মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা
jugantor
মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা

  ড. হারুন রশীদ  

১৪ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

উৎসবপ্রিয় বাঙালির মন ভালো নেই। করোনা মহামারি তাদের একঘরে করেছে। সেই যে এক বছর আগে মরণ থাবা বসিয়েছিল প্রাণঘাতী ভাইরাস কোডিভ-১৯; এখন তা নানা মাত্রায় বেড়ে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মৃত্যু আর বিভীষিকার মধ্যে আমাদের নিত্য বাস।

এমন কোনো দিন নেই, যেদিন কারও না কারও প্রিয়জন হারানোর মর্মন্তুদ খবর শুনতে হয় না। হাসপাতালে রোগীর ঠাঁই হচ্ছে না। প্রতিটি বাড়িই যেন এক-একটি হাসপাতালে পরিণত হয়েছে। মুমূর্ষু রোগীর শ্বাস নেওয়ার জন্য অক্সিজেনের সংকট। অত্যন্ত ছোঁয়াচে করোনাভাইরাস যেন আমাদের জীবনের সব আনন্দ কেড়ে নিয়েছে।

দুঃখজনক হচ্ছে, এ বড় দুর্যোগও আমাদের কিছু শেখাতে পারছে না। যেখানে মাস্ক পরা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো সাধারণ স্বাস্থ্যবিধিগুলো মানলেই প্রাণঘাতী ভাইরাসকে কাবু করা যায়; তা মানার কোনো বালাই নেই। মৃত্যু যত বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে উদাসীনতা। বাধ্য হয়ে সরকার এবার সপ্তাহজুড়ে দেশব্যাপাী কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে। ফলে এবারের নববর্ষ শুরু হচ্ছে গৃহবন্দি অবস্থায়।

দুই.

বাঙালির যে কয়টি উৎসব আছে, তার মধ্যে পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ একটি সার্বজনীন অনুষ্ঠান। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি ও বয়সের মানুষ এই উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। গ্রামগঞ্জে তো বটেই, নাগরিক জীবনেও জায়গা করে নিয়েছে এই উৎসব।

রমনার বটমূলে ছায়ানট পরিবেশিত সংগীতে বর্ষবরণের আয়োজন, চারুকলা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্তমানে বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই এক কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গেয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানায়।

নানা রঙবেরঙের পোশাকে সজ্জিত হয়ে সব বয়সি মানুষজন অংশ নেয় এই উৎসবে। বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। থাকে পান্তা ইলিশ ও ভর্তার আয়োজন। সব মিলিয়ে এদিন এক অনাবিল আনন্দ-উৎসবে মাতে সমগ্র বাঙালি জাতি।

বৈশাখে কেনাকাটারও ধুম পড়ে যায়। সরকার বৈশাখী ভাতাও চালু করেছে উৎসবের গুরুত্ব বিবেচনায়। এটি নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে উৎসবে। এছাড়া বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের।

সারা বিশ্বের অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও নাগরিক জীবনের এবং সরকারি কর্মকাণ্ডের সবকিছু চলে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের হিসাবে। তারপরও বাঙালির গভীর মানসে বাংলা নববর্ষের স্থান অনেক উঁচুতে। বাঙালির মনপ্রাণজুড়ে রয়েছে বাংলা নববর্ষ। এদেশের কৃষক-শ্রমিক, জেলে-তাঁতি, কামার-কুমোরসহ নানা পেশার মানুষ যুগ যুগ ধরে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে আসছে আনন্দ-উৎসব ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে।

ব্যবসায়ীরা এখনও হিসাবের নতুন খাতা ‘হালখাতা’ খোলেন বৈশাখের প্রথম দিনে। এ জন্য মিষ্টান্নেরও আয়োজন থাকে। নববর্ষ উপলক্ষে গ্রামেগঞ্জের নদীর পাড়ে, খোলা মাঠে কিংবা বটগাছের ছায়ায় মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় দোকানিরা মুড়ি-মুড়কি, পুতুল, খেলনা, মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল ও বাঁশিসহ বাঁশের তৈরি বিভিন্ন জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসে।

এভাবে বৈশাখ আসে আমাদের প্রাণের উৎসব হয়ে। আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে এটি এখন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলা সনের উৎপত্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত এই দেশের মানুষের জীবনধারা ও প্রকৃতি। ফসলের মৌসুম ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন তারিখ তথা পঞ্জিকার প্রবর্তন হলেও এ নববর্ষ উৎসব বাঙালির চিন্তা চেতনার সঙ্গে মিশে গেছে। এটি এমন এক উৎসব, যাকে মুসলমান, হিন্দু বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ সবাই সার্বজনীনভাবে প্রাণের আনন্দে বরণ করে নেয়।

তিন.

এবারের নববর্ষে এসবের কিছুই হচ্ছে না। জীবন বাঁচাতে যেমন জীবিকা বিসর্জন দিতে হচ্ছে; তেমনি উৎসবের আনুষ্ঠানিকতাগুলোও দিতে হচ্ছে বাদ। জীবন থেমে থাকবে না। করোনাকালের মহাসংকট কাটিয়ে নিশ্চয়ই আবার জমবে মেলা বটতলা-হাটখোলা।

কেননা, বাংলা নববর্ষ হচ্ছে সুর ও সংগীতের, আনন্দ ও উৎসবের, সাহস ও সংকল্পের। দুঃখ, গ্লানি ও অতীতের ব্যর্থতা পেছনে ফেলে তাই এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেওয়ার দিন পহেলা বৈশাখ। দেশের কল্যাণে সবাই এক কাতারে শামিল হয়ে এগিয়ে যাওয়ার অগ্নিশপথ নেওয়ার দিনও এটি।

পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও বৈশাখের চেতনায় সিক্ত হতে হবে আমাদের। সব বাধাবিপত্তি ও বিধিনিষেধ জয় করে এগিয়ে যেতে হবে। দূর করতে হবে সব কলুষতা। এবারের বৈশাখে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটুক। করোনামুক্ত হোক বিশ্ব। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। স্বাগত ১৪২৮ বঙ্গাব্দ।

সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com

মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা

 ড. হারুন রশীদ 
১৪ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

উৎসবপ্রিয় বাঙালির মন ভালো নেই। করোনা মহামারি তাদের একঘরে করেছে। সেই যে এক বছর আগে মরণ থাবা বসিয়েছিল প্রাণঘাতী ভাইরাস কোডিভ-১৯; এখন তা নানা মাত্রায় বেড়ে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মৃত্যু আর বিভীষিকার মধ্যে আমাদের নিত্য বাস।

এমন কোনো দিন নেই, যেদিন কারও না কারও প্রিয়জন হারানোর মর্মন্তুদ খবর শুনতে হয় না। হাসপাতালে রোগীর ঠাঁই হচ্ছে না। প্রতিটি বাড়িই যেন এক-একটি হাসপাতালে পরিণত হয়েছে। মুমূর্ষু রোগীর শ্বাস নেওয়ার জন্য অক্সিজেনের সংকট। অত্যন্ত ছোঁয়াচে করোনাভাইরাস যেন আমাদের জীবনের সব আনন্দ কেড়ে নিয়েছে।

দুঃখজনক হচ্ছে, এ বড় দুর্যোগও আমাদের কিছু শেখাতে পারছে না। যেখানে মাস্ক পরা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো সাধারণ স্বাস্থ্যবিধিগুলো মানলেই প্রাণঘাতী ভাইরাসকে কাবু করা যায়; তা মানার কোনো বালাই নেই। মৃত্যু যত বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে উদাসীনতা। বাধ্য হয়ে সরকার এবার সপ্তাহজুড়ে দেশব্যাপাী কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে। ফলে এবারের নববর্ষ শুরু হচ্ছে গৃহবন্দি অবস্থায়।

দুই.

বাঙালির যে কয়টি উৎসব আছে, তার মধ্যে পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ একটি সার্বজনীন অনুষ্ঠান। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি ও বয়সের মানুষ এই উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। গ্রামগঞ্জে তো বটেই, নাগরিক জীবনেও জায়গা করে নিয়েছে এই উৎসব।

রমনার বটমূলে ছায়ানট পরিবেশিত সংগীতে বর্ষবরণের আয়োজন, চারুকলা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্তমানে বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই এক কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গেয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানায়।

নানা রঙবেরঙের পোশাকে সজ্জিত হয়ে সব বয়সি মানুষজন অংশ নেয় এই উৎসবে। বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। থাকে পান্তা ইলিশ ও ভর্তার আয়োজন। সব মিলিয়ে এদিন এক অনাবিল আনন্দ-উৎসবে মাতে সমগ্র বাঙালি জাতি।

বৈশাখে কেনাকাটারও ধুম পড়ে যায়। সরকার বৈশাখী ভাতাও চালু করেছে উৎসবের গুরুত্ব বিবেচনায়। এটি নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে উৎসবে। এছাড়া বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের।

সারা বিশ্বের অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও নাগরিক জীবনের এবং সরকারি কর্মকাণ্ডের সবকিছু চলে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের হিসাবে। তারপরও বাঙালির গভীর মানসে বাংলা নববর্ষের স্থান অনেক উঁচুতে। বাঙালির মনপ্রাণজুড়ে রয়েছে বাংলা নববর্ষ। এদেশের কৃষক-শ্রমিক, জেলে-তাঁতি, কামার-কুমোরসহ নানা পেশার মানুষ যুগ যুগ ধরে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে আসছে আনন্দ-উৎসব ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে।

ব্যবসায়ীরা এখনও হিসাবের নতুন খাতা ‘হালখাতা’ খোলেন বৈশাখের প্রথম দিনে। এ জন্য মিষ্টান্নেরও আয়োজন থাকে। নববর্ষ উপলক্ষে গ্রামেগঞ্জের নদীর পাড়ে, খোলা মাঠে কিংবা বটগাছের ছায়ায় মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় দোকানিরা মুড়ি-মুড়কি, পুতুল, খেলনা, মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল ও বাঁশিসহ বাঁশের তৈরি বিভিন্ন জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসে।

এভাবে বৈশাখ আসে আমাদের প্রাণের উৎসব হয়ে। আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে এটি এখন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলা সনের উৎপত্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত এই দেশের মানুষের জীবনধারা ও প্রকৃতি। ফসলের মৌসুম ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন তারিখ তথা পঞ্জিকার প্রবর্তন হলেও এ নববর্ষ উৎসব বাঙালির চিন্তা চেতনার সঙ্গে মিশে গেছে। এটি এমন এক উৎসব, যাকে মুসলমান, হিন্দু বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ সবাই সার্বজনীনভাবে প্রাণের আনন্দে বরণ করে নেয়।

তিন.

এবারের নববর্ষে এসবের কিছুই হচ্ছে না। জীবন বাঁচাতে যেমন জীবিকা বিসর্জন দিতে হচ্ছে; তেমনি উৎসবের আনুষ্ঠানিকতাগুলোও দিতে হচ্ছে বাদ। জীবন থেমে থাকবে না। করোনাকালের মহাসংকট কাটিয়ে নিশ্চয়ই আবার জমবে মেলা বটতলা-হাটখোলা।

কেননা, বাংলা নববর্ষ হচ্ছে সুর ও সংগীতের, আনন্দ ও উৎসবের, সাহস ও সংকল্পের। দুঃখ, গ্লানি ও অতীতের ব্যর্থতা পেছনে ফেলে তাই এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেওয়ার দিন পহেলা বৈশাখ। দেশের কল্যাণে সবাই এক কাতারে শামিল হয়ে এগিয়ে যাওয়ার অগ্নিশপথ নেওয়ার দিনও এটি।

পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও বৈশাখের চেতনায় সিক্ত হতে হবে আমাদের। সব বাধাবিপত্তি ও বিধিনিষেধ জয় করে এগিয়ে যেতে হবে। দূর করতে হবে সব কলুষতা। এবারের বৈশাখে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটুক। করোনামুক্ত হোক বিশ্ব। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। স্বাগত ১৪২৮ বঙ্গাব্দ।

সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন