প্রযত্নে মানসিক স্বাস্থ্য
jugantor
প্রযত্নে মানসিক স্বাস্থ্য

  ফাবিহা বিনতে হক  

১২ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অবহেলিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি মানসিক স্বাস্থ্য। আর এর পেছনে যথেষ্ট কারণও বিদ্যমান। দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, কুসংস্কার এবং আরও নানাবিধ সামাজিক সমস্যাজনিত কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি পুরো জীবনেও হয়তো আড়াল থেকে বের হতে পারে না। আমাদের রক্ত-মাংসের শরীরের মতো মনেরও একটা শরীর আছে। আর তাকেও ভালো রাখতে হয়, ভালো রাখার চেষ্টা করতে হয়। তবে মন দেখা যায় না বলে আমরা মনের ব্যাপারে বরাবরই ভীষণ উদাসীন থাকি।

এই অতিমারির সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি খুব প্রকটভাবে আমাদের সামনে এসেছে এবং তা একেবারেই অনাবরু হয়ে। মেন্টাল হেলথের দিকে আমরা তখনই কিছুটা হলেও দৃষ্টি ফেরালাম, যখন চারপাশে করোনায় মৃত্যুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল আত্মহত্যার সংখ্যা। তবে সেটাও কেবল দৃষ্টি ফেরানো পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। আমরা এখন জানি, মনের উপস্থিতি কেবল প্রেমিকের কবিতা কিংবা লেখকের গল্পে নয়; ভীষণ ব্যস্ত ইটকাঠের নগরীর প্রতিটি পরতে পরতে বিদ্যমান। তবে কিছুক্ষেত্রে শরীরের চেয়ে মনের স্বাস্থ্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, শরীরের অসুখ হলে বিভিন্ন উপসর্গের মাধ্যমে আমরা তা টের পেয়ে যাই; কিন্তু মনের অসুখ অনেকটা সময়জুড়ে সুপ্তাবস্থায় থাকে। ছোট ছোট উপসর্গগুলো চিকিৎসা না পেয়ে একসময় বৃহৎ আকার ধারণ করে। আমরা ডিপ্রেশনে তখনই ভুগি; যখন দেখি, আমি অথৈ জলে ডুবে আছি এবং এতটাই গভীর সেই জল যে, সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই চারপাশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ডিপ্রেশন বা হতাশা মানেই আশার অভাব, সম্ভাবনাহীনতা।

হতাশা বা ডিপ্রেশন এইডসের মতোই একটি পরিণতির নাম। এইডস শরীরের অসুখ আর ডিপ্রেশন মনের। দীর্ঘদিন বিভিন্ন সমস্যায় পর্যুদস্ত হয়ে মানুষ হতাশাক্রান্ত হয়। তাই একজন ব্যক্তির জীবনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমি আজকের লেখায় সমস্যার একটি দিক নিয়ে আলোচনা করব। জীবনের যাত্রাপথে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। কেউ কেউ অল্প সময় জুড়ে যাত্রাসঙ্গী হয়; আবার কেউ কেউ অনেকটা সময়ের সাক্ষী হিসাবে যাত্রাপথে থাকে। সেসব সঙ্গীকে আমরা যে সম্পর্কের নাম ধরেই পরিচিত করতে চাই না কেন; তারা আমার জন্য উপকারী, না ক্ষতিকর-তা বুঝতে শেখা উচিত। আমার যাত্রাসঙ্গীটি বন্ধু হতে পারে; ভালোবাসার মানুষ হতে পারে; পরিবার হতে পারে। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আমরা বদলে যেতে থাকি বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে। সেই বদলটা আমার জন্য ইতিবাচক কিনা, তা মাথায় রাখা জরুরি।

যেসব মানুষের সাহচর্য আমাকে পরাধীন করে দেয়, নীতিনৈতিকতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে আর প্রচণ্ড ভাবাবেগের ছদ্মাবরণে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়; তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করাই শ্রেয়। কারণ, এই মানুষগুলো আপনার জন্য ক্ষতিকর। তবে সবচেয়ে রুঢ় বাস্তবতা হলো, মানুষের মন বইয়ের ভাষা বোঝে না; বুঝলেও মানে না। আর তাই বারবার ভুল করে নিজেই নিজের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াই। মানুষের একটা সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো, সে ভালোবাসা দেওয়ার চেয়ে পাওয়ার প্রতি বেশি আগ্রহী। আর সেই ভালোবাসা পেতে নিজের জীবনকে বাজি রাখতেও সে কুণ্ঠাবোধ করে না। বেশিরভাগ আত্মহত্যার মূলে থাকে প্রেম সংক্রান্ত জটিলতা; মানুষ মরে যেতে চায় একটুখানি মমতার আশায়। তারা মরে যাবে ভেবে শান্তি পায়-হয়তো এতে কারো মনে একটু হলেও ধাক্কা দেওয়া যাবে। এভাবেই ভুল মানুষের প্রতি ভুল ভালোবাসা দুষ্ট রাহুর গ্রাসের মতো আমাদের চিন্তাচেতনা ও ভাবনাগুলোকে স্থবির করে দেয়।

ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা, সহানুভূতি ইত্যাদি মানসিক আনন্দের প্রধান খোরাক হলেও আমরা যেন সেসব অনুভূতির দাসত্ব না করি; সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যে কোনো সমস্যার সাময়িক সমাধান অনেক সময় সেই সমস্যাকে আরও গভীর করে তোলে। তাই সাময়িক সমাধানের কথা না ভেবে স্থায়ী সমাধানের কথা ভাবতে হবে। জীবনের কিছুক্ষেত্রে স্বার্থপর হওয়া জরুরি। বলা হয়ে থাকে ঐধঢ়ঢ়রহবংং রং ধ পযড়রপব. তাই দিনশেষে নিজেকে ভালো রাখার দায় একান্তই নিজের উপর বর্তায়। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিজেকে যে কোনো ক্ষতিকর মানুষ এবং তার সহানুভূতির দাসত্ব থেকে মুক্ত রাখতে হবে। মানসিক জটিলতাগুলো গুরুত্ব সহকারে নিয়ে তা থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

fabihabintehaue83@gmail.com

প্রযত্নে মানসিক স্বাস্থ্য

 ফাবিহা বিনতে হক 
১২ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অবহেলিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি মানসিক স্বাস্থ্য। আর এর পেছনে যথেষ্ট কারণও বিদ্যমান। দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, কুসংস্কার এবং আরও নানাবিধ সামাজিক সমস্যাজনিত কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি পুরো জীবনেও হয়তো আড়াল থেকে বের হতে পারে না। আমাদের রক্ত-মাংসের শরীরের মতো মনেরও একটা শরীর আছে। আর তাকেও ভালো রাখতে হয়, ভালো রাখার চেষ্টা করতে হয়। তবে মন দেখা যায় না বলে আমরা মনের ব্যাপারে বরাবরই ভীষণ উদাসীন থাকি।

এই অতিমারির সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি খুব প্রকটভাবে আমাদের সামনে এসেছে এবং তা একেবারেই অনাবরু হয়ে। মেন্টাল হেলথের দিকে আমরা তখনই কিছুটা হলেও দৃষ্টি ফেরালাম, যখন চারপাশে করোনায় মৃত্যুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল আত্মহত্যার সংখ্যা। তবে সেটাও কেবল দৃষ্টি ফেরানো পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। আমরা এখন জানি, মনের উপস্থিতি কেবল প্রেমিকের কবিতা কিংবা লেখকের গল্পে নয়; ভীষণ ব্যস্ত ইটকাঠের নগরীর প্রতিটি পরতে পরতে বিদ্যমান। তবে কিছুক্ষেত্রে শরীরের চেয়ে মনের স্বাস্থ্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, শরীরের অসুখ হলে বিভিন্ন উপসর্গের মাধ্যমে আমরা তা টের পেয়ে যাই; কিন্তু মনের অসুখ অনেকটা সময়জুড়ে সুপ্তাবস্থায় থাকে। ছোট ছোট উপসর্গগুলো চিকিৎসা না পেয়ে একসময় বৃহৎ আকার ধারণ করে। আমরা ডিপ্রেশনে তখনই ভুগি; যখন দেখি, আমি অথৈ জলে ডুবে আছি এবং এতটাই গভীর সেই জল যে, সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই চারপাশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ডিপ্রেশন বা হতাশা মানেই আশার অভাব, সম্ভাবনাহীনতা।

হতাশা বা ডিপ্রেশন এইডসের মতোই একটি পরিণতির নাম। এইডস শরীরের অসুখ আর ডিপ্রেশন মনের। দীর্ঘদিন বিভিন্ন সমস্যায় পর্যুদস্ত হয়ে মানুষ হতাশাক্রান্ত হয়। তাই একজন ব্যক্তির জীবনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমি আজকের লেখায় সমস্যার একটি দিক নিয়ে আলোচনা করব। জীবনের যাত্রাপথে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। কেউ কেউ অল্প সময় জুড়ে যাত্রাসঙ্গী হয়; আবার কেউ কেউ অনেকটা সময়ের সাক্ষী হিসাবে যাত্রাপথে থাকে। সেসব সঙ্গীকে আমরা যে সম্পর্কের নাম ধরেই পরিচিত করতে চাই না কেন; তারা আমার জন্য উপকারী, না ক্ষতিকর-তা বুঝতে শেখা উচিত। আমার যাত্রাসঙ্গীটি বন্ধু হতে পারে; ভালোবাসার মানুষ হতে পারে; পরিবার হতে পারে। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আমরা বদলে যেতে থাকি বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে। সেই বদলটা আমার জন্য ইতিবাচক কিনা, তা মাথায় রাখা জরুরি।

যেসব মানুষের সাহচর্য আমাকে পরাধীন করে দেয়, নীতিনৈতিকতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে আর প্রচণ্ড ভাবাবেগের ছদ্মাবরণে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়; তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করাই শ্রেয়। কারণ, এই মানুষগুলো আপনার জন্য ক্ষতিকর। তবে সবচেয়ে রুঢ় বাস্তবতা হলো, মানুষের মন বইয়ের ভাষা বোঝে না; বুঝলেও মানে না। আর তাই বারবার ভুল করে নিজেই নিজের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াই। মানুষের একটা সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো, সে ভালোবাসা দেওয়ার চেয়ে পাওয়ার প্রতি বেশি আগ্রহী। আর সেই ভালোবাসা পেতে নিজের জীবনকে বাজি রাখতেও সে কুণ্ঠাবোধ করে না। বেশিরভাগ আত্মহত্যার মূলে থাকে প্রেম সংক্রান্ত জটিলতা; মানুষ মরে যেতে চায় একটুখানি মমতার আশায়। তারা মরে যাবে ভেবে শান্তি পায়-হয়তো এতে কারো মনে একটু হলেও ধাক্কা দেওয়া যাবে। এভাবেই ভুল মানুষের প্রতি ভুল ভালোবাসা দুষ্ট রাহুর গ্রাসের মতো আমাদের চিন্তাচেতনা ও ভাবনাগুলোকে স্থবির করে দেয়।

ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা, সহানুভূতি ইত্যাদি মানসিক আনন্দের প্রধান খোরাক হলেও আমরা যেন সেসব অনুভূতির দাসত্ব না করি; সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যে কোনো সমস্যার সাময়িক সমাধান অনেক সময় সেই সমস্যাকে আরও গভীর করে তোলে। তাই সাময়িক সমাধানের কথা না ভেবে স্থায়ী সমাধানের কথা ভাবতে হবে। জীবনের কিছুক্ষেত্রে স্বার্থপর হওয়া জরুরি। বলা হয়ে থাকে ঐধঢ়ঢ়রহবংং রং ধ পযড়রপব. তাই দিনশেষে নিজেকে ভালো রাখার দায় একান্তই নিজের উপর বর্তায়। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিজেকে যে কোনো ক্ষতিকর মানুষ এবং তার সহানুভূতির দাসত্ব থেকে মুক্ত রাখতে হবে। মানসিক জটিলতাগুলো গুরুত্ব সহকারে নিয়ে তা থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

fabihabintehaue83@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন