মানবহিতৈষী এক শিল্পপতির বিদায়
jugantor
মানবহিতৈষী এক শিল্পপতির বিদায়

  আবু জাফর মো. সালেহ্  

২৮ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইয়ুথ গ্রুপ, আইএফআইএল, শাহজীবাজার পাওয়ার কোম্পানি এবং পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারির মতো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও উদ্যোক্তা মরহুম রেজাকুল হায়দার দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো ছিলেন। অসংখ্য শিল্প, শিক্ষা, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণে তার মুখ্য ভূমিকা অনেককাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রখর ধীশক্তি, অধ্যাবসায়, অনন্য অভিজ্ঞতা, প্রাজ্ঞতা, দূরদর্শিতা, মুক্ত মনন, সততা, ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠায় আপসহীনতা, একনিষ্ঠ দেশপ্রেম ও সহায়হীন মানুষের জন্য কিছু করার অক্লান্ত প্রচেষ্টা তাকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করেছে।

মরহুম রেজাকুল হায়দার একজন সফল শিল্পপতি হওয়া সত্ত্বেও তার আচার-ব্যবহারে বিত্তের কোনো অসংযত প্রকাশ ছিল না। দারুণ অমায়িক ও মার্জিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএফআইএলের চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যাংকিং সম্পর্কে তার বেশ জানাশোনা ছিল; বিশেষ করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি সম্পর্কে তার ব্যাপক ধারণা ছিল।

১৯৮৪ সালে পার্টনারশিপে একটি গার্মেন্টের মাধ্যমে ব্যবসা শুরুর পর একের পর এক অসংখ্য মিল-কারখানা গড়ে তুলেছেন রেজাকুল হায়দার। এর মধ্যে ইয়ুথ ফ্যাশন, ইয়ুথ গার্মেন্টস, শাহজীবাজার পাওয়ার কোম্পানি, পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি, পেট্রোম্যাক্স সিলিন্ডার, মিডল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি উল্লেখযোগ্য। তিনি ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়াও ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিংস লিমিটেড, কমফিট কম্পোজিট নিট লিমিটেডসহ আরও অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠায় তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল।

অনেক মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডে তিনি অর্থ প্রদান করতেন এমনভাবে; যাতে কেউ তার নামটি পর্যন্ত উচ্চারণ না করেন। তিনি নোয়াখালীর চরভাটায় এককভাবে দুটি মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। নিজ এলাকা সন্দ্বীপের যত মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, স্কুল-কলেজ আছে; প্রায় সবখানে তার উল্লেখযোগ্য দানের ছোঁয়া আছে। সন্দ্বীপের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৫৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তার জন্ম হয়েছিল। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বহু স্থানে মসজিদ-মাদ্রাসায় তিনি অকাতরে অর্থ দিয়েছেন। তার কাছে একবার একটি মসজিদ কমিটির লোকজন এসে বলল-মসজিদে এতগুলো টিন লাগবে। তিনি বললেন, টিন দেবেন কেন; ছাদ ঢালাইয়ের ব্যবস্থা করুন। এরপর তিনিই সব খরচ বহন করে পুরো মসজিদ নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। কেউ হয়তো মসজিদের কিছু টাইলস চেয়ে তার কাছে আবেদন করেছেন; তিনি চারতলা মসজিদের পুরো টাইলস নিজে পছন্দ করে কিনে দিয়ে ফিনিশিং পর্যন্ত সবকিছুর তদারকি করেছেন। বঞ্চিত, দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া খেটে খাওয়া সন্দ্বীপের অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য তার শিল্পগ্রুপের উদ্যোগে ‘স্বর্ণদ্বীপ ফাউন্ডেশন হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠা করেছেন; যেখানে খুব সহজে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন সন্দ্বীপের লোকজন।

মহান আল্লাহ রেজাকুল হায়দারকে তার কাছে ডেকে নিয়েছেন এ বছরের ২৩ এপ্রিল। পবিত্র রমজান মাসে রহমতের দশকের শেষদিন শুক্রবার তিনি ইন্তেকাল করেন। পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালা তাকে মাগফিরাত দান করে জান্নাতবাসী করুন।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আইএফআইএল; সহসভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

মানবহিতৈষী এক শিল্পপতির বিদায়

 আবু জাফর মো. সালেহ্ 
২৮ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইয়ুথ গ্রুপ, আইএফআইএল, শাহজীবাজার পাওয়ার কোম্পানি এবং পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারির মতো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও উদ্যোক্তা মরহুম রেজাকুল হায়দার দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো ছিলেন। অসংখ্য শিল্প, শিক্ষা, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণে তার মুখ্য ভূমিকা অনেককাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রখর ধীশক্তি, অধ্যাবসায়, অনন্য অভিজ্ঞতা, প্রাজ্ঞতা, দূরদর্শিতা, মুক্ত মনন, সততা, ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠায় আপসহীনতা, একনিষ্ঠ দেশপ্রেম ও সহায়হীন মানুষের জন্য কিছু করার অক্লান্ত প্রচেষ্টা তাকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করেছে।

মরহুম রেজাকুল হায়দার একজন সফল শিল্পপতি হওয়া সত্ত্বেও তার আচার-ব্যবহারে বিত্তের কোনো অসংযত প্রকাশ ছিল না। দারুণ অমায়িক ও মার্জিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএফআইএলের চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যাংকিং সম্পর্কে তার বেশ জানাশোনা ছিল; বিশেষ করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি সম্পর্কে তার ব্যাপক ধারণা ছিল।

১৯৮৪ সালে পার্টনারশিপে একটি গার্মেন্টের মাধ্যমে ব্যবসা শুরুর পর একের পর এক অসংখ্য মিল-কারখানা গড়ে তুলেছেন রেজাকুল হায়দার। এর মধ্যে ইয়ুথ ফ্যাশন, ইয়ুথ গার্মেন্টস, শাহজীবাজার পাওয়ার কোম্পানি, পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি, পেট্রোম্যাক্স সিলিন্ডার, মিডল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি উল্লেখযোগ্য। তিনি ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়াও ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিংস লিমিটেড, কমফিট কম্পোজিট নিট লিমিটেডসহ আরও অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠায় তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল।

অনেক মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডে তিনি অর্থ প্রদান করতেন এমনভাবে; যাতে কেউ তার নামটি পর্যন্ত উচ্চারণ না করেন। তিনি নোয়াখালীর চরভাটায় এককভাবে দুটি মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। নিজ এলাকা সন্দ্বীপের যত মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, স্কুল-কলেজ আছে; প্রায় সবখানে তার উল্লেখযোগ্য দানের ছোঁয়া আছে। সন্দ্বীপের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৫৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তার জন্ম হয়েছিল। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বহু স্থানে মসজিদ-মাদ্রাসায় তিনি অকাতরে অর্থ দিয়েছেন। তার কাছে একবার একটি মসজিদ কমিটির লোকজন এসে বলল-মসজিদে এতগুলো টিন লাগবে। তিনি বললেন, টিন দেবেন কেন; ছাদ ঢালাইয়ের ব্যবস্থা করুন। এরপর তিনিই সব খরচ বহন করে পুরো মসজিদ নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। কেউ হয়তো মসজিদের কিছু টাইলস চেয়ে তার কাছে আবেদন করেছেন; তিনি চারতলা মসজিদের পুরো টাইলস নিজে পছন্দ করে কিনে দিয়ে ফিনিশিং পর্যন্ত সবকিছুর তদারকি করেছেন। বঞ্চিত, দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া খেটে খাওয়া সন্দ্বীপের অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য তার শিল্পগ্রুপের উদ্যোগে ‘স্বর্ণদ্বীপ ফাউন্ডেশন হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠা করেছেন; যেখানে খুব সহজে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন সন্দ্বীপের লোকজন।

মহান আল্লাহ রেজাকুল হায়দারকে তার কাছে ডেকে নিয়েছেন এ বছরের ২৩ এপ্রিল। পবিত্র রমজান মাসে রহমতের দশকের শেষদিন শুক্রবার তিনি ইন্তেকাল করেন। পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালা তাকে মাগফিরাত দান করে জান্নাতবাসী করুন।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আইএফআইএল; সহসভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন