মূর্তিমান আতঙ্কের নাম এলএসডি
jugantor
মূর্তিমান আতঙ্কের নাম এলএসডি

  আবু সালেহ মোহাম্মদ সায়েম  

০৯ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা শরীর বিবস্ত্র। শুধু একটি শর্টস পরিহিত যুবক। এর পর ভ্যান গাড়ি থেকে ডাব কাটার দা নিয়ে নিজের গলায় আঘাত! ভাবা যায়, কতটা মানসিক বিকারগ্রস্ত হলে এ ধরনের কাজ করা সম্ভব।

শুধু মাদকসেবনকারী বা বদ্ধ উন্মাদদের পক্ষেই বুঝি এমন ভয়ংকর, লোমহর্ষক কাজ করা সম্ভব! জানা গেছে, বর্তমানে মাদকের সবোর্চ্চ মাত্রায় থাকা ‘এলএসডি’ গ্রহণে মানুষ বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হতে পারে নিমিষেই। ফলে অলীক, অবাস্তব চিন্তাচেতনা, হ্যালুসিনেশন ইত্যাদি নানা ধরনের বিপত্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে যে কেউ।

লাইসার্জিক এসিড ডাই-ইথালামাইড বা এলএসডি এক ধরনের তরল। এটি ব্লটিং পেপারে সংরক্ষণ করা হয়, যা দেখতে ডাকটিকিটের মতো। এ ছাড়া ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল আকারে, তরল বা কিউব আকারে পাওয়া যায়। এ ভয়ংকর মাদক সেবনে এতটাই বিভ্রম তৈরি হয় যে, সেবনকারী নিজেকে প্রচণ্ড শক্তিশালী মনে করে। কিছুতেই কিছু হবে না-এমন বেপরোয়া মনোভাব থেকে সেবনকারী হয়ে ওঠে আত্মঘাতী। শুরুতে এ মাদক ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করা হলেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধ করা হয়। এ মাদক ইউরোপ আমেরিকার অভিভাবকদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এ মাদকের প্রচলন আগে দেখা যায়নি। তবে গত বছর বলিউডের জনপ্রিয় নায়ক সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর আলোচনায় আসে এলএসডি।

মহাখালী ডিওএইচএস থেকে ২০১৯ সালের ১৫ জুলাই এলএসডিসহ দু’জন হাতেনাতে ধরা পড়ে। এ ঘটনায় কাফরুল থানায় একটি মামলাও হয়। মামলা নম্বর ২১। গ্রেপ্তার করা হয় রেদোয়ান আনান ও সৈয়দ আহনাদ আতিফ মাহমুদ নামে দুজনকে। এটিই ছিল দেশে প্রথম এলএসডির চালান। ওই দুই তরুণের কাছ থেকে তখন ৪৬ স্ট্রিপ এলএসডি উদ্ধার করা হয়, যা ওই সময় প্রতিটি স্ট্রিপ ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। গ্রেপ্তারকৃতরা কানাডা থেকে এলএসডি এনেছিলেন বলে স্বীকার করেন।

আজকাল মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গোপনে যোগাযোগ করে পার্সেলে নেদারল্যান্ডস থেকে এলএসডি সংগ্রহ করে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিক্রি করছে বাংলাদেশি একটি চক্র। সম্প্রতি রাজধানীর ধানমণ্ডি ও লালমাটিয়া এলাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তিন তরুণকে এলএসডির ২০০টি ব্লটসহ গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের রমনা বিভাগ। করোনাকালেও থেমে নেই ভয়াবহ মাদকের আগ্রাসন। ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রতিটি প্রান্তে। মহামারির এ সময় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। শিক্ষার্থীদের অনেকেই হতাশ। এ সময়ে ঘরে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের টার্গেট করেছে মাদক কারবারিরা। অনলাইনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণে উৎসাহিত করার পাশাপাশি মাদক সরবরাহ করছে একশ্রেণির মাদক কারকারি। ফলে যে মাদক নির্মূলে সরকার বদ্ধপরিকর, তা পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের দোরগোড়ায়। তীব্র মাত্রার মাদক এলএসডি এতদূরের দেশ থেকে এনে কিভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, সে রহস্য উদঘাটিত করে দায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা উচিত।

মনে রাখা দরকার-শুধু এলএসডি নয়; যে কোনো ধরনের মাদক দেশের যুবসমাজকে খুব সহজেই বিপথগামী করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক ভারসাম্য, সংস্কৃতি, পরিবার, পরিবেশ ধ্বংস করতে মাদকই যথেষ্ট। মাদকাসক্তরা নিজেদের ধ্বংস করছে, পরিবারকেও ঠেলে দিচ্ছে বিপর্যয়ের দিকে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে পরিবার থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন-পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সব মহলকে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের পাশাপাশি মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার সংকল্প এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশের শিক্ষার্থীরা আলোকিত মানুষ হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে।

sayemforaziarc@gmail.com

মূর্তিমান আতঙ্কের নাম এলএসডি

 আবু সালেহ মোহাম্মদ সায়েম 
০৯ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা শরীর বিবস্ত্র। শুধু একটি শর্টস পরিহিত যুবক। এর পর ভ্যান গাড়ি থেকে ডাব কাটার দা নিয়ে নিজের গলায় আঘাত! ভাবা যায়, কতটা মানসিক বিকারগ্রস্ত হলে এ ধরনের কাজ করা সম্ভব।

শুধু মাদকসেবনকারী বা বদ্ধ উন্মাদদের পক্ষেই বুঝি এমন ভয়ংকর, লোমহর্ষক কাজ করা সম্ভব! জানা গেছে, বর্তমানে মাদকের সবোর্চ্চ মাত্রায় থাকা ‘এলএসডি’ গ্রহণে মানুষ বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হতে পারে নিমিষেই। ফলে অলীক, অবাস্তব চিন্তাচেতনা, হ্যালুসিনেশন ইত্যাদি নানা ধরনের বিপত্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে যে কেউ।

লাইসার্জিক এসিড ডাই-ইথালামাইড বা এলএসডি এক ধরনের তরল। এটি ব্লটিং পেপারে সংরক্ষণ করা হয়, যা দেখতে ডাকটিকিটের মতো। এ ছাড়া ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল আকারে, তরল বা কিউব আকারে পাওয়া যায়। এ ভয়ংকর মাদক সেবনে এতটাই বিভ্রম তৈরি হয় যে, সেবনকারী নিজেকে প্রচণ্ড শক্তিশালী মনে করে। কিছুতেই কিছু হবে না-এমন বেপরোয়া মনোভাব থেকে সেবনকারী হয়ে ওঠে আত্মঘাতী। শুরুতে এ মাদক ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করা হলেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধ করা হয়। এ মাদক ইউরোপ আমেরিকার অভিভাবকদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এ মাদকের প্রচলন আগে দেখা যায়নি। তবে গত বছর বলিউডের জনপ্রিয় নায়ক সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর আলোচনায় আসে এলএসডি।

মহাখালী ডিওএইচএস থেকে ২০১৯ সালের ১৫ জুলাই এলএসডিসহ দু’জন হাতেনাতে ধরা পড়ে। এ ঘটনায় কাফরুল থানায় একটি মামলাও হয়। মামলা নম্বর ২১। গ্রেপ্তার করা হয় রেদোয়ান আনান ও সৈয়দ আহনাদ আতিফ মাহমুদ নামে দুজনকে। এটিই ছিল দেশে প্রথম এলএসডির চালান। ওই দুই তরুণের কাছ থেকে তখন ৪৬ স্ট্রিপ এলএসডি উদ্ধার করা হয়, যা ওই সময় প্রতিটি স্ট্রিপ ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। গ্রেপ্তারকৃতরা কানাডা থেকে এলএসডি এনেছিলেন বলে স্বীকার করেন।

আজকাল মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গোপনে যোগাযোগ করে পার্সেলে নেদারল্যান্ডস থেকে এলএসডি সংগ্রহ করে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিক্রি করছে বাংলাদেশি একটি চক্র। সম্প্রতি রাজধানীর ধানমণ্ডি ও লালমাটিয়া এলাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তিন তরুণকে এলএসডির ২০০টি ব্লটসহ গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের রমনা বিভাগ। করোনাকালেও থেমে নেই ভয়াবহ মাদকের আগ্রাসন। ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রতিটি প্রান্তে। মহামারির এ সময় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। শিক্ষার্থীদের অনেকেই হতাশ। এ সময়ে ঘরে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের টার্গেট করেছে মাদক কারবারিরা। অনলাইনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণে উৎসাহিত করার পাশাপাশি মাদক সরবরাহ করছে একশ্রেণির মাদক কারকারি। ফলে যে মাদক নির্মূলে সরকার বদ্ধপরিকর, তা পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের দোরগোড়ায়। তীব্র মাত্রার মাদক এলএসডি এতদূরের দেশ থেকে এনে কিভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, সে রহস্য উদঘাটিত করে দায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা উচিত।

মনে রাখা দরকার-শুধু এলএসডি নয়; যে কোনো ধরনের মাদক দেশের যুবসমাজকে খুব সহজেই বিপথগামী করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক ভারসাম্য, সংস্কৃতি, পরিবার, পরিবেশ ধ্বংস করতে মাদকই যথেষ্ট। মাদকাসক্তরা নিজেদের ধ্বংস করছে, পরিবারকেও ঠেলে দিচ্ছে বিপর্যয়ের দিকে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে পরিবার থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন-পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সব মহলকে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের পাশাপাশি মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার সংকল্প এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশের শিক্ষার্থীরা আলোকিত মানুষ হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে।

sayemforaziarc@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন