করোনামুক্ত থাকতে দরকার খোলা হাওয়া-বাতাস ও ভেন্টিলেশন
jugantor
করোনামুক্ত থাকতে দরকার খোলা হাওয়া-বাতাস ও ভেন্টিলেশন

  মাহবুবউদ্দিন চৌধুরী  

০৫ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ববিখ্যাত ল্যান্সেট জার্নালে প্রকাশিত কয়েকজন বিজ্ঞানীর যৌথ গবেষণায় একাধিক তথ্যপ্রমাণ দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে করোনাভাইরাস বাতাসে ছড়ায়-অর্থাৎ বায়ুবাহিত। অবশ্য গত বছর থেকেই অনেক বিজ্ঞানী এ বিষয়ে ভাবনা-চিন্তা করছেন। ল্যান্সেটের গবেষকদের কৃতিত্ব যে, তারা সব প্রমাণ একত্রিত করে বৈজ্ঞানিক যুক্তি জোরালো করলেন। তাহলে কি এক বছর ধরে যা করা হলো, সব ভুল? না। আগের মতোই মাস্ক পরতে হবে (বরং ডবল মাস্ক পরলে বেশি ভালো) এবং শারীরিক দূরত্ব আরও বাড়াতে হবে। কিন্তু বায়ুবাহিত ভাইরাসের অস্তিত্ব যখন এবার প্রমাণিত হয়েছে, তখন মাস্ক ও দূরত্ব ছাড়া আরও কিছু সুরক্ষাবিধির কথা বলা হচ্ছে। প্রয়োজন ইনডোর পরিবেশে ভালো করে হাওয়া-বাতাস চলাচল অর্থাৎ ভেন্টিলেশন।

হাওয়া-বাতাস চলাচল জরুরি কেন? বিজ্ঞানীরা প্রথমে ভেবেছিলেন, করোনাভাইরাস মূলত নাক-মুখ নিঃসৃত পানির বড় ফোঁটার (ড্রপলেট) মাধ্যমে ছড়ায়। তবে ড্রপলেট আয়তনে বড় হাওয়ায় বেশি দূর যাওয়ার আগেই মধ্যাকর্ষণের জন্য মাটিতে পড়ে যায়। সেজন্যই দুই গজের দূরত্ব, মাস্ক পরা এবং মেঝে, টেবিল, দৈনন্দিন জীবনে ব্যাবহৃত নানা সামগ্রী স্যানিটাইজ করায় জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত এক বছরের গবেষণা থেকে বিশেষজ্ঞ মহল এখন নিশ্চিত, ড্রপলেট সাইজে বড় হলেও আসলে ওরা ছোটখাটো অপরাধী। একজন সংক্রমিত ব্যক্তি আশপাশের অন্যদের কাছে এই ভাইরাস মূলত পৌঁছে দেন পানির ক্ষুদ্র কণার (বৈজ্ঞানিক নাম ‘অ্যারোসল’ বা ড্রপলেট নিউক্লি) মাধ্যমে।

প্রথমত, আয়তনে ছোট্ট বলে ভাইরাস-ভরা অ্যারোসল মাটিতে চট করে না পড়ে বেশ কয়েক ঘণ্টা হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। তখন যে কারও পক্ষে ভাইরাস-ভরা অ্যারোসল নিশ্বাসের সঙ্গে টেনে নেওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। দ্বিতীয়ত, করোনা রোগী কাশি দিলে যত না ড্রপলেট বের হয়, তার থেকে অনেক বেশি বের হয় অ্যারোসল। তৃতীয়ত, করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে অন্তত ৫৯ শতাংশই উপসর্গহীন। তাদের হাঁচি-কাশি না হলেও নিশ্বাস-প্রশ্বাস ও কথাবার্তার সঙ্গে অ্যারোসল বের হতেই থাকে। জোরে কথা বললে আরও বেশি ভাইরাস-ভরা অ্যারোসল বেরিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এজন্যই উপসর্গহীনরাই এ অতিমারির প্রধান বাহক।

বেশির ভাগ সংক্রমণ কোথায়?

বাড়ি, অফিস, দোকান, রেস্তোরাঁ, ভিড়, যানবাহন বা হাসপাতাল থেকেই ৯০ শতাংশের বেশি সংক্রমণ হয়েছে। কারণ যে কোনো ইনডোর পরিবেশে হাওয়া চলাচল বাইরের তুলনায় কম হয়। ভিড় হলে, জানলা-দরজা বন্ধ থাকলে আরও কম। এ অবস্থায় একজন করোনা-আক্রান্ত ভাইরাস-ভরা অ্যারোসল নিঃসৃত করতে থাকলে তখন সেই অ্যারোসল ঘরের মধ্যেই কয়েক ঘণ্টা ধরে ঘুরপাক খেতে থাকে এবং ঘরের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। আধ ঘণ্টা বাদে কেউ ঢুকলেও তার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি পুরোমাত্রায় থাকছে। অন্যদিকে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করার সময় বা জানলা-খোলা ফাঁকা গাড়িতে সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা অনেক কম। কারণ, আউটডোর পরিবেশে বাতাসের পরিমাণ ও চলাচল ঘরের তুলনায় সব সময়ই বেশি। প্রচণ্ড ভিড়ে, অনেকক্ষণ ধরে কাছাকাছি না থাকলে আক্রান্ত থেকে যথেষ্ট সংখ্যায় অ্যারোসল অন্যের কাছে পৌঁছবে না।

এসি নয়, ভরসা রাখুন সিলিং ফ্যানে

করোনাকে পরাস্ত করতে জানালা খুলে রাখুন। কামরার ভেন্টিলেশন বাড়িয়ে দিন। বিশেষ করে যে জায়গায় বহু মানুষ যাওয়া-আসা করেন; যেমন অফিস, ব্যাংক, পোস্ট অফিস, দোকান, মল, রেস্তোরাঁ, টিকা কেন্দ্র, টিউশন ক্লাস, রেল ইত্যাদি। সেখানে ভালো করে হাওয়া-বাতাস চলাচল করুক। গ্রীষ্মকালে এসি প্রয়োজনীয়। কিন্তু এসি যন্ত্র ঘরের মধ্যে একই বাতাসকে বারবার ঠান্ডা ও শুষ্ক করে পুনরায় বাহিত করতে থাকে। এমন বাতাসেই ভাইরাসের স্থায়িত্ব বেশি। তাই এ বছর এসি বন্ধ করে সিলিং ফ্যান আর এক্সহস্ট পাখা চালানো উচিত। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেলে মাস্ক ও দূরত্ববিধিই যথেষ্ট নয়। তাই উন্নত মানের হেপা ফিল্টার বা এমইআরভি ফিল্টার (যা দিয়ে প্লেনের বাতাস পরিশোধিত করা হয়) ব্যবহার করার সময় এসেছে।

হাসপাতাল ও ডাক্তারখানা এবং টিকা কেন্দ্রের ভিড় থেকেই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এসব কেন্দ্রে আউটডোর ব্যবস্থা করতেই হবে। মনে রাখবেন, সচেতনতার মাধ্যমেই কেবল করোনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ঢাকা

করোনামুক্ত থাকতে দরকার খোলা হাওয়া-বাতাস ও ভেন্টিলেশন

 মাহবুবউদ্দিন চৌধুরী 
০৫ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ববিখ্যাত ল্যান্সেট জার্নালে প্রকাশিত কয়েকজন বিজ্ঞানীর যৌথ গবেষণায় একাধিক তথ্যপ্রমাণ দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে করোনাভাইরাস বাতাসে ছড়ায়-অর্থাৎ বায়ুবাহিত। অবশ্য গত বছর থেকেই অনেক বিজ্ঞানী এ বিষয়ে ভাবনা-চিন্তা করছেন। ল্যান্সেটের গবেষকদের কৃতিত্ব যে, তারা সব প্রমাণ একত্রিত করে বৈজ্ঞানিক যুক্তি জোরালো করলেন। তাহলে কি এক বছর ধরে যা করা হলো, সব ভুল? না। আগের মতোই মাস্ক পরতে হবে (বরং ডবল মাস্ক পরলে বেশি ভালো) এবং শারীরিক দূরত্ব আরও বাড়াতে হবে। কিন্তু বায়ুবাহিত ভাইরাসের অস্তিত্ব যখন এবার প্রমাণিত হয়েছে, তখন মাস্ক ও দূরত্ব ছাড়া আরও কিছু সুরক্ষাবিধির কথা বলা হচ্ছে। প্রয়োজন ইনডোর পরিবেশে ভালো করে হাওয়া-বাতাস চলাচল অর্থাৎ ভেন্টিলেশন।

হাওয়া-বাতাস চলাচল জরুরি কেন? বিজ্ঞানীরা প্রথমে ভেবেছিলেন, করোনাভাইরাস মূলত নাক-মুখ নিঃসৃত পানির বড় ফোঁটার (ড্রপলেট) মাধ্যমে ছড়ায়। তবে ড্রপলেট আয়তনে বড় হাওয়ায় বেশি দূর যাওয়ার আগেই মধ্যাকর্ষণের জন্য মাটিতে পড়ে যায়। সেজন্যই দুই গজের দূরত্ব, মাস্ক পরা এবং মেঝে, টেবিল, দৈনন্দিন জীবনে ব্যাবহৃত নানা সামগ্রী স্যানিটাইজ করায় জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত এক বছরের গবেষণা থেকে বিশেষজ্ঞ মহল এখন নিশ্চিত, ড্রপলেট সাইজে বড় হলেও আসলে ওরা ছোটখাটো অপরাধী। একজন সংক্রমিত ব্যক্তি আশপাশের অন্যদের কাছে এই ভাইরাস মূলত পৌঁছে দেন পানির ক্ষুদ্র কণার (বৈজ্ঞানিক নাম ‘অ্যারোসল’ বা ড্রপলেট নিউক্লি) মাধ্যমে।

প্রথমত, আয়তনে ছোট্ট বলে ভাইরাস-ভরা অ্যারোসল মাটিতে চট করে না পড়ে বেশ কয়েক ঘণ্টা হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। তখন যে কারও পক্ষে ভাইরাস-ভরা অ্যারোসল নিশ্বাসের সঙ্গে টেনে নেওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। দ্বিতীয়ত, করোনা রোগী কাশি দিলে যত না ড্রপলেট বের হয়, তার থেকে অনেক বেশি বের হয় অ্যারোসল। তৃতীয়ত, করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে অন্তত ৫৯ শতাংশই উপসর্গহীন। তাদের হাঁচি-কাশি না হলেও নিশ্বাস-প্রশ্বাস ও কথাবার্তার সঙ্গে অ্যারোসল বের হতেই থাকে। জোরে কথা বললে আরও বেশি ভাইরাস-ভরা অ্যারোসল বেরিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এজন্যই উপসর্গহীনরাই এ অতিমারির প্রধান বাহক।

বেশির ভাগ সংক্রমণ কোথায়?

বাড়ি, অফিস, দোকান, রেস্তোরাঁ, ভিড়, যানবাহন বা হাসপাতাল থেকেই ৯০ শতাংশের বেশি সংক্রমণ হয়েছে। কারণ যে কোনো ইনডোর পরিবেশে হাওয়া চলাচল বাইরের তুলনায় কম হয়। ভিড় হলে, জানলা-দরজা বন্ধ থাকলে আরও কম। এ অবস্থায় একজন করোনা-আক্রান্ত ভাইরাস-ভরা অ্যারোসল নিঃসৃত করতে থাকলে তখন সেই অ্যারোসল ঘরের মধ্যেই কয়েক ঘণ্টা ধরে ঘুরপাক খেতে থাকে এবং ঘরের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। আধ ঘণ্টা বাদে কেউ ঢুকলেও তার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি পুরোমাত্রায় থাকছে। অন্যদিকে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করার সময় বা জানলা-খোলা ফাঁকা গাড়িতে সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা অনেক কম। কারণ, আউটডোর পরিবেশে বাতাসের পরিমাণ ও চলাচল ঘরের তুলনায় সব সময়ই বেশি। প্রচণ্ড ভিড়ে, অনেকক্ষণ ধরে কাছাকাছি না থাকলে আক্রান্ত থেকে যথেষ্ট সংখ্যায় অ্যারোসল অন্যের কাছে পৌঁছবে না।

এসি নয়, ভরসা রাখুন সিলিং ফ্যানে

করোনাকে পরাস্ত করতে জানালা খুলে রাখুন। কামরার ভেন্টিলেশন বাড়িয়ে দিন। বিশেষ করে যে জায়গায় বহু মানুষ যাওয়া-আসা করেন; যেমন অফিস, ব্যাংক, পোস্ট অফিস, দোকান, মল, রেস্তোরাঁ, টিকা কেন্দ্র, টিউশন ক্লাস, রেল ইত্যাদি। সেখানে ভালো করে হাওয়া-বাতাস চলাচল করুক। গ্রীষ্মকালে এসি প্রয়োজনীয়। কিন্তু এসি যন্ত্র ঘরের মধ্যে একই বাতাসকে বারবার ঠান্ডা ও শুষ্ক করে পুনরায় বাহিত করতে থাকে। এমন বাতাসেই ভাইরাসের স্থায়িত্ব বেশি। তাই এ বছর এসি বন্ধ করে সিলিং ফ্যান আর এক্সহস্ট পাখা চালানো উচিত। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেলে মাস্ক ও দূরত্ববিধিই যথেষ্ট নয়। তাই উন্নত মানের হেপা ফিল্টার বা এমইআরভি ফিল্টার (যা দিয়ে প্লেনের বাতাস পরিশোধিত করা হয়) ব্যবহার করার সময় এসেছে।

হাসপাতাল ও ডাক্তারখানা এবং টিকা কেন্দ্রের ভিড় থেকেই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এসব কেন্দ্রে আউটডোর ব্যবস্থা করতেই হবে। মনে রাখবেন, সচেতনতার মাধ্যমেই কেবল করোনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ঢাকা

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন