সাধারণ বিমার কমিশন না এজেন্টের, না গ্রাহকের
jugantor
সাধারণ বিমার কমিশন না এজেন্টের, না গ্রাহকের

  শেখ মো. সরফরাজ হোসেন  

২১ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও একজন দার্শনিক।

তিনি শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, তিনি বিমা শিল্পের উচ্চপর্যায়ের একজন বিমাব্যক্তিত্বও ছিলেন। তাই জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা, বাংলাদেশের উন্নয়নের রূপকার প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিমার গুরুত্ব অনুধাবন করে পুরাতন বিমা আইনকে ঢেলে সাজিয়ে নতুন বিমা আইন-২০১০ প্রণয়ন করেছেন। পাশাপাশি প্রণয়ন করেছেন বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন-২০১০। এরপর বিমাখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ২০১১ সালে অধিদপ্তর বিলুপ্ত করে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, কমিশন বাণিজ্য ও বিমাশিল্পে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এখনো কাটেনি। বিমা অধিদপ্তর থেকে জারিকৃত ১০/০২/২০০২ইং তারিখের প্রঃবীঃনিঃ১৫/১/৯৬-২৪২ নম্বর আদেশের মাধ্যমে সাধারণ বিমা ব্যবসায় কমিশন পরিশোধ ১ মার্চ/২০০২ ইং তারিখ থেকে রহিত করা হলো মর্মে নির্বাহী আদেশটি যথাযথভাবে পালনের জন্য সব বেসরকারি সাধারণ বিমা কোম্পানিকে নির্দেশ প্রদান করা হয়।

অতঃপর বিমা অধিদপ্তরের সার্কুলার নং-প্রঃবীঃনিঃ-১৫/১/৯৬-১৪০৬, তারিখের মাধ্যমে সাধারণ বিমা ব্যবসার ওপর কমিশন প্রদান ব্যবস্থা পুনরায় প্রবর্তন করা হয়েছে এবং তা ২৬/০৭/২০০৫ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে।

সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়: বিমা আইন, ১৯৩৮-এর ৪০এ ধারায় (২) ও (৩) উপধারায় অগ্নি ও অন্যান্য শ্রেণির সংগৃহীত বিমা ব্যবসার প্রিমিয়ামের ওপর শতকরা ১৫% হারে এবং নৌ-শ্রেণির ওপর শতকরা ১০% হারে সংশ্লিষ্ট এজেন্ট/এমপ্লয়ার অব এজেন্টকে কমিশন প্রদানের বিধান রয়েছে। তবে এজেন্ট/এমপ্লয়ার অব এজেন্ট এর বাৎসরিক প্রিমিয়াম আয়ের পরিমাণ ন্যূনতম ১০০,০০০/- হলে সংগৃহীত প্রিমিয়ামের ওপর আরও ৫% হারে কমিশন/ওভাররাইডিং কমিশন কিংবা রিমিউনারেশন আকারে প্রদান করা যায়।

পরে প্রবর্তিত, বিমা আইন, ২০১০-এর ৫৮(১) ধারার বিধানে বলা হয়: ‘কোন নন-লাইফ বিমা কোম্পানি বিমা ব্যবসা অর্জন বা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিমা এজেন্ট বা এজেন্ট নিয়োগকারী বা ব্রোকার ছাড়া অন্য কাউকেও প্রিমিয়ামের ওপর শতকরা হারে পারিশ্রমিক বা পারিতোষিক পরিশোধ করিবে না।’ ওই ধারায় কমিশনের পদ্ধতি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না-থাকার কারণে, বিমা ব্যবসা আহরণে কোনো কোনো বিমাকারী প্রতিষ্ঠান তাদের খেয়ালমতো বিভিন্ন ফরম্যাটে কমিশন প্রদানসহ প্রিমিয়ামের সঙ্গে সমন্বয় শুরু করেন। বিমাশিল্পের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে, নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির উন্নতি এবং বর্তমান কমিশন পদ্ধতির অব্যবস্থাপনা দূর করার জন্য বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গত ১৫ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে একটি সার্কুলার জারি করে, যা ১ মার্চ ২০১২ থেকে কার্যকর করা হয়।

সেখানে উল্লেখ করা হয়: ‘কোনো অবস্থায়ই বিমা কোম্পানির পলিসি অথবা কভার নোটের প্রিমিয়ামের টাকা কমিশনের টাকার সঙ্গে অথবা অন্য কোনো প্রদেয় টাকার সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে না। তবে প্রিমিয়ামের বিপরীতে কোনো কমিশন প্রদেয় থাকলে তা অবশ্যই লাইসেন্সধারী বিমা প্রতিনিধির বা ব্রোকারের নামে অ্যাকাউন্টপেয়ি চেকের মাধ্যমে প্রদান করতে হবে। আবার আইডিআরএ থেকে নিবন্ধন নেওয়া প্রতিনিধি বা ব্রোকার ছাড়া কেউ এই কমিশন পাবে না।’

কিন্তু আবারও সেই পরিতাপ। অনিয়ন্ত্রিত কমিশন বাণিজ্য এবং লাগামহীন প্রতিযোগিতা নিয়ে আসে বিমাশিল্পে অসম সংস্কৃতি। তাই, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোশিয়েশন গত ৫ মার্চ ২০১২ তারিখের সভায় এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, ‘(1) No commission

will be paid by the non-life insurance companies till fixing of the rate of agency commis

sion by the IDRA and nwe rules/regulations are framed as to the appointment of agents.’

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোশিয়েশনের ওই সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা কমিশনকে নিয়ে যান দানবীয় রূপে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিমা মালিকদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেওয়ার কারণে সার্কুলারটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে কোনো কোনো কোম্পানির কারণে কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেওয়া ১৫% এজেন্ট কমিশনের হার গিয়ে দাঁড়ায় ৭০% পর্যন্ত, যা এজেন্টের বদলে চলে যায় গ্রাহকদের পকেটে। ফলে, গত ১৩/০৯/২০১২ তারিখে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সার্কুলার নং নন-লাইফ-৩৪/২০১২ জারি করে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

এরপর অতিবাহিত হলো ৭টি বছর। এরইমধ্যে কমিশন গিলে ফেলার উপক্রম প্রায় পুরা প্রিমিয়ামটাকেই। এদিকে সরকারের চাক্ষুষ উপস্থিতি বিমাশিল্পে। সুতরাং, লাগাম টেনে ধরতেই হবে এ মহাদানব কমিশন ব্যবসার। জারি হলো সার্কুলার নং: নন-লাইফ ৬১/২০১৯ গত ৩০ এপ্রিল ২০১৯ এবং সার্কুলার নং: নন-লাইফ ৬২/২০১৯ গত ৩ জুন ২০১৯। এ ছাড়া সার্কুলার নং: নন-লাইফ ৬৪/২০১৯ গত ২ জুলাই ২০১৯ এবং পরবর্তী সময়ে ওই সার্কুলার বর্ধিত করে জারি হলো আরেকটি সার্কুলার নং: নন-লাইফ ৬৮/২০১৯ গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯। ওই সার্কুলারদ্বয়ের বিষয় ছিল, নন-লাইফ বিমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে এবং উদ্দেশ্য ছিল, বিমা গ্রাহকদের যথাযথ স্বার্থ সংরক্ষণের নিমিত্তে বিমা কোম্পানিগুলো Good Governance তথা সুদৃঢ় অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ওই পদক্ষেপগুলো কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বিরাজমান; লুক্কায়িত ব্যাংক হিসাব বন্ধকরণ, অনিয়ন্ত্রিত কমিশন প্রদান বন্ধকরণ, সর্বোপরি সরকারের রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধ করা।

নন-লাইফ বিমা খাতে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনেক পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও কমিশন সংক্রান্ত বিষয়ে শৃঙ্খলা সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত হচ্ছে-না বিধায় এ খাতে শৃঙ্খলা আনয়নের স্বার্থে বিমা আইন ২০১০-এর অধীন বিমা এজেন্ট নিয়োগ ও নিবন্ধন প্রবিধানমালা গেজেট আকারে প্রকাশিত না-হওয়া পর্যন্ত নন-লাইফ বিমা খাতে ব্যবসা অর্জন বা সংগ্রহের বিপরীতে ১৫% বিমা এজেন্ট কমিশন প্রদান সংক্রান্ত সার্কুলার নং: নন-লাইফ ৩২/২০১২, তারিখ ১ এপ্রিল ২০১২ এবং নন-লাইফের কমিশন হার সংক্রান্ত জারিকৃত অন্যান্য নির্দেশনাবলি পরবর্তী নির্দেশ না-দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করে গত ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে প্রদত্ত সার্কুলার নং: নন-লাইফ-৮৪/২০২১, এর ক্রমিক নং-(২) অনুযায়ী ‘নন-লাইফ বিমা খাতে ব্যবসা অর্জন বা সংগ্রহের বিপরীতে ১৫% (পনেরো শতাংশ)-এর পরিবর্তে ০% (শূন্য শতাংশ) নির্ধারণ করা হলো,’ যা ১ মার্চ ২০২১ থেকে কার্যকর করা হয়েছে।

বিদ্যমান কোভিড-১৯ মহামারির কারণে অনেক ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিমা পলিসির সংখ্যা কমে গেছে এবং রেভিনিউ হ্রাস পেয়েছে। এদিকে মোটরযান বীমায় 3rd Party Insurance গ্রহণ অত্যাবশ্যকীয় না-থাকায় এবং Comprehensive Insurance পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকরী না-হওয়ায় বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর বিমা কোম্পানির রেভিনিউ কিছুটা সংকোচন হয়েছে।

এদিকে এজেন্ট কমিশন শূন্য শতাংশ করার পরও কিছু কিছু বিমা কোম্পানি কমিশন প্রদান করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে গ্রাহকমুখে প্রচলিত আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ১৫ শতাংশের অধিক কমিশন দেওয়া বন্ধ এবং আইডিআরএ সার্কুলার অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত সব বিষয়ে সহযোগিতার সম্মতি দেওয়া সত্ত্বেও কিছু কিছু ব্যাংক কর্মকর্তার কাছ থেকে কমিশন প্রদান বন্ধে সহযোগিতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেসব বিমা কোম্পানি সততা ও নিষ্ঠা এবং আইডিআরএ কর্তৃক প্রদত্ত বিধিনিষেধ মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছে, তাদের পক্ষে নতুন গ্রাহক আনা দূরের বিষয়; বরং পুরাতন গ্রাহকদেরই ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

অপরদিকে Unethical Competition-এর কারণে অনেক বিমা কোম্পানির ব্যবসা কমে যাচ্ছে; কিন্তু তাদের Management

Expenses বৃদ্ধি পাচ্ছে যা, ‘নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসা ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণী বিধিমালা-২০১৮’-এর ব্যত্যয় ঘটছে এবং বছর সমাপ্তিতে তাদের মুনাফা অতিমাত্রায় হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অতএব, বাংলাদেশে বিমাশিল্পের বিকাশকল্পে রুগ্ণ প্রতিযোগিতা বর্জন করে সম-সহযোগিতামূলক বিমাশিল্প প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একযোগে একই নীতিতে অগ্রসর হতে হবে। সর্বশেষে, গত ০৪/০২/২০২১ তারিখে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারিকৃত সার্কুলার নং: নন-লাইফ-৮৪/২০২১ যথাযথ প্রতিপালন ও অনুসরণ করার জন্য উন্নয়ন কর্মকর্তাসহ বিমা কোম্পানির ঊর্ধ্বতন নির্বাহীদের এবং বিমা সেবা গ্রাহকদের আরও সচেষ্ট হতে হবে।

কোম্পানি সচিব, পিপলস ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড

সাধারণ বিমার কমিশন না এজেন্টের, না গ্রাহকের

 শেখ মো. সরফরাজ হোসেন 
২১ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও একজন দার্শনিক।

তিনি শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, তিনি বিমা শিল্পের উচ্চপর্যায়ের একজন বিমাব্যক্তিত্বও ছিলেন। তাই জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা, বাংলাদেশের উন্নয়নের রূপকার প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিমার গুরুত্ব অনুধাবন করে পুরাতন বিমা আইনকে ঢেলে সাজিয়ে নতুন বিমা আইন-২০১০ প্রণয়ন করেছেন। পাশাপাশি প্রণয়ন করেছেন বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন-২০১০। এরপর বিমাখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ২০১১ সালে অধিদপ্তর বিলুপ্ত করে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, কমিশন বাণিজ্য ও বিমাশিল্পে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এখনো কাটেনি। বিমা অধিদপ্তর থেকে জারিকৃত ১০/০২/২০০২ইং তারিখের প্রঃবীঃনিঃ১৫/১/৯৬-২৪২ নম্বর আদেশের মাধ্যমে সাধারণ বিমা ব্যবসায় কমিশন পরিশোধ ১ মার্চ/২০০২ ইং তারিখ থেকে রহিত করা হলো মর্মে নির্বাহী আদেশটি যথাযথভাবে পালনের জন্য সব বেসরকারি সাধারণ বিমা কোম্পানিকে নির্দেশ প্রদান করা হয়।

অতঃপর বিমা অধিদপ্তরের সার্কুলার নং-প্রঃবীঃনিঃ-১৫/১/৯৬-১৪০৬, তারিখের মাধ্যমে সাধারণ বিমা ব্যবসার ওপর কমিশন প্রদান ব্যবস্থা পুনরায় প্রবর্তন করা হয়েছে এবং তা ২৬/০৭/২০০৫ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে।

সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়: বিমা আইন, ১৯৩৮-এর ৪০এ ধারায় (২) ও (৩) উপধারায় অগ্নি ও অন্যান্য শ্রেণির সংগৃহীত বিমা ব্যবসার প্রিমিয়ামের ওপর শতকরা ১৫% হারে এবং নৌ-শ্রেণির ওপর শতকরা ১০% হারে সংশ্লিষ্ট এজেন্ট/এমপ্লয়ার অব এজেন্টকে কমিশন প্রদানের বিধান রয়েছে। তবে এজেন্ট/এমপ্লয়ার অব এজেন্ট এর বাৎসরিক প্রিমিয়াম আয়ের পরিমাণ ন্যূনতম ১০০,০০০/- হলে সংগৃহীত প্রিমিয়ামের ওপর আরও ৫% হারে কমিশন/ওভাররাইডিং কমিশন কিংবা রিমিউনারেশন আকারে প্রদান করা যায়।

পরে প্রবর্তিত, বিমা আইন, ২০১০-এর ৫৮(১) ধারার বিধানে বলা হয়: ‘কোন নন-লাইফ বিমা কোম্পানি বিমা ব্যবসা অর্জন বা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিমা এজেন্ট বা এজেন্ট নিয়োগকারী বা ব্রোকার ছাড়া অন্য কাউকেও প্রিমিয়ামের ওপর শতকরা হারে পারিশ্রমিক বা পারিতোষিক পরিশোধ করিবে না।’ ওই ধারায় কমিশনের পদ্ধতি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না-থাকার কারণে, বিমা ব্যবসা আহরণে কোনো কোনো বিমাকারী প্রতিষ্ঠান তাদের খেয়ালমতো বিভিন্ন ফরম্যাটে কমিশন প্রদানসহ প্রিমিয়ামের সঙ্গে সমন্বয় শুরু করেন। বিমাশিল্পের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে, নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির উন্নতি এবং বর্তমান কমিশন পদ্ধতির অব্যবস্থাপনা দূর করার জন্য বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গত ১৫ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে একটি সার্কুলার জারি করে, যা ১ মার্চ ২০১২ থেকে কার্যকর করা হয়।

সেখানে উল্লেখ করা হয়: ‘কোনো অবস্থায়ই বিমা কোম্পানির পলিসি অথবা কভার নোটের প্রিমিয়ামের টাকা কমিশনের টাকার সঙ্গে অথবা অন্য কোনো প্রদেয় টাকার সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে না। তবে প্রিমিয়ামের বিপরীতে কোনো কমিশন প্রদেয় থাকলে তা অবশ্যই লাইসেন্সধারী বিমা প্রতিনিধির বা ব্রোকারের নামে অ্যাকাউন্টপেয়ি চেকের মাধ্যমে প্রদান করতে হবে। আবার আইডিআরএ থেকে নিবন্ধন নেওয়া প্রতিনিধি বা ব্রোকার ছাড়া কেউ এই কমিশন পাবে না।’

কিন্তু আবারও সেই পরিতাপ। অনিয়ন্ত্রিত কমিশন বাণিজ্য এবং লাগামহীন প্রতিযোগিতা নিয়ে আসে বিমাশিল্পে অসম সংস্কৃতি। তাই, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোশিয়েশন গত ৫ মার্চ ২০১২ তারিখের সভায় এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, ‘(1) No commission

will be paid by the non-life insurance companies till fixing of the rate of agency commis

sion by the IDRA and nwe rules/regulations are framed as to the appointment of agents.’

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোশিয়েশনের ওই সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা কমিশনকে নিয়ে যান দানবীয় রূপে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিমা মালিকদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেওয়ার কারণে সার্কুলারটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে কোনো কোনো কোম্পানির কারণে কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেওয়া ১৫% এজেন্ট কমিশনের হার গিয়ে দাঁড়ায় ৭০% পর্যন্ত, যা এজেন্টের বদলে চলে যায় গ্রাহকদের পকেটে। ফলে, গত ১৩/০৯/২০১২ তারিখে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সার্কুলার নং নন-লাইফ-৩৪/২০১২ জারি করে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

এরপর অতিবাহিত হলো ৭টি বছর। এরইমধ্যে কমিশন গিলে ফেলার উপক্রম প্রায় পুরা প্রিমিয়ামটাকেই। এদিকে সরকারের চাক্ষুষ উপস্থিতি বিমাশিল্পে। সুতরাং, লাগাম টেনে ধরতেই হবে এ মহাদানব কমিশন ব্যবসার। জারি হলো সার্কুলার নং: নন-লাইফ ৬১/২০১৯ গত ৩০ এপ্রিল ২০১৯ এবং সার্কুলার নং: নন-লাইফ ৬২/২০১৯ গত ৩ জুন ২০১৯। এ ছাড়া সার্কুলার নং: নন-লাইফ ৬৪/২০১৯ গত ২ জুলাই ২০১৯ এবং পরবর্তী সময়ে ওই সার্কুলার বর্ধিত করে জারি হলো আরেকটি সার্কুলার নং: নন-লাইফ ৬৮/২০১৯ গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯। ওই সার্কুলারদ্বয়ের বিষয় ছিল, নন-লাইফ বিমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে এবং উদ্দেশ্য ছিল, বিমা গ্রাহকদের যথাযথ স্বার্থ সংরক্ষণের নিমিত্তে বিমা কোম্পানিগুলো Good Governance তথা সুদৃঢ় অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ওই পদক্ষেপগুলো কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বিরাজমান; লুক্কায়িত ব্যাংক হিসাব বন্ধকরণ, অনিয়ন্ত্রিত কমিশন প্রদান বন্ধকরণ, সর্বোপরি সরকারের রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধ করা।

নন-লাইফ বিমা খাতে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনেক পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও কমিশন সংক্রান্ত বিষয়ে শৃঙ্খলা সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত হচ্ছে-না বিধায় এ খাতে শৃঙ্খলা আনয়নের স্বার্থে বিমা আইন ২০১০-এর অধীন বিমা এজেন্ট নিয়োগ ও নিবন্ধন প্রবিধানমালা গেজেট আকারে প্রকাশিত না-হওয়া পর্যন্ত নন-লাইফ বিমা খাতে ব্যবসা অর্জন বা সংগ্রহের বিপরীতে ১৫% বিমা এজেন্ট কমিশন প্রদান সংক্রান্ত সার্কুলার নং: নন-লাইফ ৩২/২০১২, তারিখ ১ এপ্রিল ২০১২ এবং নন-লাইফের কমিশন হার সংক্রান্ত জারিকৃত অন্যান্য নির্দেশনাবলি পরবর্তী নির্দেশ না-দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করে গত ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে প্রদত্ত সার্কুলার নং: নন-লাইফ-৮৪/২০২১, এর ক্রমিক নং-(২) অনুযায়ী ‘নন-লাইফ বিমা খাতে ব্যবসা অর্জন বা সংগ্রহের বিপরীতে ১৫% (পনেরো শতাংশ)-এর পরিবর্তে ০% (শূন্য শতাংশ) নির্ধারণ করা হলো,’ যা ১ মার্চ ২০২১ থেকে কার্যকর করা হয়েছে।

বিদ্যমান কোভিড-১৯ মহামারির কারণে অনেক ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিমা পলিসির সংখ্যা কমে গেছে এবং রেভিনিউ হ্রাস পেয়েছে। এদিকে মোটরযান বীমায় 3rd Party Insurance গ্রহণ অত্যাবশ্যকীয় না-থাকায় এবং Comprehensive Insurance পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকরী না-হওয়ায় বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর বিমা কোম্পানির রেভিনিউ কিছুটা সংকোচন হয়েছে।

এদিকে এজেন্ট কমিশন শূন্য শতাংশ করার পরও কিছু কিছু বিমা কোম্পানি কমিশন প্রদান করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে গ্রাহকমুখে প্রচলিত আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ১৫ শতাংশের অধিক কমিশন দেওয়া বন্ধ এবং আইডিআরএ সার্কুলার অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত সব বিষয়ে সহযোগিতার সম্মতি দেওয়া সত্ত্বেও কিছু কিছু ব্যাংক কর্মকর্তার কাছ থেকে কমিশন প্রদান বন্ধে সহযোগিতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেসব বিমা কোম্পানি সততা ও নিষ্ঠা এবং আইডিআরএ কর্তৃক প্রদত্ত বিধিনিষেধ মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছে, তাদের পক্ষে নতুন গ্রাহক আনা দূরের বিষয়; বরং পুরাতন গ্রাহকদেরই ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

অপরদিকে Unethical Competition-এর কারণে অনেক বিমা কোম্পানির ব্যবসা কমে যাচ্ছে; কিন্তু তাদের Management

Expenses বৃদ্ধি পাচ্ছে যা, ‘নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসা ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণী বিধিমালা-২০১৮’-এর ব্যত্যয় ঘটছে এবং বছর সমাপ্তিতে তাদের মুনাফা অতিমাত্রায় হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অতএব, বাংলাদেশে বিমাশিল্পের বিকাশকল্পে রুগ্ণ প্রতিযোগিতা বর্জন করে সম-সহযোগিতামূলক বিমাশিল্প প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একযোগে একই নীতিতে অগ্রসর হতে হবে। সর্বশেষে, গত ০৪/০২/২০২১ তারিখে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারিকৃত সার্কুলার নং: নন-লাইফ-৮৪/২০২১ যথাযথ প্রতিপালন ও অনুসরণ করার জন্য উন্নয়ন কর্মকর্তাসহ বিমা কোম্পানির ঊর্ধ্বতন নির্বাহীদের এবং বিমা সেবা গ্রাহকদের আরও সচেষ্ট হতে হবে।

কোম্পানি সচিব, পিপলস ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন