্ধ্যার পর একজন নামজাদা সাংবাদিককে কাঁধে করে সিঁড়ি বেয়ে নামিয়ে আইসিইউতে নিয়েছি। এরপর রাত নয়টার দিকে যখন পিপিই খুলতে যাব, তখন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মহোদয় মি. বাদলের বেড নম্বর দিয়ে সেখানে যেতে বললেন।

কিন্তু রোগী সেই বেডে ছিলেন না। সে সময় ওয়ার্ডের ভেতরে কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়নি। রোগীরা ইচ্ছামতো বেড পরিবর্তন করত। কয়েকটা ফ্লোর ঘুরে রোগীকে না পেয়ে যখন ফিরে যাচ্ছিলাম, তখন একজন বললেন-‘আপনি নাম ধরে ডাকলে এই রোগী আঙ্গুল নাড়ায়; হয়তো তিনিই হবেন।’ রোগী প্রায় অচেতন ছিল। রোগীর আত্মীয়-স্বজন ফোনে রোগীকে না পেয়ে তত্ত্বাবধায়ক স্যারকে ফোন করেছিল। এ প্রেক্ষিতেই আমাকে সেখানে পাঠানো হয়। যাক, পাওয়া তো গেল। স্যারকে জানালাম।

তিনি ডাক্তার-নার্স পাঠাবেন বললেন; কিন্তু পাঠাতে পারলেন না। তখন তারাবির নামাজ চলছে। সবাই ইবাদতে মশগুল। শেষমেশ আমার মতোই আরেকজন দৈনিকভিত্তিক কর্মীকে পাঠালেন। দুজনে অনেক কষ্টে রোগীকে আইসিইউতে নিয়েছিলাম; কিন্তু ততক্ষণে রোগীর ব্রেন ড্যামেজ হয়ে গেছে। তাকে আর বাঁচানো যায়নি।

এমন বিষাদময় কাহিনি অনেক আছে, যা লিখলে পত্রিকার পাতা ভিজে যাবে। বরং আমরা এর কারণ খুঁজে দেখি। এজন্য হাসপাতালের মসজিদে উঁকি দিতে হবে। হাসপাতালের নিচতলায় একদম পেটের ভিতরে ‘জিরো পয়েন্টে’ রয়েছে পরিপাটি এক মসজিদ। গত বছর এপ্রিল মাসে যখন সারা দেশে, এমন কী পবিত্র মক্কা-মদিনার সব মসজিদে নামাজ আদায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল; তখনও এ মসজিদ পুরোদমে চালু ছিল। জামাতে নামাজ হতো, লম্বা সূরা দিয়ে, দীর্ঘ সময় নিয়ে।

আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেন যুদ্ধের ময়দানে পালা করে দুই জামাতে নামাজ পড়ার জন্য। নবীজী (সা.) কর্মব্যস্তকালীন ছোট ছোট সূরা দিয়ে, কম সময় খরচ করে নামাজ আদায়ের তাগিদ দিয়েছেন। সে সব মহান বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে কোনো লাভ হয়নি।

দমবন্ধ করা পিপিই পড়ার চেয়ে সুশীতল ফ্যানের হাওয়ায় দীর্ঘ সময় কাটিয়ে নামাজ পড়া শ্রেয় ভাবলেন অনেকেই। অথচ ওই মসজিদের ১২ ফুট উপরে শ্বাসকষ্টে রোগীদের জীবন যায়-যায় অবস্থা। রোগীদের কষ্টে যে আল্লাহপাক কষ্ট পায়, তা অনেক বলে কয়েও তাদের বোঝানো গেল না।

অঘোষিত লকডাউনে তখন বাজার-ঘাট, আমদানি-রপ্তানি সব বন্ধ। ঘন ঘন লিফট বিকল হচ্ছে; কিন্তু মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। লিফট্ কোম্পানির লোকেরা নাকি করোনার ভয়ে হাসপাতালে ঢোকে না। অথচ সে সময় মিস্ত্রি এনে মসজিদের ফলস্ সিলিং লাগানো হলো, নতুন নতুন সিলিং ফ্যান লাগানো হলো। এক-দেড় লাখ টাকা দামের জাঁকজমকপূর্ণ মিম্বার বসলো-বিশাল আয়োজন! অথচ নবীজী (সা.) সিংহাসনতুল্য মিম্বার মসজিদে বসানোর পক্ষে ছিলেন না। লকডাউনের মতো পণ্য ঘাটতির সময়ে এটা আরও অকল্পনীয়!

কানাঘুষা শোনা গেল-হাসপাতালের দুর্নীতির কিয়দংশ নাকি মসজিদে ঢালা হয়েছে। ইমাম হিসাবে কর্মরত ব্যক্তিকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করে সদুত্তর পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, হাসপাতালের জনবল কাঠামোতে কোনো ইমাম পদ নেই; তাই এক ব্যক্তিকে আমার মতোই দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে পরিছন্নতাকর্মী হিসাবে পদায়িত দেখানো হয়েছে। এরপর তাকে ইসিজি করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

নির্মম সত্য হলো, করোনার প্রথম তরঙ্গের ভয়াল দিনগুলোতে (গত বছরের এপ্রিল মাসে), যখন এ হাসপাতালটি কর্মী সংকটে ভুগছিল; তখন এই স্বঘোষিত ইমাম সাহেব করোনার ভয়ে ইসিজি করতে ওয়ার্ডে যেত না। নিরুপায় হয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সাহেব আমাকেসহ আরও কজন ওয়ার্ডবয়কে ইসিজি মেশিন অপারেট করা শেখালেন। আমরা পিপিই পরে ওয়ার্ডে গিয়ে ইসিজি করতাম, উনি (স্বঘোষিত ইমাম সাহেব) ইবাদাত বন্দেগী করে নিজের জন্য বেহেশতের পথ সুগম করতেন।

এরপর এলো রোজার মাস। তখন গরমকাল। এসিবিহীন ওয়ার্ডগুলোতে দমবন্ধ করা পিপিই পরা অবস্থায় কয়েক ঘণ্টা ডিউটি করতে হলে দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। প্রথমে খাবার এবং ওষুধপত্র (যদি থাকে) খেয়ে এক-দুটো ওরস্যালাইন খাওয়া, এরপর বাথরুম সেরে তবেই পিপিই পরিধান করতে হয়। পিপিই পরা অবস্থায় খাওয়া বা বাথরুম করার প্রয়োজন দেখা দিলে পিপিই খুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে-রাষ্ট্রের ক্ষতি হবে এক-দেড় হাজার টাকা, তাই এত পূর্বপ্রস্তুতি। কয়েক ঘণ্টা পিপিই পরা অবস্থায় থাকলে শরীর খুব ঘামতে থাকে।

সারা শরীরের ঘাম পায়ের সু-কভারে জমতে থাকে। তখন ডি-হাইড্রেশনের দরুন মাথা ঘুরতে থাকে। পিপিই খুলে স্যালাইন খেয়ে সুস্থ হতে হয়। রোজার ওয়াক্তে স্যালাইন খাওয়া হারাম, তাই রোজাদারদের জন্য এ সময় পিপিই পরে ডিউটি করা কষ্টকর-বলতে গেলে অসম্ভব একটি ব্যাপার। এরপর রাতের তারাবি নামাজ, যা অনেক সময়ব্যাপী ইবাদত।

অথচ এই সন্ধ্যা-পরবর্তী সময়টুকু ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডক্টর ভিজিট, রাতের ওষুধ কেনা, হঠাৎ ভুলে কোনো ওষুধ বাদ পরে যাওয়া নৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রকৃতপক্ষে রোজার মাসে দুপুরের পর থেকেই রোজাদারদের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। আর ভারি কাজকর্ম হলে তো কোনো কথাই নেই।

এই হলো দেশের প্রথম কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের ‘ভিতর বাড়ির’ চালচিত্র। এ ধরনের গাফিলতিজনিত মৃত্যু আইনের দৃষ্টিতে আমলযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে হত্যা মামলা পর্যন্ত দায়ের হতে পারে। করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগীরা কার্যত বন্দি জীবনযাপন করে। পিপিই পরা ওয়ার্ডবয় ও ক্যান্টিনবয়রা যদি অক্সিজেন, ওষুধ, খাবার ও পানিটুকু সরবরাহে দেরি করে, তাহলে রোগীর জীবন বিপন্ন হয়ে থাকে, মারা যেতেও দেখেছি।

অভিজ্ঞতা, তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে লিখছি-বাংলাদেশে গাফলতিজনিত কারণে যত করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে, তার বেশিরভাগই ঘটেছে ওয়ার্ডবয় তথা এটেনডেন্টদের ভুলে; যদিও দিনশেষে সব দায়ভার বর্তায় ডাক্তারদের কাঁধে। ব্যাপারটি হলো, গুরুতর শ্বাসকষ্টের রোগী দুই মিনিট অক্সিজেন না পেলে মারা যেতে পারে। ডাক্তার-নার্সরা রোগীর কাছে পৌঁছার আগেই তা ঘটে যায়।

ক্ষিপ্র ও প্রখর মনোযোগী এটেনডেন্টদের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ এক্ষেত্রে ফলদায়ক। চীন, কিউবা প্রভৃতি সমাজতান্ত্রিক ঘরানার দেশে ‘নগ্নপদ চিকিৎসকের’ (Bear Footed Doctor) অবদান এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এরা মূলত প্যারামেডিক। রোগীর কাছে থাকে। ডাক্তারদেরকে যথাসম্ভব সংক্রমণমুক্ত রাখে। বিশ্বকবির ভাষায়-‘মরিবার বেলায় ইহারাই মরে।

কিন্তু বাঁচিবার পথ বাহির করিয়া দেয় ইহারাই।’ ইংরেজিতে বলে-‘ফ্রেঞ্চ ওয়াজ সেইভড্ বাই দ্যা ইডিয়টস্।’ জেনারেল হাসপাতালের একজন ওয়ার্ডবয়ের চেয়ে একজন কোভিড ওয়ার্ডবয়ের দায়িত্ব, কার্যপরিধি ও যোগ্যতা অনেক-অনেক-অনেক গুণ বেশি। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটেছে পুরো উল্টো। হাসপাতালের কর্মকর্তা এবং আউটসোর্সিংয়ের কন্ট্রাকটরের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতায় অস্থায়ী ভিত্তিতে কোভিড ওয়ার্ডবয়দের নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে স্বাস্থ্য বিভাগের কমকর্তা-কর্মচারীদের বেকার স্বজনরা অগ্রাধিকার পায়; যাদের অনেকেরই এ বিষয়ে যোগ্যতা নেই।

যাই হোক, আসন্ন রমজানে ‘করণীয়’ বিষয়ে আসি। ধর্মান্ধদের হেদায়েত করা আমাদের ‘কম্ম’ নয়। আল্লাহপাক যাকে হেদায়েত না করেন, সে হেদায়েত প্রাপ্ত হন না। অতএব আমাদের বিকল্প খুঁজতে হবে। হাসপাতালে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ অমুসলিম (ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী) কর্মী নিয়োগ দেওয়া হলে মুসলমানদের ধর্মীয় সময়গুলোতে তারা সেবা অটুট রাখতে পারত। ঈদের বন্ধে সরকারি জেনারেল হাসপাতালে রোগী মৃত্যু বেড়ে যায়-এমন সংবাদ পত্রিকায় অনেক পেয়ে থাকি।

কোভিডের মতো ‘অতি নির্ভরশীল ও বন্দি’ রোগীর ক্ষেত্রে তা আরও বেশি ঘটবে-এটাই স্বাভাবিক এবং সংক্রমণের এই উর্ধ্বগতির সময় তা ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’। অতএব রোজা শুরুর পনের দিন আগেই ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীভুক্ত কর্মী নিয়োগ দেওয়া দরকার, যাতে পনের দিনের ‘অন-দ্যা-জব’ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে রোজার প্রথম দিন থেকেই তারা প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ডিউটিতে নিযুক্ত থাকেন। তাহলে মুসলমান সম্মুখযোদ্ধারা ইফতার ও তারাবি পড়তে পারবে; অথচ রোগী সেবায় কোনো বিঘ্ন ঘটবে না।

এক বছর আগে যখন কোভিড-১৯ ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন সারা বিশ্ব অপ্রস্তুত ছিল। সব হাসপাতাল কিছু না কিছু ভুল করেছে। হয়তো মানবজাতি তা ক্ষমা করবে। তবে এখন ‘দ্বিতীয় তরঙ্গের’ ভুলগুলোর ক্ষমা পাওয়া কঠিন হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা যেন বিষয়টি মনে রাখেন।

করোনাকালীন দৈনিক ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত স্বতঃপ্রণোদিত কর্মী, কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল

রমজানে করোনা ওয়ার্ডে রোগী ভোগান্তি নিরসনের উপায় কী?

 শ.ই.শামীম 
৩১ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত রোজায় আমাদের হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডের অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি-রোজার শুরুতেই আমাদের হাসপাতালের রোগী সেবার মান পড়ে গেল।

একজন বৃদ্ধা মহিলা, যিনি কিডনি ডায়ালাইসিসের রোগী, সকাল থেকে ডায়ালাইসিস ইউনিটের ডাক্তাররা সেই রোগীর আত্মীয়কে ফোনের পর ফোন দিচ্ছেন রোগীকে ডায়ালাইসিসে নিয়ে যাওয়ার জন্য; অথচ ওয়ার্ডবয়ের অভাবে নেওয়া যাচ্ছে না।

পাঁচ ঘন্টা পরে আমি জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ ট্রলি নিয়ে যাই। একাই রোগীকে ডায়ালাইসিসে পৌঁছে দেই। ততক্ষণে রোগী অচেতন হয়ে গেছে। সময় তখন দুপুর ২টা। নেহায়েত ভাগ্যগুণে সে যাত্রায় তিনি বেঁচে যান।

তবে বিখ্যাত ব্যাংকার শহিদুল ইসলাম বাদলের সে সৌভাগ্যটুকু হলো না। বলতে গেলে আমার হাতের উপরেই তিনি মারা গেলেন। সেদিন লিফট বিকল ছিল। দুপুর দুটোর আগেই পিপিই পড়েছি; সারা বিকাল কাঁধে করে অক্সিজেন সিলিন্ডার সাততলা পর্যন্ত উঠিয়েছি। সন্ধ্যার পর একজন নামজাদা সাংবাদিককে কাঁধে করে সিঁড়ি বেয়ে নামিয়ে আইসিইউতে নিয়েছি। এরপর রাত নয়টার দিকে যখন পিপিই খুলতে যাব, তখন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মহোদয় মি. বাদলের বেড নম্বর দিয়ে সেখানে যেতে বললেন।

কিন্তু রোগী সেই বেডে ছিলেন না। সে সময় ওয়ার্ডের ভেতরে কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়নি। রোগীরা ইচ্ছামতো বেড পরিবর্তন করত। কয়েকটা ফ্লোর ঘুরে রোগীকে না পেয়ে যখন ফিরে যাচ্ছিলাম, তখন একজন বললেন-‘আপনি নাম ধরে ডাকলে এই রোগী আঙ্গুল নাড়ায়; হয়তো তিনিই হবেন।’ রোগী প্রায় অচেতন ছিল। রোগীর আত্মীয়-স্বজন ফোনে রোগীকে না পেয়ে তত্ত্বাবধায়ক স্যারকে ফোন করেছিল। এ প্রেক্ষিতেই আমাকে সেখানে পাঠানো হয়। যাক, পাওয়া তো গেল। স্যারকে জানালাম।

তিনি ডাক্তার-নার্স পাঠাবেন বললেন; কিন্তু পাঠাতে পারলেন না। তখন তারাবির নামাজ চলছে। সবাই ইবাদতে মশগুল। শেষমেশ আমার মতোই আরেকজন দৈনিকভিত্তিক কর্মীকে পাঠালেন। দুজনে অনেক কষ্টে রোগীকে আইসিইউতে নিয়েছিলাম; কিন্তু ততক্ষণে রোগীর ব্রেন ড্যামেজ হয়ে গেছে। তাকে আর বাঁচানো যায়নি।

এমন বিষাদময় কাহিনি অনেক আছে, যা লিখলে পত্রিকার পাতা ভিজে যাবে। বরং আমরা এর কারণ খুঁজে দেখি। এজন্য হাসপাতালের মসজিদে উঁকি দিতে হবে। হাসপাতালের নিচতলায় একদম পেটের ভিতরে ‘জিরো পয়েন্টে’ রয়েছে পরিপাটি এক মসজিদ। গত বছর এপ্রিল মাসে যখন সারা দেশে, এমন কী পবিত্র মক্কা-মদিনার সব মসজিদে নামাজ আদায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল; তখনও এ মসজিদ পুরোদমে চালু ছিল। জামাতে নামাজ হতো, লম্বা সূরা দিয়ে, দীর্ঘ সময় নিয়ে।

আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেন যুদ্ধের ময়দানে পালা করে দুই জামাতে নামাজ পড়ার জন্য। নবীজী (সা.) কর্মব্যস্তকালীন ছোট ছোট সূরা দিয়ে, কম সময় খরচ করে নামাজ আদায়ের তাগিদ দিয়েছেন। সে সব মহান বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে কোনো লাভ হয়নি।

দমবন্ধ করা পিপিই পড়ার চেয়ে সুশীতল ফ্যানের হাওয়ায় দীর্ঘ সময় কাটিয়ে নামাজ পড়া শ্রেয় ভাবলেন অনেকেই। অথচ ওই মসজিদের ১২ ফুট উপরে শ্বাসকষ্টে রোগীদের জীবন যায়-যায় অবস্থা। রোগীদের কষ্টে যে আল্লাহপাক কষ্ট পায়, তা অনেক বলে কয়েও তাদের বোঝানো গেল না।

অঘোষিত লকডাউনে তখন বাজার-ঘাট, আমদানি-রপ্তানি সব বন্ধ। ঘন ঘন লিফট বিকল হচ্ছে; কিন্তু মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। লিফট্ কোম্পানির লোকেরা নাকি করোনার ভয়ে হাসপাতালে ঢোকে না। অথচ সে সময় মিস্ত্রি এনে মসজিদের ফলস্ সিলিং লাগানো হলো, নতুন নতুন সিলিং ফ্যান লাগানো হলো। এক-দেড় লাখ টাকা দামের জাঁকজমকপূর্ণ মিম্বার বসলো-বিশাল আয়োজন! অথচ নবীজী (সা.) সিংহাসনতুল্য মিম্বার মসজিদে বসানোর পক্ষে ছিলেন না। লকডাউনের মতো পণ্য ঘাটতির সময়ে এটা আরও অকল্পনীয়!

কানাঘুষা শোনা গেল-হাসপাতালের দুর্নীতির কিয়দংশ নাকি মসজিদে ঢালা হয়েছে। ইমাম হিসাবে কর্মরত ব্যক্তিকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করে সদুত্তর পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, হাসপাতালের জনবল কাঠামোতে কোনো ইমাম পদ নেই; তাই এক ব্যক্তিকে আমার মতোই দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে পরিছন্নতাকর্মী হিসাবে পদায়িত দেখানো হয়েছে। এরপর তাকে ইসিজি করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

নির্মম সত্য হলো, করোনার প্রথম তরঙ্গের ভয়াল দিনগুলোতে (গত বছরের এপ্রিল মাসে), যখন এ হাসপাতালটি কর্মী সংকটে ভুগছিল; তখন এই স্বঘোষিত ইমাম সাহেব করোনার ভয়ে ইসিজি করতে ওয়ার্ডে যেত না। নিরুপায় হয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সাহেব আমাকেসহ আরও কজন ওয়ার্ডবয়কে ইসিজি মেশিন অপারেট করা শেখালেন। আমরা পিপিই পরে ওয়ার্ডে গিয়ে ইসিজি করতাম, উনি (স্বঘোষিত ইমাম সাহেব) ইবাদাত বন্দেগী করে নিজের জন্য বেহেশতের পথ সুগম করতেন।

এরপর এলো রোজার মাস। তখন গরমকাল। এসিবিহীন ওয়ার্ডগুলোতে দমবন্ধ করা পিপিই পরা অবস্থায় কয়েক ঘণ্টা ডিউটি করতে হলে দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। প্রথমে খাবার এবং ওষুধপত্র (যদি থাকে) খেয়ে এক-দুটো ওরস্যালাইন খাওয়া, এরপর বাথরুম সেরে তবেই পিপিই পরিধান করতে হয়। পিপিই পরা অবস্থায় খাওয়া বা বাথরুম করার প্রয়োজন দেখা দিলে পিপিই খুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে-রাষ্ট্রের ক্ষতি হবে এক-দেড় হাজার টাকা, তাই এত পূর্বপ্রস্তুতি। কয়েক ঘণ্টা পিপিই পরা অবস্থায় থাকলে শরীর খুব ঘামতে থাকে।

সারা শরীরের ঘাম পায়ের সু-কভারে জমতে থাকে। তখন ডি-হাইড্রেশনের দরুন মাথা ঘুরতে থাকে। পিপিই খুলে স্যালাইন খেয়ে সুস্থ হতে হয়। রোজার ওয়াক্তে স্যালাইন খাওয়া হারাম, তাই রোজাদারদের জন্য এ সময় পিপিই পরে ডিউটি করা কষ্টকর-বলতে গেলে অসম্ভব একটি ব্যাপার। এরপর রাতের তারাবি নামাজ, যা অনেক সময়ব্যাপী ইবাদত।

অথচ এই সন্ধ্যা-পরবর্তী সময়টুকু ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডক্টর ভিজিট, রাতের ওষুধ কেনা, হঠাৎ ভুলে কোনো ওষুধ বাদ পরে যাওয়া নৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রকৃতপক্ষে রোজার মাসে দুপুরের পর থেকেই রোজাদারদের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। আর ভারি কাজকর্ম হলে তো কোনো কথাই নেই।

এই হলো দেশের প্রথম কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের ‘ভিতর বাড়ির’ চালচিত্র। এ ধরনের গাফিলতিজনিত মৃত্যু আইনের দৃষ্টিতে আমলযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে হত্যা মামলা পর্যন্ত দায়ের হতে পারে। করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগীরা কার্যত বন্দি জীবনযাপন করে। পিপিই পরা ওয়ার্ডবয় ও ক্যান্টিনবয়রা যদি অক্সিজেন, ওষুধ, খাবার ও পানিটুকু সরবরাহে দেরি করে, তাহলে রোগীর জীবন বিপন্ন হয়ে থাকে, মারা যেতেও দেখেছি।

অভিজ্ঞতা, তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে লিখছি-বাংলাদেশে গাফলতিজনিত কারণে যত করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে, তার বেশিরভাগই ঘটেছে ওয়ার্ডবয় তথা এটেনডেন্টদের ভুলে; যদিও দিনশেষে সব দায়ভার বর্তায় ডাক্তারদের কাঁধে। ব্যাপারটি হলো, গুরুতর শ্বাসকষ্টের রোগী দুই মিনিট অক্সিজেন না পেলে মারা যেতে পারে। ডাক্তার-নার্সরা রোগীর কাছে পৌঁছার আগেই তা ঘটে যায়।

ক্ষিপ্র ও প্রখর মনোযোগী এটেনডেন্টদের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ এক্ষেত্রে ফলদায়ক। চীন, কিউবা প্রভৃতি সমাজতান্ত্রিক ঘরানার দেশে ‘নগ্নপদ চিকিৎসকের’ (Bear Footed Doctor) অবদান এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এরা মূলত প্যারামেডিক। রোগীর কাছে থাকে। ডাক্তারদেরকে যথাসম্ভব সংক্রমণমুক্ত রাখে। বিশ্বকবির ভাষায়-‘মরিবার বেলায় ইহারাই মরে।

কিন্তু বাঁচিবার পথ বাহির করিয়া দেয় ইহারাই।’ ইংরেজিতে বলে-‘ফ্রেঞ্চ ওয়াজ সেইভড্ বাই দ্যা ইডিয়টস্।’ জেনারেল হাসপাতালের একজন ওয়ার্ডবয়ের চেয়ে একজন কোভিড ওয়ার্ডবয়ের দায়িত্ব, কার্যপরিধি ও যোগ্যতা অনেক-অনেক-অনেক গুণ বেশি। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটেছে পুরো উল্টো। হাসপাতালের কর্মকর্তা এবং আউটসোর্সিংয়ের কন্ট্রাকটরের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতায় অস্থায়ী ভিত্তিতে কোভিড ওয়ার্ডবয়দের নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে স্বাস্থ্য বিভাগের কমকর্তা-কর্মচারীদের বেকার স্বজনরা অগ্রাধিকার পায়; যাদের অনেকেরই এ বিষয়ে যোগ্যতা নেই।

যাই হোক, আসন্ন রমজানে ‘করণীয়’ বিষয়ে আসি। ধর্মান্ধদের হেদায়েত করা আমাদের ‘কম্ম’ নয়। আল্লাহপাক যাকে হেদায়েত না করেন, সে হেদায়েত প্রাপ্ত হন না। অতএব আমাদের বিকল্প খুঁজতে হবে। হাসপাতালে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ অমুসলিম (ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী) কর্মী নিয়োগ দেওয়া হলে মুসলমানদের ধর্মীয় সময়গুলোতে তারা সেবা অটুট রাখতে পারত। ঈদের বন্ধে সরকারি জেনারেল হাসপাতালে রোগী মৃত্যু বেড়ে যায়-এমন সংবাদ পত্রিকায় অনেক পেয়ে থাকি।

কোভিডের মতো ‘অতি নির্ভরশীল ও বন্দি’ রোগীর ক্ষেত্রে তা আরও বেশি ঘটবে-এটাই স্বাভাবিক এবং সংক্রমণের এই উর্ধ্বগতির সময় তা ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’। অতএব রোজা শুরুর পনের দিন আগেই ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীভুক্ত কর্মী নিয়োগ দেওয়া দরকার, যাতে পনের দিনের ‘অন-দ্যা-জব’ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে রোজার প্রথম দিন থেকেই তারা প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ডিউটিতে নিযুক্ত থাকেন। তাহলে মুসলমান সম্মুখযোদ্ধারা ইফতার ও তারাবি পড়তে পারবে; অথচ রোগী সেবায় কোনো বিঘ্ন ঘটবে না।

এক বছর আগে যখন কোভিড-১৯ ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন সারা বিশ্ব অপ্রস্তুত ছিল। সব হাসপাতাল কিছু না কিছু ভুল করেছে। হয়তো মানবজাতি তা ক্ষমা করবে। তবে এখন ‘দ্বিতীয় তরঙ্গের’ ভুলগুলোর ক্ষমা পাওয়া কঠিন হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা যেন বিষয়টি মনে রাখেন।

করোনাকালীন দৈনিক ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত স্বতঃপ্রণোদিত কর্মী, কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন