সোশ্যাল মিডিয়ার গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়া জরুরি
jugantor
সোশ্যাল মিডিয়ার গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়া জরুরি

  ফাবিহা বিনতে হক  

২১ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একবিংশ শতাব্দীর পুরোটা জুড়েই চলছে প্রযুক্তির জয়জয়কার। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজে প্রযুক্তির কাছে আমরা দায়বদ্ধ। করোনা মহামারি যেন সেই দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে দিয়েছে আরও শতগুণে।

কিন্তু বিনিময়ে আমরা প্রযুক্তিকে কী দিচ্ছি? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইন্টারনেটের শক্তিতে পৃথিবীর প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে আমরা একাত্ম হতে পারছি, সম্পর্ক গড়ছি, ভাঙছি, হারানো বন্ধুকে খুঁজে পাচ্ছি।

তবে প্রযুক্তি কেন সিদ্ধহস্তে আমাদের জীবন সহজ করে তুলছে-এ প্রশ্নগুলো আমাদের মাথায় কখনো বাজে না। কারণ, আমরা হাতের ওই ছোট বৈদ্যুতিক ডিভাইসটিতে এতটাই ডুবে থাকি যে, দু-দণ্ড ভাবার সময় আমাদের হয় না।

অবশ্য এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে নেটফ্লিক্সের ‘The Social Dilemma’ ডকুমেন্টারিতে। প্রায় দেড় ঘণ্টার এ ডকুমেন্টারি দেখতে বসলে আপনি এক মিনিটের জন্যও চোখ ফেরাতে পারবেন না, তা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। এখানে দেখানো হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ার অন্ধকার জগতের ভয়াবহ চিত্র। যেখানে অভিনেতা স্বয়ং আপনি, আমি, আমরা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, জিমেইল, গুগলসহ যাবতীয় সব যোগাযোগ মাধ্যম কোন পলিসিতে কাজ করে, তাদের উদ্দেশ্য কী-তার সবটারই সচিত্র বর্ণনা আপনারা শুনতে পাবেন তাদেরই ইঞ্জিনিয়ারদের কাছ থেকে। The Social Dilemma-তে বেশ কয়েকটি চমৎকার কোটেশন আছে যা আপনার ভাবনার জগতে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে: ‘lf you're not paying for the products, you're the products. অর্থাৎ, কোনো পণ্য ব্যবহার করতে আপনাকে যদি মূল্য দিতে না-হয়; তবে মনে রাখবেন পণ্যটি স্বয়ং আপনি।

দিনের-পর-দিন ধরে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে যাচ্ছি এবং ব্যবহারের হার দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। ব্যক্তিগত আচরণ থেকে শুরু করে পেশাগত কাজ সবকিছুতেই ইন্টারনেটকে জড়াতে হয়।

আমাদের প্রতিটি তথ্য তারা সংরক্ষণ করে, প্রতিটি কার্যবিধি লক্ষ করে। ইন্টারনেট কর্তৃপক্ষ জানে, আপনি শেষ কবে আপনার সাবেক প্রেমিকার ছবি দেখেছিলেন কতক্ষণ ধরে; কোন ধরনের জোকস পড়ে আপনি হাসেন; কেমন করে আপনি পৃথিবীটাকে দেখেন। আমাদের মনে কখনো এ প্রশ্নটি কেন আসে না: ইউটিউব কেমন করে জানে, আমি কোন গানটা ভালোবাসি? কেন রবীন্দ্রসংগীত শুনতে গেলে আমাদের সামনে একের পর এক রবীন্দ্রনাথের গানই ভাসতে থাকে? কোন জাদুবলে আমরা ফোনটা হাতে নিলেই এক ঘণ্টা পার হয়ে যায়?

জাদুর ছোঁয়া তো নিশ্চয়ই আছে। পর্দার অন্তরালে জাদুকররা আমাদের নিয়ে জাদু করেন। কারণ, আমাকে ফোনের স্ক্রিনে আটকে রাখার মাধ্যমেই তারা বেতন পান, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব কোম্পানিগুলো টাকা রোজগার করে। যত বেশি সময় ধরে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় আটকে রাখা যাবে, ততই তাদের মুনাফা বাড়তে থাকবে। এখন নিশ্চয়ই প্রশ্ন আসবে, আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় আটকে রেখে তারা কীভাবে টাকা কামায়? আমরা যখন ইউটিউবে যাই, বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন আমাদের সামনে আসে। এ বিজ্ঞাপনগুলোই তাদের আয়ের প্রধান মাধ্যম। ব্যবহারকারীর সামনে যত বেশি বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখানো যাবে, বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলো তত বেশি টাকা সোশ্যাল মিডিয়াকে দেবে। ভাবতে গেলে অবাক না-হয়ে পারবেন না-কী করে আমাদের সময়, মেধা এবং শ্রমকে ব্যবহার তারা অর্থ কামাচ্ছে দেদার।

‘A Critical Social Media By Christian Church’ বইটিতে সোশ্যাল মিডিয়ার পলিসি নিয়ে বলা হয়েছে: ‘Unpaid

internet prosumer labour is a new form of labour that is connected to the other forms of

exploited labour.’ হ্যাঁ, আমরাই প্রযুক্তির অবৈতনিক শোষিত শ্রমিক; যারা ধনীকে আরও ধনী করতে প্রতিনিয়ত খেটে যাচ্ছি হাসিমুখে। আমরা ফেসবুকের আপডেটেড ভার্সন এলে খুশি হই, গুগলে নতুন সুবিধা যুক্ত হলে আনন্দে আত্মহারা হই, স্ন্যাপচ্যাটের নতুন নতুন ফিল্টার আমাদের চেহারার সঙ্গে সঙ্গে মনকেও রাঙিয়ে দেয়। কিন্তু এ সবই প্রযুক্তিবিদদের ছলনা, মায়া। তারা প্রতিটি সেকেন্ড আমাকে পর্যবেক্ষণ করছে বলে তারা জানে, কী করে আমাকে আরও বেশিক্ষণ ফোনের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা যায়। তারা আমাদের মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা দিন দিন মেধাশূন্য জাতিতে পরিণত হচ্ছি। কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল; বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি। কারণ, আমরা কী দেখছি এবং কী দেখব-তার পুরোটাই সেসব জাদুকরের জাদুমন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।

ফেসবুক, গুগল, ইনস্টাগ্রাম আমাকে তা-ই দেখাবে, যা আমি দেখতে চাই। আমরা এটা ভেবে ভুল করে বসি-আমার বন্ধু, আমার প্রতিবেশী, আমার ভাইবোন, আমার পরিবার একই জিনিস দেখছে; যা আমি দেখছি। কিন্তু এ ধারণা ভুল। আমি যা দেখি, বাকি সবাই ঠিক তা-ই দেখে না। তাদের কাছে দুনিয়াটা ঠিক তাদের মনের মতো, তাদের ভাবনার মতো। আর এখান থেকেই বিবাদের শুরু। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এত হানাহানি, রক্তপাত, সহিংসতার মূলে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার ইন্ধন। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে খুব সহজেই গুজব ছড়িয়ে যায় দিকে দিকে। সেই গুজবের কারণে রক্তপাত, হত্যাকাণ্ডের উদহারণও বড় কম নয়। কয়েক মাস আগে লালমনিরহাটে ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারণেই এক যুবককে কুরআন শরিফ ফেলে দেওয়ার অপরাধে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়। কিছুদিন আগে সুনামগঞ্জের শাল্যা উপজেলায় হিন্দুদের ঘরবাড়ি পোড়ানোর ঘটনা ঘটে এ ফেসবুকের স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করেই।

এ সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের বর্বরতার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা সামান্য লাইক, কমেন্ট নিয়ে মারামারি করতে বসি; অথচ আমরা জানি না, পাশের ঘরে আমার ভাইটি সারা দিন কী করছে। আমাদের কাছের লোকদের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলার সময় নেই, পারিবারিক আড্ডা নেই, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলেও যে যার মতো মুখ ঘুরিয়ে ভার্চুয়াল পৃথিবীতে ঢু মারতে থাকি। আমি দেখতে কেমন, আমি কোন পোশাক পরব, কোন হেয়ার স্টাইলে থাকব-তা নির্ধারণ করে দেয় ফেসবুক। আমরা চালিত হই অন্যের কথায়, যার কোনো বাস্তবিক ভিত্তি নেই।

প্রযুক্তিবিদরা আমাদের সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাদের হস্তক্ষেপ রাখছে এবং আমরা তা অনুধাবনও করতে পারছি না। আমাদের পাপেট বানিয়ে পর্দার আড়াল থেকে নাচিয়ে যাচ্ছে তারা। ‘Like how we wake up from the matrix

when you don’t know you're in the matrix?’ আমরা গোলকধাঁধায় আটকে গেছি; অথচ সেখান থেকে বেরোনোর কোনো চেষ্টা আমাদের নেই। কেননা, আমরা জানিই না, আমরা গোলকধাঁধায় আছি।

আপনারা জেনে থাকবেন, সোশ্যাল মিডিয়ার উদ্ভাবক-উদ্যোক্তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো অ্যাকাউন্ট নেই। এমন কী তার পরিবারের সদস্যদেরও টেকনোলজি থেকে দূরে রাখা হয়। আর তার কারণ কী, তা তো বর্ণনা করাই আছে ওপরের লেখায়। কিন্তু কথা হচ্ছে, আমরা কী-করে এ গোলকধাঁধা থেকে বের হতে পারি? আমাদের স্বার্থে কেন টেক সোসাইটি তাদের পলিসি বাদ দেবে? কেন এত বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে?

এ সমস্যার সমাধান একটাই। আমাদের বদলাতে হবে। আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে আরও সচেতন হতে হবে; খুব কম সময় নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়ায় জড়াতে হবে। আমাদের ব্যবহারের আধিক্য কমে গেলে প্রযুক্তিবিদরা বাধ্য হবে তাদের কালাকানুন সংস্কার করতে; আমাদের প্রাইভেসি বজায় থাকে, এমনভাবে টেকনোলজিকে ঢেলে সাজাতে।

শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

fabihabintehaue83@gmail

সোশ্যাল মিডিয়ার গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়া জরুরি

 ফাবিহা বিনতে হক 
২১ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একবিংশ শতাব্দীর পুরোটা জুড়েই চলছে প্রযুক্তির জয়জয়কার। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজে প্রযুক্তির কাছে আমরা দায়বদ্ধ। করোনা মহামারি যেন সেই দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে দিয়েছে আরও শতগুণে।

কিন্তু বিনিময়ে আমরা প্রযুক্তিকে কী দিচ্ছি? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইন্টারনেটের শক্তিতে পৃথিবীর প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে আমরা একাত্ম হতে পারছি, সম্পর্ক গড়ছি, ভাঙছি, হারানো বন্ধুকে খুঁজে পাচ্ছি।

তবে প্রযুক্তি কেন সিদ্ধহস্তে আমাদের জীবন সহজ করে তুলছে-এ প্রশ্নগুলো আমাদের মাথায় কখনো বাজে না। কারণ, আমরা হাতের ওই ছোট বৈদ্যুতিক ডিভাইসটিতে এতটাই ডুবে থাকি যে, দু-দণ্ড ভাবার সময় আমাদের হয় না।

অবশ্য এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে নেটফ্লিক্সের ‘The Social Dilemma’ ডকুমেন্টারিতে। প্রায় দেড় ঘণ্টার এ ডকুমেন্টারি দেখতে বসলে আপনি এক মিনিটের জন্যও চোখ ফেরাতে পারবেন না, তা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। এখানে দেখানো হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ার অন্ধকার জগতের ভয়াবহ চিত্র। যেখানে অভিনেতা স্বয়ং আপনি, আমি, আমরা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, জিমেইল, গুগলসহ যাবতীয় সব যোগাযোগ মাধ্যম কোন পলিসিতে কাজ করে, তাদের উদ্দেশ্য কী-তার সবটারই সচিত্র বর্ণনা আপনারা শুনতে পাবেন তাদেরই ইঞ্জিনিয়ারদের কাছ থেকে। The Social Dilemma-তে বেশ কয়েকটি চমৎকার কোটেশন আছে যা আপনার ভাবনার জগতে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে: ‘lf you're not paying for the products, you're the products. অর্থাৎ, কোনো পণ্য ব্যবহার করতে আপনাকে যদি মূল্য দিতে না-হয়; তবে মনে রাখবেন পণ্যটি স্বয়ং আপনি।

দিনের-পর-দিন ধরে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে যাচ্ছি এবং ব্যবহারের হার দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। ব্যক্তিগত আচরণ থেকে শুরু করে পেশাগত কাজ সবকিছুতেই ইন্টারনেটকে জড়াতে হয়।

আমাদের প্রতিটি তথ্য তারা সংরক্ষণ করে, প্রতিটি কার্যবিধি লক্ষ করে। ইন্টারনেট কর্তৃপক্ষ জানে, আপনি শেষ কবে আপনার সাবেক প্রেমিকার ছবি দেখেছিলেন কতক্ষণ ধরে; কোন ধরনের জোকস পড়ে আপনি হাসেন; কেমন করে আপনি পৃথিবীটাকে দেখেন। আমাদের মনে কখনো এ প্রশ্নটি কেন আসে না: ইউটিউব কেমন করে জানে, আমি কোন গানটা ভালোবাসি? কেন রবীন্দ্রসংগীত শুনতে গেলে আমাদের সামনে একের পর এক রবীন্দ্রনাথের গানই ভাসতে থাকে? কোন জাদুবলে আমরা ফোনটা হাতে নিলেই এক ঘণ্টা পার হয়ে যায়?

জাদুর ছোঁয়া তো নিশ্চয়ই আছে। পর্দার অন্তরালে জাদুকররা আমাদের নিয়ে জাদু করেন। কারণ, আমাকে ফোনের স্ক্রিনে আটকে রাখার মাধ্যমেই তারা বেতন পান, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব কোম্পানিগুলো টাকা রোজগার করে। যত বেশি সময় ধরে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় আটকে রাখা যাবে, ততই তাদের মুনাফা বাড়তে থাকবে। এখন নিশ্চয়ই প্রশ্ন আসবে, আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় আটকে রেখে তারা কীভাবে টাকা কামায়? আমরা যখন ইউটিউবে যাই, বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন আমাদের সামনে আসে। এ বিজ্ঞাপনগুলোই তাদের আয়ের প্রধান মাধ্যম। ব্যবহারকারীর সামনে যত বেশি বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখানো যাবে, বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলো তত বেশি টাকা সোশ্যাল মিডিয়াকে দেবে। ভাবতে গেলে অবাক না-হয়ে পারবেন না-কী করে আমাদের সময়, মেধা এবং শ্রমকে ব্যবহার তারা অর্থ কামাচ্ছে দেদার।

‘A Critical Social Media By Christian Church’ বইটিতে সোশ্যাল মিডিয়ার পলিসি নিয়ে বলা হয়েছে: ‘Unpaid

internet prosumer labour is a new form of labour that is connected to the other forms of

exploited labour.’ হ্যাঁ, আমরাই প্রযুক্তির অবৈতনিক শোষিত শ্রমিক; যারা ধনীকে আরও ধনী করতে প্রতিনিয়ত খেটে যাচ্ছি হাসিমুখে। আমরা ফেসবুকের আপডেটেড ভার্সন এলে খুশি হই, গুগলে নতুন সুবিধা যুক্ত হলে আনন্দে আত্মহারা হই, স্ন্যাপচ্যাটের নতুন নতুন ফিল্টার আমাদের চেহারার সঙ্গে সঙ্গে মনকেও রাঙিয়ে দেয়। কিন্তু এ সবই প্রযুক্তিবিদদের ছলনা, মায়া। তারা প্রতিটি সেকেন্ড আমাকে পর্যবেক্ষণ করছে বলে তারা জানে, কী করে আমাকে আরও বেশিক্ষণ ফোনের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা যায়। তারা আমাদের মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা দিন দিন মেধাশূন্য জাতিতে পরিণত হচ্ছি। কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল; বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি। কারণ, আমরা কী দেখছি এবং কী দেখব-তার পুরোটাই সেসব জাদুকরের জাদুমন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।

ফেসবুক, গুগল, ইনস্টাগ্রাম আমাকে তা-ই দেখাবে, যা আমি দেখতে চাই। আমরা এটা ভেবে ভুল করে বসি-আমার বন্ধু, আমার প্রতিবেশী, আমার ভাইবোন, আমার পরিবার একই জিনিস দেখছে; যা আমি দেখছি। কিন্তু এ ধারণা ভুল। আমি যা দেখি, বাকি সবাই ঠিক তা-ই দেখে না। তাদের কাছে দুনিয়াটা ঠিক তাদের মনের মতো, তাদের ভাবনার মতো। আর এখান থেকেই বিবাদের শুরু। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এত হানাহানি, রক্তপাত, সহিংসতার মূলে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার ইন্ধন। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে খুব সহজেই গুজব ছড়িয়ে যায় দিকে দিকে। সেই গুজবের কারণে রক্তপাত, হত্যাকাণ্ডের উদহারণও বড় কম নয়। কয়েক মাস আগে লালমনিরহাটে ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারণেই এক যুবককে কুরআন শরিফ ফেলে দেওয়ার অপরাধে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়। কিছুদিন আগে সুনামগঞ্জের শাল্যা উপজেলায় হিন্দুদের ঘরবাড়ি পোড়ানোর ঘটনা ঘটে এ ফেসবুকের স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করেই।

এ সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের বর্বরতার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা সামান্য লাইক, কমেন্ট নিয়ে মারামারি করতে বসি; অথচ আমরা জানি না, পাশের ঘরে আমার ভাইটি সারা দিন কী করছে। আমাদের কাছের লোকদের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলার সময় নেই, পারিবারিক আড্ডা নেই, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলেও যে যার মতো মুখ ঘুরিয়ে ভার্চুয়াল পৃথিবীতে ঢু মারতে থাকি। আমি দেখতে কেমন, আমি কোন পোশাক পরব, কোন হেয়ার স্টাইলে থাকব-তা নির্ধারণ করে দেয় ফেসবুক। আমরা চালিত হই অন্যের কথায়, যার কোনো বাস্তবিক ভিত্তি নেই।

প্রযুক্তিবিদরা আমাদের সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাদের হস্তক্ষেপ রাখছে এবং আমরা তা অনুধাবনও করতে পারছি না। আমাদের পাপেট বানিয়ে পর্দার আড়াল থেকে নাচিয়ে যাচ্ছে তারা। ‘Like how we wake up from the matrix

when you don’t know you're in the matrix?’ আমরা গোলকধাঁধায় আটকে গেছি; অথচ সেখান থেকে বেরোনোর কোনো চেষ্টা আমাদের নেই। কেননা, আমরা জানিই না, আমরা গোলকধাঁধায় আছি।

আপনারা জেনে থাকবেন, সোশ্যাল মিডিয়ার উদ্ভাবক-উদ্যোক্তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো অ্যাকাউন্ট নেই। এমন কী তার পরিবারের সদস্যদেরও টেকনোলজি থেকে দূরে রাখা হয়। আর তার কারণ কী, তা তো বর্ণনা করাই আছে ওপরের লেখায়। কিন্তু কথা হচ্ছে, আমরা কী-করে এ গোলকধাঁধা থেকে বের হতে পারি? আমাদের স্বার্থে কেন টেক সোসাইটি তাদের পলিসি বাদ দেবে? কেন এত বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে?

এ সমস্যার সমাধান একটাই। আমাদের বদলাতে হবে। আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে আরও সচেতন হতে হবে; খুব কম সময় নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়ায় জড়াতে হবে। আমাদের ব্যবহারের আধিক্য কমে গেলে প্রযুক্তিবিদরা বাধ্য হবে তাদের কালাকানুন সংস্কার করতে; আমাদের প্রাইভেসি বজায় থাকে, এমনভাবে টেকনোলজিকে ঢেলে সাজাতে।

শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

fabihabintehaue83@gmail

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন