এবার কোনো ভুল নয়
jugantor
এবার কোনো ভুল নয়

  নাবিল হাসান  

০৭ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এবারের লকডাউনে আর আগের ভুল করা যাবে না। হেলায়-ফেলায় নন্দলাল হওয়ার দিন শেষ। অন্তত দুবেলা আধপেটা খেয়েপরে বেঁচে থাকার ‘প্লান অ্যান্ড পলিসি’ করতে হবে। তবে সেই পলিসি কেমন হবে, অভিজ্ঞতা থেকে বলছি-

১. করোনার প্রথম ওয়েভে বাসায় এসে আমার পরিবারের সবাই মিলে হরেক রকম সবজি ও ধান চাষ করা শুরু করেছিলাম। হাতে কলমের দাগ আর মগজে ক্লাসের পড়াগুলো ভোলার আগেই মাঠে নেমে পড়তে হয়েছিল।

কাস্তে আর কোদালের জোরে গোটা পাঁচ-ছয় মাস সানন্দে কেটেছিল। সুতরাং, এবারের লকডাউনে বাসায় এসেই চাষবাস আর গৃহে মুরগি, কবুতর ইত্যাদি চাষ করার পরামর্শ থাকবে। পুকুরে মাছ চাষ করলেও মন্দ না। এতে করে নিজেরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই মৌলিক চাহিদা বহুলাংশে মেটানো যাবে। যদি খাদ্যের জোগানটা নিজেরাই দেওয়া যায়, তাহলে বাকি সমস্যাগুলো গৌণ মনে হবে।

২. লকডাউনে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে হয় কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের। হোস্টেল বা হলে অবস্থান করে নিজেরাই টিউশন করে যারা পড়াশোনার খরচ চালাত এবং বাসায়ও খরচাপাতি দিত, তারাই এখন বাসায় এসে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফলে পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ এসে পড়ছে। কিন্তু প্রথম থেকেই যদি টিউশনটা অনলাইনে করে নেওয়া যায়, তাহলে বাসায় বসেও টাকা আয় করে পরিবারকে একটু হলেও সাহায্য করা যেতে পারে। অনলাইনে টিউশনির টুলস অ্যান্ড অভিজ্ঞতার ব্যাপারগুলো একটু আগেভাগেই ঝালাই করে নিলে ভালো হয়।

৩. গত লকডাউনে আগাম প্রস্তুতি নিয়েও কিছু ভুল ছিল; যেমন বাসায় যাওয়ার সময় স্বল্প পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে যাওয়া কারণ-সবাই ভেবেছে, এটা তো সাতদিনই থাকবে; তাই প্রয়োজনীয় বইপত্র হোস্টেলে বা হলে রেখে আসা হয়েছিল। ব্যবসায়ীরাও কিছু ভুল করে বসেছিল। যেমন-চরম অবস্থা বিবেচনায় না নিয়ে বিনিয়োগ করে বসা, ঋণ করে ফেলা ইত্যাদি। এবার সব শ্রেণির মানুষেরই উচিত, বুঝেশুনে ঘরে ফেরা; যাতে ঘরে ফেরার পর বিরাট কোনো আফসোস না পেয়ে বসে! এমনিতেই বিষণ্ন মন, তার ওপর আফসোস এসে আরও জ্বালা বাড়িয়ে দিবে।

৪. লকডাউনে যাওয়ার আগে থাকতে হবে আত্মোন্নয়নমূলক কিছু পদক্ষেপ। যে কাজগুলো ঘরে বসেই দিব্যি করে ফেলা যাবে। যেমন-স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্লান, অনলাইন বিজনেস প্লান, কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজ প্লান ইত্যাদি। এসব করলে অবসর সময়টা যেমন আনন্দে কেটে যাবে, তেমনি আগামীর জন্যও নিজেকে আরেকটু প্রস্তুত করা যাবে।

৫. গত লকডাউনে আত্মহত্যা, ধর্ষণ, ব্যক্তিগত আক্রমণের হারও অনেকাংশে বেড়ে গিয়েছিল। এ থেকে বাঁচতে হলে অবশ্যই সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। হতাশ হওয়া যাবে না; কারণ উপর্যুক্ত পদক্ষেপগুলো নিলে হতাশা লাঘব হবে। আর শারীরিক দূরত্ব বাড়লেও যাতে সামাজিক দূরত্ব না বাড়ে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জনগণ উভয়কেই এই মহামারির ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।

৬. লকডাউন ঘোষণা করলেই অনলাইন জগৎটা একটু চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তাই অবশ্যই নিজেসহ পরিবারের সদস্যদের অনলাইনের ব্যাপারে একটু সচেতন থাকা বিশেষ প্রয়োজন। অনলাইনে বুলিং, ক্রাইম, মিসইউজ ইত্যাদি থেকে সাবধান থাকতে হবে। সবাইকে অবশ্যই আরও একটি জায়গায় নজর দিতে হবে আর সেটি হলো, অনলাইনে হতাশাজনক কোনো পোস্ট দেওয়া যাবে না। এসব পোস্ট সবাইকে আতঙ্কিত এবং বিপন্ন করে তোলে। আমাদের অনলাইনটা ঠিক থাকলে ‘ঝামেলা’ আরেকটু কম হবে। সমস্যা কাউকে বলে-কয়ে আসে না। আগাম প্রস্তুতিই পারে সেটির ধাক্কা মোকাবিলা করতে। লকডাউনের অন্যান্য বিধিনিষেধের পাশাপাশি আমাদের উচিত এ ব্যাপারগুলো মাথায় রাখা, যাতে বিপদ রুখার ক্ষেত্রে আমরা না হেরে যাই।

সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এবার কোনো ভুল নয়

 নাবিল হাসান 
০৭ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এবারের লকডাউনে আর আগের ভুল করা যাবে না। হেলায়-ফেলায় নন্দলাল হওয়ার দিন শেষ। অন্তত দুবেলা আধপেটা খেয়েপরে বেঁচে থাকার ‘প্লান অ্যান্ড পলিসি’ করতে হবে। তবে সেই পলিসি কেমন হবে, অভিজ্ঞতা থেকে বলছি-

১. করোনার প্রথম ওয়েভে বাসায় এসে আমার পরিবারের সবাই মিলে হরেক রকম সবজি ও ধান চাষ করা শুরু করেছিলাম। হাতে কলমের দাগ আর মগজে ক্লাসের পড়াগুলো ভোলার আগেই মাঠে নেমে পড়তে হয়েছিল।

কাস্তে আর কোদালের জোরে গোটা পাঁচ-ছয় মাস সানন্দে কেটেছিল। সুতরাং, এবারের লকডাউনে বাসায় এসেই চাষবাস আর গৃহে মুরগি, কবুতর ইত্যাদি চাষ করার পরামর্শ থাকবে। পুকুরে মাছ চাষ করলেও মন্দ না। এতে করে নিজেরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই মৌলিক চাহিদা বহুলাংশে মেটানো যাবে। যদি খাদ্যের জোগানটা নিজেরাই দেওয়া যায়, তাহলে বাকি সমস্যাগুলো গৌণ মনে হবে।

২. লকডাউনে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে হয় কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের। হোস্টেল বা হলে অবস্থান করে নিজেরাই টিউশন করে যারা পড়াশোনার খরচ চালাত এবং বাসায়ও খরচাপাতি দিত, তারাই এখন বাসায় এসে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফলে পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ এসে পড়ছে। কিন্তু প্রথম থেকেই যদি টিউশনটা অনলাইনে করে নেওয়া যায়, তাহলে বাসায় বসেও টাকা আয় করে পরিবারকে একটু হলেও সাহায্য করা যেতে পারে। অনলাইনে টিউশনির টুলস অ্যান্ড অভিজ্ঞতার ব্যাপারগুলো একটু আগেভাগেই ঝালাই করে নিলে ভালো হয়।

৩. গত লকডাউনে আগাম প্রস্তুতি নিয়েও কিছু ভুল ছিল; যেমন বাসায় যাওয়ার সময় স্বল্প পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে যাওয়া কারণ-সবাই ভেবেছে, এটা তো সাতদিনই থাকবে; তাই প্রয়োজনীয় বইপত্র হোস্টেলে বা হলে রেখে আসা হয়েছিল। ব্যবসায়ীরাও কিছু ভুল করে বসেছিল। যেমন-চরম অবস্থা বিবেচনায় না নিয়ে বিনিয়োগ করে বসা, ঋণ করে ফেলা ইত্যাদি। এবার সব শ্রেণির মানুষেরই উচিত, বুঝেশুনে ঘরে ফেরা; যাতে ঘরে ফেরার পর বিরাট কোনো আফসোস না পেয়ে বসে! এমনিতেই বিষণ্ন মন, তার ওপর আফসোস এসে আরও জ্বালা বাড়িয়ে দিবে।

৪. লকডাউনে যাওয়ার আগে থাকতে হবে আত্মোন্নয়নমূলক কিছু পদক্ষেপ। যে কাজগুলো ঘরে বসেই দিব্যি করে ফেলা যাবে। যেমন-স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্লান, অনলাইন বিজনেস প্লান, কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজ প্লান ইত্যাদি। এসব করলে অবসর সময়টা যেমন আনন্দে কেটে যাবে, তেমনি আগামীর জন্যও নিজেকে আরেকটু প্রস্তুত করা যাবে।

৫. গত লকডাউনে আত্মহত্যা, ধর্ষণ, ব্যক্তিগত আক্রমণের হারও অনেকাংশে বেড়ে গিয়েছিল। এ থেকে বাঁচতে হলে অবশ্যই সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। হতাশ হওয়া যাবে না; কারণ উপর্যুক্ত পদক্ষেপগুলো নিলে হতাশা লাঘব হবে। আর শারীরিক দূরত্ব বাড়লেও যাতে সামাজিক দূরত্ব না বাড়ে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জনগণ উভয়কেই এই মহামারির ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।

৬. লকডাউন ঘোষণা করলেই অনলাইন জগৎটা একটু চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তাই অবশ্যই নিজেসহ পরিবারের সদস্যদের অনলাইনের ব্যাপারে একটু সচেতন থাকা বিশেষ প্রয়োজন। অনলাইনে বুলিং, ক্রাইম, মিসইউজ ইত্যাদি থেকে সাবধান থাকতে হবে। সবাইকে অবশ্যই আরও একটি জায়গায় নজর দিতে হবে আর সেটি হলো, অনলাইনে হতাশাজনক কোনো পোস্ট দেওয়া যাবে না। এসব পোস্ট সবাইকে আতঙ্কিত এবং বিপন্ন করে তোলে। আমাদের অনলাইনটা ঠিক থাকলে ‘ঝামেলা’ আরেকটু কম হবে। সমস্যা কাউকে বলে-কয়ে আসে না। আগাম প্রস্তুতিই পারে সেটির ধাক্কা মোকাবিলা করতে। লকডাউনের অন্যান্য বিধিনিষেধের পাশাপাশি আমাদের উচিত এ ব্যাপারগুলো মাথায় রাখা, যাতে বিপদ রুখার ক্ষেত্রে আমরা না হেরে যাই।

সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন